ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনে জটিলতা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমান প্রশাসকদের একাংশের অকর্মণ্যতার কারণে দেশের ফুটবলে সংকট বাড়ছে।ভারতের ফুটবল প্রশাসনে বড় পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি ফেডারেশনের নতুন সংবিধানকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই সংবিধান কার্যকর করতে হবে। তবে নতুন নিয়মের একটি ধারা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিপাকে পড়েছেন বহু কর্তা, যাদের অনেককেই হয়তো আসন্ন দিনগুলোতে পদ ছাড়তে হবে। ১২ অক্টোবর, রবিবার অনুষ্ঠিত ফুটবল ফেডারেশনের বার্ষিক সাধারণ সভা এজিএমেই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু নতুন সংবিধান। যে সংবিধান প্রস্তুত করেছিলেন প্রাক্তন বিচারপতি এল. নাগেশ্বর রাও। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি দীর্ঘ পর্যালোচনার পর সংবিধান খসড়া তৈরি করেছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই খসড়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এনে চূড়ান্ত রূপ দেয়। নতুন সংবিধানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হচ্ছে ধারা ২৫.৩ (সি)। এই ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, এআইএফএফ-এর কর্মসমিতির কোনও সদস্য যদি একই সময়ে কোনও রাজ্য সংস্থার (স্টেট অ্যাসোসিয়েশন) পদে থাকেন, তবে তাঁকে একটি পদ ছাড়তে হবে। অর্থাৎ, তিনি হয় কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন, নয়তো রাজ্য সংস্থার কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন দু’টি একসঙ্গে নয়। যদি কেউ পদ না ছাড়েন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর রাজ্য সংস্থার পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খালি বলে গণ্য হবে। এই নিয়ম কার্যকর হলে দেশের ফুটবল প্রশাসনে এক বড়ধরনে রদবদল আসতে পারে। বর্তমানে ফেডারেশনের কর্মসমিতির বহু প্রভাবশালী সদস্যই রাজ্য সংস্থার শীর্ষপদে রয়েছেন। তাঁদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে একই সঙ্গে দুই পদ সামলে আসছেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাঁদের যে কোনো একটি পদ ছাড়তেই হবে। এর সিদ্ধান্তের ফলে একাধিক রাজ্যে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে বাধ্য বলে অনেকেই মনে করছেন।
ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা কর্মসমিতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কেউ কেউ আবার রাজ্য সংস্থার নেতৃত্ব বজায় রেখে ফেডারেশনের পদ ছাড়বেন বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। এই প্রক্রিয়ায় এআইএফএফ-এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। প্রাক্তন বিচারপতি নাগেশ্বর রাও-এর কমিটি যে উদ্দেশ্যে সংবিধানটি তৈরি করেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল ফুটবল প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি। অতীতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দ্বৈত পদে থেকে স্বার্থের সংঘাতসহ নানা অভিযোগ উঠেছিল। নতুন নিয়মের ফলে সেই দ্বৈত ভূমিকা বন্ধ হবে এবং রাজ্য সংস্থা ও কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের মধ্যে দায়িত্বের সীমানা আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দেশের অন্যান্য কয়েকটি রাজ্য সংস্থার কর্তা এই সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, রাজ্যের প্রতিনিধিত্বের অভিজ্ঞতা ফেডারেশনের নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে। একই ব্যক্তি যদি দুই জায়গায় থেকে কাজ করতে না পারেন, তাহলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যা হবে। সবমিলিয়ে, নতুন সংবিধানের প্রয়োগ এআইএফএফ-এর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এটি প্রশাসনিক অস্থিরতার সূচনা করতে পারে। ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক রূপ এখন নির্ভর করছে সেই সভার সিদ্ধান্তের ওপর।
ফুটবল সম্পর্কিত কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করা সুপ্রিম কোর্টের কাজ নয়। শীর্ষ আদালত শুধু কোনও বেনিয়ম বা সমস্যা তৈরি হলে সেই সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট ফেডারেশনের নতুন সংবিধান নিয়ে যে রায় দিয়েছিল, তারই একটা ধারা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ণ চেয়েছিলেন ফেডারেশনের আইনজীবী। ফেডারেশনের নতুন সংবিধানে ২৫.৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফেডারেশনের কার্যকারী কমিটির সদস্য হলে তাঁকে রাজ্য সংস্থার পদ ছাড়তে হবে। যার অর্থ, রাজ্য ফুটবল সংস্থা অথবা সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার মধ্যে সদস্য হিসাবে থাকার জন্য যে কোনও একটি সংস্থাকে বেছে নিতে হবে। এখানেই হচ্ছে মূল সমস্যা। ফেডারেশনের বর্তমান কার্যকরী কমিটিতে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারিস-সহ বেশিরভাগ সদস্যই কোনও না কোনও রাজ্য ফুটবল সংস্থার প্রতিনিধি হিসাবে আছেন। যাঁরা ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য হওয়ার পাশাপাশি রাজ্য ফুটবল সংস্থার কার্যকরী কমিটিরও সদস্য। ফলে সমস্যায় পড়েছেন তাঁরাই। ফেডা১রেশনে বর্তমান এই কমিটির মেয়াদ রয়েছে আরও আট মাসের মতো। তারপরেই রয়েছে নির্বাচন। এই কমিটিতে এখন থাকতে গেলে রাজ্য ফুটবল সংস্থার পদ ছেড়ে দিতে হবে।
এদিকে আট মাস পরে ফেডারেশনের নির্বাচনে বর্তমান কার্যকরী কমিটির সদস্যরাই যে নির্বাচিত হবেন এরকম কোনও গ্যারান্টি নেই। সেইরকম হলে ফেডারেশনের পদও যাবে আবার রাজ্য ফুটবল সংস্থার পদও হাতছাড়া হবে। বলতে গেলে প্রশাসক হিসাবে ফুটবল মহল থেকে হারিয়ে যেতে হবে। তাই ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটির বহু সদস্যরাই চাইছেন না রাজ্য ফুটবল সংস্থার পদ ছেড়ে দিয়ে মাত্র আট মাসের জন্য ফেডারেশনের কমিটিতে থাকতে। আর সত্যি সত্যিই যদি এই রকমটা হয় ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটিতে শূন্যতা তৈরি হবে।
এই সমস্যা কাটাতে ওই ধারায় পুনর্মুল্যয়ণ চেয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ফেডারেশন। ফেডারেশনের আইনজীবীর বক্তব্য, ওই একটি ধারায় আপত্তি রয়েছে ফিফারও। তাই স্পষ্টতা প্রয়োজন। যার প্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালতের পিএস নরসীমা রাও আর এসএস চান্দুরকরের ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য, “আমাদের ভারতীয় ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও ইচ্ছা নেই। এই সমস্যাটা আদালতের বাইরেও মেটানো যেত। যাই হোক এ বিষয়ে প্রাক্তন বিচারপতি নাগেশ্বর রাও এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির মতামত নেবে শীর্ষ আদালত।” ওই দুই বিচারপতিই ফেডারেশনের সংবিধান মামলা শুনেছেন। কোর্টের তরফে জানানো হয়েছে, যিনি নতুন খসড়া সংবিধান তৈরি করেছেন সেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নাগেশ্বর রাও শনিবার সব পক্ষের কথা শুনবেন। তাঁর রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেবে সুপ্রিম কোর্ট।





