বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে টিম ইন্ডিয়া মুখোমুখি হবে পাঁচবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিলের। নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়, ভারতীয় ফুটবল দল নিজেদের ইতিহাসে এত বড় ম্যাচ খেলেনি আজ পর্যন্ত। একটা সময় এশিয়ান গেমস বা অলিম্পিকের মতো প্রতিযোগিতায় নিয়মিত খেলত ভারত। তৎকালীন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম নামী দল ফ্রান্স বা যুগোশ্লাভিয়ার মুখোমুখিও হয়েছেন আনোয়ার আলি, আপুইয়াদের ফুটবল-পূর্বসূরিরা। এশিয়ান গেমসে ইরান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ান-জায়ান্টদের টেক্কা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বাস্তবে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিল-উরুগুয়ের মতো ফুটবলগ্রহের প্রথম সারির দেশগুলির সঙ্গে খেলার নজির তেমন নেই ভারতের। এবারের ফিফা ইন্টারন্যাশনাল উইন্ডো একেবারেই অন্যরকম যাচ্ছে ভারতের। পাঁচ বারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ভারত খেলছে, দু’বারের বিশ্বজয়ী ও দু’বারের অলিম্পিকজয়ী উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ভারত খেলছে–এ যে এত দিন কল্পনার অতীত ছিল! বেঙ্গালুরুতে ভারত মুখোমুখি হয়েছিল সদ্য বিশ্বকাপ খেলে আসা পানামার। কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে যে ম্যাচ ড্র ১-১ গোলে। তার রেশ কাটার আগেই এবার ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে কোচ খালিদ জামিলের দল। যে ম্যাচ খেলার জন্য ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহা, এনড্রিক, এস্তেভাও, ব্রুনো গুইমারেজ, মার্কুইনোসের মতো মহাতারকাদের নিয়ে আসছে ব্রাজিল। বিবেকানন্দ যুবভারতী স্টেডিয়ামে যাঁরা খেলতে নামবেন! ৬ অক্টোবর ভারত লড়বে আর এক বিশ্বজয়ী দেশ উরুগুয়ের বিরুদ্ধে। লাতিন দেশটির অধিনায়ক ফেডেরিকো ভালভার্দে চোটের জন্য ছিটকে গিয়েছেন। ডারউইন নুনেজ, ম্যাক্সমিলিয়ানো আরাউহো, রোনাল্ড আরাউহো, ফাকুন্দো পেলেস্ত্রি, রডরিগো বেন্টাঙ্কুরদের নিয়েই আসছে উরুগুয়ে। যাদের রিজার্ভ বেঞ্চে বসছেন মহাতারকা কোচ দিয়েগো ফোরলান। ব্রাজিল আর উরুগুয়ে–দু’টো ম্যাচই হবে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। অতীতে নেহরু কাপের জন্য এই মাঠে খেলে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার একঝাঁক ফুটবলার, যাঁরা পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন হন ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। অলিভার কান, টমাস মুলার, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, মার্কো মাতেরাজ্জি, রবার্তো কার্লোস, লুসিও, ফ্লোরেন্ত মালুদা, নিকোলাস আনেলকা, ফিল ফোডেনের মতো তারকাদেরও দেখেছে এই মাঠ। লাতিন আমেরিকার দুই বিশ্বজয়ী দেশ কলকাতায় এসে পরপর খেলে যাচ্ছে, স্বাধীনতাত্তোর ভারতবর্ষে কখনও হয়নি। ব্রাজিল আর উরুগুয়েকে স্বাগত জানাতে নতুন