Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

মাইকের ঘোষণাই বিপদের সঞ্চার? ‘অনভিজ্ঞ’ পুজো কমিটি ও পুলিশের পরিকল্পনায় ফাঁক?

RK NEWZ পদদলিত হয়ে ১৯টি প্রাণ চলে গেল। ভবানীভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, শনিবার রাতে দুর্ঘটনাস্থল দেখে তাঁর মনে হয়েছে, মণ্ডপের ভিতরে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তা হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হত। অপরিসর রাস্তা, আর তার মধ্যেই থিমের ঝলকানিতে ভিড়ের ঢেউ। চোরবাগানের ভিড় আগেও একাধিক বার বল্গাহীন হয়েছে। বন্ধ করতে হয়েছে প্রতিমাদর্শন। তবে তখন পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দুর্ঘটনা এড়ানো গিয়েছিল। এ বার তেমনটা হল না। কলকাতা পুলিশের আধিকারিকদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে চোরবাগানের ভিড় সামাল দিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি গাফিলতি রয়েছে পুলিশের তরফেও। এক পুলিশকর্তা এখনও মনে করতে পারেন ২০১৮ সালের কথা। সে বারেও পুজো উদ্বোধন হওয়ার পর থেকেই চোরবাগানে ভিড়। দোসর বৃষ্টি। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, তার জন্য দ্রুত মণ্ডপে ঢোকার রাস্তা বদলে দেয় পুলিশ। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের গিরিশ পার্কমুখী অংশ দিয়ে শুরু হয় লাইন। অর্থাৎ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ এবং মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের সংযোগস্থলের (সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব দিকের অংশ) ঠিক উল্টোদিক থেকে লাইন শুরু। দর্শনার্থীদের সেখান থেকে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় গিরিশ পার্ক মোড়ের দিকে। সেখানে রাস্তা পেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ধর্মতলাগামী অংশ ধরে মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের সংযোগস্থল। প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি রাস্তা দর্শনার্থীদের ঘোরানোর একটাই কারণ, একসঙ্গে অনেক মানুষ যাতে মুক্তারামবাবু স্ট্রিট এবং অমর বসু সরণির মতো গলিসদৃশ রাস্তায় ঢুকতে না পারেন। দর্শনার্থীদের মণ্ডপে ঢোকার রাস্তা দৈর্ঘ্যে লম্বা করার পাশাপাশি তিন থেকে চার জায়গায় লাইন আটকানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য, নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি মানুষ একসঙ্গে যাতে মণ্ডপে ঢুকতে না পারেন। বেরোনোর ক্ষেত্রেও পার্বতী ঘোষ লেন দিয়ে বিধান সরণির দিকে দর্শনার্থীদের পাঠানো হয়েছিল, যাতে মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের ঢল প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ভিড়ে মিশে না যায়।

২০১৮ সালের পর ২০২২। ক্রমশ বাড়তে থাকা ভিড় দেখেই ‘প্রমাদ গুনেছিলেন’ চোরবাগানের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে লাইনে দাঁড়ানো অবস্থাতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এক বৃদ্ধের। জয়ন্ত অভিযোগ করেছেন, রাজ্যে পালাবদলের পর তাঁকে বাধ্য করা হয়েছে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে। রবিবার টেলিফোনে আনন্দবাজার ডট কমকে বলেন, ‘‘আমি দায়িত্বে থাকাকালীন লাইনে বার বার দড়ি দিয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতাম, যাতে একসঙ্গে গলির মধ্যে সবাই পৌঁছোতে না পারে।’’ বর্তমান উদ্যোক্তারা সমস্ত সতর্কতা উপেক্ষা করার জন্যই এই অঘটন বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি দায়ী করেছেন শিল্পীকেও। চোরবাগানের মতো ছোট জায়গায় এ রকম ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরা এবং মণ্ডপের মধ্যে উড়ালপথ তৈরি করা বিপজ্জনক বলেও মন্তব্য জয়ন্তের। তাঁর অভিযোগ, মণ্ডপ ভেঙে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারত। তাঁর দাবি, ‘‘মণ্ডপের মাঠের তলার মাটি ইঁদুর ফোঁপরা করে দিয়েছে। সেখানে সঠিক পদ্ধতি মেনে ইট দিয়ে ভরাট না করে কাঠের তক্তা পেতে মণ্ডপ খাড়া করা হয়েছে।’’ ভিড়ের চাপে মাটি বসে গিয়ে মণ্ডপও বসে গিয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর। ভবানীভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, শনিবার রাতে দুর্ঘটনাস্থল দেখে তাঁর মনে হয়েছে, মণ্ডপের ভিতরে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তা হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হত। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘চোরবাগানের মণ্ডপে ঢোকা এবং বেরোনোর রাস্তা আলাদা নয়। প্রবেশ এবং প্রস্থান একই পথ দিয়ে কেবলমাত্র দড়ি দিয়ে রাস্তা দু’টো অংশে ভাগ করে করা হয়েছিল। যাদের দড়ি ধরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব ছিল, সেই অস্থায়ী সিভিক ভলান্টিয়ারেরা বৃষ্টিতে দড়ি ফেলে চলে যায়।’’ ভিতরে ঢোকার এবং বাইরে বেরোনো দর্শনার্থীদের ভিড় মিলেমিশে বিপত্তি বলেই ইঙ্গিত মুখ্যমন্ত্রীর। চোরবাগানের থিম শিল্পী সুশান্ত পাল জয়ন্তের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘শিল্পী হিসেবে আমি প্রথমেই খেয়াল রাখি যে, স্ট্রাকচারে যেন কোনওরকম সমস্যা না হয়। কারণ, প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। এয়ার সার্কুলেশনের দিকটা খেয়াল রাখতে হয়।’’ তাঁর দাবি, সমস্ত সুরক্ষাবিধি মেনেই মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। এমনকি, আদালতের নির্দেশ মেনে ঢোকা-বেরোনো এবং আপৎকালীন আলাদা আলাদা দরজা করা হয়েছে বলে দাবি সুশান্তের। কলকাতা পুলিশের অন্দরেই প্রশ্ন উঠছে, চোরবাগানের মতো ছোট জায়গায় লোহার গ্রিলে ঘেরা উড়ালপথ, যা যে কোনও সময় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে, সেই থিম বা মণ্ডপ কলকাতা পুলিশ এবং দমকলের ছাড়পত্র পেল কী করে?

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দুর্ঘটনার সময় প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। তার ফলে মণ্ডপ থেকে না-বেরিয়ে অনেক দর্শনার্থীই সেখানে দাঁড়িয়ে পড়েন। একই সময়ে যাঁরা মণ্ডপে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তাঁরাও ঢুকে পড়েন মণ্ডপে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী না থাকায়, লাগামহীন ভাবেই মুহূর্তেই মণ্ডপের মধ্যে দমবন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, মণ্ডপে যখন ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গিয়েছে, ঠিক এ রকম পরিস্থিতিতে মাইকে ঘোষণা শুরু হয়, ‘‘এগ্‌জ়িট গেট খুলে দাও, মানুষকে বেরোতে দাও। মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে যান। মণ্ডপ ভেঙে গিয়েছে। অবস্থা খুব খারাপ। মণ্ডপের দিকে আসবেন না।’’ সমাজমাধ্যমেও এই ঘোষণার ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে (যদিও ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, মাইকে ওই ঘোষণা চলাকালীন হাতেগোনা দু’জন পুলিশকর্মী ক্রমাগত বাঁশি বাজিয়ে জনসমুদ্রের মধ্যে অসহায় ভাবে মানুষকে বাইরে দিকে পাঠানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেখানে ঢোকা-বেরোনোর ভিড় মিলে মিশে একাকার। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এর পরই ঠেলাঠেলি হুড়োহুড়ির রূপ নেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পদপিষ্ট হন একের পর এক মানুষ। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত। তবে কে ওই ঘোষণা করে আতঙ্ক ছড়ালেন? উত্তর মেলেনি। আদালতে চোরবাগানের ঘটনায় ধৃত সাত জনকে পেশের সময় সেই ঘোষণার প্রসঙ্গ তুলেছেন সরকারি আইনজীবী।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজের সময়ও পুলিশ ছিল না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন,‘‘আমি দু’জন আহতের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা জানিয়েছেন পুলিশ অ্যাপ ক্যাব জোগাড় করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।’’ রবিবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী উদ্যোক্তাদের ত্রুটি ছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি কোনও প্রশ্ন তোলেননি। তাঁর নিশানায় বিগত জমানায় নিযুক্ত অস্থায়ী হোমগার্ডেরা।

মুখ্যমন্ত্রীর এই বয়ানের সঙ্গে একমত নন কলকাতা পুলিশেরই একাংশ। তাঁদের কথায়, পুজোর ছাড়পত্র দেওয়া থেকে শুরু করে ভিড় বাড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় পুলিশেরই। স্থানীয়দের দাবি, তৃতীয়া থেকেই চোরবাগানে উপচে পড়ছে ভিড়। তার পরেও পুলিশ কেন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিল না? ভিড় নিয়ন্ত্রণ করল না? কেন ঢোকার ভিড় এবং বেরোনোর ভিড় যাতে না মেশে, তার ব্যবস্থা করা হল না? অতিরিক্ত বাহিনীই বা মোতায়েন করা হয়নি কেন? প্রশ্ন ঘুরছে পুলিশের অন্দরেই। আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই পুজো নিয়ে শীর্ষ আধিকারিকদের হোমওয়ার্ক এবং পরিকল্পনায় খামতির চিত্র প্রকট হচ্ছে। কলকাতার একাধিক বড় পুজো সামলানো এক সহকারী কমিশনারের কথায়, ‘‘কলকাতা পুলিশের শীর্ষপদে এখন যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছাড়া কারও মহানগরের পুজো সামলানোর অভিজ্ঞতা নেই।’’ এই অনভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটেছে বলে ইঙ্গিত তাঁর। পালাবদলের পর থানা স্তরে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছিল। বর্তমানে থানাগুলিতে এমন আধিকারিক রয়েছেন, যাঁদের কলকাতার পুজো সামলানোর অভিজ্ঞতায় খামতি রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশেরই একাংশ।

রাজ্যে পালাবদলের পর চোরবাগান ক্লাবের অন্দরেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পুজোর চেয়ারম্যানপদে বসেছেন জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা। মুখ্য পরামর্শদাতা উত্তর কলকাতার বিজেপি নেতা তমোঘ্ন ঘোষ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম রয়েছে দেবদীপ অধিকারীর। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দোপাধ্যায় তাঁর এক্স পোস্টে দেবদীপকে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো বলে দাবি করেছেন। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো নাবালক।’’ কলকাতা পুলিশের একাধিক আধিকারিক এই নামগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে বিভিন্ন জমানাতেই পুজো কমিটিগুলো নিয়ম ভেঙে ছাড় পেয়ে যায়। তবে তার পরেও পুলিশের আরও তৎপরতার দরকার ছিল। মুখ্যমন্ত্রী চোরবাগানের ঘটনায় সরাসরি পুলিশকে দোষারোপ করেননি। তবে কলকাতায় দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাওয়া দুই আইপিএস-কে স্বাধীন ভাবে (পুলিশ কমিশনারকে রিপোর্ট না করে) শহরের বিভিন্ন পুজো ঘুরে দেখে নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সঁপেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশের গলদ যে ছিল, তা মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই স্পষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, কলকাতার পুজো সামলানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ন’জন আইপিএস আধিকারিককে অস্থায়ী ভাবে লালবাজারে ফেরানো হয়েছে। কোপ পড়েছে গিরিশ পার্কের অফিসার-ইন চার্জের উপর। পুলিশের উপর ‘সবটা না-ছেড়ে’ মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং লালবাজারের কন্ট্রোল রুমে হাজির হন। তার আগে দুপুরে বলেছিলেন, ‘‘শহরের অবস্থা চোখ দিয়ে দেখা উচিত, কান দিয়ে নয়।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles