RK NEWZ পাহাড়ের পর্যটনে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনে জুড়তে চলেছে নয়া পালক! পালাবদলের বঙ্গে এবার নতুন দিগন্ত দেখবে পাহাড় সুন্দরী দার্জিলিং? নবান্ন সূত্রে খবর, কার্শিয়ং থেকে দার্জিলিং রোপওয়ে তৈরির প্রস্তাব নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে আদানিরা। কলকাতার ‘সৌজন্য’ ভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রের খবর। প্রস্তাবিত রোপওয়ের দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার। তবে প্রকল্পের রুট, স্টেশন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগের অঙ্ক কিংবা নির্মাণের সময়সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সরকারি স্তরে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে নিয়ম মেনে দরপত্র ডাকা হবে। আদানি গোষ্ঠী সেই দরপত্রে অংশ নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে। সূত্রের দাবি, দার্জিলিংয়ের এই সম্ভাব্য প্রকল্প নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী গৌতম আদানি। উত্তরাখণ্ডে সোনপ্রয়াগ থেকে কেদারনাথ পর্যন্ত দেশের অন্যতম উচ্চাভিলাষী রোপওয়ে প্রকল্পের দায়িত্ব ইতিমধ্যেই পেয়েছে আদানি এন্টারপ্রাইজেস। সেই অভিজ্ঞতাই দার্জিলিংয়ের প্রস্তাবিত রোপওয়েকে ঘিরে প্রত্যাশা বাড়াচ্ছে। এদিন সকালে নিউটাউনে আদানি আরোগ্য মন্দিরের ভূমিপুজো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গৌতম আদানি। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী আদানি গোষ্ঠী। বন্দর, লজিস্টিকস, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন, সিমেন্ট কারখানা এবং হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের পাশাপাশি রোপওয়েকেও সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি। পরে ‘সৌজন্যে’ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিনিধিস্তরের বৈঠকেও দার্জিলিং রোপওয়ের প্রস্তাব নিয়ে কথা হয় বলে সূত্রের খবর।
আদানি গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত সম্ভাব্য রুট নিয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা করেছে বলেও জানা যাচ্ছে। তবে সেই সমীক্ষা কোনও সরকারি বরাত নয়। সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলে প্রথমে বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট, পরিবেশ ও বন সংক্রান্ত অনুমোদন, জমির ব্যবস্থা, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। তার পরেই দরপত্রের মাধ্যমে নির্মাণকারী সংস্থা বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। প্রস্তাবিত রোপওয়ের সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত নকশা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। নবান্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও কেবিনের আকারের উপর নির্ভর করে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ থেকে ১,৮০০ যাত্রী পরিবহণ করা সম্ভব হতে পারে। প্রাথমিক ভাবনায় দিনের বেলায় যাত্রী এবং পর্যটকদের পরিবহণের পাশাপাশি রাতের নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য বহনের ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। পাহাড়ের হোটেল, দোকান এবং বাজারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রোপওয়ের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া গেলে সড়কের উপর পণ্যবাহী গাড়ির চাপ কমতে পারে। একই পরিকাঠামোয় যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত নকশা, নিরাপত্তাবিধি এবং পরিচালন পরিকল্পনার উপর। কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত বর্তমানে মূলত হিল কার্ট রোড বা বিকল্প পাহাড়ি সড়কের উপর নির্ভর করতে হয়। পর্যটনের মরসুমে গাড়ির চাপ বাড়লে বিভিন্ন জায়গায় যানজট তৈরি হয়। ধস বা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে যোগাযোগেও সমস্যা দেখা দেয়। পরিকল্পিত রোপওয়ে হলে তা সড়কপথের একটি বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।
রোপওয়ে চালু হলে সম্ভাব্য সুবিধাগুলি হল—
কার্শিয়াং ও দার্জিলিংয়ের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমানো
পাহাড়ি সড়কে ছোট গাড়ি ও পণ্যবাহী গাড়ির চাপ হ্রাস
জ্বালানি ব্যবহার এবং যানবাহনজনিত দূষণ কমানো
পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি
রুটের মধ্যবর্তী এলাকায় নতুন পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি
রোপওয়ের জানালা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা, চা-বাগান এবং পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অংশ দেখার সুযোগ থাকলে সেটি শুধু পরিবহণের মাধ্যম নয়, নিজেই একটি বড় পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। দার্জিলিং প্রকল্পের সম্ভাব্য আকার বুঝতে আদানি গোষ্ঠীর সোনপ্রয়াগ–কেদারনাথ রোপওয়েকে একটি বেঞ্চমার্ক হিসাবে দেখা যেতে পারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ন্যাশনাল হাইওয়েজ লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের কাছ থেকে ওই প্রকল্পের ‘লেটার অফ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিল আদানি এন্টারপ্রাইজেস। প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ১২.৯ কিলোমিটার এবং আনুমানিক নির্মাণব্যয় ৪,০৮১ কোটি টাকা। বর্তমানে সোনপ্রয়াগ থেকে কেদারনাথ পৌঁছতে প্রায় আট থেকে নয় ঘণ্টার দুর্গম পদযাত্রা করতে হয়। রোপওয়ে চালু হলে সেই যাত্রা প্রায় ৩৬ মিনিটে সম্পূর্ণ হওয়ার কথা।
