Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ঢ্যাম কুড় কুড়! বাজনার ব্যাকরণ বদলালেও ঢাক স্বমহিমায়

পরিবর্তনের নানা ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে ঢাকের মহিমা ম্লান হয়নি, বরং ঢাকের সমাদর ও চাহিদা বেড়েছে বহু গুণ। সে ঢাকের কাঠামো বদলাক বা তার বাজনা— ঢাক যে ফিরছে, তা অস্বীকার করা ‌যায় না। বিশেষ করে, সম্প্রতি শব্দদূষণ রোধে কড়া আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ডিজে বা কানফাটা সাউন্ড বক্সের ব্যবহার অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। বদলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ঢাকের মতো আদি ও অকৃত্রিম বাদ্যকে। দেবীপক্ষের সূচনায় কলকাতা শহরও মুখরিত হয়েছে ঢাকবাদ্যে। ইডেন গার্ডেন্সে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনায় প্রায় ৩০০০ ঢাকি একসঙ্গে ঢাক বাজিয়েছেন। কলকাতার এই অনুষ্ঠান গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও জায়গা করে নিয়েছে বলে শোনা গিয়েছে। ঐতিহ্যরক্ষাতেই নয়, সুর-তালের সীমানা ভাঙতেও ঢাক অগ্রগামী। দেশ-বিদেশের নানা সঙ্গীতানুষ্ঠান, লাইভ কনসার্ট এবং অর্কেস্ট্রার মূল মঞ্চে ঢাককে উপস্থাপন করা হচ্ছে এক অনন্য বাদ্যযন্ত্র হিসেবে। পুরুষতান্ত্রিক ধারা ভেঙে মহিলারাও কাঁধে ভারী ঢাক তুলে নিয়ে বাজাচ্ছেন দেবীর আগমনীর বোল। দুর্গাপুজোর চারদিন শুধু নয়, ইদানীং ভোটের প্রচারেও মহিলা ঢাকিদের কদর অনেক বেশি। শহরে, জেলায়, ভিন্‌রাজ্যে, এমনকি বিদেশেও মহিলা ঢাকিরা বায়না পাচ্ছেন। কাজেই ঢাকে বিবর্তন ঘটলেও, শিকড়ের টানে স্বমহিমায় তার রাজকীয় প্রত্যাবর্তনই ঘটছে। ঢাকের বাদ্যির নিজস্ব কিছু তাল, মাত্রা, বোল আছে,। বিলম্বিত লয়ে একটানা ঢাক বাজানোর শিক্ষা তা খুব কম জনেরই আছে। সেই তালিম দেওয়ার পণ্ডিতও বা কই! ঢাকবাদ্যি এখন নিয়মনীতির চেয়ে অনেকটাই বাণিজ্যিক। দুর্গাপুজোর প্রতিটি আচার— যেমন, সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা-প্রবেশ, সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণ, আরতি, কিংবা বিজয়ার বিষাদঘন বিসর্জন— প্রতিটি ধাপেরই রয়েছে নির্দিষ্ট ছন্দ, চার-আট বা ষোলো মাত্রার নিজস্ব বোল। সেই বৈচিত্র ম্লান হয়ে এসে ঠেকেছে একঘেয়ে বাজনায়। সেখানে ঠাঁই করে নিয়েছে ফিল্মি গান কিংবা ফিউশনের চড়া তাল। তবুও, সব বদলের পরেও ঢাকের সেই চেনা বাদ্য না বাজলে আজও বাঙালির পুজো পানসে।

ঢাকের খোলনলচে বদলেছে। বদল এসেছে চিরচেনা সেই বোলেও। ঢাক শুধু পুজোকেন্দ্রিক নয়, তার ব্যাপ্তি আরও বেড়েছে। তবুও ঢাকের বাদ্যি ছাড়া দুর্গাপুজো ভাবাই যায় না। চেনা ‘ঢ্যাম কুড় কুড়’ বোল আর চণ্ডীপাঠের আওয়াজ কানে গেলেই সহসা নড়েচড়ে বসে বাঙালির হৃদয়। হাড়েমজ্জায় জাঁকিয়ে বসে পুজোর আমেজ। সে স্থানটি কলকাতা হোক বা রাঢ়বঙ্গের প্রান্তিক কোনও গ্রাম, কিংবা সুদূর সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার— ঢাকের সেই চিরন্তন বাদ্য ছাড়া দুর্গাপুজো ভাবাই যায় না। শতাব্দী পার করেও ঢাক কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র রয়ে যায়নি, তা হয়ে উঠেছে উৎসবের হৃৎস্পন্দন, বোধন থেকে বিসর্জনের এক অবিচ্ছেদ্য আবহ। সময়ের চাকা যত গড়িয়েছে, পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে ঢাকের বোলেও। এককালে যা ছিল স্রেফ বনেদি বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ কিংবা গ্রামবাংলার পুজোর সাবেক অনুষঙ্গ, তা আজ বিশ্বায়নের আলোয় নতুন রূপ পেয়েছে। ঢাকবাদ্যির ব্যাকরণ বদলেছে, তার খোলনলচেতেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। ঢাক একসময় ছিল শুধুই পুজোকেন্দ্রিক, আজ তা বিয়েবাড়ি, কর্পোরেট ইভেন্ট, ভোটের প্রচার, রাজনৈতিক বিজয় মিছিল থেকে শুরু করে যে কোনও শুভকাজে সমান সমাদৃত। আর এ বছর তো ঢাকবাদকদেরই পোয়াবারো! নতুন সরকার ঘোষণা করেই দিয়েছে যে, সাউন্ড বক্স বা ডিজে-র কান ফাটানো বাজনার বদলে ঢাকবাদ্যেই মুখরিত হবে দুর্গোৎসব। কাজেই ঢাক যে আবার স্বমহিমায় প্রত্যাবর্তন করছে, তা বলাই বাহুল্য। বসিরহাট, হাড়োয়া, হাসনাবাদে বহু ঢাকির বাস। একসময় দুর্গাপুজো বা কালীপুজো বাদে, বছরের বাকি সময়টা অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে বা টুকিটাকি কাঠের কাজ করে দিন গুজরান করতেন তাঁরা। এখন ঢাকির কদর সারাবছরই থাকে। হাসনাবাদ থেকে শিবপুরে এসেছেন রতন দাস। জানালেন, একসময় শিয়ালদহ স্টেশনে তাঁরই মতো কয়েকশো ঢাকিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হত বায়নার অপেক্ষায়। এখন দিন বদলেছে। অনেক আগে থেকেই ঢাকের বরাত আসতে শুরু করেছে। কারণ শুধু পুজো নয়, ভোটের প্রচার, প্রাক্-পুজো নানা অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রায় ঢাকিদের ডাক পড়ছে। কলকাতা-সহ অন্যান্য পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও পুজোর উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ইতিমধ্যেই ফোনের মাধ্যমে বেশির ভাগ অর্ডার চলে এসেছে। ডিজে-র ঝিনচাক থেকেও লোকজন ঢাকের বাদ্যি বেশি পছন্দ করছেন। এমনকি শপিং মলের উদ্বোধন হোক বা কোনও বিপণির যাত্রারম্ভ— ক্রেতাদের নজর কাড়তেও ঢাকিদের ডাক পড়ছে।

একসময় ঢাকের খোল তৈরি হত আম, জামের মতো শক্ত গাছের গুঁড়ি খোদাই করে। ঢাকের সেই খোলের ওজনই হত ৩০-৪০ কেজির উপরে। মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা, হাওড়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢাক বাজাতে আসেন গোপাল সাধুখাঁ। বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। পিঠে ভারী ঢাক বয়ে বেড়ান, অথচ মুখে ক্লান্তির ছাপটুকু নেই। জানালেন, একসময় ৪০ কেজি অবধি ওজনের ঢাক বয়েছেন। ঢাকের ওজন এখন অনেক কমেছে। ঢাকের বোলেও যে বদল এসেছে, তা-ও জানালেন প্রবীণ ঢাকি। ঢাকের বোল কেমন হবে, তা শিখতে হয়। গভীর অনুশীলনের প্রয়োজন। কারণ, ঢাকের নানা বোলের নানা অর্থ। ঢাকের কাঠি যেন কথা কয়। আরতির সময়ে ঢাকের বাজনা এক রকম হয়, ঘট স্থাপনের সময়ে বাজনা বদলায়, আবার বিসর্জনের বাদ্যি অন্য রকম। ঢাকবাদ্যিরও ব্যাকরণ আছে। নিজে লেখাপড়া তেমন না শিখলেও, ঢাকের এই ব্যাকরণে পটু গোপালবাবু। অবসরে তরুণ ঢাকিদের শেখানোর কাজও করেন। ঢাকে যে বদল এসেছে, তা মেনে নিয়েছেন নদিয়ার বিশুও। ঢাক নিয়ে তাঁর তেমন বিদ্যে নেই, তবে বাজনাতে সিদ্ধহস্ত। জানালেন, একসময় ঢাক বাজালে গুরুগম্ভীর নাদ বার হত। এখন তা অনেক হালকা। এক পিঠে ছাগলের চামড়ার পাতলা ‘ছাওয়া,’ আর বিপরীত প্রান্তে গরুর চামড়ার মোটা ‘তালা’— এই যুগলবন্দিই ছিল ঢাকের বৈশিষ্ট্য। তাতেই ঢাকের পেট থেকে বেরিয়ে আসত জলদগম্ভীর নাদ। কালের নিয়মে সেই সাবেক খোলনলচে বদলেছে অনেকখানি। ভারী কাঠের স্থান নিয়েছে মাটি বা টিনের তৈরি হালকা খোল, যার আওয়াজ বেশ অন্য রকম। চামড়ার বদলে তাতে জুড়েছে প্লাস্টিকের তালা। ফলে ঢাক তার চিরন্তন গাম্ভীর্য ও মিষ্টত্ব হারিয়ে একরকম ধাতব ও কৃত্রিম রূপ ধারণ করেছে। তবে গোপাল, রতন বা বিশুরা টিনের ঢাক বা মাটির খোলের ঢাক বাজান না। ঢাকের সেই আদিরূপেই তাঁরা পটু। ওজন যতই হোক, ঢাকের ভারে শরীর ন্যুব্জ হলে তবেই না তার বোল মাতাল করে দেবে। এই কায়িক শ্রমই তাঁদের কাছে আনন্দের, গর্বেরও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles