টিম ইন্ডিয়ার ক্রিকেটারদের ঠোঁটের কোণেও হাসি। চতুর্থ দিনও দাপুটে মেজাজ। টিম ইন্ডিয়ার ক্রিকেটারদের দাপুটে পারফরম্যান্স। রহস্যটা কী! লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড দেশি মেনু পরিবেশনের সিদ্ধান্ত। হয়তো দেশি খাবার খেয়ে বুমরাহ, সিরাজরা বাড়তি উজ্জীবিত হয়ে খেলেছিলেন। ২০০’র কমে অলআউট ইংল্যান্ড! ঐতিহাসিক লর্ডসে লাঞ্চের মেনুতে ছিল মুরগির টিক্কা কারি, পনির কোর্মা-সহ নানান খাবার। স্টেডিয়ামের মধ্যে থাকা ক্যাটারিংয়ের জন্য বিখ্যাত লর্ডস। ভারতীয় পদ দেখে যে কোনও ভারতীয়দের মুখেই হাসি। দক্ষ পুষ্টিবিদদের পরামর্শেই এই মেনু তৈরি। কন্টিনেন্টাল ও সাবকন্টিনেন্টাল পদ। ছিল ভারতীয় পদও। ঘটনাচক্রে দেশি মেনুই সমস্ত খাবারকে টপকে চলে এসেছে খবরের শিরোনামে। বাসমতী চালের ভাত ও আলু, মিক্সড সবজি, মসুর ডালের তরকারি, টমেটো বেসিল স্যুপ, চিকেন টিক্কা কারি, পনির কোর্মা, প্রন ইন মেরি রোস, ফলের স্যালাড, নানান শাকসবজি ইত্যাদি। মনপসন্দ খাবার খেয়েই দারুণ ঝাঁজ দেখাল ভারত। ১৯২ রানে ইংল্যান্ডকে বেঁধে ফেললেন বুমরাহ, সিরাজ, আকাশ, নীতীশ, ওয়াশিংটনরা। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে চার উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ইংল্যান্ড। লাঞ্চের পরে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন জো রুট ৪০। অধিনায়ক বেন স্টোকস ৩৩ রান। টিম ইন্ডিয়ার বোলিংয়ে ব্যতিক্রমী পারফরম্যান্সে ওয়াশিংটন সুন্দর নেন ২২ রানে ৪ উইকেট। বুমরাহ, সিরাজের শিকার ২টি করে উইকেট। আকাশ দীপ ও নীতীশ রেড্ডি নেন ১ উইকেট। দলগত বোলিং পারফরম্যান্স। লিডস টেস্টে বুমরাহর দাপট। এজবাস্টনে কামাল করেছিলেন আকাশ দীপ এবং মহম্মদ সিরাজ। লর্ডসের প্রথম ইনিংসে ফের বুমরাহর আগুনে ফর্ম। এবার পাঁচ বোলারের মিলিজুলি পারফরম্যান্সে গুটিয়ে গেল ইংল্যান্ডের ইনিংস। ভারতের সামনে ১৯৩ রানের লক্ষ্য। সিরিজে লিড নেওয়াই এখন লক্ষ্য শুভমানদের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে খারাপ শট খেলে আউট হলেন যশস্বী। আর্চারের বল তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে ক্যাচ ধরলেন উইকেটকিপার স্মিথ। শূন্য রানে আউট যশস্বী। এরপর জীবন পান লোকেশ রাহুল। ক্রিস ওকসের বল সোজা তাঁরই হাতে মারেন রাহুল। সহজ ক্যাচ ফস্কান ওকস। ব্রাইডন কার্সের বলে শট খেলার চেষ্টা না করায় বল গিয়ে লাগল করুন নায়ারের প্যাডে। আম্পায়ার আউট দিলেন। করুন আউট ১৫ রানে ও শুভমন ৬ রানে। নাইট ওয়াচম্যান আকাশদীপ আউট হন ১ রানে ও ক্রিজে কেএল রাহুল অপরাজিত ৩৩ রানে। ভারত ৫৮/৪। পঞ্চম দিনে ভারতের জয় ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখবে ক্রিকেটভক্তরা।
লর্ডস টেস্টে ইংল্যান্ডের ব্যাটিংএ ধস নামিয়েছেন ভারতীয় বোলাররা। মহম্মদ সিরাজদের আগ্রাসনে কুপোকাত ইংরেজ ব্যাটার। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক বেন স্টোকসের এমন জায়গায় লাগল যে কুপোকাত স্টোকস। সিরাজের বল নিয়ে মজা করতে ছাড়ল না ইংল্যান্ড ক্রিকেটও। দ্বিতীয় ইনিংসের বয়স তখন ২৯তম ওভার। ব্যাট করছিলেন স্টোকস ও জো রুট। আগুনে মেজাজে ছিলেন মহম্মদ সিরাজ। আচমকাই তাঁর একটি লেংথ বল কিছুটা নীচে নেমে যায়। স্টোকস চেষ্টা করেছিলেন ডিফেন্ড করার। বাউন্সের অভাব ও বলের গতিতে তা স্টোকসের মোক্ষম জায়গায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়েন স্টোকস। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই পড়ে থাকেন। উদ্বেগের সঙ্গে রবীন্দ্র জাদেজা তাঁর সঙ্গে গিয়ে কথা বলেন। সিরাজকেও কিছুটা চিন্তায় দেখায়। পরে উঠে ব্যাট করেন স্টোকস। এই সুযোগে মজা করতে ছাড়ল না ইংল্যান্ড ক্রিকেটও। সোশাল মিডিয়ায় ওই বলের ভিডিও পোস্ট, ‘যেখানে চাও না, সেখানে বলের আঘাত’। ইংল্যান্ড ক্রিকেটের ওই পোস্ট ভাইরাল।
তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হতে বাকি মাত্র ৭ মিনিট। শুভমান গিল বল তুলে দিলেন জশপ্রীত বুমরাহর হাতে। দু’টো বল যেতে না যেতেই দেখা গেল দুই ইংরেজ ব্যাটার বেন ডাকেট, জ্যাক ক্রলিরা নানান বাহানায় সময় নষ্ট করছেন। দিনের শেষদিকে নতুন বলের সুইং সামলানোটা যে কোনও ব্যাটারের পক্ষেই কঠিন। দ্বিতীয় ওভার বল করার সময় যাতে ভারত না পায়, ইংরেজ ব্যাটাররা সেই চেষ্টাই করছিলেন। এ ঘটনায় রীতিমতো তেতে ওঠেন ভারত অধিনায়ক গিল। যেভাবে তিনি আগ্রাসন দেখেছিয়েছেন লর্ডসে, তাতে যেন পূর্বসুরিদেরই ‘ট্রিবিউট’ দিয়েছেন গিল। শুভমানের আগ্রাসনে ছায়া সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং বিরাট কোহলিরও। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়ের সেই স্মৃতি। লর্ডসে সেই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জার্সি ওড়ানোর দৃশ্য তো রীতিমতো আইকনিক হয়ে রয়েছে ক্রিকেটের ইতিহাসে। ক্রিকেট তো বটেই, যে কোনও ক্রীড়াক্ষেত্রেই আগ্রাসনের প্রতীক হিসেবে এই দৃশ্যকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যায়। তাঁর টিম ইন্ডিয়ার দাপটের সামনে বাঘা বাঘা ক্রিকেটাররা নতজানু হতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই তালিকায় ছিলেন অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দেশ। চোখে চোখ রেখে খেলে বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিকভাবে জিততে শেখানো মানুষটার নাম সৌরভই। বিরাট কোহলি আগ্রাসনও সৌরভ পরবর্তী জমানায় উদাহরণ। অধিনায়ক থাকাকালীন বহুবার প্রতিপক্ষ ক্রিকেটারদের সঙ্গে সৌরভের মতোই তর্কে জড়িয়েছেন। সতীর্থদের আগলেও রেখেছেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে তো একবার জো রুটের দিকেই আঙুল তুলে তেড়ে গিয়েছিলেন। তৃতীয় দিনের শেষ লগ্নে শুভমান হয়তো ‘শুভস্য শীঘ্রম’ ভঙ্গিতে তাঁর বোলারদের দিয়ে অন্তত দু’টো ওভার বল করাতে চেয়েছিলেন। শুভমান গিলের গুরু যুবরাজ সিংয়ের ক্রিকেট মাঠে আগ্রাসন। ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অ্যান্ড্রু ফ্লিনটপের সঙ্গে বাদানুবাদের কথা তো মিথের পর্যায়ে। এর ঠিক পরের ওভারে স্টুয়ার্ট ব্রডকে ৬ বলে ছয় ছক্কা হাঁকিয়ে ফ্লিনটপের কটূক্তির জবাব দিয়েছিলেন যুবি। এই সেই ফ্লিনটপ, যিনি ওয়াংখেড়েতে সিরিজ ড্রয়ের পর খালি গায়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। যদিও এর বদলা ন্যাটওয়েস্ট ফাইনাল জিতে সুদে-আসলে নিয়েছিলেন সৌরভ। মহেন্দ্র সিং ধোনিকে ঠান্ডা মাথায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেলেও তাঁর কাছে আগ্রাসনের সংজ্ঞাটা একেবারে ‘সাইলেন্ট কিলারে’র ভূমিকা। পূর্বজদের কাছ থেকে গুরুমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েই সাহসী’শুভমান।
অভিনব রেকর্ড। শুভমান গিলের টিম ইন্ডিয়া। লর্ডস টেস্ট চলাকালীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডকে ছাপিয়ে গেল ভারত। লর্ডসে প্রথম ইনিংস ‘টাই’। দু’দলের ইনিংসই ৩৮৭ রানে শেষ হয়। সেঞ্চুরি করেন কেএল রাহুল। ঋষভ পন্থ করেন ৭৪ রান। ৮টা চারের পাশাপাশি দুটো ছক্কাও হাঁকিয়েছেন পন্থ। রবীন্দ্র জাদেজা, ওয়াশিংটন সুন্দর ও আকাশ দীপও একটি করে ছক্কা হাঁকান। ছক্কার জেরেই নয়া রেকর্ড গড়ল ভারত। লর্ডস টেস্টের আগে পর্যন্ত বিপক্ষের মাঠে একটি সিরিজে সবচেয়ে বেশি ছয় মারার রেকর্ড ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের। দুটো দলই একটি সিরিজে সর্বোচ্চ ৩২টা ছক্কা হাঁকিয়েছে। পন্থ-জাদেজাদের দাপটে প্রতিপক্ষের মাঠে একটি সিরিজে ভারতের ছয়ের সংখ্যা হয়ে গেল ৩৬। লর্ডসে ভারতের এখনও একটা ইনিংস বাকি। এরপর ওল্ড ট্রাফোর্ড ও ওভাল টেস্ট বাকি। ভারতের ছয়ের সংখ্যা বাড়বে। লিডসে প্রথম টেস্টে ভারত ১২টি ছয় মেরেছিল। এজবাস্টনে দ্বিতীয় টেস্টে গিলরা ১৯টি ছক্কা হাঁকান। দুই ইনিংস মিলিয়ে একা শুভমান গিলই মেরেছেন ১১টি ছয়। তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫টি ছক্কায় একটি সিরিজে সবচেয়ে বেশি ছয়ের রেকর্ড ভারতের।




