Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

চোরবাগান কোনও আকস্মিক বিশৃঙ্খলা নয়!‌ ভিড়ের চরিত্র বুঝে মৃত্যুফাঁদ এড়াতে পারে বিজ্ঞান

RK NEWZ প্রতি বর্গমিটারে ১-২ জন মানুষ থাকলে প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে চলতে পারে। ঘনত্ব বেড়ে ৩-৪ জন হলে চলাচল ধীর হয়। ঘনত্ব প্রতি বর্গমিটারে ৪ থেকে ৫ জন হলে, পরিস্থিতি ভয়ংকর। ভিড়ের চাপে মৃত্যু কোনও আকস্মিক বিশৃঙ্খলা নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞান। পদার্থবিদ্যা, গণিত ও মনস্তত্ত্বের সমন্বয়ে সেই মৃত্যুফাঁদ রুখতে পারে ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’। ভিড়কে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, ভিড়ের চরিত্র বুঝেই বাঁচানো সম্ভব প্রাণ। লিখছেন, অর্ণবকুমার রায়। ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’ বা ভিড়ের বিজ্ঞান এখন আর কোনও তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জীবনরক্ষাকারী বহুশাস্ত্রীয় বিজ্ঞান। সাধারণ চোখে একটি বিশাল জনসমুদ্রকে চরম বিশৃঙ্খল মনে হতে পারে, কিন্তু এর গভীরে রয়েছে পদার্থবিদ্যা, গণিত, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, স্থাপত্যবিদ্যা এবং কম্পিউটার সিমুলেশনের একরকম জটিল ও সুনিপুণ সমন্বয়। যখন হাজার হাজার মানুষ একটি নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়, তখন তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আচরণ এবং চলাচল কীভাবে সমষ্টিগত রূপ নেয় এবং কীভাবে তৈরি হয় চাপ, ঢেউ এবং বিপর্যয়– এই সমগ্র প্রক্রিয়াটিকেই বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস এবং নিয়ন্ত্রণ করাই হল ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’-এর মূল লক্ষ্য। তাই একে বলা হয় ‘মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি সায়েন্স’। দুর্গাপুজো বা অন্য যে কোনও ধর্মীয় উৎসব, কুম্ভমেলা, হজ যাত্রা, রাজনৈতিক র‍্যালি, স্টেডিয়ামের খেলা বা কোনও আকস্মিক দুর্যোগ– যেখানেই বিপুল জনসমাগম হয়, সেখানেই এই ভিড়ের বিজ্ঞান ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। এই বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ জনগণের ভিড়কে বিশৃঙ্খল হতে না দিয়ে সুশৃঙ্খল, পরিকল্পিত এবং নিরাপদ রাখে। তাই এটিকে বলা হয় ‘জীবনরক্ষার বিজ্ঞান’।

প্রতি বর্গমিটারে ১-২ জন মানুষ থাকলে প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে চলতে পারে। ঘনত্ব বেড়ে ৩-৪ জন হলে চলাচল ধীর হয়। ঘনত্ব প্রতি বর্গমিটারে ৪ থেকে ৫ জন হলে, পরিস্থিতি ভয়ংকর। এই বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন জার্মান পদার্থবিদ ডির্ক হেলবিং, সহযোগী ইয়েলেস ফারকাস ও তামাস ভিসেক। ২০০০ সালে বিশ্বখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালে তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণাপত্র ‘সিমুলেটিং ডায়নামিক্যাল ফিচারস অফ এসকেপ প্যানিক’ প্রকাশিত হয়। এখানে প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করা হয় যে, আতঙ্কিত ভিড় কোনও সাধারণ মানুষের দলের মতো আচরণ করে না, বরং ‘তরল পদার্থ’ বা ‘ফ্লুইড’-এর মতো আচরণ করে। তঁার তৈরি ‘সোশ্যাল ফোর্স মডেল’ বা ‘প্যানিক মডেল’ দেখায়, সঠিক বৈজ্ঞানিক সিমুলেশন ছাড়া ভিড়ের এই তরল চাপই পদদলিত হওয়ার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। বর্তমান ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ থেকে শুরু করে বিশ্বের সমস্ত আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা তাদের নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলেছে– লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ নয়, বরং একমুখী চলাচল, সিসিটিভি-র মাধ্যমে জনঘনত্ব পরিমাপ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামোই হল ‘ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট’ বা সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। এই ক্ষেত্রের আর-এক দিকপাল, ব্রিটিশ অধ্যাপক জি. কিথ স্টিল দেখিয়েছেন, একটি স্টেডিয়াম বা পুজোমণ্ডপের নকশা তৈরির সময়ই যদি ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’ মেনে চলা হয়, তবে ‘জরুরি অবস্থা’-য় হাজারো মানুষ নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারবে। ভিড়ের বিজ্ঞানকে বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে মানুষের স্বাধীনতার বিলীন হয়ে যাওয়া। গবেষকরা বলছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি বর্গমিটারে ১-২ জন মানুষ থাকলে প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে চলতে পারে। ঘনত্ব বেড়ে ৩-৪ জন হলে চলাচল ধীর হয়। কিন্তু যখনই ঘনত্ব প্রতি বর্গমিটারে ৪ থেকে ৫ জন ছাড়ায়, তখনই শুরু হয় ভয়ংকর এক অবস্থা– যাকে বলা হয় ‘তরল মানবতা’ বা ‘ক্রাউড ফ্লুইড ডায়নামিক্স’। এই অবস্থায় মানুষ আর ব্যক্তি থাকে না, সে হয়ে যায় স্রোতের একটি কণা। পদার্থবিদ্যায় তরল যেমন পাত্রের আকার নেয়, সরু পাইপে তীব্র বেগে ছোটে, মানুষও তেমনই পিছনের ধাক্কায় এবং সামনের টানে অবশভাবে ভাসতে থাকে। এই অবস্থায় তৈরি হয় ‘ক্রাউড টার্বুলেন্স’ এবং ‘শকওয়েভ’। একটি ধাক্কা মুহূর্তে শত শত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ চাইলেও থামতে পারে না, পড়ে গেলে উঠতে পারে না।

‘স্ট্যামপিড’ মানে হল মানুষ আতঙ্কে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে একে-অপরকে মাড়িয়ে দৌড়চ্ছে। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, বিশ্বের ৯০% বড় ভিড়-দুর্ঘটনা আসলে স্ট্যামপিড নয়, এগুলো হল ‘ক্রাউড ক্রাশ’। এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণার সংশোধন। আমরা সাধারণত ভিড়ের মৃত্যুকে ‘পদদলিত’ বা ‘স্ট্যামপিড’ বলি। ‘স্ট্যামপিড’ মানে হল মানুষ আতঙ্কে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে একে-অপরকে মাড়িয়ে দৌড়চ্ছে। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, বিশ্বের ৯০% বড় ভিড়-দুর্ঘটনা আসলে স্ট্যামপিড নয়, এগুলো হল ‘ক্রাউড ক্রাশ’। ২০১৫ সালে মক্কার মিনায় হজে অথবা ২০২২ সালে সিওলের ইত্যেওনে হ্যালউইন উৎসবে বহু মানুষের মৃত্যু– এই ঘটনা দু’টির সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্ত রিপোর্ট পরবর্তীতে বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন যে, সেখানে কোনও মানুষ দৌড়ানোর সুযোগই পায়নি। তারা স্রেফ একটি মানব-দেওয়ালের চাপে আটকে গিয়েছিলেন। সরু গলি বা গেটে ‘বট্‌লনেক’ বা বোতলের সরু মুখের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। চারদিক থেকে আসা প্রচণ্ড চাপে মানুষের বুকের পাঁজর প্রসারিত হওয়ার জায়গা পায়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কমপ্রেসিভ আসফিক্সিয়া’ বা ‘চাপজনিত শ্বাসরোধ’। মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। এটি কোনও বিশৃঙ্খলা নয়, এটি একটি নিছক ভৌত বিপর্যয়।

