RK NEWZ কথায় বলে ‘অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। জার্সি বদলানো সঙ্গীরা দলের বিপদ ডেকে আনতে পারে কি না, তা নিয়ে চর্চা ক্রমশ বাড়ছে বিজেপির নীচের তলায়। পালাবদলের পর দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ নানা স্তরের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে গা ঘষাঘষি করে ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। যা নিয়ে ক্ষোভ দানা বাঁধছে শাসক দলের অন্দরে। “তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের উল্টো করে ঝুলিয়ে সোজা করব।’’ বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যে এসে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন অমিত শাহ। এক বার নয়, একাধিক বার। তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করার কথা বলেছিলেন রাজ্য বিজেপির শীর্ষনেতারাও। ভোট মিটেছে। ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশ ‘ভাল’ হয়ে গিয়েছেন। তাঁদের কেউ সরাসরি বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন, কারও কারও সঙ্গে বিজেপির সখ্য তৈরি হয়েছে। পরিণামে ক্ষোভ এবং হতাশা তৈরি হয়েছে বিজেপির অন্দরে। দলের নেতারা সে কথা অস্বীকার করছেন না। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘এ কথা তো মানতেই হবে যে, মানুষ ভোট দিয়েছেন, পোশাকের ভিতরে থাকা মানুষটার পরিবর্তনের জন্য, শুধু পোশাক পরিবর্তনের জন্য নয়।’’ কিন্তু সমাধান কোন পথে, সেটাও স্পষ্ট নয়। ৪ মে-র পরে তৃণমূল কংগ্রেস চার টুকরো। এক, রাজ্যসভার তিন সাংসদ ইস্তফা দিয়ে বিজেপিতে নাম লিখিয়ে ফের সাংসদ হয়েছেন। দুই, লোকসভার ২০ জন সাংসদ দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে গিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে তৃণমূল ছেড়েছেন। অজ্ঞাতকুলশীল এনসিপিআইয়ে যোগ দিয়ে তাঁরা এখন এনডিএ-র শরিক। কালীঘাটের মামলার জেরে সংসদ পদ রক্ষার ভার ‘সঁপেছেন’ মোদীর উপরে। তিন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬৫ জন বিধায়ক নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করেছেন। ঋতব্রত বিরোধী দলনেতার পদ পেয়েছেন। তৃণমূলের অস্থায়ী সদর দফতর চলে গিয়েছে তাঁদের দখলে। চতুর্থ খণ্ড হিসেবে রয়েছেন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলীরা। প্রথম তিন খণ্ডকে নিয়েই রাজ্য বিজেপির বিড়ম্বনা। প্রকাশ চিক বরাইকের কথাই ধরুন। উত্তরবঙ্গের জনসভায় তাঁকে গরুচোর বলে বিঁধেছিলেন সুকান্ত মজুমদার। রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি। প্রকাশ রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে বিজেপি দফতরে উত্তরীয় পরিয়ে তাঁকে সাদরে দলে নিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। রাজ্য বিজেপির বর্তমান সভাপতির মুখে ছিল, সর্বভারতীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কথা। রাজ্য বিজেপির এক প্রাক্তন সহ-সভাপতির কথায়, ‘‘সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব আর প্রকাশ চিক বরাইককে যে ভাবে বিজেপিতে যোগ দেওয়ানো হল এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যে ভাবে রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রার্থী করে দেওয়া হল, এ রকম ঘটনা তো আগে কখনও দেখিনি! তৃণমূল থেকে আসা লোকজন তা হলে এতটা মূল্যবান!’’ সুখেন্দুশেখর রায় বা সুস্মিতা দেবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সে ভাবে নেই। কিন্তু কোন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার দায়ে প্রকাশ চিক বরাইককে দলে নিতে হল, সে ব্যাখ্যা বিজেপি নেতারা দেননি। ফলে রাজ্যে দলের তৃণমূলীকরণ হচ্ছে কি না, এ প্রশ্ন বিজেপির পুরোনো কর্মীদের মনে উঠছে। প্রশ্নটা উস্কে দিচ্ছে ঋতপন্থীদের প্রতি সরকারের ‘নরম’ মনোভাবও। এই শিবিরের নেতাদের একটা বড় অংশ দুর্নীতিগ্রস্ত বলে বিজেপির অভিযোগ। বলা হচ্ছে, এলাকার মানুষও এঁদের অনেকের প্রতি ক্ষুব্ধ। জাভেদ খান, ফিরহাদ হাকিমদের দিকে তো অভিযোগের আঙুল তুলেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। অথচ, কালীঘাটপন্থী কিছু তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হলেও ঋতপন্থীদের কারও গায়ে এখনও আঁচড় লাগেনি। তা হলে অরূপ বিশ্বাস, দেবাশিস কুমারেরা কি সব ‘ভাল তৃণমূল’ হয়ে উঠলেন? ভোটের আগে তাঁদের সম্পর্কে বলা কথাগুলো কি ভিত্তিহীন ছিল? এ ধরনের গুচ্ছ প্রশ্নের মুখে বিজেপি-কে এখন দাঁড়াতে হচ্ছে। মমতা শিবিরের কুণাল ঘোষ থেকে শুরু করে সিপিএমের শতরূপ ঘোষরা ছুড়ে দিচ্ছেন ‘ওয়াশিং মেশিন’ কটাক্ষ।
‘ভাল’ তৃণমূল তত্ত্বটা ভোটের ঠিক পরে পরেই দিয়েছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির রাজ্য সভাপতি মে মাসের শেষ সপ্তাহে বলেছিলেন, ‘‘তৃণমূলে কিছু ভাল মানুষ রয়েছেন এবং দল তাঁদের কথা ভাবতে পারে।’’ তখন কটাক্ষের বান ডেকেছিল। প্রতিক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি শমীক নিজেও বুঝেছিলেন। সুর বদলে বলেছিলেন, ‘‘তৃণমূলের প্রতি মানুষের কতটা ঘৃণা ভেবে দেখুন। তৃণমূলে কেউ ভাল রয়েছেন বলে মানুষ মানতেই চান না।’’ তার পরেও তৃণমূল নেতাদের দলে নেওয়া হচ্ছে কেন? কেন তাঁদের সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছে বিজেপি? কার নির্দেশে? অনেকে বলছেন, সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করানোর জন্য প্রকাশ চিক বরাইক বা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়দের সমর্থন প্রয়োজন। বিধানসভার ক্ষেত্রে সেই ব্যাখ্যাও খাটে না! ওন্দার বিজেপি বিধায়ক অমরনাথ শাখা বাঁকুড়া জেলায় বিজেপির আদি নেতা। গোটা রাজ্যে যখন বিজেপি-কে প্রায় খুঁজেই পাওয়া যেত না, অমরনাথের এলাকায় বিজেপি তখনও পঞ্চায়েতে জিতত। দু’বারের বিধায়ক সেই অমরনাথ দিন কয়েক আগে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘জীবন, যৌবন, পরিবার, পরিজন সর্বস্বকে দূরে ঠেলে সারা জীবনটা এই দলটার জন্য সমর্পণ করে দিয়েছি। ৩৪ বছর সিপিএমের রক্তচক্ষু, সন্ত্রাস, সঙ্গে তৃণমূলের অত্যাচার, সব কিছু সহ্য করেছি। তবে মানুষ আমাদের ওপর বিশ্বাস করেছে। কিন্তু কিছু মানুষের জন্য দলটার ক্ষতি হচ্ছে। কারও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।’’ নিচুতলার অসন্তোষের প্রতি সহানুভূতিশীল সুকান্ত মজুমদার। সরাসরি না-বললেও তাঁর মন্তব্য, ‘‘ভাল তৃণমূল বলে কিছু হয় না। এই পৃথিবীতে ও রকম কিছু নেই। ভাল তৃণমূল শব্দবন্ধটি হল একটি অলীক কল্পনা।’’ ইঙ্গিত স্পষ্ট। তৃণমূল থেকে এক জনকেও বিজেপিতে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন না সুকান্ত। সংঘ-ঘনিষ্ঠ পত্রিকা ‘স্বস্তিকা’র সাম্প্রতিক সংখ্যাতেও লেখা হয়েছে, ‘‘পূর্ববর্তী শাসক দল এবং বিজেপি একই মুদ্রার দুই পিঠ— এমন ধারণা তৈরি হলে ৯০ শতাংশ ভোটার বিজেপির দিক থেকে মুখ ফেরাতে দ্বিধা বোধ করবেন না।’’




