রাজকুমার মণ্ডল
লেখক, সাংবাদিক
শারোৎসব? নাকি দুর্গাপূজো? রঙ বদলের হাওয়ায় ভেসে কলকাতার জনপ্রিয় উৎসব। পুজো দখল, নাকি প্যান্ডেল? ভোলবদল? প্রশ্নেও অনেক বিতর্ক! আবার কখনও,পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে রাজনৈতিক ‘বৈপরীত্য। জুলাইয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলের নেতাদের পুজো কমিটি দখল না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দুর্গাপুজো কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। অথচ বাস্তবে একের পর এক পুজোয় বিজেপি নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার খবর এল। তৃণমূল আমলে পুজো হয়ে উঠেছিল কিছু নেতা-মন্ত্রীর বিজ্ঞাপন থেকে টাকা তোলার যন্ত্র। মমতা দেখেও দেখেননি। কেড়ে নেওয়া উচিত ছিল মন্ত্রী, বিধায়কদের পুজোয় প্রত্যক্ষ যোগাযোগের অধিকার। তা তখন হয়নি। এবারও হয়নি। দুর্গাপুজোর মণ্ডপ কয়েকদিনের জন্য তৈরি হয়, উৎসব শেষে খুলেও ফেলা হয়। মণ্ডপের আড়ালে যে সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তার আয়ু অনেক দীর্ঘ। এবার কলকাতার পুজোয় ফুটে উঠেছে সেই সম্পর্কেরই নতুন ছবি। প্রতিমা বিসর্জনের পরে আলো নিভে যাবে, মণ্ডপ ভাঙা হবে। পুজোর কমিটিতে এই রাজনৈতিক পালাবদল কত দিন স্থায়ী হয়? এই পুজো রাজনীতির কাছে শিশু। কলকাতার পুজো প্যান্ডেল। এখন ঠাকুরমার ঝুলির বুদ্ধ। ঠাকুরমার ঝুলির সেই অংশ মনে পড়ে। রাজকুমার বুদ্ধ যখন রাজকন্যা কলাবতীকে উদ্ধার করে জিজ্ঞেস করে, ‘রাজকন্যা, এখন তুমি কা’র?’, তখন রাজকন্যা উত্তরে বলেছিল, ‘আগে ছিলাম বাপের-মায়ের, তা’র পরে ছিলাম আমার; এখন তোমার ।.. কলকাতার এবারের বহু পুজো প্যান্ডেলগুলোর দশা আপাতত সেরকমই। কোনও বুদ্ধ মানুষ যদি অধিকাংশ প্যান্ডেলকে প্রশ্ন করে, প্যান্ডেল এখন তুমি কার, তখন প্যান্ডেল উত্তর দেবে, ‘আগে ছিলাম তৃণমূলের, এখন বিজেপির।’ দেবী সপরিবার নিশ্চয়ই হাসছেন দেখেশুনে। কিছু কিছু বড় পুজো এবার তৃণমূল নেতাদের হাত থেকে চলে গেল বিজেপি নেতাদের হাতে। ডিগবাজির বিপ্লব। নাকি জবরদখল। আত্মসমর্পণ। মসৃণভাবেই হস্তান্তর। চরম সত্য হল, কলকাতার পুজোর গৈরিকীকরা সম্পূর্ণ। অনেক খুঁজে হয়তো কলকাতায় গোটা দু-তিনেক পুজোর খোঁজ মিলবে, যা এখনও তৃণমূল-এমের হাতে রয়েছে। বাকি সব বিজেপি নেতাদের দখলে। কালীঘাট মিলন সংঘ, এবার একমাত্র যে পুজো উদ্বোধন করতে পেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাজরা পার্কে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ছেলের পুজো এবং গড়পারের একটি পুজো। মমতা থেকে দূরে গিয়ে বিজেপির কথায় ভালো তৃণমূলে হাত মেলানো অধিকাংশ পুজোদুর্গ অক্ষত। মমতার এককালের দক্ষিণ ও বাম হস্ত অরূপ বিশ্বাস বা ববি হাকিম বিশ্বাসঘাতকতা করেও পুজো হাতে রাখতে পারেননি। পেরেছেন দেবাশিস কুমার বা অতীন ঘোষ। সুব্রত মুখোপাধ্যায় অনেক আগেই প্রয়াত না হলে এখন একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাবের পুজোতেও ছড়ি ঘোরাতেন বিজেপি নেতারা। যোধপুর পার্কের সবচেয়ে বড় পুজোর প্যান্ডেল ভেঙে দেওয়া হয়েছে কিছু হিন্দুত্ববাদী লোকের থিম পছন্দ হয়নি বলে। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে শুধু দুর্গা প্রতিমা। ওটাই একটা থিম। নিউটাউনের এক পুজোয় আর এক অংশীদার হাজির বিধায়কের নেতৃত্বে। হাইকোর্টে যেতে হয়েছে পুজো করতে। টস করার প্রস্তাব। তারপর প্যান্ডেল আড়াআড়ি ভাগ করে পুজো। অন্য পুজোর জন্য রাজ্যের প্রধান উপদেষ্টার ছবিতে ছয়লাপ নিউটাউন। অন্যদিকে দিলীপ ঘোষের ছবি। তাঁর স্ত্রী যে একটি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। বিজেপি নেতা সজল ঘোষ শুধু লেবুতলা পার্কের পুজো নিয়েই সন্তুষ্ট নন। বরাকারের দিকে লোল্যান্ড, বন্ধু দল সহ অনেক বড় পুজোর বড় মাথা।
গতবার পর্যন্ত দুর্গাপুজোর উদ্বোধন মানেই ছিল মমতার উপস্থিতি। বর্তমানে অধিকাংশ উদ্বোধনের অতিথি শুভেন্দু অধিকারী। সব ক্ষেত্রেই পুজো কমিটি বিজেপির দখলে? সাংগঠনিক নেতৃত্বে বদল। পরিবর্তন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার। অথবা উদ্বোধক বা অতিথির তালিকার। তিন ধরনের পরিবর্তন। কলকাতার দুর্গাপুজোর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক গভীরতর। দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম পরিচিত সুরুচি সংঘের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তৃণমূলের বিশ্বাস ব্রাদার্স। এখন মাথা উত্তর দমদমের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ শিকদার। পুজোর সাংগঠনিক নেতৃত্বে সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ। সুজিত বসু মন্ত্রী থাকাকালীন শ্রীভূমির দুর্গাপুজোকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। বিজেপির স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এখন পুজোর দণ্ডমুণ্ডের হোতা। সুজিতের জন্য পাত্তা না পাওয়া বিজেপি কর্মীরাই দায়িত্ব পালন করেন। জয়পুরের হাওয়া মহল দেখে মনে হচ্ছে অবাঙালিদের বিয়ে বাড়ির মণ্ডপ। আহিরীটোলায় পুজোর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন প্রাত্তন মন্ত্রী শশী পাঁজা। এবার কমিটির চেয়ারপার্সন শ্যামপুকুরের বিজেপি বিধায়ক পূর্ণিমা চক্রবর্তী। মুখ্যমন্ত্রী প্রতিমার চক্ষুদান হবে না বললেও, এখানে পূর্ণিমা সেই অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। মহম্মদ আলি পার্কে দীর্ঘদিন যুক্ত সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার তাঁর ‘চিরশত্রু’ মন্ত্রী তাপস রায়ই মাথা। রাজডাঙা নব উদয় সংঘের পুজো ছিল তৃণমূলের দাপুটে কাউন্সিলার সুশান্ত ঘোষের। এবার পুজো কমিটির চেয়ারপার্সন হয়ে বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র কেয়া ঘোষের অনুপ্রবেশ। টালা প্রত্যয়ে এবার বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি মাথা হন। এক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তন নয়, নতুন সাংগঠনিক কাঠামোতেও আমূল বদল। নাকতলা উদয়ন সংঘে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িয়েছিল প্রাক্তন তৃণমূল মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অনুগামীরা। পার্থ জেলবন্দি থাকার সময়ও। এবার কমিটিতে না থাকলেও প্যান্ডেলের পাশে পার্থর উপস্থিতি শুধু মমতার বিরুদ্ধে মুখ খোলার কারণে। শাসকের চোখে ভালো তৃণমূল। পাটুলির কেন্দুয়া শান্তি সংঘ এতদিন তৃনমুলের বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এবার প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। সজল ঘোষ স্টাইলে অনেক পুজোর সঙ্গে শর্বরী। আনোয়ার শাহ রোডের একাংশ ছেয়ে বিজেপি নেতাদের স্বাগত জানানোর হুড়োহুড়িতে। চেতলা অগ্রণী, হিন্দুস্থান ক্লাব, ত্রিধারার তিন মাথা ববি হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, দেবাশিস কুমাররা তৃণমূলে বিশাল ডিগবাজি দিয়ে মমতার বিশ্বাসে চরম আঘাত দিয়ে পুজোয় উপস্থিতি কণফার্ম করেন। প্রত্যেকেরই প্রবল তৈলমর্দ্দনের ধারায় উদ্বোধনের প্রধান অতিথি শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতার বহু পরিচিত পুজোয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা অথবা উদ্বোধনের অতিথিদের পরিবর্তনের চিহ্ন। এবার আদানি গোষ্ঠী ৮টি পুজোকে বিশাল অঙ্কের অনুদান দিয়েছে। পুজো শুরুর আগেই পুরস্কৃতদের বাছাই! বিশাল বিতর্ক?