কেন্দ্রের অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেদারনাথ রোপওয়ের প্রতি ঘণ্টায় প্রতি অভিমুখে ১,৮০০ যাত্রী পরিবহণের ক্ষমতা থাকবে। দিনে প্রায় ১৮ হাজার মানুষকে বহন করতে পারবে এই ব্যবস্থা। প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে তৈরি হচ্ছে। সোনপ্রয়াগ–কেদারনাথ রোপওয়েতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ‘ট্রাই-কেবল ডিট্যাচেবল গন্ডোলা’ বা 3S প্রযুক্তি। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই ব্যবস্থায় তিনটি তার বা কেবল ব্যবহৃত হয়। দুটি কেবল কেবিনের ভার বহন করে এবং তৃতীয় কেবলটি কেবিনকে টেনে নিয়ে যায়। সাধারণ মনোকেবল রোপওয়ের তুলনায় 3S ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে—প্রবল হাওয়ায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল, দুই টাওয়ারের মধ্যে বেশি দূরত্ব রাখা যায়, বড় এবং বেশি যাত্রীবাহী কেবিন ব্যবহার করা সম্ভব, দ্রুতগতিতে এবং বেশি সংখ্যায় যাত্রী পরিবহণ করা যায়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টাওয়ারের সংখ্যা সীমিত রাখার সুযোগ থাকে, স্টেশনে কেবিন মূল কেবল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধীরগতিতে চলতে পারে, ফলে যাত্রীদের ওঠানামা সহজ হয়। এই প্রযুক্তির রোপওয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭ মিটার গতিতে চলতে এবং ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহণ করতে সক্ষম হতে পারে। তবে প্রকল্পভেদে বাস্তব গতি ও ক্ষমতা আলাদা করে নির্ধারিত হয়। দার্জিলিংয়ের প্রকল্পে 3S প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হবে কি না, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। কিন্তু দীর্ঘ রুট, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, প্রবল হাওয়া এবং বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহণের প্রয়োজন বিবেচনা করলে উন্নত প্রযুক্তির কোনও ব্যবস্থা বেছে নেওয়া হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
রোপওয়ে সড়ক পরিবহণের তুলনায় পরিবেশবান্ধব হতে পারে। কিন্তু প্রকল্প নির্মাণের সময় পাহাড় কাটা, গাছ অপসারণ, টাওয়ার ও স্টেশন তৈরির জন্য জমি ব্যবহার এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহণের প্রভাবও যাচাই করতে হবে। দার্জিলিংয়ের মতো ধসপ্রবণ এলাকায় ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাওয়ারগুলি কোথায় বসবে, মাটির ভারবহন ক্ষমতা কতটা, প্রবল হাওয়া ও বজ্রপাতের সময় পরিষেবা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মাঝপথ থেকে যাত্রীদের কীভাবে উদ্ধার করা হবে—সবকিছুর বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষ, চা-বাগান এবং সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দার্জিলিংয়ে বর্তমানে রঙ্গিত ভ্যালি প্যাসেঞ্জার কেবল কার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত ২৫–৩০ কিলোমিটারের প্রস্তাবিত রোপওয়ে তার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাপের গণপরিবহণ ও পর্যটন প্রকল্প হতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কার্শিয়াং নিজেও পর্যটকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত হতে পারে। রোপওয়ের স্টেশন ঘিরে হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় হস্তশিল্পের বাজার ও অন্যান্য পর্যটন পরিষেবা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও থাকবে। কার্শিয়ং থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত মূলত হিল কার্ট রোড বা অন্যান্য পাহাড়ি রাস্তার উপর নির্ভর করতে হয় পর্যটকদের। পরিকল্পিত রোপওয়ে হলে তা সড়কপথের একটি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হবে। যাতায়াতের সময় যেমন কমবে, তেমনই পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চাপও কমবে। যানজটের সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে। অনেকাংশে হ্রাস পাবে দূষণও।
উত্তরাখণ্ডের শোনপ্রয়াগ থেকে কেদারনাথ পর্যন্ত অন্যতম রোপওয়ে প্রকল্পের দায়িত্ব বর্তমানে আদানি গোষ্ঠীর কাঁধে। ১২.৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রোপওয়ে তৈরিতে আনুমানিক ব্যয় করা হচ্ছে ৪ হাজার ৮১ কোটি টাকা। শোনপ্রয়াগ থেকে কেদারনাথে পৌঁছতে প্রায় ৮-৯ ঘণ্টা ট্রেক করতে হয়। রোপওয়ে চালু হলে সেই পথ মাত্র ৩৬ মিনিটে সম্পূর্ণ হওয়ার কথা। কেদারনাথের রোপওয়ের রাস্তা ধরে পশ্চিমবঙ্গের প্রকল্পটিও বাস্তবায়িত হলে পর্যটকদের গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে হিসেবে ধরা দেবে কার্শিয়ং। নতুন করে পর্যটন পরিষেবা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও যে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। তাই মুখ্যমন্ত্রী ও গৌতম আদানির বৈঠকে ওঠা প্রস্তাবটি পাহাড়ের পর্যটন ও যোগাযোগ পরিকাঠামোয় নতুন দিগন্ত আসবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আপাতত গোটা বিষয়টি আলোচনার স্তরে রয়েছে। সরকারকে প্রকল্পের বাস্তবতা যাচাই করে দরপত্র ডাকতে হবে এবং আদানি-সহ আগ্রহী সংস্থাগুলিকে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। তা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী ও গৌতম আদানির বৈঠকে প্রস্তাবটি ওঠা পাহাড়ের পর্যটন ও যোগাযোগ পরিকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।




