Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

নরেন্দ্র মোদিকে আমি প্রথম যে সময়ে দেখেছি! আগে নাম ধরে ডাকতেন, যেদিন থেকে রাজ্য সভাপতি হয়েছি, অধ্যক্ষজি বলেন

শমীক ভট্টাচার্য সাংসদ, রাজ্য সভাপতি, বিজেপি

প্রায় বছর ৩০-৩৫। নরেন্দ্র মোদিকে আমি প্রথম যে সময়ে দেখেছি। তখন তিনি আজকের প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি ছিলেন সংগঠনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একজন রাজনৈতিক কর্মী। নয়ের দশকের গোড়া। কলকাতায় হয়েছিল আমাদের দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক। প্রথমবার দেখেছিলাম মানুষটাকে। আমিই হাওড়া স্টেশন থেকে আনতে গেছিলাম। তখন তো আর আমাদের দলের অত টাকা পয়সা ছিল না। একটা গাড়িতেই জনা তিন-চার উঠেছিলাম। গাড়িতে উঠেই প্রথম জানতে চেয়েছিলেন, বেলুড় মঠ কোনদিক থেকে যেতে হয়? কত সময় লাগে? সেবারের একটা গল্প না বললেই নয়। একটি বাচ্চা মেয়ে এসেছিল বড়বাজারের হিমালয় হোটেলে। সেখানে আবার আদবানিজিও ছিলেন। উনি তখন সর্বভারতীয় স্তরের বড় নেতা। তাঁর নিরাপত্তাও তেমন। সেই মেয়েটি আদবানিজির অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য নাজেহাল হয়ে ঘুরঘুর করছিল। কিন্তু আদবানিজির কাছে তো ওভাবে পৌঁছনো যায় না। অগত্যা সে পড়ল মোদিজিকে নিয়ে। উনি বলে উঠলেন, “বেটি, আমি কোনও বড় নেতা নই। বড় নেতারা ফ্লাইটে আসে। ওকে জিজ্ঞেস করো, আমি ট্রেনে করে এসেছি।” বাচ্চাটার মন রাখতে আমি মোদিজিকে অনুরোধ করেছিলাম অটোগ্রাফ দিয়ে দিতে। বলেছিলাম, “আরে আপনিও তো একদিন ফ্লাইটে আসবেন।” তাতে উনি হেসে বলেছিলেন, “তুমি কি জ্যোতিষচর্চা করো নাকি?” সেদিনের নিছক সেই ভবিষ্যৎ বাণী কেমন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। একটা মানুষ প্রথমে রাজ্যের, পরে দেশের প্রশাসনের সর্বোচ্চ আসনে ২৫টা বছর কাটিয়ে ফেললেন। ভাবতে পারছেন? সিকি শতাব্দী। দীর্ঘ এই সময়ে মোদিজির দায়িত্ব পাল্টেছে। ওঁকে নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পাল্টেছে। প্রশাসনের পদ্ধতি পাল্টেছে। তবে আমার চোখে ওঁর একটা বিষয়ে কোনও বদল আসেনি। তা হল, কাজের প্রতি মানুষটার তাগিদ। ধারাবাহিকভাবে মানুষটা কাজ করে যাচ্ছেন। যেখানেই ভোট হয়, উনি নিজে গিয়ে বলেন, আমায় ভোট দিন। অনেকেই এটাকে আমিত্ব বলেন, কিন্তু আসলে তা নয়। সামান্য কিছু ব্যর্থতার দায়ও উনি নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেন। সময় বড় অদ্ভুত। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে ধার করে মনে হয়, সামনে শুধু পথ তার শেষ কোথায়, তা জানা নেই। বিশ্বাস করবেন, লোকটা যখন দলের, সংগঠনের বৈঠকে আসেন, ওঁকে দেখলে কেউ বলবে না উনি বিশ্বের জনপ্রিয়তম নেতা। দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমাদের কখনও সখনও এক-আধ মিনিট দেরি হয়ে যায়। কখনও বাথরুমে বা অন্য কোনও কাজে হয়তো বেরই। কিন্তু উনি? মিটিং শুরুর নির্দিষ্ট সময়ের আগে এসে সিটে বসে পড়েন। যতক্ষণ না বৈঠক শেষ হয়, এক ইঞ্চিও নড়েন না। আর ওখানে তখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে থাকেন না। দলের কর্মী হিসাবে থাকেন। সবার কথা শোনেন। ওঁর বক্তব্য, ভাবনার বিরুদ্ধ মত কেউ দিলে, তাও শোনেন। এমন আশ্চর্য হোমওয়ার্ক, এই ধরুন গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে। কেন্দ্রভিত্তিক প্রার্থী নিয়ে আলোচনার সময়, বেশিরভাগ কেন্দ্র নিয়ে দেখলাম ওঁর কাছে রিপোর্ট আছে। কোন বুথে আমরা শক্তিশালী। কোথায় নয়, সব স-অ-ব তথ্য ওঁর কাছে আছে। নাম বলব না, তবে এমন প্রার্থীও আছে, যাঁর নাম শুনেই বলেছেন, তার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আছে। তাঁর জীবন যাপনে কোনও পরিবর্তন এসেছে কি না, কোনও বিচ্যুতি হয়েছে কি না, সব তথ্য থাকে মানুষটার কাছে। হাজার কাজের মাঝেও সংগঠনের প্রতি ওঁর এই আগ্রহ, প্রতিটা খবর রাখা এগুলো ওঁর থেকে শিক্ষণীয়। লোকটা যে কোন লেভেলের পারফেকশনিস্ট, বলে বোঝানো যাবে না। সেভাবে পরিচিতি পাওয়ার আগে বেশ কয়েকবার কলকাতা এসেছেন মোদিজি। ৬, মুরলীধর সেন লেনের যে পার্টি অফিস, তার বাথরুম আর রান্নাঘরের মাঝে একটা প্যাসেজ ছিল। সেখানে বসে সবার সঙ্গে পাত পেরে খেয়েছেন। পরিবেশন করেছেন। মনে রাখতে হবে তখন কিন্তু উনি যুবমোর্চার জাতীয় কর্মসমিতির অবজার্ভার। মোদ্দা কথা উনি বরাবরই মাটির কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ। যার কোনও পরিবর্তন হয়নি আজও।

হ্যাঁ, একটা ছোট্ট পরিবর্তন অবশ্য হয়েছে। আগে নাম ধরে ডাকতেন। যেদিন থেকে রাজ্য সভাপতি হয়েছি, অধ্যক্ষজি বলেন। সে যে কী বিড়ম্বনা কী বলি। ওঁর সঙ্গে দেখা হলে আরও একটা জিনিস করেন। জোরে জোরে পিঠ চাপড়ে দেন। সত্যি বলতে কী, ওর ওই শক্ত হাত যখন দুম করে পিঠে এসে পড়ে, বড্ড লাগে। তবে এটা হল, আদরের যন্ত্রণা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে। গুজরাতের মসনদে বসার পরে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। মানুষটাকে তিনভাবেই দেখেছি। ২৫ বছর আগে উনি যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন কিন্তু গুজরাতে অনেক প্রবীণ, অভিজ্ঞ নেতা ছিলেন। উনি দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকেই আড়ালে আবডালে অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু তাঁদের সবাইকে ভুল প্রমাণ করে উনি আজ এই উচ্চতায় এসেছেন। মনে রাখতে হবে, গুজরাতে মোদি জমানা শুরুর আগে কিন্তু আকছার দাঙ্গা সেই ঘটনার পর আর কিন্তু কখনও অশান্ত হয়নি গুজরাত। রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই পাল্টে দিয়েছিলেন। আমাদের সবাই মুসলমান হত। কিন্তু ২০০২-এর বিরোধী হিসাবে দাগিয়ে দেয়। কিন্তু মোদিজি দায়িত্বে আসার পর মোদিজি বলে উঠলেন, “বেটি, আমি কোনও বড় নেতা নই। বড় নেতারা ফ্লাইটে আসে। ওকে জিজ্ঞেস করো, আমি ট্রেনে করে এসেছি।” বলেছিলাম, “আরে আপনিও তো একদিন ফ্লাইটে আসবেন।” তাতে উনি হেসে বলেছিলেন, “তুমি কি জ্যোতিষচর্চা করো নাকি?” থেকে গুজরাতের মুসলমানদের যেভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক বিকাশ হয়েছে, তা সেই মানুষদের খোঁজ করে দেখতে বলুন। একবার কেউ মোদিজিকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি গুজরাতের মুসলমানদের জন্য কী করেছেন। উনি সরাসরি বলেছিলেন, কিচ্ছু না। হিন্দুদের জন্যও কিছু করিনি। যা করেছি, ছ’ কোটি গুজরাতিদের জন্য করেছি। যা সবাই দেখতে পায়। উনি যখন গুজরাতের সাধারণ সম্পাদক, তখন সংগঠনের কাজের পর যেটুকু সময় পেতেন, বৈশ্বিক রাজনীতি, তার সমস্যা নিয়ে সবসময় খোঁজখবর রাখতেন। বিভিন্ন নেতা, এমনকী যাঁরা বিরোধী মতের, তাঁদের বক্তৃতা দেখা, পড়া এগুলো করতেন। বরাবরের অনুসন্ধিৎসা কথাটা হয়তো ওঁর জন্য এক্কেবারে খেটে যায়। আবার দেখুন প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও সংগঠনের খুঁটিনাটি খবর রাখেন। এইজন্যই উনি অনুনকরণীয়। ওঁকে কেউ কোনওদিন হারাতে পারবেন না। ভীষ্মের যেমন স্বেচ্ছামৃত্যু ছিল, তেমনি উনিও যেদিন চলে যাবেন, স্বেচ্ছায় রাজনীতি ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন। কারও কোনও ক্ষমতা নেই ওঁকে হারাতে বা সরাতে পারবে। মোদিজির পঁচিশ বছরের প্রশাসনিক বর্ষপূর্তিতে ওঁর কাছে একটাই আবেদন। ওঁর নেতৃত্বে, ওঁর আমলে ভারতীয় ইতিহাসের পুনর্লিখন করা। নিজের খুব প্রিয় একজনকে নিয়ে যখন লিখতে হলই, আরেক প্রিয় মানুষকে এড়াই কী করে? শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে ধার করেই লেখাটা শেষ করা ভাল। মোদিজির জন্য হয়তো এটাই ঠিকঠাক লাইন হবে। যিনি দেশবাসীকে বলছেন, ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান…’‌ শেষ একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করি। তৃণমূল জমানায় উনি একবার সরকারি কর্মসূচি করছিলেন রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে। ওঁর সামনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নানা অভাব অভিযোগ করেছিলেন। আমরা ভাবছিলাম, এ কেমন রাজনৈতিক সৌজন্য? সরকারি অনুষ্ঠান। উনি বলতে উঠে বললেন, “মমতাজি যেটা বললেন, ঠিক বললেন। উনি আমার সামনে বলেও ঠিক করেছেন। কারণ উনি জানেন, এই কাজ একমাত্র মোদিই করতে পারে।” সেটা করেও দেখিয়েছিলেন। এটাই নরেন্দ্র মোদি। ‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles