বঙ্গ ক্রিকেটের সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার প্রত্যাবর্তন প্রশাসক সৌরভ গাঙ্গুলির। সিএবির প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াচ্ছেন মহারাজ। ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক স্বয়ং জানিয়ে দিলেন, তিনি সিএবি-র আসন্ন বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন জমা করবেন। প্রাক্তন বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আবার ফিরছেন ক্রিকেট প্রশাসনে। সিএবির অন্দরমহলে বর্তমানে অনেক কিছু চলছে। দুর্নীতি ছেয়ে গিয়েছে। সৌরভ সভাপতির পদে এলে অনেক অঙ্কই বদলে যাবে। আশায় বঙ্গ ক্রিকেট! সিএবি বর্তমান প্রেসিডেন্ট আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন বঙ্গ ক্রিকেটকে স্বচ্ছতার পথে চালিত করতে। একের পর এক পদক্ষেপে সফলও হয়েছেন। কিন্তূ সরষের মধ্যে ভুত সব স্থানেই বিরাজ করে। সিএবির অন্দরমহলেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু অসাধু কর্তার ক্রিয়াকলাপে একের পর এক বিতর্ক চেপে বসেছে। দেবব্রত দাস থেকে শুরু করে অম্বরিশ মিত্র বিতর্ক। এক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীর নামেও দুর্নীতির অভিযোগ। সিএবিতে কর্মরত সিসিটিভির দায়িত্বে থাকা ক্যাজুয়াল এক কর্মী শান্তনু সাহার নামেও সিএবির অন্দরমহলে বিস্তর ক্ষোভের পাহাড়। কিছু কর্তাদের দিবারাত্র পদলেহন করে ঐ কর্মী নানান অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকেন বলে অভিযোগ সিএবির বেশ কয়েকজন কর্তা। সিএবির কয়েকজন কর্তা রীতিমতো ক্ষুব্ধ সর্বক্ষেত্রে অবাধ বিচরণরত কর্মীর হামবড়া আচরণে। কর্তারা প্রশ্নও তুলেছেন, কে এই শান্তনু সাহা? আইপিএল চলাকালীন জনাকয়েক কর্তার সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ উঠেছিল শান্তনুর নামে। এখনও সেই ক্ষোভ রয়েছে সিএবির অন্দরমহলে। অনেকেই ক্ষুব্ধ এই শান্তনুর উপর।
অভিযোগ, পালটা অভিযোগে রীতিমতো বিতর্কে পুড়েছে সিএবি। যুগ্ম সচিব দেবব্রত দাস, কোষাধ্যক্ষ প্রবীর চক্রবর্তী থেকে শুরু করে সিএবি-র সঙ্গে জড়িত অম্বরীশ মিত্রের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল। যা নিয়ে মঙ্গলবার সিএবির অ্যাপেক্স কাউন্সিলের বৈঠকে আলোচনা হয়। সেখানে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেমন দেবব্রতকে শোকজ করা হয়েছে। তাঁকে টিকিটের বকেয়া অর্থ পনেরো দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেবব্রতর বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত আরও অভিযোগ জমা পড়েছিল। যার ভিত্তিতে তাঁকে শোকজ করা হয়েছে। সিএবি কোষাধ্যক্ষ প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ক্লাব থেকে তিনি নিজের নামে টাকা তুলে নিয়েছেন। এদিনের বৈঠকে ঠিক হয়, যেহেতু এটা ক্লাবের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তাই সিএবি এই বিষয়ে ঢুকবে না। তবে কোষাধ্যক্ষের ক্লাব উয়াড়ি সিএবি যে অনুদান পায়, সেটা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। উয়াড়ি ক্লাবকে বলে হয়েছে, সিএবির অনুদান তারা কোন কোন খাতে ব্যবহার করেছে, তার সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। যতক্ষণ জমা না দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সিএবি সমস্ত অনুদান বন্ধ রাখবে। একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এরিয়ানের ক্ষেত্রেও। তাদেরও অনুদান আপাতত বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়েছিল সিএবির সঙ্গে জড়িত অম্বরীশ মিত্রের বিরুদ্ধও। কিন্তু অম্বরীশের বিরুদ্ধে যিনি অভিযোগ করেছিলেন, সোমবার তিনি সমস্ত অভিযোগ তুলে নিয়েছেন বলেই সিএবি সূত্রের খবর। এর বাইরে আরও বেশ কয়েকটা সিদ্ধান্ত হয় অ্যাপেক্স কাউন্সিলের বৈঠকে। লিগ ফাইনালে অশান্তির জন্য যে সব ক্রিকেটারের লেভেল ‘থ্রি’ অনুযায়ী শাস্তি হয়েছিল, তাঁদের চার ম্যাচ নির্বাসিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আসন্ন মরশুমে তাঁরা লিগের চারটে ম্যাচে খেলতে পারবেন না। ওই ম্যাচে যাঁরা আম্পায়ার, পর্যবেক্ষক ছিলেন তাঁরাও পরের বছর লিগ ফাইনাল করতে পারবেন না। অর্থাৎ তাঁদেরও এক ম্যাচ করে নির্বাসন হয়েছে। সিএবির বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নিয়েও আলোচনা হয়। অরূপ ভট্টাচার্যকে জীবনকৃতি সম্মান দেওয়া হচ্ছে। ৩০ আগস্ট সিএবির বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। গতবার প্রধান অতিথি হিসাবে নিয়ে আসা হয়েছিল অজয় জাদেজাকে। এবারও হরভজন সিং, যুবরাজ সিংয়ের মতো কয়েকজন প্রাক্তন তারকা ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলছে সিএবি। আগামী কিছু দিনের মধ্যেই সেটা চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
২০ সেপ্টেম্বর সিএবির বার্ষিক সাধারণ সভা। বড় ইঙ্গিত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। বেশ কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল, ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের সভাপতির পদের জন্য লড়বেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক। এবার তাতে সিলমোহর দিলেন খোদ সৌরভ। মঙ্গলবার ইডেন ছাড়ার সময় জানান, প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়বেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচন হবে কিনা সেটা অবশ্য এখনই বলা যাচ্ছে না। সিলেকশন হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। সৌরভের সিএবির মসনদে ফেরা সময়ের অপেক্ষা। এর আগেও সিএবির সভাপতি ছিলেন। তারপর বিসিসিআইয়ের সভাপতি হন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কমিটিতেও রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদে। ক্রিকেট পরবর্তী জীবনে তাঁকে একাধিক ভূমিকায় দেখা যায়। সফল অধিনায়কের পাশাপশি প্রশাসক হিসেবেও সফল সৌরভ। বোর্ডের সভাপতিত্ব ছাড়ার পর আইপিএলের সঙ্গে যুক্ত হন। দিল্লি ক্যাপিটালসের ক্রিকেট ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন করেন। ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার বিষয়ে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন মহারাজ। তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল, রাজনীতি না কোচিং। দ্বিতীয় বিকল্প বেছে নেন। সৌরভ জানান, ভারতীয় দলকে কোচিং করাতে ইচ্ছুক। তবে আপাতত সেই পরিকল্পনা স্থগিত রাখছেন। ৩০ আগস্ট সিএবির বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। আগের দু’বছরের মতো এবারও ধনধান্য অডিটোরিয়ামে হবে। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে যুবরাজ সিং, জাহির খান এবং হরভজন সিংকে। বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পাবেন সুদীপ ঘরামী। জেন্টলম্যান ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ারের পুরস্কার পাবেন শাহবাজ আহমেদ। বর্ষসেরা ফাস্ট বোলার সায়ন ঘোষ। রঞ্জি ট্রফিতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীর পুরস্কার পাবেন সুদীপ চ্যাটার্জি। রঞ্জিতে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির পুরস্কার পাবেন সুরজ সিন্ধু জয়েসওয়াল। মেয়েদের বর্ষসেরা ক্রিকেটার তনুশ্রী সরকার। মেয়েদের ক্রিকেটে টি-২০ ফরম্যাটে সর্বোচ্চ রানের পুরস্কারও তিনিই পাবেন। একদিনের টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রানের পুরস্কার পাবেন ধারা গুজ্জার। মেয়েদের একদিনের টুর্নামেন্ট এবং টি-২০ তে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রহকারীর পুরস্কার পাবেন সাইকা ইশাক।
প্রাক্তন বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আবার ফিরছেন ক্রিকেট প্রশাসনে। সিএবির অন্দরমহলে বর্তমানে অনেক কিছু চলছে। দুর্নীতি ছেয়ে গিয়েছে। সৌরভ সভাপতির পদে এলে অনেক অঙ্কই বদলে যাবে। সিএবির যুগ্মসচিব দেবব্রত দাসের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সবদিক খতিয়ে দেখার পর তাঁকে শোকজ করে সিএবির অ্যাপেক্স কাউন্সিল। জরুরি বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৫ দিনের মধ্যে শোকজের জবাব চাওয়া হয়েছে। উত্তর সন্তোষজনক না হলে দেবব্রত দাসকে বড় শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। সিএবির কোষাধ্যক্ষ প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধেও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছিল। উয়াড়ি ক্লাবের শীর্ষকর্তার বিরুদ্ধে ক্লাবের অ্যাকাউন্টস গরমিল এবং তহবিল তছরুপের অভিযোগ ওঠে। যদিও সেই বিষয়ে এখনও কোনও রায় জানানো হয়নি।
বিতর্ক বারবার। একের পর এক অভিযোগ। কিছুতেই পিছু ছাড়ে না সিএবিতে অভিযোগের পাহাড়? কোনও না কোনও কর্তা কলুষিত করছেন সিএবির মর্যাদাকে। একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। আর্থিক দুর্নীতি, স্বার্থের সংঘাত, তথ্য গোপন, এবং অর্থের বিনিময়ে দলে সুযোগ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগগুলির কারণে সিএবি বর্তমানে সমালোচিত এবং বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। সিএবি-র কোষাধাক্ষের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও। যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তারা তাদের পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। সিএবি-র বিরুদ্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করার অভিযোগ। এবার অভিযোগের তালিকায় নাম জুড়ল দক্ষিন দিনাজপুরের গৌতম গোস্বামীর? দক্ষিন দিনাজপুর ডিস্ট্রিক্ট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বিজয় কুমার সাহা টি২০ ক্রিকেট ছিল সম্পূর্ণ অনৈতিক। দিবারাত্রিব্যাপি এই ক্রিকেট, যা বিসিসিআই এর নিয়ম মেনে হয়নি বলে অভিযোগ। অভিযোগের তীর দক্ষিন দিনাজপুর ক্রিকেটের প্রধান গৌতম গোস্বামীর দিকেই। তিনি সিএবির কমিটি মেম্বার এবং অ্যপেক্স কাউন্সিলের প্রাক্তন সদস্যও। দক্ষিন দিনাজপুর ডিস্ট্রিক্ট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত টুর্ণামেন্টে খেলানো হয়েছিল বাংলা, ওড়িশা, ঝাড়খন্ড, দিল্লি, হরিয়ানা এমনকি ভারতের বাইরে বাংলাদেশের দলের খেলোয়াড়দেরও। অর্থাৎ বাংলার ক্রিকেটার ও দেশের বাইরের ক্রিকেটারদের নিয়ে আয়োজিত হয়। অভিযোগ, দক্ষিন দিনাজপুর ডিস্ট্রিক্ট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান গৌতম গোস্বামী আয়োজন করেছিলেন এমনই এক টুর্ণামেন্ট, যা কখনোই বিসিআই অনুমোদিত নয়। এমনকি এই ই প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন সিএবি আম্পায়াররাও। অভিযোগের চিঠি প্রেরিত হয়েছে বিসিসাআই সচিবকে। এছাড়াও বিসিসিআই ওম্বুডসম্যান, সিএবি ওম্বুডসম্যান, বিসিসিআই সিইও থেকে সকল আধিকারীকে। অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর রয়েছে অরূপ কুমার দত্তের। সুপ্রিম কোর্টের নিয়মকে ভায়োলেশন করেই এই টুর্ণামেন্টের আয়েজন করেছেন দক্ষিন দিনাজপুর ক্রিকেটের প্রধান গৌতম গোস্বামী বলে তীব্র অভিযোগ।
সিএবিতে নবাগত কর্তা অম্বরিশ মিত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ। অম্বরীশ মিত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ সিএবি-তে। বাংলার ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থার দফতরে চিঠি দিয়েছেন মহম্মদ আজহারউদ্দিন। অম্বরীশের সঙ্গে বিতর্কিত চ্যাট প্রকাশ্যে, সেখানে এই আজহারউদ্দিনের নাম রয়েছে। অম্বরীশ সিএবি-র স্টেডিয়াম কমিটি এবং বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগ কমিটির সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে এ রাজ্যের উঠতি ক্রিকেটারদের থেকে টাকা তোলার অভিযোগ তুলেছেন আইনজীবী সুমন কীর্তনিয়া। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে, আজহারউদ্দিনকে টাকা তোলার কথা বলছেন অম্বরীশ। আজহারউদ্দিন সিএবি-কে দেওয়া জবাবে এই টাকা তোলার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, উঠতি ক্রিকেটারদের যাতে জার্সি, খাবার এবং অনুশীলনের যথাযথ সুযোগ পেতে কোনও সমস্যা না হয়, সেই জন্যই তাঁরা টাকা তুলেছেন। সিএবি-র ওমবুড্সম্যান, সভাপতি এবং সচিবকে লেখা দু’পাতার জবাবে আজহারউদ্দিন নিজেকে পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বলেছেন, এখন তিনি সিএবি-র সঙ্গে যুক্ত থেকে ক্রিকেটের উন্নতিতে কাজ করছেন। অম্বরীশের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। মোট ১০ পয়েন্টের জবাবের তৃতীয় পয়েন্টে আজহারউদ্দিন লিখেছেন, গত কয়েক বছর ধরে তিনি এবং অম্বরীশ যত রকম ভাবে সম্ভব, ক্রিকেটের সেবা করার চেষ্টা করেছেন। সেটা করতে গিয়ে আরও নানা কাজের সঙ্গে টাকাও তুলেছেন। সেখানেই তিনি লিখেছেন, উঠতি দরিদ্র ক্রিকেটারেরা যাতে জার্সি, খাবার এবং অনুশীলনের যথাযথ সুযোগ পায়, সেই জন্যই তাঁরা টাকা তুলেছেন। অম্বরীশের বিরুদ্ধে টাকা তোলার অভিযোগে কলকাতা ময়দানের হাই কোর্ট ক্লাবের নাম উঠেছে। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আজহারউদ্দিন জানিয়েছেন, গত ক্রিকেট মরসুমে এই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অম্বরীশ। হাই কোর্ট ক্লাবের ক্রিকেট সংক্রান্ত বিষয়ে যাতে উন্নতি হয়, সেই কারণেই তাঁরা দু’জন টাকা তুলেছেন এবং ক্লাবকে তা দিয়েছেন। এই টাকা অম্বরীশের জন্য নয়, দেবনিক দাসের (এঁর নামও চ্যাটে রয়েছে) জন্যও নয়। আজহারউদ্দিনের ব্যাখ্যা, তিনি যে টাকা তুলেছেন, তা অনলাইনে অম্বরীশের অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে এই সংক্রান্ত সাতটি আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলি হল, ৫০,০০০ টাকা (৩০ অগস্ট, ২০২৪), ৫০,০০০ টাকা (৩১ আগস্ট, ২০২৪), ৪০,০০০ টাকা (৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪), ৫০,০০০ টাকা (১৬ অক্টোবর, ২০২৪), ৪৯,০০০ টাকা (৭ নভেম্বর, ২০২৪), ১ টাকা (৭ নভেম্বর, ২০২৪) এবং ৪০,০০০ টাকা (তারিখ উল্লেখ নেই)। চিঠির শেষে আজহারউদ্দিন লিখেছেন, তাঁর এবং অম্বরীশের ব্যাক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ্যে আসায় তিনি অবাক। তাঁর বক্তব্য, ময়দানের অধিকাংশ ক্লাব এ ভাবেই অনুদানের উপর নির্ভর করে চলে। এটা দুর্নীতি হিসেবে দেখানোয় তিনি বিস্মিত। সিএবি-র আসন্ন বার্ষিক সাধারণ সভার কথা উল্লেখ করে আজহারউদ্দিন বলেছেন, ‘‘সেপ্টেম্বরে যে সিএবি-র এজিএম আছে সেটা আমি জানি। তার আগে আমার এবং অম্বরীশ মিত্রের ভাবমূর্তিতে কালি লাগানোর জন্য এই অভিযোগ করা হয়েছে। অম্বরীশের সততা এবং সদিচ্ছা নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই। সিএবি-র কাছে আমার অনুরোধ, ওঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ খারিজ করা হোক।’’