রূপে সেজে উঠছে যুবভারতী। প্রথমবার স্টেডিয়ামের প্রত্যেক আসনে থাকছে নির্দিষ্ট নম্বর। দুই ম্যাচে দর্শকরা কাটতে পারবেন নির্দিষ্ট আসনের টিকিট। দর্শকদের দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা উপহার দিতে নতুন করে সাজানো হয়েছে র্যাম্প, শৌচাগার। গ্যালারির লবিতে থাকছে ফুড স্টলও। মাঠের ভিতরেও বদল হয়েছে। ব্রাজিলের বিশেষজ্ঞদের দেখানো পথে মাঠের ঘাসের মান উন্নত করেছেন যুবভারতীর কর্মীরা। বদল হয়েছে স্টেডিয়ামের ভিতরে থাকা একজোড়া ট্রেনিং গ্রাউন্ডেও। যেখানে ভারতীয় তারকাদের পাশাপাশি অনুশীলন সারবেন ভিনিসিয়াস-নুনেজরা। মূল মাঠ এবং ট্রেনিং গ্রাউন্ডের মানে সন্তুষ্ট ব্রাজিলের বিশেষজ্ঞরা। প্রতিক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর। বিশ্ব ফুটবলের তারকাদের বরণ করে নিতে প্রায় প্রস্তুত ভারতীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠতম স্টেডিয়াম।
ভিনিদের প্লেটে রাজকীয় খাদ্যতালিকা নজর কেড়েছে
ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহাদের মতো তারকাদের ভারত সফর
যুবভারতীর সবুজ গালিচায় সাম্বার ছন্দে পা মেলাতে তৈরি ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহাদের মতো তারকাদের ভারত সফর নিয়ে ইতিমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উৎসবের আবহ। অতিথিদের আপ্যায়নে যাতে একটুও খামতি না থাকে, সেই প্রস্তুতিও তুঙ্গে। শহরে ছেয়ে গিয়েছে হোর্ডিং। পাশাপাশি ‘সেলেকাও’দের রাজকীয় খাদ্যতালিকাও নজর কেড়েছে। ১ অক্টোবর কলকাতা আসবেন পাঁচবারের বিশ্বজয়ীরা। পরিকল্পনা হয়েছে, বিমানবন্দর থেকে ভিনিসিয়াস-নুনেজদের সরাসরি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। পরের দিন দুপুরে হোটেল থেকেই সাংবাদিক সম্মেলন। বিকেলে যুবভারতীতে অনুশীলন ব্রাজিল দলের। ২৩ সেপ্টেম্বর মোহনবাগানকে কলকাতা লিগ জয়ের ট্রফি তুলে দিলেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ বলেছিলেন, “ব্রাজিল দলকে আমরা বিশেষ আপ্যায়ন করব। ম্যাচের আগের দিন স্টেট ডিনারের আয়োজন থাকবে। স্টেট রিসেপশনও হবে। ম্যাচের দিনও বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।” সেজে উঠছে তিলোত্তমা। শহরের নানান জায়গায় ব্রাজিল এবং উরুগুয়ে ম্যাচের হোর্ডিং। ৩ অক্টোবর ম্যাচ। ম্যাচ খেলে সেদিন রাতেই ভিনিসিয়াস, রাফিনহারা ক্লাবের ম্যাচ খেলতে চলে যাবেন। ব্রাজিল দলের খাদ্যাভ্যাস এবং ফিটনেস নিয়ে সতর্কতার কথা সর্বজনবিদিত। তাই কলকাতা সফরেও খাবারের দায়িত্বে থাকছেন দলের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ শেফেরা। খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন চাহিদা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে পাঁচ দফার খাদ্যতালিকা। সকালের শুরুতেই প্রোটিন জাতীয় খাবারে জোর দেওয়া হয়েছে। তেল ছাড়া ডিমের নানা পদ, চিজ অমলেট, স্মোকড টার্কি এবং বিশেষ ভাবে তৈরি মুরগির পদ থাকছে প্রাতরাশে। সঙ্গে গাজরের কেক, ওয়াফেল, বিভিন্ন