জল্পনা নয়, পরপর পোস্ট দিচ্ছে খোদ হোয়াইট হাউস। সোশ্যাল মিডিয়া, এক্স হ্যান্ডেলে একের পর এক পোস্ট। কাউন্ট ডাউন। একপক্ষের দিকে আঙুল। স্পষ্ট মূল বার্তা। স্পষ্ট, আর কিছুক্ষণেই অচল হয়ে পড়তে পারে গোটা মার্কিন প্রশাসন। ট্রাম্প সরকারের ‘শাটডাউন’ স্পষ্ট হচ্ছে ওই পোস্টগুলি থেকেই। জানা যাচ্ছে, বুধবার থেকেই, অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল হয়ে পড়বে মার্কিন সরকার। কিন্তু আচমকা কেন এই পরিস্থিতি? এই গোটা ঘটনার পিছনে রয়েছে মঙ্গলবারের এক বৈঠক। মঙ্গলবার বৈঠক বসেছিল, কারণ ১ অক্টোবর থেকে মার্কিন মুলুকে শুরু হয় অর্থবর্ষ। গত অর্থ বর্ষের শেষদিনে অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর নয়া অনুমোদন বিল প্রসঙ্গে একমত হতে পারেনি দুই পক্ষ। জানা গিয়েছে, রিপাবলিকান এবং ড্যামোক্রেটরা প্রশাসনের তহবিল সংক্রান্ত বলে একমত হতে পারেনি কোনও শর্তেই। বরাদ্দ তহবিলের নয়া বিল রিপাবলিকানরা পাশ করাতে চাইলেও, তাতে ভোট মেলেনি ডেমোক্র্যাটদের। পর্যাপ্ত ভোটের অভাবে ওই বিল প্রেসিডেন্টের টেবিল পর্যন্তই পৌঁছতে পারেনি বলে জানা যাচ্ছে হোয়াইট হাউস সূত্রে। কারণ সেনেটে বিল পাশ করানোর জন্য ১০০ সদস্যের মধ্যে প্রয়োজন অন্তত ৬০ জনের ভোট। সেখানে রিপাবলিকানদের সদস্য সংখ্যা কেবল ৫৩। ফলে নয়া বিল পাশে ব্যর্থ। এই গোটা ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন আঙুল তুলেছে ডেমোক্র্যাটদের দিকেই। যদিও সোমবার থেকেই এই ‘শাটডাউন’ পরিস্থিতি স্পষ্ট হচ্ছিল ধীরে ধীরে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ছ’ বছর আগেও মার্কিন মুলুকে একবার এই পরিস্থিতি হয়েছিল। তখনও প্রশাসনের গদিতে ট্রাম্পই। মার্কিন মুলুকে সেই সময়ে টানা একমাসের বেশি সময় ধরে অচলাবস্থা ছিল। ৩৫ দিনের ওই অচলাবস্থা মার্কিন মুলুকের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময়কালের ‘শাটডাউন।’ ফের তাঁর সময়কালেই এই পরস্থিতি তৈরি হল মার্কিন মুলুকে। মার্কিন মুলুকের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত বারোটার পর থেকে শুরু হবে ‘শাটডাউন’। যেহেতু আর্থিক অভাবে এই শাটডাউন, সেক্ষেত্রে সরকারের বহু কর্মীর বেতন বন্ধ থাকার সম্ভাবনা। কাজ হারাতেও পারেন বহু মানুষ। বন্ধ থাকার সম্ভাবনা একাধিক সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প। শাটডাউন অবস্থা কাটা পর্যন্ত এমন ভাবেই চলতে পারে সরকার। হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই কর্মী ছাঁটাইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে খবর সূত্রের। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ‘শাটডাউন থেকে অনেক ভাল কিছু বেরিয়ে আসতে পারে।’ এবং তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ‘আমরা যা চাই না, এমন অনেক জিনিস থেকে মুক্তি পেতে এই বিরতি ব্যবহার করবেন।’
প্রতি অর্থবর্ষে সরকারের বিভিন্ন দফতরের কাজ চালানোর জন্য মার্কিন কংগ্রেসকে অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। অর্থবর্ষ শুরু হয় ১ অক্টোবর থেকে। যদি এই সময়ের মধ্যে সেনেট সদস্যেরা একমত হয়ে ব্যয় বরাদ্দ চূড়ান্ত করতে না পারেন, তবে বিভিন্ন দফতরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। যত দিন পর্যন্ত কংগ্রেস থেকে অর্থ বরাদ্দ না করা হচ্ছে, তত দিন দফতরগুলি বন্ধ থাকবে। ১০০ সদস্যের মার্কিন সেনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যা ৫৩। যে কোনও বিল পাশ করাতে অন্তত সাত জন ডেমোক্র্যাটের সমর্থন তাঁদের প্রয়োজন হয়। সরকারি তহবিল সংক্রান্ত বিলে তা হয়নি। সেই কারণে সেনেটের অনুমোদনও মেলেনি। ‘শাটডাউন’-এর প্রভাব পড়বে আমেরিকার খাদ্য দফতরে। জরুরি পরিষেবা চালু থাকলেও অনেক কাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনও কোনও কাজ পিছিয়ে যেতে পারে বা সাময়িক ভাবে বন্ধ হতে পারে। মার্কিন শিক্ষা দফতর জানিয়েছে, অধিকাংশ কর্মীকেই আপাতত বসিয়ে দেওয়া হবে। আমেরিকার স্বদেশ নিরাপত্তা দফতর (হোমল্যান্ড সিকিউরিটি) চালু থাকবে। এই দফতরের কর্মীদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। শুল্ক এবং সীমান্তরক্ষা দফতরের কর্মীদেরও কাজ করতে হবে। অভিবাসন, পরিবহণ নিরাপত্তা, সিক্রেট সার্ভিস, নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবার কাজ চালু থাকবে ‘শাটডাউন’-এও। আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতরে বাছাই করা কিছু দিক খোলা রাখা হবে। তার মধ্যে দক্ষিণ সীমান্ত, পশ্চিম এশিয়া এবং গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অগ্রাধিকার পাবে বলে দফতর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বয়স্ক নাগরিক, প্রতিবন্ধী এবং অন্যান্যদের মার্কিন সরকারের তরফ থেকে যে সামাজিক সুরক্ষা ভাতা দেওয়া হয়, তা বন্ধ হচ্ছে না। শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, যত ক্ষণ পর্যন্ত প্রক্রিয়াকরণের জন্য তহবিল রয়েছে, তত ক্ষণ আমেরিকার বেকারদের সুযোগসুবিধাগুলি বন্ধ হবে না। বিনা বেতনে কাজ করতে হবে এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারীদের। কত দিন এই ‘শাটডাউন’ চলতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম দফায় মার্কিন প্রশাসন ৩৫ দিনের জন্য অচল হয়ে পড়েছিল। এখনও পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে সেটাই সবচেয়ে বড় ‘শাটডাউন’। তহবিল সংক্রান্ত আলোচনায় অগ্রগতি না-হওয়ায় ডেমোক্র্যাটদেরই দোষারোপ করছেন ট্রাম্প। তিনি ইতিমধ্যে গণছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়ে রেখেছেন। বলেছেন, ‘‘শাটডাউনের অনেক ভাল দিকও রয়েছে। আমরা যেগুলো চাই না, তেমন অনেক জিনিস ফেলে দিতে পারি। অনেককে ছাঁটাই করা হবে। তাঁরা প্রত্যেকেই হবেন ডেমোক্র্যাট।’’ ব্যয় বাজেট গঠনকারী ১২টি বিলের কোনওটিই এখনও আইনসভার দুই কক্ষে পাশ হয়নি। ফলে ‘শাটডাউন’টি হতে চলেছে ‘সম্পূর্ণ শাটডাউন’। ‘শাটডাউন’-এর কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করে দেয় হোয়াইট হাউস। বুধবার ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে (স্থানীয় সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার রাত ১২টা, বুধবারের সূচনা) ‘শাটডাউন’ শুরু হয়েছে আমেরিকায়।‘শাটডাউন’-এ মার্কিন সরকারের অধিকাংশ দফতরের কাজই বন্ধ হয়ে যাবে। চালু থাকবে কেবল আপৎকালীন পরিষেবাগুলি। কোন কোন দফতর চালু থাকবে, কত জন কর্মীকে নিয়ে চলবে, তা আলোচনার মাধ্যমে স্থির করা হয়। যাঁরা ‘শাটডাউন’ চলাকালীনও কাজ করবেন, তাঁদের অধিকাংশই বেতন পাবেন না। ‘শাটডাউন’ শেষ হলে আবার তাঁদের বেতন দেওয়া হবে।