সিএবির কোষাধ্যক্ষ প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আর্থিক বেনিয়ম ও স্বার্থের সংঘাতে জড়ানোর মতো গুরুতর অভিযোগের পাহাড় সাজিয়ে রাখা আইনজীবীর দল। আম্পায়ারের মতো যে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সিএবি-র এথিক্স অফিসার, প্রাক্তন বিচারপতি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়। সিএবি-র সচিবের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে থানা, আদালত ও সিএবি-র দ্বারস্থ হয়েছিলেন উয়াড়ি ক্লাবের একদল সদস্য। অভিযোগ এক, লোঢা কমিটির সুপারিশ মেনে গঠিত সিএবি-র সংশোধিত গঠনতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একসঙ্গে দুই পদে বিরাজমান প্রবীর চক্রবর্তী। সিএবি-র কোষাধ্যক্ষ হওয়ার পাশাপাশি তিনি উয়াড়ি ক্লাবের সচিবও। অভিযোগ দুই, ধারে ও ভারে যা আরও মারাত্মক, প্রবীর চক্রবর্তী সিএবি-র উয়াড়ি ক্লাবের জন্য বরাদ্দ অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ। সিএবি-র কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধেই আর্থিক বেনিয়মের এত বিস্ফোরক অভিযোগ উঠছে, বঙ্গ ক্রিকেটের ইতিহাসে এ ঘটনা আগে ঘটেছে কি না, মনে করতে পারছেন না ময়দানের কেউই। সিএবি-র এথিক্স অফিসার, প্রাক্তন বিচারপতি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮ জুন গোটা ঘটনার শুনানি করেন। সেদিন অভিযুক্তের তরফে আরও সময় চাওয়া হয়েছিল বলেই খবর। প্রাক্তন বিচারপতি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় ২৮ জুন, শনিবার ফের একটু শুনানি ডেকেছিলেন। যে শুনানিতে প্রবীর চক্রবর্তীর তরফে দাবি করা হল যে, তিনি উয়াড়ি ক্লাবের সচিব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। ফলে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ আর খাটে না। শুনানিতে ছিলেন সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় ও সচিব নরেশ ওঝা। সিএবি-র আইনজীবী সম্রাট সেন এথিক্স অফিসার, প্রাক্তন বিচারপতি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়কে সহায়তা করার (অ্যাসিস্ট) জন্য ছিলেন। প্রবীর চক্রবর্তীর তরফে ছিলেন আইনজীবী দীপকরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। উয়াড়ি ক্লাবের অভিযোগকারীদের তরফেও ছিলেন এক ঝাঁক আইনজীবী। শুনানিতে শোনা যায়, প্রবীর চক্রবর্তীর আইনজীবী এথিক্স অফিসারের হাতে উয়াড়ি ক্লাবের সচিব পদ থেকে অভিযুক্তের ইস্তফাপত্রের কপি দেন। শোনা গেল, এথিক্স অফিসার জানান, ইস্তফা দিয়ে দিলে তো স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নের অবসান। যদিও উয়াড়ি ক্লাবের অভিযোগকারীদের আইনজীবীরা জানান, একসঙ্গে দুই পদে থাকাটাই যেখানে অবৈধ, সেখানে টাকা নয়ছয় করা হয়েছে স্বার্থের সংঘাত থাকাকালীন। সওয়াল করা হয়, কী করে কেউ অন্যায় করার পরে পদ ছেড়ে দাবি করতে পারেন যে, তিনি ইস্তফা দিয়েছেন এবং আর কোনও দায় তাঁর নেই! প্রবীর চক্রবর্তী ইস্তফাপত্রের যে কপি এথিক্স অফিসারকে দিয়েছেন, সেটি ১৬ জুনের। ঘটনা হচ্ছে, ৩০ মে প্রথম তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা পড়ে। পরে ১৬ জুন আরও কিছু অভিযোগ যুক্ত হয়। প্রবীর চক্রবর্তীর তরফে বলা হচ্ছে, অভিযোগ উঠতেই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি ক্লাবকে পদের ফায়দা নিয়ে কোনও সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেননি বলেও জানান। প্রশ্ন থামছে না। কেন লোঢা কমিটির সুপারিশ জানার পরেও স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়েছিলেন প্রবীর চক্রবর্তী? কেন তিনি অভিযোগ ওঠার পর ইস্তফা দিলেন? তিনি কী করে ক্লাবের জন্য বরাদ্দ টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে পারেন? কেন সিএবি-র কোষাধ্যক্ষের পদে থেকে এতবড় আর্থিক বেনিয়ম করলেন? কেন প্রায় ১০ বছর উয়াড়ি ক্লাবের বার্ষিক সাধারণ সভা হয়নি? প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং একাধিক তদন্ত ও মামলা চলছে জেনেও কেন তাঁকে সাময়িকভাবে কোষাধ্যক্ষের পদ থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে না, জোরাল প্রশ্ন উঠছে। বলা হচ্ছে, অতীতে যখন সহকারী সচিব থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোশেন্ট পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, তাঁকে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেবার সিএবি প্রশাসকেরা স্বচ্ছতা আঁকড়ে ধরলে এবার পারছেন না কেন?
বিতর্কে থাকা সিএবির যুগ্ম সচিব দেবব্রত দাস। যাঁর কথায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বাংলা ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে গিয়েছিলেন ঋদ্ধিমান সাহা। ম্যাচ গড়াপেটা-সহ নানা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত সিএবির এই যুগ্ম সচিব। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির গুরুতর অভিযোগ তুলে সিএবিকে চিঠি পাঠায় আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস। এমনকী সিএবির ওম্বুডসম্যানের কাছেও জমা পড়ে অভিযোগ, আর্জি জানানো হয় তদন্ত শুরুর। সবমিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি বলে আশঙ্কা। সিএবি-র পদাধিকারী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। বাংলা দলে সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্রিকেটারদের থেকে কয়েক লক্ষ টাকা তুলেছেন। একটি অ্যাকাডেমির সঙ্গে সিএবি অনুমোদিত কোনও ক্লাবের চুক্তি করিয়ে সেই অ্যাকাডেমির শিক্ষার্থীদের ময়দানে খেলার সুযোগ করে দেবেন কথা দিয়ে ৪ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। সিএবি-তে তাঁর বিরুদ্ধে জমা পড়েছে জোড়া অভিযোগপত্র। একটি দিয়েছে তাঁর নিজের ক্লাব টাউন ক্লাব। অন্যটি, আদিত্য স্কুল অফ স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট নামের একটি অ্যাকাডেমি।
সিএবি-র বিতর্কবিদ্ধ সেই যুগ্মসচিব দেবব্রত দাস সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। দাবি করছেন, তাঁকে কালিমালিপ্ত করার জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাঁর ভাবমূর্তি কলুষিত করার জন্য এমনকী, টাউন ক্লাবের লেটারহেড জাল করা হয়েছে বলে পাল্টা অভিযোগ করলেন দেবব্রত। ২ জুলাই সিএবি-র ওম্বাডসম্যানের কাছে একটি চিঠি দেন টাউন ক্লাবের সভাপতি বিশাখ ঘোষ (মোহর)। তিনি অভিযোগ করেন, ক্রিকেটারদের বাংলা দলে সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোটি টাকা তুলেছেন সিএবি-র যুগ্মসচিব, টাউন ক্লাবের প্রতিনিধি দেবব্রত। তিনি বাংলার দল নির্বাচনী সভায় থাকেন এবং সেই সূত্রে বাংলা দলে টাকার বিনিময়ে সুযোগ করে দেবেন বলে কথা দেন বলে অভিযোগ। পাশাপাশি টাউন ক্লাবে খেললে বাংলা দলে সুযোগ মিলবে বলেও ক্রিকেটারদের থেকে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ দেবব্রতর বিরুদ্ধে। টাউন ক্লাবের খাবারের বিল সিএবি-র খাবারের খরচের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, টাকার বিনিময়ে সিএবি-তে কোনও ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি – দেবব্রতর বিরুদ্ধে চার দফা অভিযোগ তুলে দু’পাতার চিঠি জমা দেন বিশাখ। গত ২৪ এপ্রিল সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে দু’পাতার একটি অভিযোগপত্র জমা দেন আদিত্য স্কুল অফ স্পোর্টসের প্রতিনিধি শচীন ঢোন্ডগেও।
চক্রান্তের পাল্টা অভিযোগ তুলে দেবব্রত বলেন, ‘অভিযোগপত্র যে লেটারহেডে দেওয়া হয়েছে, সেখানে টাউন ক্লাবের যুগ্মসচিব হিসাবে সুরঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও স্বপন দে-র নাম রয়েছে। যদিও টাউন ক্লাবের আসল লেটারহেডে সুরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কোনও উল্লেখ নেই। চিঠিটা ভিত্তিহীন।’ প্রসঙ্গত, টাউন ক্লাবের যুগ্মসচিব সুরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে। তিনি টাউন ক্লাবের পদাধিকারী হওয়ার পাশাপাশি সিএবি-র কিউরেটরও। টাউন ক্লাবের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে শোনা গেল।
সিএবি সূত্রে খবর, টাউন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বিশাখ আগেও দেবব্রতর নামে সিএবি-তে নালিশ করেছিলেন। বিশ্বকাপ ও আইপিএলের প্রায় ৭ লক্ষ টাকার টিকিট কিনে সিএবি-তে সেই দাম মেটাননি বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। যা নিয়ে সিএবি-র ওম্বাডসম্যান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য একটি শুনানিও করেছেন। সেই শুনানিতে ৩ লক্ষ টাকার টিকিটের রশিদ দেখানো হয়। বাকি ৪ লক্ষ টাকার রশিদ দেখতে চান ওম্বাডসম্যান। টাকার বিনিময়ে তিনি কি ক্রিকেটারদের বাংলা দলে সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? দেবব্রত বললেন, ‘সিএবি-র গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল নির্বাচনী বৈঠকে তো আমার সই করার ক্ষমতা নেই। আমি বাংলা দলের কোচ, অধিনায়ক নই। সিএবি সচিব বা প্রেসিডেন্টও নই। সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। খেলাটাকে ভালবাসি। ২২ বছর ধরে টাউন ক্লাবের ক্রিকেট দল দেখছি। নিজের জন্য একটা টাকাও নিইনি কখনও। যা খরচ করেছি সব ক্রিকেটের জন্য। টাউন ক্লাবের পাশাপাশি বড়িশা স্পোর্টিং ক্লাবের দলও করেছি কয়েকবছর ধরে। আর সেটা করেছি ক্রিকেট ভালবাসি বলে।’