ধরনের কফি, হারবাল চা এবং তাজা ফলের রস। দুপুরের পাতে থাকতে পারে টাটকা স্যালাডের সঙ্গে থাকছে বেকড পর্ক হ্যাম, গ্রিলড চিকেন ব্রেস্ট এবং কাঁটাবিহীন রেড স্ন্যাপার। সঙ্গে ভাত, পাস্তা এবং ব্রাজিলের জনপ্রিয় খাবার ‘ফারোফা’। শেষ পাতে ব্রাজিলীয় মিষ্টি ‘ডুলস দে লেশে’। এর পর অনুশীলনের ফাঁকে ‘ট্রেনিং স্ন্যাক্স’। কর্ন কেক, হালকা স্যান্ডউইচ এবং নানা ধরনের ফল। আর ‘ঘরে’র স্বাদ ফিরিয়ে আনতে থাকছে ব্রাজিলের প্রিয় ক্যান্ডি ‘ব্যানানিহা’ এবং মিষ্টি ‘প্যারোকুইনহা’। রাতের খাবারেও বৈচিত্র কম নয়। রোস্টেড চিকেন থাই, গ্রিলড পর্ক এবং তেরিয়াকি সসে নরওয়ের স্যামন। সঙ্গে ভাত, সবজি ও পাস্তা। ডেজার্টে অ্যাপেল ক্রাম্বল। রাতে দেরিতে খিদে পেলেও চিন্তা নেই। থাকছে পঞ্চম দফার ব্যবস্থা। হালকা পাউরুটি, ওটস, ড্রাই ফ্রুটস, দই, অরেঞ্জ কেক এবং ওয়াফেল। সবমিলিয়ে, বিশ্ব ফুটবলের তারকাদের বরণ করে নিতে প্রায় প্রস্তুত ভারতীয় ফুটবলের মক্কা কলকাতা।
কোচ হিসেবেও খালিদের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ
‘ব্রাজিলকে শ্রদ্ধা করছি, ভয় পাচ্ছি না’, অকপট খালিদ
নেতিবাচক মানসিকতা নয়। ডিফেন্সিভ ফুটবলও নয়। অ্যাটাকের সুযোগ পেলে ঝড় তোলো। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এই তিন মন্ত্রে মাঠে নামবে টিম ইন্ডিয়া। কোচ খালিদ জামিলের গলায় আত্মবিশ্বাস, ‘ব্রাজিলকে শ্রদ্ধা অবশ্যই করব। কিন্তু আমরা নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামব না।’ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৪৪ নম্বরে থাকা পানামার বিরুদ্ধে জেতা ম্যাচ ড্র করে আনোয়ার–রায়ান–মনবীরদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। এতটা দাপটের সঙ্গে কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলতে সাম্প্রতিক অতীতে টিম ইন্ডিয়াকে দেখা যায়নি। টিম ইন্ডিয়ার কোচ খালিদ বলেন, ‘পানামার বিরুদ্ধে ড্র ফুটবলারদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আমরা দেখিয়ে দিতে পেরেছি, যদি এক হয়ে লড়া যায়, মাঠে একশো শতাংশ দেওয়া যায়, পরিকল্পনামাফিক খেলা যায়, তা হলে বিশ্বের অন্যতম সেরা টিমের সঙ্গেও আমরা লড়তে পারি।’ এর পরেই অবশ্য খালিদ বলে দিচ্ছেন, ‘পানামা ম্যাচ অতীত। সামনে এখন ব্রাজিল। অনেক কঠিন লড়াই। পানামা ম্যাচের কিছু ভুল থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। কারণ জানি, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে একটা ভুল করলেই সব শেষ। পানামার বিরুদ্ধে যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে ভারত। ব্রাজিলের বিরুদ্ধেও কি এই একই মেজাজে দেখা যাবে। সুযোগ পেলে অবশ্যই আক্রমণে যাব আমরা। আমাদের পুরো টিম একসঙ্গে কাজ করবে। যদি ভাবেন, ডিফেন্স করাটা শুধু ডিফেন্ডারদেরই দায়িত্ব, তা হলে ভুল। আমাদের সবাই সবাইকে সাহায্য করবে। একেবারে শুরু থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত চূড়ান্ত সতর্ক থাকতে হবে প্রত্যেককে। আমার চেয়েও বড় সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ আমার ছেলেদের কাছে। আমার কাজ ওদের তৈরি করা। কিন্তু আসল খেলাটা ওরা মাঠে গিয়ে খেলবে। ভবিষ্যতের জন্য বিরাট অভিজ্ঞতার সুযোগ। আমাদের আরও বেশি করে এই ধরনের ম্যাচ খেলা উচিত। শক্তিশালী টিমের বিরুদ্ধে খেললে আমরাও উন্নতির সুযোগ পাব।’ ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে আটকানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হবে আনোয়ারদের। খালিদ ছেলেদের বলছেন, ‘একা কাউকে নিয়ে নয়, পুরো ব্রাজিল টিম নিয়ে ভাবো। প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু আমরা ভয় পাচ্ছি না।’ কোচ হিসেবেও খালিদের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ।
‘ব্রাজিলের বিরুদ্ধে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হবে’
ভারতীয় টিমে সবচেয়ে বেশি নজরে সেরা ডিফেন্ডার আনোয়ার আলি
পাঞ্জাব কা পুত্তর। যুবভারতীতে ৩ অক্টোবর ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ফিফা ফ্রেন্ডলিতে ভিনিসিয়াস-রাফিনিয়াদের অ্যাটাকিং ফোর্সকে আটকানোর চ্যালেঞ্জ আনোয়ার আলির। নেতৃত্বভার থাকবে পাঞ্জাবের ২৬ বছরের স্টপার আনোয়ারের কাঁধেই। তাঁর সঙ্গে ডিফেন্স সামলাবেন বিজয় ভার্গিস, অভিষেক টেকচাম ও আকাশ মিশ্র। তুলনায় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি লাল হলুদের আনোয়ারেরই। ধারাবাহিকতায় আনোয়ার সকলের চেয়েই এগিয়ে। অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপেও ডিফেন্স সামলানোর কাজ করেছেন। বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে ৯৪ ধাপ এগিয়ে থাকা পানামার বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছিলেন আনোয়ার। তাঁকে টপকাতে হিমশিম খেয়েছেন বিশ্বকাপাররা। আনোয়ারের মাথায় এখন ব্রাজিল। ভারতীয় ফুটবলের সের্খিও রামোস’ আনোয়ার বলেন, ‘পানামার সঙ্গে ড্র করাটা আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেকটা বাড়িয়েছে। কিন্তু এটার জন্য শুধু আমাদের ডিফেন্ডারদের কৃতিত্ব নয়। টিমের সবাই ডিফেন্সকে মজবুত রাখতে লড়াই করেছে। একে অন্যকে সাপোর্ট করেছে। তবে পানামা ম্যাচ দিয়ে ব্রাজিল ম্যাচ বিচার না করাই ভালো। ওদের অ্যাটাকিংয়ের প্রচুর বৈচিত্র্য রয়েছে। যা সামলানোর জন্য আমরা খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। একসঙ্গে লড়াইয়ের শপথ নিচ্ছি আরও একবার সেরাটা মেলে ধরার জন্যই। একজন ফুটবলার হিসেবে স্কোয়াড কেমন, তার বিচার আমি করতে পারি না। কোচ টিম বেছেছেন। আমাদের খেলার সুযোগ দিয়েছেন। টিমে কে আছে, কে নেই, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগও আমাদের নেই। প্রত্যেকের প্রতি বিশ্বাস আছে। আমরা তৈরি একে অন্যকে সাহায্য করতে। এটা আমাদের কাছে বিরাট প্রাপ্তি। এই পর্যায়ের টিমের বিরুদ্ধে খেলে আমরা অনেক কিছু শিখব। এই অভিজ্ঞতা আমাদের উন্নত করতে সাহায্য করবে। তাই এই ধরনের ম্যাচ যত হবে, ততই আমাদের উন্নতি ঘটাবে।’



