ইস্টবেঙ্গল – ৪ (এডমুন্ড হ্যাটট্রিক, বিপিন সিং)
মোহনবাগান – ১ (মণবীর সিং)
RK NEWZ চিরশত্রুকে তছনছ করেও দিনের শেষে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের একটা আক্ষেপ থাকতে পারে, পাঁচ গোল হল না! ২২ বছর পর ডুরান্ড জয় ইস্টবেঙ্গলের। দিনের শেষে মোট শট, গোলে শট, বল নিয়ন্ত্রণ— সবেতেই মোহনবাগান এগিয়ে থাকলেও ম্যাচের ব্যবধান এত প্রকট। ডার্বিতে ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক এডমুণ্ডের। যুবভারতীতে লাল-হলুদ ঝড়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে চূর্ণ করে ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হল ইস্টবেঙ্গল। কলকাতা ডার্বির ইতিহাসে নিজের নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে রাখলেন এডমুণ্ড লালরিনডিকা। প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক করলেন তিনি। বাইচুং, কিয়ান নাসিরির পর ৩য় ভারতীয় হিসেবে ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করলেন এডমুন্ড। ইস্টবেঙ্গলের অন্য গোলটি বিপিন সিংয়ের। বৃষ্টিস্নাত যুবভারতীতে বলের সঙ্গে সঙ্গে বাগানের ভাগ্যও বারবার পিছলে গিয়েছে, ফলে আর গোলমুখ খুলতে পারেনি মোহনবাগান। একসময় লাল-হলুদ গ্যালারি ভেবেই নিয়েছিল, ১৯৭৫-এর স্মৃতি ফিরিয়ে ৫-০ হচ্ছেই। কিন্তু তা হল না। না হওয়ার প্রধান কারণ, বিশাল কাইথের হাত। গোটা দুয়েক নিশ্চিত গোল তিনি না বাঁচালে আজ ৬ গোল খেত মোহনবাগান।মোহনবাগানের সবেধন গোল দিয়েছেন মনবীর সিং। রবিবাসরীয় সন্ধেয় আরও এক মাইলফলক তৈরি হল কলকাতা ডার্বিতে। যে ম্যাচে প্রথমার্ধ্বেই ইস্টবেঙ্গলের কাছে ৪ গোল খেয়ে গেল মোহনবাগান। ১৯৯৭ সালের ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে বাইচুং ভুটিয়ার হ্যাটট্রিকে মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। ২৯ বছর পর সেই একই স্কোরলাইনে ফের সবুজ-মেরুনকে হারাল তারা। এবার হ্যাটট্রিকের নায়ক এডমুণ্ড। জয়ের সুবাদে ১৭তম বার ডুরান্ড কাপ ঘরে তুলল ইস্টবেঙ্গল। একই সঙ্গে সর্বাধিক ১৭ বার এই প্রতিযোগিতা জেতার মোহনবাগানের রেকর্ডও ছুঁয়ে ফেলল লাল-হলুদ। ফাইনালের আগে অবশ্য সাম্প্রতিক ডার্বির ফল আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছিল মোহনবাগানকেই। এবারের ডুরান্ড কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়েছিল সবুজ-মেরুন। কিন্তু খেতাবের লড়াইয়ে সেই হারের হিসাব সুদে-আসলে মিটিয়ে দিল আন্তোনিয়ো লোপেজ হাবাসের দল। ম্যাচের শুরুতে বলের দখল এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে ছিল মোহনবাগান। কিন্তু গোলের মুখ খুলতেই বদলে যায় ছবিটা। ১০ মিনিটে বিপিন সিংয়ের গোলে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। বক্সের বাঁ দিক থেকে শুভাশিস বসুকে কাটিয়ে বিপিনের মাটি ঘেঁষা শট বিশাল কাইথকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। মোহনবাগান সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় গোল। মাত্র দু’মিনিট পর বক্সের বাইরে থেকে শট নেন এডমুণ্ড। বলের নাগাল পেতে ঝাঁপিয়েও শেষরক্ষা করতে পারেননি বিশাল। ১২ মিনিটের মধ্যেই ২-০ এগিয়ে যায় লাল-হলুদ। ২২ মিনিটে মোহনবাগানের রক্ষণকে ফের ছিন্নভিন্ন করেন এডমুণ্ড। ড্যানিয়েল রামিরেজের পাস ধরে বক্সে ঢুকে প্রথমে এক ডিফেন্ডার এবং পরে গোলকিপার বিশালকে কাটিয়ে ফাঁকা জালে বল পাঠান তিনি। স্কোরলাইন হয়ে যায় ৩-০। ৩৩ মিনিটে ব্যক্তিগত দক্ষতায় একটি গোল শোধ করেন মনবীর সিং। ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে জয় গুপ্তকে কাটিয়ে তাঁর শট আনোয়ার আলির পায়ের ফাঁক দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। গোলরক্ষক প্রভসুখন গিল বল স্পর্শ করলেও তা আটকাতে পারেননি। মোহনবাগানের প্রত্যাবর্তনের আশা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। প্রথমার্ধের ৪৪ মিনিটে ফের গোল এডমুণ্ডের। মহম্মদ রশিদের ফ্রি-কিক থেকে বল পান জয় গুপ্ত। তাঁর বাড়ানো বল জালে ঠেলে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এডমুণ্ড। বিরতিতে ৪-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। প্রতি-আক্রমণ থেকে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। এমন সুযোগ যে রবিবাসরীয় ডার্বিতে মোহনবাগানকে হাফ ডজন গোল দিয়ে পঞ্চাশ বছরের রেকর্ডও ভেঙে দিতে পারত। এমনকী এডমুণ্ডের সামনে চতুর্থ গোল করার সুযোগও এসেছিল। পরে পরিবর্ত হিসেবে নামা জেসিন একবার বিশালকে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি। তবে ততক্ষণে ম্যাচের ভাগ্য কার্যত লেখা হয়ে গিয়েছে। শেষ বাঁশি বাজতেই উৎসবে ফেটে পড়ে যুবভারতীর লাল-হলুদ গ্যালারি। মরশুমের প্রথম ডার্বিতে হারের হতাশা মুছে সবচেয়ে বড় মঞ্চে মোহনবাগানকে বিধ্বস্ত করল ইস্টবেঙ্গল। আর বাইচুংয়ের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিকের স্মৃতি ফিরিয়ে লাল-হলুদ সমর্থকদের নতুন নায়ক হয়ে উঠলেন এডমুণ্ড লালরিনডিকা। ডার্বির ইতিহাসে যুক্ত হল আরও একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
হাবাসের মগজাস্ত্র ও প্যানোসের ভুল: আন্তোনিও লোপেজ হাবাস কেন ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা কোচ, তা প্রমাণ করে দিলেন। মরশুমের শুরুতে ডার্বিতে হার। কিন্তু কদিনের মধ্যে বুঝে গেলেন, তাঁর হাতে ঠিক কী মালমশলা আছে! ভারতীয় ব্রিগেডকে পুরো সাজিয়ে নিলেন। এদিন জয় গুপ্তাকে উইংয়ে খেলিয়ে মাস্টারস্ট্রোক দিলেন। বক্স স্ট্রাইকার নেই। কিন্তু দানি রামিরেজ ও এডমুন্ড জুটিতেই কামাল করে দিলেন। ঠিক ততটাই ভুল করলেন মোহনবাগানের কোচ প্যানাজিওটিস দিলম্পেরিস। কেন সাহাল আবদুল সামাদ প্রথম দলে নেই? কেন সেই লিস্টনই প্রথম একাদশে? আনফিট জেমি ম্যাকলারেন শুরু থেকে খেলবেন? কেন আপুইয়া এতক্ষণ মাঠে থাকবেন? প্রশ্ন অনেক। উত্তর নেইই।
‘অদৃশ্য’ ম্যাকলারেন: গোলের সুযোগ কি মোহনবাগানের কাছে আসেনি? মনবীর একটি গোল শোধ করেন। কিন্তু জেমি ম্যাকলারেন যে ভুলগুলো করলেন, সেগুলো না হলে অনায়াসে হ্যাট্রট্রিক করে যেতে পারতেন। বোঝাই যাচ্ছিল আনফিট। তাছাড়া তিনি যেন গোল না করবেন না বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। ইস্টবেঙ্গলকে গতবার ভারতসেরা করানোর পর মিগুয়েল এদিন বদলি হিসেবে নেমেছিলেন সবুজ-মেরুন জার্সিতে। তিনিও নিষ্প্রভ রইলেন।
ডুরান্ডের ফাইনালে ১২ বার মুখোমুখি! ইস্টবেঙ্গল নাকি মোহনবাগান— ট্রফির লড়াইয়ে এগিয়ে কে?
গ্যালারি বা ময়দান ছাপিয়ে কলকাতার বাঙাল-ঘটির দ্বৈরথের উত্তাপ টের পায় গোটা দেশ। রবিবাসরীয় বিকেলে একটি নতুন খেতাব জয়ের লক্ষে এ বার ডুরান্ড ফাইনালের মুখোমুখি লড়াইয়ে নামছে দুই প্রধান ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান। গ্যালারি বা ময়দান ছাপিয়ে কলকাতার বাঙাল-ঘটির দ্বৈরথের উত্তাপ টের পায় গোটা দেশ। রবিবাসরীয় বিকেলে একটি নতুন খেতাব জয়ের লক্ষে এ বার ডুরান্ড ফাইনালের মুখোমুখি লড়াইয়ে নামছে দুই প্রধান ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান। তবে ম্যাচের বাঁশি বাজার আগে পরিসংখ্যানে চোখ বোলালে বোঝা যাবে, ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতার ট্রফি লড়াইয়ে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর পাল্লা একেবারেই সেয়ানে সেয়ানে। ডুরান্ডের ফাইনালে এখনও পর্যন্ত ১২ বার মুখোমুখি হয়ে ট্রফি জয়ের নিরিখে সমতার আসনে দাঁড়িয়ে রয়েছে লাল-হলুদ ও সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। রিপ্লে ম্যাচ ও যৌথ জয়ের স্মৃতি
ডুরান্ড ফাইনালে কলকাতা ডার্বির প্রথম অধ্যায় লেখা হয়েছিল ১৯৬০ সালে। দিল্লির আম্বেদকর স্টেডিয়ামে নির্ধারিত সময়ে ম্যাচের অখণ্ডতা না ভাঙায় পরদিন অনুষ্ঠিত হয় ‘রিপ্লে’ ম্যাচ। সেই ম্যাচও অমীমাংসিত থাকায় শেষ পর্যন্ত দুই দলকেই যৌথ বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এর ঠিক ১২ বছর পর, ১৯৮২ সালের ডুরান্ড ফাইনালেও একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটে। মূল ম্যাচ এবং তার রিপ্লে— দু’টিই ড্র হওয়ায় সে বারও যৌথ ভাবেই ট্রফি ভাগাভাগি করে নেয় দুই দল।
নিষ্পত্তিমূলক ফাইনালে ৫-৫ লড়াই
যে ১০টি ডুরান্ড ফাইনালে স্পষ্ট জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে, তার পরিসংখ্যানও বিস্ময়কর ভাবে সমান। ৫টি ম্যাচে জিতেছে ইস্টবেঙ্গল এবং বাকি ৫টিতে শেষ হাসি হেসেছে মোহনবাগান।
প্রথম জয়: ১৯৬৪ সালে লাল-হলুদকে হারিয়ে প্রথম ডুরান্ড ফাইনাল জয়ের স্বাদ পায় মোহনবাগান। অন্যদিকে, ডুরান্ড ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে ইস্টবেঙ্গলের প্রথম ট্রফি জয় আসে ১৯৭০ সালে।
সাম্প্রতিক স্মৃতি: ২০২৩ সালের ডুরান্ড ফাইনালে শেষ বার দেখা গিয়েছিল দুই প্রধানের খণ্ডযুদ্ধ। দিমিত্রি পেত্রাতোসের এক গোল ম্যাচ ভাগ্য গড়ে দিয়েছিল মোহনবাগানের পক্ষে।
ডুরান্ড ফাইনালে ডার্বির পরিসংখ্যান
বছরবিজয়ী দল ও ফলাফল
১৯৬০ যৌথ বিজয়ী
১৯৬৪ মোহনবাগান (২-০)
১৯৭০ ইস্টবেঙ্গল (২-০)
১৯৭২ ইস্টবেঙ্গল (১-০)
১৯৭৮ ইস্টবেঙ্গল (৩-০)
১৯৮২ যৌথ বিজয়ী
১৯৮৪ মোহনবাগান (১-০)
১৯৮৬ মোহনবাগান (১-০)
১৯৮৯ ইস্টবেঙ্গল (৩-১, টাইব্রেকারে)
১৯৯৪ মোহনবাগান (১-০)
২০০৪ ইস্টবেঙ্গল (২-১)
২০২৩ মোহনবাগান (১-০)
চলতি মরসুমের ডুরান্ডেই এর আগে এক বার মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল, যেখানে ১-০ গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় মোহনবাগান। সব মিলিয়ে ডুরান্ড কাপে দুই দলের শেষ পাঁচটি মুখোমুখি লড়াইয়ের মধ্যে দু’টি করে ম্যাচ জিতেছে দুই প্রধান এবং একটি ম্যাচ মাঝপথেই বাতিল হয়।
২০০৪ এর পর ২০২৬, সেবারও দিল্লিতে মোহনবাগানকে হারিয়েই ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। আজকে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটল। বেশি নয়, এক মাস আগের কথা। শেষ যে বার ইস্টবেঙ্গল ডুরান্ড কাপ জিতেছিল, তখনও ময়দান গ্রাস করে নেয়নি কর্পোরেট গোষ্ঠী। মাস কয়েক আগেই এসেছে আইএসএল, ২৩ বছর পর জাতীয় কোনও লিগ জিতেছিল লেসলি ক্লডিয়াস সরণির ক্লাব। কয়েক মাস পরেই আবার ডুরান্ড কাপ। ২২ বছর পর ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন। ম্যাচের পর টিভির ক্যামেরা এক বৃদ্ধ লাল-হলুদ সমর্থককে ধরল, যাঁর চোখে জল তখন বাঁধ মানছে না। বাঁধ না মানাই স্বাভাবিক। এই ২২ বছর ধরে কম অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি ইস্টবেঙ্গলকে। এই হাবাসের কাছেই কম পর্যুদস্ত হয়নি ইস্টবেঙ্গল। হাবাসই হারান, আবার সেই হাবাসের মগজাস্ত্রেই মোহনবাগানকে মাত করে ম্যাচ জেতে ইস্টবেঙ্গল। ইদানিং ইনস্টাগ্রামে একটি রিল বেশ ভাইরাল হয়েছে – “তুমি এমন ভাবে জেতো, যে তোমার আগের সব হার ফিকে হয়ে যায়।” সেই রিল কি দেখেছেন স্প্যানিশ কোচ? নাহলে এভাবে একপেশে ফাইনাল করে ফেভারিটদের পাড়ার ক্লাবের পর্যায়ে নামান কিকরে?