এই বিপর্যয় রুখতেই বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন কম্পিউটার সিমুলেশন। পুজোমণ্ডপ বা স্টেডিয়াম তৈরির আগেই সফটওয়্যারে দেখে নেওয়া হয় ‘জরুরি অবস্থা’-য় মানুষ কত দ্রুত বেরতে পারবে। এই সিমুলেশন থেকেই জন্ম নিয়েছে এক আশ্চর্য কৌশল– ‘আর্কিটেকচারাল বাফারিং’ বা পিলার কৌশল। সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয়, বেরনোর দরজার সামনে একটি পিলার থাকলে বাধা হবে। কিন্তু সিমুলেশন দেখায়, দরজার সামনে সঠিক দূরত্বে একটি শক্ত পিলার থাকলে তা পিছনের মানুষের সরাসরি চাপকে দু’-ভাগে ভাগ করে দেয়, ফলে দরজার মুখে প্রাণঘাতী চাপ আর জমে না। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আতঙ্কিত পিঁপড়ের দল যখন কোনও সরু গর্ত দিয়ে দ্রুত বের হতে চেষ্টা করে, তখন গর্তের মুখের সামনে একটি ছোট কাঠি বা পাথর থাকলে পিঁপড়েরা অনেক দ্রুত এবং কোনও জটলা ছাড়াই বের হতে পারে। প্রকৃতির এই নিয়মটিকেই বিজ্ঞানীরা মানুষের সুরক্ষায় স্থাপত্যবিদ্যায় কাজে লাগিয়েছেন। ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’-এর আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ‘ইভাকুয়েশন ডায়নামিক্স’ বা জরুরি নিষ্কাশন। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মনস্তাত্ত্বিক ধারণা। ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’-এর আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ‘ইভাকুয়েশন ডায়নামিক্স’ বা জরুরি নিষ্কাশন। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মনস্তাত্ত্বিক ধারণা। স্বাভাবিক সময়ে মানুষ যুক্তি দিয়ে ভাবে, কিন্তু আগুন বা বিস্ফোরণের মতো আতঙ্কে মানুষ ‘হার্ড মেন্টালিটি’ বা পালের মানসিকতায় চলে যায়। সামনের জন যেদিকে দৌড়য়, প্রত্যেকে সেদিকেই ছোটে। ফলে দেখা যায়, প্রধান গেটে হাজারো মানুষের ভিড়ে মৃত্যু হচ্ছে, অথচ পাশেই ফাঁকা জরুরি নির্গমন পথ খালি পড়ে আছে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে আধুনিক ইভাকুয়েশন ডিজাইনে উজ্জ্বল আলো, স্পষ্ট দিকনির্দেশ, এবং আতঙ্ক না ছড়িয়ে শান্ত গলায় ঘোষণার উপর জোর দেওয়া হয়। সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ মানুষের আতঙ্ক শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই আধুনিক ব্যবস্থায় সাইরেনের বদলে শান্ত, গভীর ও স্পষ্ট কণ্ঠে রেকর্ড করা বা লাইভ ঘোষণা (‘পাবলিক অ‌্যাড্রেস সিস্টেম’) ব্যবহার করা হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে শান্ত, গম্ভীর ও নির্দেশনামূলক কণ্ঠস্বর শুনলে মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত আতঙ্ক কাটিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে নির্দেশ পালন করতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, আধুনিক ভিড় ব্যবস্থাপনার তিনটি সোনালি সূত্র রয়েছে। প্রথমটি একমুখী চলাচল। ঢোকার ও বেরনোর পথ সম্পূর্ণ আলাদা। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষ বন্ধ হয় এবং তরল গতি মসৃণ থাকে। দ্বিতীয়টি ব্যাচিং। হাজারো মানুষকে একসঙ্গে মূল ভেন্যুতে ঢুকতে না দিয়ে অনেক দূরে ব্যারিকেড দিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ করা। এক দল বেরলে আর-এক দল ঢুকবে। এতে মূল গেটে কখনওই ধারণক্ষমতার বেশি চাপ তৈরি হয় না। তৃতীয়টি ‘রিয়েল টাইম’ ঘনত্ব পরিমাপ। এখন এআই এবং সিসিটিভি-র মাধ্যমে প্রতি বর্গমিটারে কতজন মানুষ আছে তা সরাসরি মাপা হয়। কোনও জোনে ঘনত্ব ৪ জন ছাড়ালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কতা জারি হয় এবং ভিড়কে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পরিশেষে বলা যায়– জনসংখ্যা যত বাড়ছে, আমাদের উৎসব, মেলা, শহর ততই জনাকীর্ণ হচ্ছে। এই অবস্থায় ‘ক্রাউড ডায়নামিক্স’ কোনও বিলাসিতা নয়– এটি অস্তিত্বের শর্ত। আধুনিক গবেষণা বলেছে লাঠি বা জোর খাটিয়ে ভিড় সামলানোর দিন শেষ। ভিড়কে বুঝতে হবে বিজ্ঞান দিয়ে, সামলাতে হবে মানবিকতা ও গণিত দিয়ে। তবেই ‘তরল মানবতা’ আর কোনও বিপর্যয় ডেকে আনবে না, পরিবর্তে তা হয়ে উঠবে আনন্দেরই এক নিরাপদ প্রবাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles