সরকার বদলের পরে এই কয়েক মাসে ব্যক্তিগত জীবনে কতটা পরিবর্তন এল?
শর্বরী: কবিতা পড়া কমে গিয়েছে। গান শোনাও। ওয়েব সিরিজ় দেখাও কমে গেল। ছেলেকে ভাত বেড়ে খাওয়াতে পারছি না। আমি যখন বেরোই ও ঘুমায়। আমি কাজ সেরে যখন রাতে বাড়ি ঢুকি, ছেলে কাজে ব্যস্ত থাকে। ফলে ঠিক করে দেখা পর্যন্ত হচ্ছে না। বদল তো বটেই। সবচেয়ে বেশি গায়ে লাগছে আমার নিজের থিয়েটার দল ‘নয়াবাদ তিতাস’-এর নতুন নাটকে অভিনয় করতে পারলাম না। সময় বার করতেই পারিনি রিহার্সালের জন্য। ব্যাকস্টেজ করেছি। এই প্রথম আমার মনে হলো, তা হলে রাজনৈতিক ব্যস্ততা কি আমাকে থিয়েটার থেকে সরিয়ে দেবে? সে দিন ডিসিশন নিই, যাই হয়ে যাক থিয়েটার ছাড়তে পারব না। যে ভাবেই হোক সময় বের করে থিয়েটার করতে হবে।
আসানসোলের মেয়ে থেকে যাদবপুরের বিধায়ক, এই সফরে কী-কী হারালেন?
শর্বরী: জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে সত্যি আর হিসেব করি না। তবে একটা মজার গল্প বলি। ’৯৮–এ প্রথম কলকাতায় আসি। ছেলের বয়স তখন ৬ মাস। রবীন্দ্রসদন যাব বলে বেরিয়েছি, রবীন্দ্রসদনের কাছাকাছি এসেই খুঁজছি যে কোন দিকে যাব। রাস্তায় একজনকে জিজ্ঞেস করেছি, নন্দনটা কোন দিকে? তিনি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে খুব রূঢ় ভাবে বললেন, ‘বিহার থেকে এসেছেন নাকি?’ খুব গায়ে লেগেছিল। সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন গোটা পশ্চিমবঙ্গ আমায় চিনবে। অভিনেত্রী হিসেবে চিনেছেন, তার পরে নেত্রী হিসেবেও চিনলেন, আর এ বার বিধায়িকা হিসেবে চিনছেন। তাই যা হারিয়েছি, সেসব নিয়ে ভাবি না।
রাজনৈতিক জীবনের ওঠাপড়া সামলান কী ভাবে?
শর্বরী: কোনও কিছু পাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না। আমি এ ব্যাপারে খুব স্পেসিফিক। বিধায়ক ২০২৬-এ হয়েছি। তার আগে ২০১২ থেকে একটানা দলের অনুগত সৈনিক হিসাবে কাজ করে গিয়েছি। দল যখন যে কাজ দিয়েছে, সেটা করেছি। যখন দল মনে করেছে কাজটা কেড়ে নেবে, নিয়েছে। তাতে আমার অবস্থান বদলায়নি। আমার যেহেতু রাজনীতি থেকে পাওয়ার কিছু নেই, তাই কোনও ওঠাপড়া, ব্যর্থতা গায়ে লাগতে দিই না।
২৭ বছরের অভিনয় জীবন, পর্দায় ফিরতে চান?
শর্বরী: চাই তবে ধারাবাহিকে নয়। সিরিয়ালে যে সময়টা দিতে হবে, সেটা আমার কাছে নেই। ওটিটি আর ভালো ছবি হলে, কাজ করতে চাই। টলিউডের কয়েকজন পরিচালককে বলেছি, কাজ করতে চাই তাঁদের সঙ্গে। বিধায়ক হিসেবে আমি নিজের কাছে কিছু পণ করেছি। মরে গেলেও ব্যক্তিপুঁজির সংখ্যা বাড়াব না। ৬৮৩ স্কোয়্যার ফুটের একটা ফ্ল্যাটে আমি থাকি। যেখানে চারটে লোক একসঙ্গে গেলে বসার ঘরে বসতে দেওয়ার জায়গা নেই। আমি চাই না আমার সেই অবস্থার পরিবর্তন হোক।
অভিনয়ের শিক্ষা রাজনীতিতে কতটা কাজে লাগছে?
শর্বরী: ভীষণ ভাবে কাজে লাগছে। অভিনয় এবং রাজনীতিতে ডিসিপ্লিন খুবই জরুরি। আমি সেটা মেনে চলি। কাজের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত জরুরি। আমি জীবনের সব ক্ষেত্রে ডিসিপ্লিন মেনে চলার চেষ্টা করি। দুই, কখন কী বলা, কী ভাবে বলা, এটাও অভিনয়ের অনুশীলন থেকেই পেয়েছি। রাজনীতির ময়দানে সঠিক সময়ে, সঠিক শব্দের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়। যদিও আমার কথা, সাজগোজ নিয়ে অনেকেই ট্রোল করছেন, নোংরা কথা বলছেন। তাঁদেরকেও বলব যদি কখনও আমার একটা সিগনেচারের প্রয়োজন পড়ে, নির্দ্বিধায় আসতে পারেন।
প্রবল ব্যস্ততার মাঝে কী ভাবে আপনি নিজের যত্ন নেন?
শর্বরী: সকাল ৯.৩০-১০টার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরোই। তার আগে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পুজো সেরে রেডি হতে বসি। তার পরে আর সারাদিন আয়না দেখারও সময়টুকু থাকে না। তবে আমার স্কিনটা বরাবরই ভালো। এটা অনেকেই বলেছেন। আমার এক সময়ের সহকর্মী বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী আমাকে একবার বলেছিলেন, ‘মনে কোনও কালি জমতে দিবি না। তা হলে দেখবি বাইরে থেকে এমনিই সুন্দর দেখাচ্ছে।’ লিলিদির কথাটা আজও মেনে চলি।
টলিউড শুদ্ধিকরণের টিমে চারজন তারকা-বিধায়ক, আপনি নেই কেন?
শর্বরী: এর কোনও উত্তর নেই আমার কাছে। দায়িত্ব যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা জানেন আমি কত বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত। এত বছর ধরে বিরোধী পরিসরে থেকে নিজের থিয়েটারের দলটাকে আগলে রেখেছি, বাঁচিয়ে রেখেছি। মাঝে অনেক বাধা এসেছে। বিগত কয়েকটা বছর সরকারি হল পাইনি। তবু হাল ছাড়িনি। সহজে মাটি ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নই আমি। টলিউডের দায়িত্ব যদি পাই, জান লড়িয়ে দেব। অপেক্ষা করে আছি। কাজ করে যাব। একদিন হয়তো দায়িত্ব দিতে বাধ্য হবেন। সেই প্রাপ্তিটা বড় আনন্দের হবে।
কি চারজন অভিনেতা-বিধায়কের সঙ্গে আপনার কোনও প্রতিযোগিতা আছে?
শর্বরী: না, না। প্রতিযোগিতায় আমি বিশ্বাস করি না। ইঁদুর দৌড়ে আমি নেই। নিজেদের মধ্যে আবার প্রতিযোগিতা কী? ফার্স্ট গার্ল হওয়ার দৌড়ে আমি থাকতে চাই না। আর ফার্স্ট গার্ল কখনও প্রতিযোগিতা করে হওয়া যায় না। ফার্স্ট গার্ল হওয়া নির্ভর করে মেধা, পড়াশোনা, আর ঠিক সময়ে ঠিক প্রশ্নের ঠিক উত্তর দিতে পারার উপরে। প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে যদি পড়াশোনাটাই না করি, তা হলে প্রথম হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।




