Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

‘মৃত্যুপুরী’ নেপালে নয়া আতঙ্ক!‌ ‘বন্ধুত্বে’র খেসারত দিচ্ছে কাঠমান্ডু?

RK NEWZ প্রকৃতির রুদ্র তাণ্ডবে তছনছ নেপাল। লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। ভয়ংকর এই দুর্যোগে এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫৯ জন। নিখোঁজ প্রায় ১৬০০। মৃতের সংখ্যা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে সন্দিহান প্রত্যেকেই। এই পরিস্থিতিতে নেপালের আকাশে ফের ঘনাতে শুরু করেছে বিপদের কালো মেঘ। জানা যাচ্ছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সৃষ্টি আরও একটি হিমবাহ হ্রদ আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে যেতে পারে, যার ফলে ফের হুড়মুড়িয়ে নেমে আসতে পারে বিপুল জলরাশি। বলা বাহুল্য, নতুন এই বিপর্যয়ের ফলে আবার ভাসতে পারে নেপাল। ইতিমধ্যেই সে বিষয়ে কাঠমান্ডুকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে বেজিং। চিনের জলসম্পদ মন্ত্রক জানিয়েছে, ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে হিমবাহ হ্রদ সৃষ্ট হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত এটিতে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমেছে। শুধু তাই নয়, হ্রদের জল ইতিমধ্যেই উপচে পড়তে শুরু করেছে। আগামী তিন দিনে হ্রদটিতে আরও ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমতে পারে। ফলে অতিরিক্ত জলের চাপে ভেঙে পড়তে পারে হ্রদটি। যার জেরে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হতে পারে। চিনা কর্তৃপক্ষ নতুন করে বন্যার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে, নেপাল সরকার ভোটেকোশী, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এদিকে নেপাল বিপর্যয়ের দায় ইতিমধ্যেই এড়িয়েছে বেজিং। তারা জানিয়ে দিয়েছে, কাঠমান্ডু যেভাবে চিনের দিকে আঙুল তুলেছে, তা ভিত্তিহীন। তাদের দাবিগুলি ভুয়ো। শি জিনপিঙের সরকারের সাফ কথা, দোষারোপ করে লাভ নেই। সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়। এই পরিস্থিতিতে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে বক্তব্য, বেজিঙের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বে’রই কি খেসারত দিচ্ছে কাঠমান্ডু?

সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল। একের পর এক পাহাড়ি এলাকায় ধস, বিধ্বংসী বন্যা এবং হড়পা বানের তাণ্ডবে সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গিয়েছে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নেপালের স্থানীয় সূত্রের প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত জল ও কাদার স্তূপ থেকে অন্তত ৩৩২ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ। চরম বিপদের মুখে পড়েছেন সেখানে আটকে থাকা শত শত ভারতীয় নাগরিক। বেশ কিছু বছর আগেই ভারতের উত্তরাখণ্ডও কিছুটা এমনই ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। তারপর এমন একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হল নেপালও। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটল কী করে? একদিনের বিপর্যয়ে এত ক্ষয়ক্ষতি, এত মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা – এটা কি নিছকই প্রকৃতির রুদ্ররোষ? কী কারণ থাকতে পারে এই ভয়াবহ দুর্যোগের নেপথ্যে দ্য ওয়ালের সঙ্গে সেই বিষয়েই আলোচনা করলেন পরিবেশবিদ আজনারুল ইসলাম।

পরিবেশবিদ প্রথমেই বলেন, ‘নেপালের এই বন্যাকে আমি অন্তত কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছি না। এটা হওয়ারই ছিল এবং এটা শুধু নেপাল না, আমাদের নেপাল লাগোয়া বিহার, উত্তর প্রদেশের মতো যেসব জায়গা আছে, সেখানেও এরকম বন্যা হতে পারে। এইজন্য ভারত সরকারের তরফ থেকেও এই বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো সীমান্ত জেলাগুলিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।’ নেপালের নদীর সঙ্গে এই হড়পা বানের বিশেষ যোগ রয়েছে। তার কারণ অনেকটা যেমন প্রাকৃতিক, পাশাপাশি বিস্তর কারণও রয়েছে। একে একে সেগুলি ব্যাখ্যা করতে করতে পরিবেশবিদ আজনারুল ইসলাম বলেন, ‘নেপালের নদীগুলি বেশিরভাগই হিমালয়ের জলে পুষ্ট। মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ দেখেছিলাম নদীর তলদেশ প্রায় শুকিয়ে গেছে। কিন্তু নদীর গভীরতা বা নাব্যতা একদম নেই, প্রায় মজে গেছে। শুধু তাই নয়, প্রচুর জায়গাতে এখন নেপাল সরকার বাঁধ, ব্যারেজ তৈরি করছে। ফলে নদীর লংগিটিউডিনাল ফ্লো পথ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরই একটি স্বাভাবিক ফলাফল হঠাৎ করে জল জমে যাওয়া এবং তার বার্স্ট হওয়া।’

