RK NEWZ দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক। কারিগর রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ নগেন্দ্র রায় তথা অনন্ত মহারাজ। তিনি কোচবিহারের রাজপরিবারের সদস্যও। লাগাতার নেতাজি-নিন্দায় তাঁর ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মানও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে যে কোনওরকম বিতর্কিত মন্তব্যের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এনিয়ে প্রবল শোরগোলের মাঝে কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে অবধারিতভাবে। নেতাজিকে বারবার ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে যে কটাক্ষ করছেন অনন্ত মহারাজ, তা কতটা সত্যি? পণ্ডিত নেহরু কি তাঁকে সত্যি ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’ ঘোষণা করার কথা বলেছিলেন? ইতিহাসের সাক্ষ্য ঠিক কী? রহস্যময় চরিত্র সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণারত দু’জন সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত এসবের স্পষ্ট জবাব দিলেন। ইতিহাসের গবেষক ও লেখক সৈকত নিয়োগী নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ তকমা নিয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন একেবারে ঐতিহাসিক নথি থেকে। তাঁর কথায়, ‘‘পণ্ডিত নেহরু কোন পরিস্থিতিতে নেতাজিকে ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, তার যাবতীয় নথিপত্র রয়েছে। নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে যখন খোসলা কমিশনের কাজ চলছিল, সেসময় নেহরুর স্টেনোগ্রাফার শ্যামলাল জৈন জানিয়েছেন, তিনি একটি চিঠির খসড়া করেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলিকে পাঠাবেন বলে। তাতে লেখা ছিল, নেতাজিকে ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’ বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সে চিঠি পাঠানো হয়নি শেষপর্যন্ত। এখন চিঠির ওই একাংশই সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা ঢাল করছেন অনন্ত মহারাজরা। এছাড়া শ্যামলাল জৈন নিজে খোসলা কমিশনে সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছিলেন, ১৯৬৭ সালে উত্তরপ্রদেশে তাঁর সঙ্গে নেতাজির দেখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে, ২০০২-০৩ সাল নাগাদ সাংসদ শশী থারুর সংসদে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন, নেতাজি কি যুদ্ধাপরাধী? তাঁকে উত্তরে জানানো হয়েছিল, নেতাজির নাম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কোথাও তালিকাভুক্ত নেই। এটা আবার আলাদা করে প্রমাণের কী আছে?” বিশদে এই ‘যুদ্ধাপরাধী’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবতা বিরোধী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদেরই এই তকমা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিলেন অক্ষশক্তির নেতা। এই যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় সংযোজন-বিয়োজন করা হয় প্রতি বছর। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম নেই। অনন্ত মহারাজের মন্তব্য নিয়ে আবার গবেষক-লেখক সৌম্যব্রত দাশগুপ্তর ব্যাখ্যা অন্য। তাঁর কথায়, ‘‘কোন মহারাজাদের কথা উনি বলছেন? কোচবিহারের যে রাজারা ব্রিটিশদের সহযোগিতা করেছিল? নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ কোচবিহারকে রাজতন্ত্রমুক্ত করতে লড়াই করেছিলেন। লড়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের মন্ত্রী দেবনাথ দাস। এসব ইতিহাস কি উনি ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন? আমার মনে হয়, মানুষকে এভাবে ভ্রান্তপথে চালিত করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গকে ভাগ করার জন্য আগেও যেমন চিনের উসকানি ছিল,আজও সেই উসকানি চলছে।”
জনরোষ ক্রমশ বাড়ছে। যেকোনও মুহূর্তে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। হতে পারে জেলযাত্রাও। কেড়ে নেওয়া হয়েছে বঙ্গবিভূষণ সম্মান। তা সত্ত্বেও নিজের অবস্থানে অনড় রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ। নেতাজি অসম্মানের অভিযোগ কোচবিহারের কোতয়ালি থানার পুলিশ অনন্ত মহারাজের ২ অনুরাগীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর দাবি, “যে সময়ের কথা বলেছি, তখন আমার জন্ম হয়নি। আমি নেতাজিকে অপমান করিনি। কাউকে গালাগালও করিনি। নিজের মুখ থেকে কোনও মিথ্যা কথা বা মনগড়া রূপকথা বানিয়ে বলিনি। কারও নামে বদনামও করিনি। যেটা ইতিহাসের পাতায় রয়েছে, সেটাই সাধারণ মানুষকে বলেছি। শুধুমাত্র ঐতিহাসিক কিছু তথ্য সামনে তুলে ধরেছি। আমি অন্যায় করে থাকলে আইনি শাস্তি দেওয়া যেতেই পারে।” সুতরাং হাজার চাপানউতোর চললেও নিজের অবস্থানে অনড় অনন্ত মহারাজ। কী বলেছিলেন অনন্ত মহারাজ? সম্প্রতি বর্ষীয়ান নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “শুধু মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু বা কংগ্রেসের আন্দোলনের ফলেই ভারত স্বাধীন হয়েছে, এই ধারণা সঠিক নয়। কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকা ইতিহাসে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। কোচবিহারের মহারাজা যুদ্ধ করে হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাজিত করেছিলেন। জার্মানির হাতে বন্দি হওয়া ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাদের নেতাজির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সেনাদের নিয়েই আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। নেতাজি সেই সুযোগের অপব্যবহার করেছিলেন। আজ যদি আমি সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিই, তা হলে আমাকে এনকাউন্টার করা হবে। ব্রিটিশ আমলেও আইন ছিল। কোচবিহারের মহারাজাকে যদি স্বাধীন ভারতের সম্রাট করা হত, তবে দেশভাগ হত না। ভারত ও পাকিস্তান এক থাকত।” এই মন্তব্যের পর থেকেই উঠেছে বিতর্কের ঝড়। তাতে রাশ টানতে পুলিশকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিয়মের ঊর্ধ্বে যে কেউই নন, তা-ও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। সুতরাং ক্রমশ চাপ বাড়ছে অনন্ত মহারাজের।