দেবব্রতর দাবি, যে ক্রিকেটারের বাবার কাছ থেকে তিনি ৩০-৪০ লক্ষ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ, সেটার সঙ্গে ক্রিকেটের কোনও সম্পর্ক নেই। দেবব্রত বললেন, ‘ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমার অনেক পুরনো সম্পর্ক। অনেকদিন ধরে চিনি। যে টাকার কথা বলা হচ্ছে তার সঙ্গে ক্রিকেটের কোনও সম্পর্ক নেই।’ যোগ করলেন, ‘আদিত্য অ্যাকাডেমির কাছে কোনও টাকা নিইনি।’ মহম্মদ সামি, মুকেশ কুমারদের উত্থানের নেপথ্যে অভিযুক্ত সিএবি কর্তার অবদান রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। দেবব্রত বলছিলেন, ‘নিজের টাকায় সামির পরিচর্যা, মুকেশ কুমারের জুতো কিনে দেওয়া, অনেক কিছুই করেছি। কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখিনি। অভিযোগপত্র ওম্বাডসম্যানের কাছে জমা পড়েছে কি না, বা কোনও নোটিশ পাঠানো হচ্ছে কি না বলতে পারব না। হাতে এখনও কিছুই পাইনি। ডাকা হলে যা বলার বলব।’ অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বাংলা ক্রিকেটের ময়দান সরগরম। সিএবি-র একাংশ সব শুনে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলছে। বলা হচ্ছে, দেবব্রত বাংলা দলে কিংবা ক্লাব ক্রিকেটে সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নিয়েছেন প্রমাণিত হলে তাঁর শাস্তি প্রাপ্য। তবে ঘুষ দিয়ে ক্লাব বা বাংলা দলে ঢোকার চেষ্টা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটার বা অ্যাকাডেমির বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সিএবি-র কোষাধ্যক্ষ প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। ১৯ জুলাই ওম্বাডসম্যানের কাছে সেটিরও শুনানি রয়েছে। বার্ষিক সাধারণ সভা হচ্ছে না বলে সিএবি ভাইস প্রেসিডেন্ট অমলেন্দু বিশ্বাসের উত্তরপল্লি মিলন সংঘের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। গত এপ্রিল মাসে সিএবিতে চিঠিটি পাঠিয়েছে আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস। প্রতিলিপিতে অভিযোগ? দেখে নেওয়া যাক। আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের তরফে চিঠিতে স্বাক্ষর রয়েছে সচিন ধন্দগের। অভিযোগ, এই সংস্থার থেকে চার লক্ষ টাকা নিয়েছেন দেবব্রত। বিনিময়ে তিনি আশ্বাস দেন, আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস সিএবি স্বীকৃত ক্লাবের মর্যাদা পাবে। সংস্থাটি ভেবেছিল এর ফলে শিক্ষার্থীরা সিএবি অনুমোদিত বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পাবেন এবং মিলবে যথাযথ স্বীকৃতি। যদিও দুই বছর পেরিয়ে গেলেও দেবব্রত দাস প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছে আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস। এমনকী এই সময়কালে সংস্থার তরফে দেবব্রত দাসকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি, মেসেজের উত্তর দেননি। ফলে বিশ্বাসভঙ্গের পাশাপাশি দেবব্রত দাস নিজের পদের অপব্যবহার করেছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ। সিএবির মতো প্রতিষ্ঠানকে এমন কেলেঙ্কারিতে যেভাবে জড়ানোর চেষ্টা হলো তাতে বিস্মিত আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস। সিএবি সভাপতি স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চিঠিতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপের আর্জি জানানো হয়েছে। অভিযুক্ত দেবব্রত দাসের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালানোর পাশাপাশি চার লক্ষ টাকা তাঁর কাছ থেকে আদায় করে ফেরত দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি। এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে যথাযথ শৃঙ্খলাজনিত পদক্ষেপ সিএবি করবে এবং ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করবে বলে আশা আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টসের। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে এপ্রিল মাসে। তারপর মাস দুয়েক পেরিয়ে গেলেও বহাল তবিয়তে দেবব্রত দাস ঘুরছেন বলে জানতে পেরেছে সংস্থাটি। এমনকী বেঙ্গল প্রো টি২০ লিগের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা গিয়েছে। গত ২ জুলাই সিএবির ওম্বুডসম্যানের কাছে জমা পড়ে চাঞ্চল্যকর একাধিক অভিযোগ। টাউন ক্লাবের সভাপতি বিশাখ ঘোষের তরফে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ, দল নির্বাচনী বৈঠকে তিনি উপস্থিত থাকেন এবং নির্বাচকদের প্রভাবিত করেন বলে দাবি করে দেবব্রত বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। বাংলার বিভিন্ন দলে সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এই টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ। সেই সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের নথিও জমা পড়েছে ওম্বুডসম্যানের কাছে।নিজের পদের অপব্যবহার করে বিশেষ করে বছর দেড়েক ধরে দেবব্রত যে অনৈতিক কাজ চালাচ্ছেন, দুর্নীতি করছেন, শৃঙ্খলাভঙ্গ করছেন তা টাউন ক্লাব ও সিএবির গরিমায় আঘাত বলে উল্লেখ। টাউন ক্লাবের তরফে আরও অভিযোগ, সৌম্যদীপ মণ্ডল, গীত পুরীর মতো ক্রিকেটারদের দেবব্রত বাধ্য করেছেন টাউন ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য। তাঁদের আশ্বাস দেন টাউনের হয়ে খেললে বাংলা দলে সুযোগ মিলবে। তবে তাঁদের যে অর্থের বিনিময়ে টাউন ক্লাবের হয়ে খেলতে বলা হয়েছিল সেই অর্থ বকেয়া রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। আবার এমন অভিযোগও আছে যে, অনেকের কাছ থেকে দেবব্রত এই আশ্বাস দিয়ে টাকা নিয়েছেন যে তাঁদের সিএবি অনুমোদিত ক্লাবে খেলার বন্দোবস্ত করে দেবেন। প্রতারিত হয়ে, বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়ে আর্থিক লেনদেনের কপি-সহ ক্রিকেটার ও অভিভাবকরা অভিযোগ জানিয়েছেন টাউন ক্লাবে। এমনকী টাউন ক্লাবের ক্রিকেটারদের খাবারের বিল তিনি সিএবির ক্যান্টিন বিলে যোগ করেছেন বলে অভিযোগ। সেই বিলগুলিতে দেবব্রত নিজেই স্বাক্ষর করেছেন। এ বিষয়ে ওম্বুডসম্যানের কাছে যথাযথ তদন্তের আবেদন। আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টসের মতো মুর্শিদাবাদের মিলন, কালীঘাট ক্লাবের সমীরণ দাস, রিয়াল এস্টেটের মালিক অমিত গুপ্ত সিএবির যুগ্ম সচিবের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারি ও প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন সিএবি সভাপতির কাছে। বিষয়টি জানতে পেরেছে টাউন ক্লাবও। একাধারে সিএবির যুগ্ম সচিব, অন্যদিকে টাউন ক্লাবের কর্তা হিসেবে দেবব্রত দাস যে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন তাতে তা স্বার্থের সংঘাত বলে দাবি করেছে টাউন ক্লাব। দেবব্রতকে শোকজ করা ও তাঁর বিরুদ্ধে উপযুক্ত তদন্ত শুরু করে যথোপযুক্ত পদক্ষেপের অনুরোধ জানানো হয়েছে টাউন ক্লাবের কাছে। এই অভিযোগ নিয়ে দেবব্রতর প্রতিক্রিয়া মেলেনি। সিএবিতে বার্ষিক সাধারণ সভা তথা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। এই আবহে এমন গুরুতর অভিযোগে শোরগোল বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থায়।
প্রবীর চক্রবর্তী, দেবব্রত দাস, অম্বরীশ মিত্রর পর সিএবিতে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ মহাদেব চক্রবর্তীর নামে। সিএবির ওম্বুডসম্যান, সিএবি সচিব ও কলকাতা পুলিশ ক্লাবের সচিবের কাছে চিঠি পাঠান লেকটাউনের বাসিন্দা তথা ক্রিকেট অনুরাগী শ্যামল দাস। গত ১৮ জুলাই। অভিযোগ, সিএবির নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মহাদেব চক্রবর্তী বাংলার ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থার অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য হয়ে রয়েছেন। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা দফতরের এসিপি (ওএসডি) পদে আসীন থাকা অবস্থায় কীভাবে মহাদেব চক্রবর্তী সিএবির অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য হয়ে গেলেন তা নিয়েই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অভিযোগকারী। এমনকী তিনি মনোনয়নের সময় বা হলফনামায় যথোপযুক্ত নথি জমা দিয়েছিলেন কিনা, তাতে কোনও গরমিল আছে কিনা তা নিয়ে উপযুক্ত তদন্তের আর্জিও জানানো হয়েছে। সিএবির নিয়মের চতুর্থ চ্যাপ্টারে ৩৪(৩)(ডি) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ মূলত উঠেছে মহাদেবের বিরুদ্ধে। এই নিয়মে উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনও সরকারি কর্মচারী স্পোর্টস কোটায় নিযুক্ত হয়ে থাকেন একমাত্র সে ক্ষেত্রেই তিনি অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য বা সিএবির পদাধিকারী হতে পারবেন। আবেদনকারীর সংশয় এই জায়গাতেই। ফলে ক্লিনচিট পেতে মহাদেব এখন যথোপযুক্ত নথি পেশ করেন কিনা বা তিনি কী পদক্ষেপ করেন সেদিকেই তাকিয়ে সকলে। আবেদনকারীর আর্জি, মহাদেবকে সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে রেখে শৃঙ্খলা সংক্রান্ত তদন্ত অবিলম্বে শুরু হোক। প্রয়োজনে ফৌজদারি পদক্ষেপ শুরু করা যেতে পারে বলেও আবেদন জানানো হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে, মহাদেবের নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে তাঁর সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বছর বাহাত্তরের ওই অভিযোগকারী। শুধু তাই নয়, এমন গুরুতর অভিযোগে দোষী প্রতিপন্ন হলে মহাদেব যাতে ভবিষ্যতে সিএবিতে কোনওভাবে যুক্ত থাকতে না পারেন সেই ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার আর্জিও জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিএবির কেউ কিংবা অভিযুক্ত মহাদেব চক্রবর্তী মুখ খোলেননি।
সিএবি-র অ্যাপেক্স কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকের শেষে সিএবি-তে যান সৌরভ। সৌরভ জানান, ‘আমি এবার সিএবি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াব।’ ২০২২ সালেও সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভার আগে সৌরভ জানিয়েছিলেন যে, তিনি সিএবি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন। তারপর তিনি দাদা স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়কে জায়গা ছেড়ে দেন। স্নেহাশিস সিএবি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এবার সৌরভ ফের ঘোষণা করলেন, তিনি সিএবি-র মসনদে বসতে আগ্রহী। সিএবি-র অ্যাপেক্স কাউন্সিলের জরুরি সভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সম্প্রতি বাংলা ক্রিকেটের যে সমস্ত বিতর্ক সামনে এসেছিল, তা নিয়ে আলোচনা হয় সদস্যদের। সিএবি কোষাধ্যক্ষ প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। যে অভিযোগ যায় ওম্বাডসম্যানের কাছে। ওম্বাডসম্যান সেটি আবার অ্যাপেক্স কাউন্সিলে পাঠান। মঙ্গলবার সন্ধ্যার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রবীর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছে উয়াড়ি ক্লাব, ওম্বাডসম্যান তা খতিয়ে দেখবেন। আর আর্থিক অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, প্রবীর চক্রবর্তীকে তা নিয়ে ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে সিএবি-তে। দেখাতে হবে, তিনি টাকা কোন খাতে কীভাবে খরচ করেছেন। একইভাবে এরিয়ান ক্লাবকেও ইউসি জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রবীরের বিরুদ্ধে যে আইনি পদক্ষেপ করেছেন উয়াড়ি ক্লাবের কয়েকজন সদস্য, বিচারাধীন সেই ব্যাপারে সিএবি হস্তক্ষেপ করবে না। সিএবি-র যুগ্মসচিব দেবব্রত দাসের বিরুদ্ধে সিএবি-কে টিকিটের দাম না মেটানো, ইস্টবেঙ্গল ও টাউন ক্লাবের টুর্নামেন্টের অংশগ্রহণের টাকা বকেয়া রাখা সহ একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। দেবব্রত টিকিটের দাম বাবদ আগেই কিছু টাকা জমা করেছিলেন সিএবি-তে। মঙ্গলবার অ্যাপেক্স কাউন্সিলের বৈঠকে টিকিটের বাকি টাকাও ১৫ দিনের মধ্যে দিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অন্য অভিযোগ ও ইস্টবেঙ্গল বা টাউন ক্লাবের বকেয়া টাকা নিয়ে আলোচনা হয়নি। অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য মহাদেব চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছিল। কলকাতা পুলিশে কর্মরত হয়েও সিএবি-র অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য হয়েছেন মহাদেব, সেই অভিযোগ উঠেছিল। মঙ্গলবারের বৈঠকে সেই অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। বলা হয়, মহাদেব অবসর নিয়েছেন এবং আপাতত তিনি কলকাতা পুলিশে চুক্তিভিত্তিক হিসাবে রয়েছেন। অভিযোগ খাটে না। সিএবি-র কমিটি মেম্বার অম্বরীশ মিত্রর বিরুদ্ধে দলে সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ করেছিলেন এক আইনজীবী। যা নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, হাই কোর্ট ক্লাবের দল তৈরি করে দেবেন বলেও টাকা নিয়েছেন অম্বরীশ। তবে মঙ্গলবারের বৈঠকে জানানো হয়, সেই আইনজীবী অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় জানান, তিনি সব পক্ষকে ডেকে কথা বলে বিষয়টি মিটমাট করে নেবেন। রেল বা ভিজিলেন্সের তরফে কোনও তদন্ত করা হবে কি না, এখনও নিশ্চিত নয়। ইস্টবেঙ্গল বনাম ভবানীপুর লিগ ফাইনালে আচরণবিধি ভাঙার দায়ে যে ক্রিকেটারদের শাস্তি দেওয়া হবে বলে ঠিক হয়েছিল, তাঁদের পরের মরশুমে লিগের নির্দিষ্ট সংখ্যক ম্যাচ থেকে নির্বাসিত করা হবে বলে আলোচনা হয় বৈঠকে। সেই সঙ্গে প্রাক্তন মহিলা ক্রিকেটার কেয়া রায় ভারতীয় দলের হয়ে কখনও খেলেননি বলে তিনি প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসাবে আর বিবেচিত হবেন না বলেও বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। একের পর এক পদাধিকারীকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড় জমা হচ্ছে কেন? একাধিক ক্লাবের বিরুদ্ধে এজিএম না করার অভিযোগপত্র জমা পড়েছে সিএবি-তে। সার্বিকভাবে বাংলার ক্রিকেটকে ঘিরে এত বিতর্ক, এত জলঘোলা কেন? প্রাক্তন বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আবার ফিরছেন ক্রিকেট প্রশাসনে। সিএবির অন্দরমহলে বর্তমানে অনেক কিছু চলছে। দুর্নীতি ছেয়ে গিয়েছে। সৌরভ সভাপতির পদে এলে অনেক অঙ্কই বদলে যাবে। আশায় বঙ্গ ক্রিকেট!