খুব সহজ করে বলতে গেলে নেপালের এই ঘটনার সঙ্গে GLOF (মানে গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড)-এর কানেকশন আছে। মানে এই বন্যাকে শুধুমাত্র নদীতে আসা বন্যা হিসেবে দেখলে হবে না, এর সঙ্গে আবহাওয়ার একটা বিশেষ ভূমিকা জড়িয়ে রয়েছে – এমনটাই মত পরিবেশ বিশেষজ্ঞের। ”এল নিনো’ শব্দটার সঙ্গে আমরা এখন ভালরকম পরিচিত। এবছর যেমন খরার বছর, বন্যা হওয়ার কথা নয়। এতে হয়তো বৃষ্টিপাত একদমই হয়তো কমে যেতে পারে, কিন্তু দুম করে দুই-তিনদিনের বা কয়েক ঘণ্টার হঠাৎ বৃষ্টি আসতে পারে। যার ফল হড়পা বান। এটা সমতলের বন্যার মতো নয়। সমতলে বন্যা ধীরে ধীরে আসে, সতর্কতা জারি করার সময় থাকে। নেপালের এই বন্যা হয়েছে ভূতকোশী নদীতে যেটা লেন্ডা খোলা নামের একটা ট্রিবিউটারি সিস্টেমেরই একটা অংশ। এখানে যেটা হয়েছে সেটা গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট মানে হঠাৎ করে ওই পাথর ধস (তুষার-পাথর ধস বলা যায় আরও সহজ করে) নেমে নীচের দিকে চলে এসেছে। এটা শুধু নদীর কারণে হয় না, এই হড়পা বান কিন্তু মেঘভাঙা বৃষ্টি থেকেও হতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে হচ্ছে GLOF (গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড)। বিশেষজ্ঞ এও বলেন, ‘জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব ইউনাইটেড স্টেটস (USGS) বা BBC-র বক্তব্য, ওই সময়ে স্থানীয় এবং তুলনামূলক ছোট একটা ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে। সেইজন্য ওই জায়গাটা থেকে উপরের বরফ-পাথর হঠাৎ নেমে এসে ওইখানে একটা ধস এনেছে। কাল যা ঘটেছে, সেই হঠাৎ জলরাশ বা ফ্লাশ ফ্লাড বা হড়পা বান যেটাই বলি, খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে, আবার নেমেও যায়। কিন্তু যখন আসে মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধুয়ে মুছে নিয়ে চলে যায়।’

শুধু প্রকৃতিকে দোষ দিলেই হবে না, মানুষের ভূমিকাও এখানে ঠিক কতটা – তা অস্বীকার করার উপায় নেই, সেকথা একবাক্যে মেনে নিলেন পরিবেশবিদ আজনারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘যে নদীতে এই বন্যা হল, তার আশপাশে বড় বড় বিল্ডিং, হোটেল, সেখানকার কৃষিকাজ, রাস্তাঘাট, পর্যটনের স্বাভাবিক উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। এইসব কারণেই মানুষের ক্ষতিটা এত বেশি হয়েছে। এসব না হলেও নিঃসন্দেহে ক্ষয়ক্ষতি হত, কিন্তু যে ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতি হয়েছে, এই তার জন্য আমরাই দায়ী। এই ঘটনাটার দায় সবাইকেই নিতে হবে। সাধারণ মানুষকে নিতে হবে, সরকারকে নিতে হবে। সচেতনতারও অভাব ছিল এখানে। নদীটাকে নষ্ট করেছে মানুষই। ‘গাছপালা কেটে নিচ্ছে, যেখানে সেখানে বিল্ডিং বানাচ্ছে, ড্যাম-ব্যারেজ দিয়ে নদীগুলোর নাব্যতা একেবারে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতির কারণে হয়তো এই বন্যাটা হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতিটা হয়েছে মানুষেরই কারণে’, মন্তব্য তাঁর।

নদীর আশেপাশে যে হারে বসতি, নির্মাণ গড়ে উঠছে তাতে মানুষই আদতে প্রকৃতির ধৈর্য পরীক্ষা করছে বলে মনে করেন পরিবেশবিদ আজনারুল ইসলাম। তিনি তাঁর মতামতের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলেন, ‘আমরা সবসময় প্রকৃতিকে দোষ দিই, কিন্তু প্রকৃতিরও সহ্য করার একটা সীমা আছে। নদীর ৫০০ মিটার বা ১ কিলোমিটারের আশেপাশে (নদীর করিডোর স্পেস বা ফ্রিডম স্পেসে) যদি কোনও নির্মাণ বা বসতি না থাকত, তাহলে এতটা ক্ষয়ক্ষতি হত না। তাই এই বন্যাটাকে নিছকই শুধু বন্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়।’
পরিবেশবিদ হিসেবে সাবধানবাণী, এমন একটা ঘটনা ঘটার পরও সেই ভুলগুলোই আমরা বারবার করি। তার কারণ লং-টার্ম সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্টের কথা ভাবি না। ফিউচার লং-টার্ম ডেভেলপমেন্টের কথা ভাবতে না পারলে এমন বিপর্যয় চলতেই থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles