বয়স তখন ৬। আইপিএলের পুনে দলকে সমর্থন করত বৈভব। এখন সেই দল আর নেই। এখন বয়স ১৪। নিলামে বৈভবকে কিনেছে রাজস্থান রয়্যালস। দলের হয়েই ইতিহাস গড়েছে সেদিনে ছোট্ট ছেলেটা। বৈভব সূর্যবংশী। ২০১৭ সালে বৈভব আইপিএলের একটি ম্যাচ দেখতে কলকাতায়। গালে রাইজিং পুণে সুপার জায়ান্টসের নাম লেখা। মাথায় ছিল সেই দলের ফেট্টি। সেই দলের জার্সিও পরনে। পুণের দলটির মালিক ছিলেন সঞ্জীব গোয়েন্কা। আইপিএলে দলটি নেই। এখন লখনউ সুপার জায়ান্টসের মালিক গোয়েন্কাও বৈভবের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, “অবাক হয়ে সেদিন রাতে খেলা দেখছিলাম। সকালে ছবিটি দেখতে পেলাম। বৈভব আমার দলকে সমর্থন করছিল। ২০১৭ সালে রাইজিং পুণে সুপারজায়ান্টসের জন্য গলা ফাটিয়েছিল ও। অনেক শুভেচ্ছা বৈভবের জন্য। এমন প্রতিভা, আত্মবিশ্বাসকে স্যালুট। ৩৫ বলে অসাধারণ শতরান।”

অর্থাভাবে এক সময়ে ছেলের ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন শেষ হতে বসেছিল। হাল ছাড়েননি বাবা। নিজের শেষ সম্বল, একফালি জমি বিক্রি করে ছেলের স্বপ্নপূরণের রসদ জুগিয়েছেন। বিহারের সমস্তিপুরের বালক বৈভব। সেখান থেকে ১০০ কিলোমিটার যাত্রা করে পাটনায় এসে প্রত্যেকদিন ৬০০টি বল খেলত। ১৬-১৭ বছর বয়সি নেট বোলারদের সামলে ব্যাটিং প্র্যাকটিস। নেট বোলাররা যেন প্র্যাকটিস করে, তাই তাদের জন্য বাড়তি খাবার নিয়ে আসতেন বৈভবের বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশী। নিজের জমিটুকু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়ে ছেলের খেলার খরচ জুগিয়েছেন। ভোর চারটের সময়ে উঠে বৈভবের জন্য প্রতিদিন খাবার বানিয়ে দিতেন তার মা। পরিবারের সকলের পরিশ্রমের ফল প্রকাশ বৈভবের পারফরম্যান্সে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা সেই ছেলে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তোলপাড় ফেলে দিয়েছে ক্রিকেটদুনিয়ায়। কনিষ্ঠতম হিসাবে টি-২০ ক্রিকেটে সেঞ্চুরি বৈভব সূর্যবংশীর। গতবছর আইপিএল নিলাম থেকেই বিহারের বৈভবের রেকর্ড গড়ার যাত্রা শুরু। কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসাবে আইপিএল নিলামে দল পাওয়া। আইপিএল মহা নিলামে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকায় বৈভবকে কেনে রাজস্থান রয়্যালস। সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএলে অভিষেক। আইপিএল জীবনের শুরু ছক্কা হাঁকিয়ে। আইপিএল কেরিয়ারের প্রথম ম্যাচে মারকুটে ব্যাটিং। দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি বৈভব। প্রথম দিন হাফ সেঞ্চুরি মাঠে ফেলে এসে কেঁদেছিল ১৪ বছরের কিশোর। জয়পুরে নিজের শতরান পূর্ণ করল বৈভব, মাত্র ৩৫ বলে। আইপিএলে দ্রুততম শতরানের রেকর্ড ক্যারিবিয়ান তারকা ক্রিস গেইলের, ৩০ বলে সেঞ্চুরির পরেই খোদাই হল বৈভবের নাম। ইশান্ত শর্মা, মহম্মদ সিরাজের, রসিদ খান মতো অভিজ্ঞ বোলারদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে বৈভব। কিশোর ক্রিকেটারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ শচীন তেণ্ডুলকর থেকে শুরু করে বিশ্ব ক্রিকেটমহল।

বয়স মাত্র ১৪ বছর। যে বয়সে ক্রিকেটারেরা বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা খেলে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করে সেই বয়সে দুনিয়া কাঁপাচ্ছে বৈভব সূর্যবংশী। ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেছে। এই সাফল্যের পরে প্রথমেই বাবা-মায়ের স্বার্থত্যাগের কথা মনে পড়ছে তার। বাবা-মা যে পরিশ্রম করেছেন সেই কাহিনি শুনিয়েছে বৈভব। গুজরাতের বিরুদ্ধে শতরান করে মাঠে দাঁড়িয়েই প্রথমে বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশীকে ফোন করে বৈভব। সঙ্গে থাকা রাজস্থান রয়্যালসের ম্যানেজার রোমি ভিন্ডে বৈভবের হাতে ফোন দিয়ে বলেন, “যাকে ইচ্ছা ফোন করো।” বৈভব বলে, “প্রথমেই বাবাকে ফোন করব।” মুখে হাসি থাকলেও ছলছল চোখে ফোন করে প্রথমেই বাবাকে প্রণাম জানায় বৈভব। রোমির সঙ্গে কথা হয় তার বাবার। রোমি বলেন, “ছেলের এই ইনিংসের পর কেমন লাগছে?” জবাবে সঞ্জীব বলেন, “আমাদের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনারা যে বৈভবের উপর ভরসা রেখেছেন তার জন্য অনেক ধন্যবাদ।” রোমি বলেন, “এই তো সবে শুরু। এখনও অনেক পথচলা বাকি। বৈভবের মা কী বলছে?” সঞ্জীব বলেন, “আমরা সকলেই অভিভূত। ফোন বেজেই চলেছে।” রোমি বলেন, “এখন তো গোটা সমস্তিপুর ফোন করবে।” বৈভব পুরো সময় পাশে দাঁড়িয়েছিল। শেষে সে বাবাকে জানায়, হোটেলে ফিরে আবার ফোন করবে। ম্যাচ শেষে বাবা-মায়ের পরিশ্রমের কাহিনি শুনিয়ে বৈভব বলে, “আমি আজ যা হয়েছি তা আমার বাবা-মায়ের জন্য। আমি অনুশীলনে যাওয়ার আগে আমার মা ঘুম থেকে উঠে খাবার বানাত। মাকে অনেক ভোরে উঠতে হত। সারা দিনে মা মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমাত। বাবাও আমার জন্য নিজের কাজ ছেড়ে দিয়েছিল। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। কিন্তু বাবা কখনওই আমাকে ক্রিকেট ছাড়তে বলেনি। আমার পাশে থেকেছে। তার ফল আজ দেখতে পাচ্ছি। আমি যেটুকু সাফল্য পেয়েছি, তা আমার বাবা-মায়ের জন্য।”

বিহারের সমস্তিপুরের বাসিন্দা বৈভব চার বছর বয়সে বাবা সঞ্জীবের কাছে ক্রিকেট শেখা শুরু করে। সঞ্জীব পেশায় কৃষক হলেও ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা অগাধ। ছেলের মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ দেখে তাকে ক্রিকেটার হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বাড়ির পিছনে ছোট একটু জায়গা পরিষ্কার করে ছেলেকে ক্রিকেট শেখাতে শুরু করেছিলেন। বাবার কাছে প্রাথমিক ক্রিকেট পাঠের পর ন’বছর বয়সে সমস্তিপুর ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয় বৈভব। সেখানে আড়াই বছর শেখার পর বিজয় মার্চেন্ট ট্রফির জন্য ট্রায়ালে যায় বৈভব। ভাল পারফর্ম করলেও কম বয়সের কথা ভেবে তাকে স্ট্যান্ড বাই রেখেছিলেন বিহারের অনূর্ধ্ব ১৬ দলের নির্বাচকেরা। সেখানেই চোখে পড়ে যান প্রাক্তন রঞ্জি ক্রিকেটার মণীশ ওঝার। তার পর থেকে তিনিই বৈভবের কোচ। ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়স। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় মিডল অর্ডার ব্যাটার বৈভবের। ২১১ দিনের জন্য রেকর্ড হয়নি। ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে সব থেকে কম বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার নজির রয়েছে রাজপুতানার প্রাক্তন ক্রিকেটার আলিমুদ্দিনের। অজমেরের ক্রিকেটারের রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক হয়েছিল ১৯৪২-’৪৩ মরসুমে বরোদার বিরুদ্ধে। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ১২ বছর ৭৩ দিন। এর আগে ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ ‘বি’ দলের হয়ে ভাল পারফরম্যান্স করেছিল বৈভব। ভাল খেলেছিল বিনু মাঁকড় ট্রফিতেও। সেই প্রতিযোগিতায় পাঁচ ম্যাচে ৪০০-র বেশি রান করে সে। গত ১ অক্টোবর বেসরকারি টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব ১৯ দলের বিরুদ্ধে ৫৮ বলে শতরান করে আলোচনায় উঠে আসে ১৩ বছরের বৈভব। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের লাল বলের ক্রিকেটে ভারতের হয়ে এটাই দ্রুততম শতরান। ইনিংসে ছিল ১৪টি চার ও চারটি ছয়। স্ট্রাইক রেট ১৬৭.৭৪।

এ বারের আইপিএল নিলামের আলোচনা বিহারের কিশোর ব্যাটারকে নিয়েই। নিলামের তালিকায় কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসাবে ছিল বৈভবই। ন্যূনতম দাম ছিল ৩০ লাখ টাকা। নিলামের সঞ্চালিকা মল্লিকা সাগর বৈভবের নাম ঘোষণা করতেই আগ্রহ দেখান দিল্লি কর্তৃপক্ষ। টাকার যুদ্ধে নামেন রাজস্থান রয়্যালস কর্তৃপক্ষ। রাজস্থানকে নিলামে নেতৃত্ব দেন কোচ দ্রাবিড় নিজে। দিল্লির হাতে ছিল ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ১৮ জন ক্রিকেটারকে দলে নেওয়া শেষ। অন্য দিকে, রাজস্থানের হাতে ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কেনা হয়েছিল ১৬ জন ক্রিকেটার। ১ কোটি ১০ লাখ টাকা দাম উঠতেই লড়াই থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় দিল্লি। বৈভবকে কেনে রাজস্থান। আইপিএল অভিষেকে প্রথম বলেই ছক্কা বৈভবের। প্রথম ইনিংসেই অর্ধশতরান হাতছাড়া হওয়ার পরে ডাগ আউটে ফেরার সময় কেঁদে ফেলেছিল বৈভব। গুজরাতের বিরুদ্ধে রেকর্ড। কিশোরের জন্য ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। সমাজমাধ্যমে সূর্যবংশীর সঙ্গে নিজের ২০২৪ সালের একটি ছবিও পোস্ট করা নীতীশের আশা, সূর্যবংশী ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও সাফল্য পাবেন। সূর্যবংশী! উপহার ভারতীয় ক্রিকেটের, বিহারের কিশোরকে দেখে বাক্রুদ্ধ-উচ্ছ্বসিত সতীর্থ, প্রতিপক্ষ। সূর্যবংশীর ব্যাট থেকে এসেছে ৩৫ বলে ১০১ রানের ইনিংস। ৭টি চার এবং ১১টি ছক্কা রয়েছে তার ইনিংসে। তার দাপটে ১৫.৫ ওভারের ২১০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ৮ উইকেটে গুরুত্বপূর্ণ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে রাজস্থান।

বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটের দাপটে জয়পুরের সওয়াই মানসিংহ স্টেডিয়ামে ছক্কার বন্যা। ১১৭৭ কিলোমিটার দূরে বিহারের সমস্তিপুর জেলার একটি বাড়িতেও চলছিল উৎসব। দেদার ফাটছিল আতশবাজি। চলছিল মিষ্টি বিতরণ। বৈভবের নামে চিৎকার। সঞ্জীব সূর্যবংশী বলেছিলেন, “মনে হচ্ছে ছ’মাস আগেই দীপাবলি এসে গিয়েছে।” এক রাতে, এক ইনিংসে সমস্তিপুরের আবহই পাল্টে দিয়েছে বৈভব। যে রাজ্য থেকে ক্রিকেটার উঠে আসার সংখ্যা বেশ কম, যে রাজ্যের ক্রিকেট সংস্থাই অন্তর্দ্বন্দ্বে জীর্ণ, সেই রাজ্যের ১৪ বছরের এক খুদে এ ভাবে আইপিএল মাতিয়ে দেবে, কেউ ভাবতেই পারছেন না। শুভমন গিল, সরফরাজ খান, পৃথ্বী শ, অভিষেক শর্মার মতো বৈভবও বাবা সঞ্জীবের অপূর্ণ স্বপ্ন সত্যি করার চেষ্টা। শুভমনের উত্থানের নেপথ্যে যেমন লখবিন্দর গিল, সরফরাজের জন্য যেমন নৌশাদ খান, অভিষেকের উত্থানে যেমন রাজকুমার শর্মা, তেমনই বৈভবের নেপথ্যে সঞ্জীব। ২০২০-২১ সালে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফিতে গাব্বায় শুভমন ৯১ রান যে দিন করেছিলেন, তার পরের দিন একটি খবর মন দিয়ে পড়েছিলেন সঞ্জীব। শুভমনের উত্থানের নেপথ্যে তাঁর বাবা লখবিন্দরের অবদান নিয়ে লেখা ছিল সেই প্রতিবেদন। সেখানে বলা ছিল, কী ভাবে পাঞ্জাবের ফাজিলকায় নিজের বাড়িতে শুভমনের জন্য সিমেন্টের একটি পিচ বানিয়ে দিয়েছিলেন। বিষয়টি মনে ধরেছিল সঞ্জীবের। তিনিও নিজের বাড়ির উঠোনে একটি পিচ বানিয়ে ফেলেন। সেখানেই অনুশীলন করে বেড়ে উঠেছে বৈভব। ক্রিকেটজীবন ছোট হলেও বৈভব ইতিমধ্যেই ভিভিএস লক্ষ্মণের সঙ্গে জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে সময় কাটিয়েছে। সান্নিধ্য রাহুল দ্রাবিড়ের। লক্ষ্মণই বৈভবকে নেওয়ার জন্য রাজস্থানের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। সঞ্জীবের কথায়, “লক্ষ্মণ স্যর গত দু’বছর খুব কাছ থেকে বৈভবের উন্নতি লক্ষ করেছেন। এখন দ্রাবিড় স্যর ওকে নিজে থেকে দেখছেন।” শতরান করে ছলছল চোখে বাবাকে ফোন, মায়ের দিনে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর কথা মনে পড়ছে বৈভবের গত বছর মহানিলামে বৈভবকে নেওয়ার জন্য এক কোটি টাকারও বেশি খরচ করতে পিছপা হয়নি রাজস্থান। সঞ্জীব সব কৃতিত্ব দিয়েছেন সেই দলটিকেই। বলেছেন, “এটা ঠিক যে বৈভব প্রচুর পরিশ্রম করেছে। তবে রাজস্থান রয়্যালসের দল পরিচালন সমিতিকে বেশি কৃতিত্ব দেওয়া দরকার। গত তিন-চার মাসে রাহুল দ্রাবিড়, বিক্রম রাঠৌর এবং জুবিন ভারুচা ওকে নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছেন। এখন ও তার ফসল পাচ্ছে।” ম্যাচের পর বৈভবকে বিশেষ প্রতিভা বলে বর্ণনা করে বিক্রম রাঠৌর বলেন, “দারুণ একটা প্রতিভা। ব্যাট যে ভাবে নীচের দিকে নামায় সেটা অসাধারণ। এই জন্যেই ওর শটে এত জোর। আজ সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে ও কতটা ভাল। ওকে নিয়ে একটানা কথা বলা যায়।”

বিষ্ময় কাটছে না ক্রিকেট বিশ্বের। ১৪ বছরের একটা ছেলে আইপিএলের মতো মঞ্চে কী ভাবে এমন বিধ্বংসী ব্যাটিং করতে পারে! বিস্মিত নন শুধু এক জন। তিনি সূর্যবংশীর ছোটবেলার কোচ মণীশ ওঝা। নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন রাজস্থান রয়্যালসের ব্যাটারকে। তিনি জানেন তাঁর ছাত্র ব্যাট হাতে পেলে কী করতে পারে। ১০ বছর বয়স থেকেই ৯০ মিটার দূরত্বের ছয় মারতে পারে সূর্যবংশী। ছাত্রের শতরানে উচ্ছ্বসিত হলেও বিস্মিত নন মণীশ। বিশ্বের কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসাবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সূর্যবংশী শতরান করার পরের দিন গর্বিত মণীশ বলেছেন, ‘‘ক্রিকেটের জন্য এক দিনও সূর্যবংশীকে বকাঝকা করতে হয়নি আমায়। কোন শট বা টেকনিক ওকে দ্বিতীয় বার বোঝাতে হয়নি। এক বারে শিখে নিত ছোট থেকে। ছাত্র হিসাবে অসম্ভব ভাল সূর্যবংশী। ২০১৮ সালে ওকে প্রথম দেখি। প্রথম দিন বাবার সঙ্গে কোচিং ক্যাম্পে এসেছিল। সে দিন আমি ছিলাম না। তাই দেখা হয়নি। তার এক সপ্তাহ পর দেখা হয়েছিল। ওর বাবা আমার ফোন নম্বর জোগাড় করেছিলেন। আমাকে ফোন করেন। ফোনে কথা হওয়ার পর আসতে বলেছিলাম। এটা অসম্ভব কিছু নয়। পাওয়ার হিটিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আত্মবিশ্বাস। নিজের স্বচ্ছন্দ অনুযায়ী খেলতে হয়। ছোট থেকে ওকে ফুলটস বলে অনুশীলন করাতাম। ছোট বেলায় বোলিং মেশিনের বল খেলতে পারত না। বলের গতি সামলাতে পারত না। তা ছাড়া বল পিচে পড়ে ওর মাথার উপর দিয়ে চলে যেত। তাই ফুলটস বলে অনুশীলন করাতাম। জোর দিতাম শটের টাইমিং এবং টেকনিকের উপর। সাধারণত ওকে ব্যাট একটু উঁচুতে তুলে ধরতে বলতাম। বলের লাইনে গিয়ে খেলতে বলতাম। যতটা জোরে সম্ভব বল মারার কথা বলতাম। ক্রিকেটের সব ধরনের শট ওকে শেখাতাম। কাট, পুল, ব্যাট-ফুট পাঞ্চ মারা যেমন শিখিয়েছি, তেমনই বল ছাড়তেও শিখিয়েছি। হাত খুলে ব্যাট করতে বলতাম। লক্ষ্য করলে দেখবেন, ব্যাট করার সময় সূর্যবংশীর হাতের অবস্থান অনেকটা অভিষেক শর্মা বা যুবরাজ সিংহের মতো থাকে। প্রথম থেকেই দিনে ৩৫০ থেকে ৪০০ বল খেলত সূর্যবংশী। বোলিং মেশিন থেকে এমন ভাবে বল দেওয়া হত, যাতে ওকে সব ধরনের শট মারতে হয়। সামনের এবং পিছনের পায়ে খেলতে হয়। কয়েকটা বল অন্তর অন্তর ফিল্ডিং বদলে দিতাম। নানা রকম ফিল্ডিং সাজাতাম। মাঠের কোন জায়গায় শট মারা যাবে না বলে দিতাম। তুলে মারতে বলতাম ফিল্ডারদের এড়ানোর জন্য। ছোট থেকেই ৯০ মিটার দূরত্বের ছয় মারতে পারত। তখন ওর বয়স বছর দশেক হবে। ম্যাচের আগের দিন সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ আমাকে ফোন করেছিল সূর্যবংশী। ওকে বলেছিলাম, তোকে পাওয়ার প্লে নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি ওভারে একই ভাবে খেলার চেষ্টা করতে হবে। বল ঠিক ভাবে মারতে পারলে, মাঠের বাইরে যাবেই। চাপ নেওয়ার কিছু নেই। ধৈর্য্য ধরতে হবে। মারার বলের জন্য অপেক্ষা করবি। যে বলের যেমন পরিণতি হওয়া উচিত, সেটাই করার চেষ্টা করবি। নিজের স্বাভাবিক আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের উপর আস্থা রাখবি।’’

১৪ বছরের কিশোরের কারিগর খুশি মনীষ আরও ভাল কিছুর আশায় রয়েছেন। জয়পুরের মাঠে বৈভব সূর্যবংশী শতরান করতেই উঠে দাঁড়ান রাহুল দ্রাবিড়। আইপিএলের শুরুর আগে পায়ে চোট পেয়েছিলেন রাজস্থান রয়্যালসের কোচ। হুইলচেয়ারে করেই মাঠে ঘুরতে দেখা যেত। বৈভব শতরান করার পর উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিলেন। দাঁড়ানোর সময় একটু হোঁচট খেয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রের সাফল্যের পর আর বসে থাকতে পারেননি। ১৪ বছর ৩২ দিনের একটি ছেলের পক্ষে কী ভাবে এমন বোলারদের শাসন করা সম্ভব! বৈভব বাস্তবে করে দেখাল। এর নেপথ্যে রয়েছেন রাহুল দ্রাবিড় এবং ভিভিএস লক্ষ্মণ। অনূর্ধ্ব-১৯ ভারতীয় দলের হয়ে খেলেছিল বৈভব। সেই দলের কোচ ছিলেন ভিভিএস লক্ষ্মণ। একটি ম্যাচে ৩৬ রান করে আউট হয়ে যায়। কেঁদে ফেলেছিল সাজঘরে ফিরে। বৈভবের কোচ মনোজ ওঝা বলেন, “একটা ম্যাচে বৈভব ৩৬ রানে আউট হয়ে গিয়েছিল। সাজঘরে ফিরে কাঁদতে শুরু করে দেয়। লক্ষ্মণ সেটা দেখতে পেয়েছিলেন। উনি এসে বৈভবকে বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে শুধু রান দেখি না। আমরা দেখি কোন কোন ক্রিকেটার বড় রান করতে পারে।’ লক্ষ্মণ ওর মধ্যে কিছু একটা দেখেছিলেন। সেই কারণে বিসিসিআই-ও বৈভবের পাশে থেকেছে।”

দ্রাবিড় বলেছিলেন, “খুব ভাল অনুশীলন করছে। দুর্দান্ত প্রতিভা। আমরা ওকে তৈরি করছি। দলের সকলের সঙ্গে অনুশীলন করে অভ্যস্ত হোক। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিক। এগুলো বৈভবের জন্য একটা অভিজ্ঞতা। হঠাৎ দর্শকদের সামনে ফেলে দেওয়ার আগে ওকে তৈরি করা প্রয়োজন। সুযোগ পেলে ও যাতে ভয় না পেয়ে যায়।” বৈভব সৌভাগ্যবান। জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভিভিএস লক্ষ্মণের অধীনে কাজ করার সুযোগ পেয়ে এবং রাজস্থান রয়্যালসে রাহুল দ্রাবিড়ের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের সুযোগ পেয়ে। লক্ষ্মণই প্রথম রাহুল দ্রাবিড়কে বৈভবের নাম সুপারিশ করেছিলেন। ১৪ বছর বয়সে বৈভব সূর্যবংশী আইপিএলে শতরান করা সবচেয়ে কনিষ্ঠ ক্রিকেটার। জয়পুরে গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে মাত্র ৩৫ বলে শতরান করে তিনি আইপিএলের ইতিহাসে দ্রুততম ভারতীয় সেঞ্চুরিয়ান হয়েছেন। সমস্তিপুরে বৈভবের কাকা রাজীব কুমার সূর্যবংশী বলেন, ‘ও যা করেছে, তা আইপিএলের ইতিহাসে অত্যন্ত গৌরবজনক ও অসাধারণ। এটি আমাদের এলাকার ও বিহারবাসীর জন্য গর্বের ও সম্মানের বিষয়… ও ভবিষ্যতে আরও সাফল্য অর্জন করবে। এটি আমাদের জন্য বিশাল সম্মানের ব্যাপার।’
আইপিএল ২০২৫-এর ৪৭তম ম্যাচ। স্মরণীয় ক্রিকেট দুনিয়ার কাছে। ১৪ বছর বয়সি বৈভব সূর্যবংশী রেকর্ড বইয়ে ঝড়। নজরকাড়া ইনিংসে যেসব রেকর্ড গড়েছেন বা ভেঙেছেন।
১) ৩৫ বলে শতরান সূর্যবংশীর, আইপিএল ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম। ক্রিস গেইলের ২০১৩ সালে পুণের বিরুদ্ধে ৩০ বলে শতরানই আগে রয়েছে। এই শতরান ভেঙে দিল ইউসুফ পাঠানের ৩৭ বল, ২০১০ দ্রুততম ভারতীয় শতরানের রেকর্ড। কোনও ভারতীয় ক্রিকেটারের এটাই দ্রুততম শতরানের রেকর্ড।
আইপিএলের দ্রুততম শতরান:
ক্রিস গেইল ৩০ বলে ২০১৩ সালে শতরান
বৈভব সূর্যবংশী ৩৫ বলে জয়পুর শতরান ২০২৫
ইউসুফ পাঠান ৩৭ রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে মুম্বই ইন্ডিয়ানস বিরুদ্ধে ২০১০ সালে শতরান
২) ১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে শতরান করে সূর্যবংশী পেশাদার ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান। রেকর্ড ছিল বিজয় জোলের ১৮ বছর ১১৮ দিন, ২০১৮ সালে। সর্বকনিষ্ঠ টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরিয়ান বৈভব সূর্যবংশী ১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে শতরান। বিজয় জোল ১৮ বছর ১১৮ দিন ১০৯ মহারাষ্ট্র মুম্বই ২০১৮ সালে করেছিলেন।
৩) ৩ ইনিংসের মধ্যেই শতরান করে বৈভব গড়লেন দ্রুততম ভারতীয় সেঞ্চুরির রেকর্ড। রেকর্ড ছিল মনীশ পান্ডে, পল ভলথাটি এবং প্রিয়াংশ আর্যর ৪ ইনিংসে।
৪) ১৭ বলে ফিফটি করে আইপিএলে কোনও আনক্যাপড ভারতীয় ব্যাটারের দ্রুততম প্রথম ফিফটির রেকর্ডও গড়েন। আগে ছিল যশস্বী জসওয়ালের ১৯ বলে।
৫) ১১টি ছক্কা হাঁকিয়ে এক ইনিংসে কোনও ভারতীয় ব্যাটারের সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডে যৌথভাবে জায়গা করে নেন মুরলি বিজয়ের সঙ্গে। মুরলি বিজয় ১১ ছক্কা মেরে ১২৭ রান করেছিলেন ৫৬ বলে, ২০১০ সালে
বৈভব সূর্যবংশী ১১ ছক্কা হাঁকিয়ে ১০১ রান করেন ৩৮ বলে, ২০২৫ সালে।
৬) ৯৩.০৬% রান বাউন্ডারি থেকে। আইপিএলে শতরানের মধ্যে সর্বোচ্চ শতাংশে ৭ চার, ১১ ছক্কায় ৯৪ রান
৭) ৩০ রান দেওয়া কারিম জানাতের প্রথম ওভার আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রথম ওভার।
৮) ৮৭/০ পাওয়ার প্লেতে, রাজস্থান রয়্যালসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পাওয়ার প্লে স্কোর।
৯) ১৬৬ রানের ওপেনিং জুটি বৈভব সূর্যবংশী ও যশস্বী জসওয়ালের, যা রাজস্থান রয়্যালসের ইতিহাসে যে কোনও উইকেটে সর্বোচ্চ পার্টনারশিপ। যশস্বী-সূর্যবংশী ওপেনিং জুটিতে আসে ১৬৬ রান ১১.৫ ওভারে।
১০) ২৫ বল হাতে রেখে ২০০+ রান তাড়া, আইপিএলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বল হাতে রেখে সফল রান তাড়া করার রেকর্ড।

অবিস্মরণীয় শতরান করে বৈভবের আত্মবিশ্বাসে স্পষ্ট, ‘দারুণ অনুভূতি। আইপিএলে এটা আমার প্রথম শতরান এবং এটা আমার তৃতীয় ইনিংস। গত তিন-চার মাস ধরে যেটার জন্য অনুশীলন করছিলাম, তারই ফল পাচ্ছি। আমি শুধু বল দেখি আর খেলি। জয়সওয়ালের সঙ্গে ব্যাটিং করতে আমার ভাল লাগে। আইপিএলে শতরান করাটা আমার কাছে স্বপ্ন। কোনও বোলারকেই আমি ভয় পাই না। আমি শুধু নিজের খেলায় মন দিই’।




