RK NEWZ দেশের মুখ্য নির্বচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে ফের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে এককাট্টা বিরোধী শিবির। সূত্রের খবর, সংসদের দু’কক্ষেই নোটিস জারি করা হতে পারে। তার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। নোটিসের সপক্ষে আইনি পরামর্শও নিচ্ছে বিরোধীরা। এর আগে জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে লোকসভা এবং রাজ্যসভায় প্রস্তাব আনা হয়েছিল। যদিও বিরোধীদের জারি করা নোটিস খারিজ করে দেওয়া হয়। দেশীয় সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পরেই দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা ও কমিশনের অন্দরের টানাপোড়েনের বিষয় নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সূত্রের দাবি, গত ১০ মাসে জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে একাধিকবার মতপার্থক্য হয়েছে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সিধুর। অভিযোগ, তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও একাই একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। এর ভিত্তিতেই এবার জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে বিরোধী শিবির। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদ থেকে সরাতে তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হচ্ছে বলে খবর। কংগ্রেস সূত্রে জানা গিয়েছে, আইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ প্রস্তাবের একটি খসড়াও তৈরি হচ্ছে। বিরোধী দলগুলি পৃথকভাবে সংসদের দুই কক্ষেই নোটিস জারি করতে পারে। জ্ঞানেশের পদত্যাগ, গ্রেফতারির দাবি জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, রাহুল গান্ধীরা। এই মর্মে বৃহস্পতিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করে জ্ঞানেশকে তদন্তের আওতায় আনার আবেদন জানান তিনি। সেই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ‘ক্রিমিনাল’ বলে কটাক্ষ করে মহুয়া বলেন, “দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সিধু এবং বিবেক জোশীর সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমার যা করছেন, তা বেআইনি। তাঁদের অগ্রাহ্য করে জ্ঞানেশ কুমার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” এই প্রসঙ্গে রাজ্যসভার তৃণমূল ডেরেক ও’ব্রায়েন ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই বার্তা দিয়ে একটি বিবৃতিও জারি করেন। উল্লেখ্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একটি সাংবিধানিক পদ। সেই পদের বিরোধিতা করে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে গেলে অন্তত ১০০ জন সাংসদের সম্মতি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিরোধী শিবির নতুন করে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনলে, তা সংসদে গৃহীত হয় না কি খারিজ হয়ে যায়, সেটাই দেখার।
“ভোট চুরি থেকে আইন চুরির জন্ম। আজ ভোট নেই, আইন প্রণয়নের ব্যবস্থাও নেই। যদি ভোট চুরি হয়ে থাকে, তবে ভোট চুরির মাধ্যমে সংসদে আসা আইনপ্রণেতারা যেসব আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন এনেছেন, সেগুলোও অবৈধ।” বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে সাংবাদিক সম্মেলন করে এই ভাষাতেই একধারে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ শানালেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারকে দেশদ্রোহী বলেও তোপ দাগলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম বুধবার বিস্ফোরক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনে ঘোরতর ভিন্নমতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে! অপর দুই কমিশনারের বক্তব্য উপেক্ষা করে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার গত ১০ মাসে বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের লিখিত আপত্তি জানিয়েছিল দুই নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া, বাদ দেওয়া নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় সংযোজনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশীর সম্মতি ছিল না। যা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটে গিয়েছে। ভোটচুরি নিয়ে সরব হয় কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি। সংবিধান হাতে সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বলেন, “দেশ বিরোধী কাজ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। ভোট কেড়েছেন মানেই দেশদ্রোহী। অপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে। সব ফাঁস করব আমরা। ” এখানেই না থেমে লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের সময়েও আপত্তি তুলেছিলাম। গণতন্ত্রের উপর এত বড় আক্রমণ আগে হয়নি। ভোটজালিয়াতি নিয়ে ছেড়ে কথা বলবে না কংগ্রেস। কারণ ভোট কাড়া হচ্ছে মানে গণতন্ত্রকেও ধ্বংস করা হচ্ছে।” জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে রাহুল বলেন, “২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে ভোটচুরি হয়েছে, আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত।” এদিকে ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ নিয়ে আসরে নেমেছে জেন-জিদের দল ককরোচ জনতা পার্টিও। তারাও সাংবাদিক সম্মেলন করে অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করেছে। বিরোধীরা একযোগে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা একসুরে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। বিজেপির দিকে নিশানা করে বিরোধীদের বক্তব্য, গেরুয়া শিবির যে চুরি করেই ভোটে জিতছে, সেটা এবার প্রমাণিত হয়ে গেল। এদিকে বিতর্কের মধ্যে কমিশন জানিয়েছে, “কমিশন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাজ করে। কোনও বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ধরনের আলোচনা ও মতবিনিময় হয়। কমিশনের ৩ সদস্যের পাশাপাশি অন্য আধিকারিকরাও নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে জানাতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় ঐক্যবদ্ধভাবেই।” পালটা মুখ খোলে বিজেপি। গেরুয়া সাংসদ সম্বিত পাত্র সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গড়বড় আছে, এই ধারণাটা ভাঙা দরকার। বারবার ভোট চুরি করে জিতছি, এই ভ্রান্ত ধারণা বন্ধ করতে হবে। কংগ্রেস এবং শরিকদের মিথ্যার চক্রব্যূহ একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত ভাঙতে হবে।” পাত্রর দাবি, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি যদি কোথাও হয়ে থাকে তাহলে সেটা হয়েছে কংগ্রেস আমলে। দুর্নীতির জন্মই কংগ্রেস থেকে হয়েছে। ১৯৫৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত একের পর এক উদাহরণ তুলে সম্বিত দাবি করেন, কংগ্রেস আমলে বহু নির্বাচন কমিশনারকে আনুগত্যের উপহার দেওয়া হয়েছে। সেই কেভিকে সুন্দরন থেকে নবীন চাওলা পর্যন্ত কোন নির্বাচন কমিশনার পরে সরাসরি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন, কে সরকারি পুরস্কার পেয়েছেন, কে অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং পেয়েছেন, সব উদাহরণ তুলে ধরেছে বিজেপি। সম্বিত পাত্র সবচেয়ে বড় উদাহরণ দিয়েছেন, প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের। তিনি কংগ্রেসের হয়ে ১৯৯৬ নির্বাচন লড়েছিলেন। টিএন সেশন নিজের সহকারী নির্বাচন কমিশনারদের ‘গাধা’ ও ‘বোকা’ বলেছিলেন। সে সময় রীতিমতো বিতর্কও হয়। এদিকে রাহুলের এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনকে কটাক্ষ করলেন বিজেপি মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি। তিনি বিরোধী দলনেতার সংবাদিক সম্মেলনকে নিষ্ফল বলে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘উনি এমন এক জন হতাশ নেতা, যিনি গণতান্ত্রিক উপায়ে মানুষের সমর্থন পেতে সক্ষম নন।’’ গত কয়েক দশকে বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের পতন নিয়েও রাহুল কটাক্ষ করেন ভান্ডারি।




