Friday, July 24, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ভাঙন শুরু তৃণমূল দলে, পালাবদলও?‌ কল্যাণে অনাস্থা মমতার!‌ ‘প্রবীণ’ সুদীপের জায়গায় লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা ‘নবীন’ অভিষেক

‘‘দিদি আমার প্রতি অবিচার করলেন! মহিলাকেন্দ্রিক দলে মহিলাদেরই প্রাধান্য। পুরুষদের কোনও গুরুত্ব নেই। আমার দরকার ফুরিয়ে গিয়েছে। এ বার দিদিই দল চালান!’’ মুখ্য সচেতকের পদ থেকে কল্যাণের ইস্তফা। মহুয়ার সঙ্গে কল্যাণের বাদানুবাদ। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সামনে তা চরম পর্যায়ে পৌঁছোয়। কল্যাণকে দেখিয়ে সেখানে কর্তব্যরত বিএসএফ, সিআইএসএফ জওয়ানদের উদ্দেশে মহুয়া বলেছিলেন, ‘‘ওঁকে অ্যারেস্ট করুন!’’ ঘটনার পর কল্যাণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন দমদমের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায়। যিনি আপাতত অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পাল্টা সৌগতকে ‘নারদার চোর’ বলেছিলেন কল্যাণ। মহুয়া অভিযোগ জানিয়ে দলনেত্রী মমতাকে দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন। পুরো বিষয়টি জানান অভিষেককেও। দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের কোনও উন্নতি হয়নি। প্রথম মমতা স্বয়ং লোকসভার সাংসদদের মধ্যে ‘সমন্বয়ের অভাব’ নিয়ে প্রকাশ্য বৈঠকে অনুযোগ প্রকাশ করেন। সোমবার এক্স পোস্টে মহুয়া সম্পর্কে কল্যাণ লেখেন, ‘‘সম্প্রতি একটি পডকাস্টে মহুয়া মৈত্রের মন্তব্য শুনেছি। যেখানে তিনি সহ-সাংসদকে ‘শূকরশাবক’ বলেছেন। যা শুধু অবমাননাকর নয়, সাধারণ নাগরিক রীতির পরিপন্থী।’’ দিল্লির একটি বাংলোর সামনে গাড়ি থেকে মহুয়া নামার সময়েই মূল ফটক দিয়ে হেঁটে ঢুকছেন কল্যাণ। মহুয়াকে দেখেই কল্যাণের স্বগতোক্তি, ‘‘আজকে দিনটা গেল রে!’’ স্পষ্ট দু’জনের মধ্যে আকচাআকচির মনোভাব।

লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতকের পদ থেকে আচমকাই ইস্তফা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সোমবার তৃণমূলের সাংসদদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বৈঠকের অব্যবহিত পরেই দলনেত্রীকে ইস্তফাপত্র পাঠান কল্যাণ। ইস্তফার কারণ হিসাবে শ্রীরামপুরের সাংসদ জানিয়েছেন, নেত্রী মমতা তাঁর উপর আস্থা রাখতে পারেননি। তাই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন। সহকারী সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে সংঘাতও আরও এক কারণ? মহুয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক্স হ্যান্ডলে দীর্ঘ একটি পোস্ট কল্যাণের। কল্যাণের ইস্তফার দিনেই মমতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভার দলনেতা ঘোষণাও কি তাঁর ইস্তফার কারণ? কল্যাণ বলেছেন, অভিষেকের লোকসভার নেতা হওয়ার সঙ্গে তাঁর ইস্তফার কোনও সম্পর্ক নেই বলে জানিয়ে বলেন ‘‘অভিষেকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভাল।’’ কল্যাণ ইস্তফা দেওয়ার পর তাঁকে ফোন করেছিলেন অভিষেক। ৭ আগস্ট দিল্লি যাওয়ার কথা অভিষেকের। দিল্লি পৌঁছে কল্যাণের সঙ্গে বসে আলাদা করে কথা বলবেন। তৃণমূল সূত্রের খবর, কল্যাণ ইস্তফা দিলেও তা আনুষ্ঠানিক ভাবে গৃহীত হয়নি। এর আগেও অনেক বার কল্যাণের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দলের ‘মন কষাকষি’ হয়েছে। কিছু দিন পরে আবার সব মিটমাটও হয়ে গিয়েছে। এ বারেও তেমনই হবে। অভিষেকের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে কল্যাণকে সমঝোতার পথে যেতে হলে ইস্তফাপত্র ফিরিয়ে নিতে হবে। কল্যাণ জানিয়েছেন, লোকসভায় দলের সহকারী নেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে তিনি বলেছেন, কল্যাণের জন্য যেন লোকসভায় পিছনের দিকের একটি আসন নির্দিষ্ট করা হয়। কল্যাণের সখেদ মন্তব্য, ‘‘আমার দরকার ফুরিয়ে গিয়েছে। এ বার দিদিই দল চালান!’’ মমতার সঙ্গে দলের সাংসদদের ভার্চুয়াল বৈঠকে। রাজ্যসভার সংসদীয় দলের কাজ নিয়ে মমতা সন্তোষ প্রকাশ করলেও লোকসভার সাংসদদের মধ্যে ‘সমন্বয়’ নিয়ে তিনি অনুযোগ করেন। দলনেত্রী বলেন, লোকসভার সাংসদদের মধ্যে ঠিকমতো সমন্বয় হচ্ছে না। যা শুনে কল্যাণ বলেন, ‘‘লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ। তিনি সংসদে যান না। উপদলনেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদার কখনও যান, কখনও যান না। আমি এক দিকে মামলা করি, তার সঙ্গে সংসদ করি। আমার পক্ষে আর কতটা সম্ভব?’’ ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে কল্যাণ বলেন,, ‘‘দিদি এটা ঠিক বলেননি। এটা সত্য নয়। আমি সব জানিয়েছি দিদিকে। আমি দিদিকে জানিয়েছিলাম। দিদি মহুয়া মৈত্রের নাম বলেছিলেন। আমি তখন বলি, মহুয়া বললে আমি সংসদে থাকব না। তার পরে দিদিই সায়নী ঘোষের নাম বলেন।’’ সিঁদুর অভিযান নিয়ে লোকসভায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলেছিলেন কল্যাণ নিজে এবং যাদবপুরের সাংসদ সায়নী। কল্যাণের বক্তব্য, মমতা তাঁর প্রতি ‘অবিচার’ করলেন। গত লোকসভা নির্বাচনে শ্রীরামপুরে কল্যাণের বিরুদ্ধে বামেদের প্রার্থী ছিলেন জেএনইউ-এর প্রাক্তনী দীপ্সিতা ধর। সেই সময়ে দীপ্সিতা সম্পর্কে কল্যাণের নানা মন্তব্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে কল্যাণের সেই আচরণ এবং মন্তব্য সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মহুয়া বলেছিলেন, ‘‘শূকরশাবকের সঙ্গে কখনও লড়াই করতে নেই। সে চাইবে লড়াই করতে। কিন্তু আপনি করলে নোংরাটা আপনার গায়েও লাগবে। নারীবিদ্বেষী, হতাশাগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা সব দলেই রয়েছেন। সংসদেও তার প্রতিফলন রয়েছে।’’ এক্স পোস্টে মহুয়া সম্পর্কে কল্যাণ লেখেন, ‘‘সম্প্রতি একটি পডকাস্টে মহুয়া মৈত্রের মন্তব্য শুনেছি। যেখানে তিনি সহ-সাংসদকে ‘শূকরশাবক’ বলেছেন। যা শুধু অবমাননাকর নয়, সাধারণ নাগরিক রীতির পরিপন্থী।’’ কসবার আইন কলেজে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের পরে কল্যাণ এবং তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও দুই নেতার মন্তব্যের নিন্দা করেছিল তৃণমূল। দলের ‘এক্স হ্যান্ডল’ থেকে নিন্দা করে পোস্টও করা হয়েছিল তৃণমূলের তরফে। দলের সেই পোস্ট উল্লেখ করে সমাজমাধ্যমে মহুয়া লিখেছিলেন, ‘‘ভারতে নারীবিদ্বেষ দলের গণ্ডিতে আটকে নেই। কিন্তু তৃণমূলকে অন্যদের থেকে আলাদা করে একটাই বিষয়, আমরা এই ধরনের বিরক্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদ করি, তা সে যিনিই করুন না কেন।’’ তার পরেই ক্রুদ্ধ কল্যাণ বলেছিলেন, ‘‘আমি সব নারীকে সম্মান করি। কেবল ঘৃণা করি একজনকে। তিনি মহুয়া মৈত্র।’’ মহুয়াকে আক্রমণ করতে গিয়ে সেই পর্বে তাঁর বিবাহের প্রসঙ্গও টেনে এনেছিলেন কল্যাণ বলেছিলেন, ‘‘আমি নারীবিদ্বেষী? আপনি (মহুয়া) এক মহিলার ৪০ বছরের বিবাহিত জীবন নষ্ট করে, তাঁকে কষ্ট দিয়ে সেই পুরুষকে বিয়ে করেছেন। আর আমি নারীবিদ্বেষী?’’ কৃষ্ণনগরে মহুয়া কোনও মহিলা নেত্রীকে উঠতে দেন না বলেও অভিযোগ করেছিলেন কল্যাণ। মহুয়া তা নিয়ে তখন কোনও পাল্টা মন্তব্যের রাস্তায় হাঁটেননি।

‘প্রবীণ’ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা হলেন ‘নবীন’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার তৃণমূলের সাংসদদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন দলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বৈঠকেই তাঁর ওই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছেন মমতা। ঘটনাচক্রে, তৃণমূলের অন্দরে ‘প্রবীণ-নবীন’ আলোচনা বা মতদ্বৈধ শুরু সুদীপকে ঘিরেই। প্রবীণের তালিকায় রয়েছেন সাংসদ সৌগত রায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। গত কয়েক মাস ধরে সুদীপও অসুস্থ। তাঁর অসুস্থতা এতটাই গুরুতর যে, চলতি বাদল অধিবেশনে তাঁকে এক দিনও সংসদে দেখা যায়নি। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, এ হেন পরিস্থিতিতে লোকসভায় দলনেতা বদল করা অনিবার্যই ছিল। অধিবেশনের মধ্যেই তা করে দিলেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী। তৃণমূলের কাঠামো অনুযায়ী লোকসভা এবং রাজ্যসভার সংসদীয় দলের পৃথক দু’জন নেতা রয়েছেন। রাজ্যসভার সংসদীয় দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। লোকসভায় সুদীপের বদলে হলেন অভিষেক। এই দুই দলেরই মাথায় থাকা মমতা,দুই কক্ষের সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তৃণমূলে পরবর্তী প্রজন্মকে তুলে আনার পালাবদলের পালা শুরু হল। মমতা সুদীপকে বলেন, অসুস্থতার জন্য লোকসভার নেতাকে সংসদে বাদল অধিবেশনে দেখাই যায়নি। সুদীপ যেন বিশ্রাম নেন। তাঁর বদলে অভিষেক লোকসভার কাজকর্ম দেখবেন। বৈঠকে উপস্থিত এক সাংসদের কথায়, ‘‘সুদীপ’দা তখন নেত্রীকে বলেছিলেন, তিনি সুস্থ হয়ে গিয়েছেন। নেত্রী চাইলে তিনি কালকেই মঙ্গলবার দিল্লি পৌঁছে যেতে পারেন। কিন্তু নেত্রী তাঁকে বলেন, তার প্রয়োজন নেই। সুদীপদা যেন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে সংসদে যান। অভিষেকই এখন থেকে লোকসভার দলনেতার কাজ করবেন। কারা কোন বিষয়ে, কখন বক্তৃতা করবেন, তা-ও অভিষেকই ঠিক করবেন। চূড়ান্ত তালিকা মমতাকে দেখিয়ে নেবেন।’’ তার পরে সুদীপ আর কিছু বলেননি। মমতা তাঁর এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘‘লোকসভা এবং রাজ্যসভার সাংসদদের সঙ্গে আমি আজ ভার্চুয়াল বৈঠক করি। যে হেতু আমাদের লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ এবং চিকিৎসাধীন, সাংসদেরা সমবেত ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ওই দায়িত্ব সামলাবেন, যত দিন না সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সুস্থ শরীরে ফিরছেন। আমরা সুদীপদার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।’’ এক্স হ্যান্ডলে অভিষেক লেখেন, ‘‘লোকসভায় সংসদীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ‘দিদি’ এবং সমস্ত সাংসদ যে আমার উপর আস্থা রেখেছেন, তার জন্য আমি সম্মানিত বোধ করছি।’’ পোস্টে অভিষেক স্পষ্ট করে দিয়েছেন, লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা হিসাবে তাঁর লক্ষ্য হবে বাংলার অধিকার এবং সম্মান রক্ষা করা। পোস্টের শেষে বাংলায় অভিষেক লিখেছেন, ‘জয় হিন্দ, জয় বাংলা’। তার পর পেশী ফোলানোর একটি ইমোজি।

অভিষেককে তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা করার সিদ্ধান্তকে নিছক ‘অনিবার্য’ বলে মনে করছেন না অনেকেই। এই ঘোষণা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। কারণ, লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে অভিষেকের থেকেও বেশি বার জেতা এবং সংসদীয় রাজনীতিতে আরও অভিজ্ঞ সাংসদ রয়েছেন। তাঁদের বাদ দিয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে লোকসভার দলনেতা করা ‘অর্থবহ’। অভিষেক দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির বিষয়ে দলীয় স্তরে তাঁর ‘নিয়ন্ত্রণ’ খর্ব করা হল। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা এবং অপারেশন সিঁদুরের পরে কেন্দ্রের সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলে তৃণমূলের তরফে অভিষেকই এশিয়ার পাঁচটি দেশে সফর করেছিলেন। প্রথমে বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকার বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠানের নাম ঠিক করলেও তা মানেনি তৃণমূল। পরিস্থিতি এমন হয় যে, বরফ গলাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু মমতার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার পরে মমতা অভিষেককেই ওই দায়িত্বের জন্য মনোনীত করেন। অনেকে মনে করছেন, তখনই সংসদীয় দলে অভিষেকের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। সেই ইঙ্গিতও স্পষ্টতর। এক ধাপ এগিয়ে অভিষেককেই সংসদীয় রাজনীতিতে আরও বড় দায়িত্ব দিলেন দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles