Saturday, July 25, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশেই রয়েছে আস্ত এক ‘ব্রহ্মাণ্ড’!‌ এক কিউবিক মিলিমিটার মানে একটি চালের অর্ধেক প্রায়

মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশেই গোটা এক ‘ব্রহ্মাণ্ড’। ১০ বছর ধরে গবেষণার তথ্য। মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র অংশের গঠন। বিস্মিত গবেষকেরাও। মস্তিষ্কের কোষে। মানুষের মস্তিষ্কের ১ কিউবিক মিটার একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। ১০ বছর ধরে গবেষণা। এক কিউবিক মিলিমিটার মানে একটি চালের অর্ধেক প্রায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিচম্যান ল্যাবের গবেষকেরা মৃগী রয়েছেন এমন এক ব্যক্তির মস্তিষ্কের টেম্পোরাল কর্টেক্সের অংশ সংগ্রহ করে। সেরিব্রাল কর্টেক্সের অংশ হল টেম্পোরাল কর্টেক্স। গবেষকেরা জানিয়েছেন, মস্তিষ্কের ওইটুকু অংশেই রয়েছে গোটা এক ‘ব্রহ্মাণ্ড’। টেম্পোরাল কর্টেক্সের ওই এক কিউবিক মিলিমিটার অংশে রয়েছে কয়েক লক্ষ স্নায়ুসন্ধি সাইন্যাপস, রক্তবাহ। গবেষকরা বলছেন, জটিল এবং সংগঠিত মস্তিষ্কের গঠন। লিচম্যান ল্যাবের প্রধান গবেষক জেফ লিচম্যানও বিস্মিত হয়েছেন মস্তিষ্কের ওই ক্ষুদ্র অংশের গঠন দেখে। গত ২০ বছর ধরে এই নিয়েই কাজ করে চলেছেন তিনি। স্নায়ুকোষের যোগ নিয়েও নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন তিনি। দু’টি স্নায়ুকোষের মধ্যে যোগসূত্র একটি নয়, একাধিক হতে পারে। আগে এই বিষয়টি অজানা ছিল গবেষকদের। বিষয়টিকে সহজ করে বোঝানোর জন্য জেফ জানিয়েছেন, স্নায়ুকোষকে বাড়ি ধরলে, দু’টি বাড়ির মধ্যে সংযোগের জন্য একটি ফোনলাইন থাকা উচিত। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, দু’টি বাড়ির মধ্যে হয়তো ৫০টি ফোন লাইন রয়েছে। অর্থাৎ দু’টি স্নায়ুকোষের মধ্যে সংযোগের জন্য ৫০টি স্নায়ুসন্ধি রয়েছে। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, এই অতি শক্তিশালী সংযোগ প্রতিবর্ত ক্রিয়ার সঙ্কেত এনকোড পাঠানোর জন্য বা অতি দ্রুত সাড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ যখন অতি দ্রুত সাড়া দেওয়ার বিষয় থাকে, তখনই এক স্নায়ুকোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষে ৫০টি স্নায়ুসন্ধির মাধ্যমে সঙ্কেত পাঠানো হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা টেম্পোরাল কর্টেক্সের অংশ পরীক্ষা করে এ-ও দেখেছেন যে, প্রত্যেক নিউরোন বা স্নায়ুকোষের দু’টি করে গ্লিয়া বা ‘সাপোর্ট কোষ’ থাকে। তারা দ্রুত মূলত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। ক্ষতিগ্রস্ত কলা, কোষের ভগ্নাংশ, প্যাথোজেন দ্রুত অপসারণ করে, যাতে স্নায়ুকোষ ভাল ভাবে কাজ করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্কের একটা মানচিত্র তৈরির চেষ্টা বহু বছর ধরে করে চলেছেন গবেষকেরা। মনে করা হয় দু’হাজার বছর ধরে এই প্রচেষ্টা চলছে। খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়ায় মস্তিষ্কের ভিতরে থাকা সেরিব্রাম এবং সেরিবেলামের ফারাক করেছিলেন হেরোফিলাস এবং এরাসিসট্রটাস।

মস্তিষ্কে বসানো ইলেক্ট্রনিক চিপ। তাতেই কথা ফুটছে! মানুষের কণ্ঠে নয়, যন্ত্র-মুখে। মনে মনে যা-ই ভাবা হচ্ছে, তা-ই প্রায় নির্ভুল ভাবে লিখে দিচ্ছে কম্পিউটার। শুধু তা-ই নয়, কখনও কখনও সেই যন্ত্র উঁকি দিচ্ছে মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরিতেও। সাম্প্রতিক গবেষণায় এ রকম ফল মিলতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে বিজ্ঞানীমহলে। ওসাকার এক গবেষণাগারে তিন বছরের পরিশ্রমে ফুটবলের দেড় গুণ আয়তনের এক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার ‘কম্পু’ তৈরি করেছিলেন ‘প্রফেসর শঙ্কু’রা। সেই প্রাক্‌-আন্তর্জালের দুনিয়ায়, গুগ্‌লহীন পৃথিবীতে, ‘কম্পু’ ছিল বিশ্বকোষের প্রতিস্থাপক। কিংবা আরও কিছু বেশি। সে পঞ্চাশ কোটি প্রশ্নের জবাব দিতে পারত। তার ছিল বিবেচনার ক্ষমতা। খেলতে পারত ব্রিজ কিংবা দাবা। এমনকি, বিচার করতে পারত সঙ্গীতের সুরেরও। সেই ‘কম্পু’ই যদি মানুষের মনের কথা পড়া শিখে ফেলে, তা হলে কেমন হয়? তারই উত্তর খুঁজলেন একদল গবেষক। জটিল রোগে কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন, এ রকম ব্যক্তির অস্ফুট বুলি পড়ে ফেলার যন্ত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। এ বার সেই মৃদু বা অস্পষ্ট শব্দও ছিল না। যা ছিল, তা একেবারেই মনে মনে। ধরুন, আপনি নিজের মনে বললেন, ‘আপেল’। আর সেই ইলেকট্রনিক চিপ আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ুবিক নির্দেশ (সিগন্যাল) সংগ্রহ করে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) যন্ত্রের হাতে তুলে দেবে। তার পর ওই যন্ত্রই যা করার করে লিখে জানিয়ে দেবে আপনি মনে মনে ‘আপেল’ বলেছিলেন। ‘সেল’ নামে একটি জার্নালে এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। কথা বলার শক্তি পুরোপুরিই হারিয়েছেন, এ রকম কয়েক জন রোগীর উপর পরীক্ষা চালিয়েছিলেন গবেষকেরা। ওই রোগীদের অনেকেই ‘অ্যামিয়োট্রপিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস’ (এএলএস) রোগে আক্রান্ত। স্নায়ুর এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-ও। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গবেষণা চলাকালীন কেসি হ্যারেল নামে এক রোগীর মনে মনে ভাবা অন্তত ছ’হাজার শব্দ সঠিক ভাবে পড়ে ফেলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট এরিন কুনজ় বলেন, ‘‘পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে বলা হয়েছিল, মনে মনে ‘ঘুড়ি’ বা ‘দিন’—এই জাতীয় শব্দ বলতে। দেখা গেল, কম্পিউটার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নির্ভুল ভাবে পড়ে দিচ্ছে। পরে ওঁদের বলা হয়েছে, একটি গোটা বাক্য মনে মনে বলতে। দেখা গেল, সেটাও কম্পিউটার প্রায় নির্ভুল ভাবে লিখে দিচ্ছে।’’ গবেষকদের মত, আসলে ভাবনার জন্য ভাষাও প্রয়োজন। তার কোনও বহিঃপ্রকাশ না হলেও তো সেটা ভাষাই। কিন্তু এই যন্ত্র কি মনের গোপন কথাও পড়তে পারবে? এমন কথা, যা কেউ মনে মনেও উচ্চারণ করবেন না। বিজ্ঞানীদের দাবি, এখনও ততটা সম্ভব হয়নি। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজের মন ‘খুলে’ দেন, তা হলে ওই যন্ত্র মন পড়ে ফেলতে পারবে। এই স্বেচ্ছায় নিজের ‘মন’ খুলে দেওয়ার বিষয়টি বুঝতে গবেষকেরা পাসওয়ার্ড পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। কুনজ় বলেন, ‘‘এক জনকে বার বার ‘চিটি চিটি ব্যাং ব্যাং’ এই শব্দবন্ধ বলতে বলা হয়েছিল। আর যন্ত্রকে বলা হয়েছিল, এই শব্দবন্ধ শোনার পরেই যাতে সে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনের কথায় আড়ি পাতে। ‘চিটি চিটি ব্যাং ব্যাং’— এই শব্দবন্ধই যন্ত্রের কাছে পাসওয়ার্ডের মতো ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এই শব্দবন্ধ বলছেন মানেই যন্ত্র ধরে নিচ্ছে, ওই ব্যক্তি নিজের মন উন্মুক্ত করতে চাইছে।’’ অস্ট্রেলিয়ার ওলংগং বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিসিস্ট মার্কাস লিয়োনেল ব্রাউন বলেন, ‘‘এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আমরা সঠিক পথে এগিয়েছি। যদি ঠিকঠাক ভাবে প্রয়োগ করা হয়, তা হলে দেখা যাবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যতটুকু চাইবেন, যন্ত্র ততটুকুই পড়তে পারবে।’’ আবার যখন অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুর কথা ভাবতে, তখনও তার কোনও স্পষ্ট জবাব দিতে পারেনি ওই যন্ত্র। গবেষকদের যুক্তি, সম্ভবত এই ধরনের প্রশ্নে একাধিক উত্তর মাথায় ভিড় করে। ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুর কথা বলতে বললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাথায় একাধিক মুখের ছবি ঘুরতে থাকে। তখন যন্ত্রটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। তা সত্ত্বেও এই ফলাফল নতুন গবেষণার দরজা খুলে দেবে বলেই মনে করছেন নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রুখ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট ক্রিস্টান হার্ফ। তিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। মার্কিন সংবাদপত্র ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে তিনি বলেন, ‘‘এই গবেষণা শুধু কোনও যন্ত্র বা প্রযুক্তি সম্পর্কিত নয়, তার গণ্ডি ছাড়িয়ে ভাষা এবং ভাবনার অন্তর্নিহিত সম্পর্ক নিয়েও অনেক কিছু জানিয়েছে আমাদের।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles