RK NEWZ পুরীর মন্দিরে প্রতি দিনই জগন্নাথদেবকে ছাপ্পান্ন ভোগ নিবেদন করা হয়। তবু রথযাত্রা উপলক্ষে ভোগের আয়োজনে থাকে বিশেষ আড়ম্বর। ভোগ রান্নার পুরো আয়োজনটাই হয় মন্দিরের বিরাট হেঁশেলে। প্রায় ৪৪,০০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে তৈরি এই হেঁশেল। এই হেঁশেলকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রান্নাঘরও বলা হয়ে থাকে। আষাঢ়ের শুক্লা দ্বাদশীর দিন জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান। ওই দিন দেশ জুড়ে ঘটা করে পালিত হয় রথযাত্রা। সাত দিন মাসির বাড়িতে কাটিয়ে আবার ঘরে ফেরেন ত্রয়ী। রথযাত্রা উপলক্ষে বিপুল জনসমাগম হয় শ্রীক্ষেত্র পুরীতে। রথের দিন প্রায় ১ লক্ষ দর্শনার্থীর জন্য প্রসাদ তৈরি করা হয় মন্দিরের হেঁশেলে। যদিও মন্দিরে প্রতি দিনই জগন্নাথদেবকে ছাপ্পান্ন ভোগ নিবেদন করা হয়। তবু রথযাত্রা উপলক্ষে ভোগের আয়োজনে থাকে বিশেষ আড়ম্বর। ভোগ রান্নার পুরো আয়োজনটাই হয় মন্দিরের বিরাট হেঁশেলে। প্রায় ৪৪, ০০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে তৈরি এই হেঁশেল। এই হেঁশেলকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রান্নাঘরও বলা হয়ে থাকে। কথিত আছে, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদের এমনই মহিমা যে, কোনও দিন সেখানে প্রসাদ বাড়তিও হয় না, আবার কমও পড়ে না।

মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রোসাঘরের অবস্থান। হেঁশেলে ভোগ তৈরির কাজ করেন প্রায় ৬০০ জন রাঁধুনি ও তাঁদের সাহায্যের জন্য থাকেন প্রায় ৪০০ জন সেবক। হেঁশেলের রাঁধুনিরা বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন। কথিত আছে যে, স্বয়ং দেবী মহালক্ষ্মী ছদ্মবেশে জগন্নাথদেবের জন্য রান্নাঘরে প্রবেশ করেন এবং অত্যন্ত পবিত্র উপায়ে চারটি বিশেষ পদের—ভীম পাক, নল পাক, সৌর পাক ও গৌরী পাক রান্না করেন। রোসাঘরের রাঁধুনিদের মা লক্ষ্মীর প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হয়। দেবী দক্ষিণাকালী নাকি এই রান্নাঘরের তত্ত্বাবধান ও সুরক্ষার দায়িত্বে থাকেন, এমন কথাও প্রলিত আছে। কেবল সুয়ারা (সেবক), মহাসুয়ারা (মূল রাঁধুনি) এবং পান্ডাদেরই রান্নাঘরে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। রাঁধুনিরা দক্ষিণাকালীর পুজো সেরে কপালে তিলক কেটেই রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। রান্নাঘরে প্রবেশের আগে ভগবান গণেশের কাছে প্রার্থনা করেন, যাতে জগন্নাথদেবের নৈবেদ্য প্রস্তুতির কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। তার পরেই শুরু হয় রান্নার প্রস্তুতি। হেঁশেলে ঢোকার আগে রাঁধুনিদের বেশ কিছু নিয়ম মানতে হয়। স্নান করে ধোয়া-পরিষ্কার কাপড় পরেই হেঁশেলে ঢুকতে হবে। হেঁশেলের রাঁধুনিদের গোঁফ-দাড়ি রাখার নিয়ম নেই। তাঁরা হাতে লোহার আংটি বা কোনও রকম সুতো পরতে পারবেন না। তাঁদের তামাক বা পান খাওয়াও বারণ। রান্নার সময় কোনও রকম কথা বলাও যাবে না। মুখে কাপড় বেঁধেই রান্না করার নিয়ম পুরীর হেঁশেলে।

রামের নামের খিচুড়ি খান কেউ, কেউ বা মেশান দুধ, তেঁতুলও! দেশ জুড়ে ‘অদ্ভুত’ সব খিচুড়ির গল্প। প্রতি দিন মহাপ্রভুর দিনের শেষ ভোগটি নিবেদনের পর, তিন শ্রেণির সেবক—ধ্রুব পকাল, গোবর পানিয়া ও রাবড়িয়া—রন্ধনশালায় প্রবেশ করেন এবং রান্নাঘরের অবশিষ্ট সমস্ত উপকরণ (যেমন—জল, নুন, হলুদ, চাল ইত্যাদি) সরিয়ে ফেলেন। ব্যবহৃত পাত্রগুলিকেও ভেঙে ফেলা হয় হয় সঙ্গে সঙ্গে। এর পর পুরো রান্নাঘরটি জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। সমস্ত উনুন জল দিয়ে ধোয়ার পর সেগুলিতে নতুন গোবর লেপে দেওয়া হয়। প্রতি দিন মহাপ্রভুর দিনের শেষ ভোগটি নিবেদনের পর, তিন শ্রেণির সেবক—ধ্রুব পকাল, গোবর পানিয়া ও রাবড়িয়া—রন্ধনশালায় প্রবেশ করেন এবং রান্নাঘরের অবশিষ্ট সমস্ত উপকরণ (যেমন—জল, নুন, হলুদ, চাল ইত্যাদি) সরিয়ে ফেলেন। ব্যবহৃত পাত্রগুলিকেও ভেঙে ফেলা হয় হয় সঙ্গে সঙ্গে। এর পর পুরো রান্নাঘরটি জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। সমস্ত উনুন জল দিয়ে ধোয়ার পর সেগুলিতে নতুন গোবর লেপে দেওয়া হয়। সকালে মঙ্গলারতি, অবকাশ ও বেশ-এর পর পান্ডাকে জানানো হয় যে রান্নাঘর পরিষ্কার এবং তাঁরা ‘রোসহোম’ (রান্নাঘরের পবিত্র অগ্নি প্রজ্জ্বলন) শুরু করতে পারেন। হোমের জন্য আগের দিনের উনুনের আগুনই ব্যবহার করা হয়। হোম সম্পন্ন হওয়ার পর, সকাল ৮টা থেকে ৮টা ৩০-এর মধ্যে চাল ধোয়া ও সব্জি কাটার মতো রান্নার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রান্না শুরু হয়। মোট তিন ধরনের মহাপ্রসাদ তৈরি হয় পুরীর মন্দিরের রোসাঘরে। শঙ্খুড়ি বা অবাধ মহাপ্রসাদের অন্তর্ভুক্ত পদগুলির মধ্যে রয়েছে ভাত, ঘি-ভাত ও মিশ্র ভাত এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল, নানা রকমের শাকের পদ, তরকারি আর পায়েস। নিশাঙ্খুড়ি বা শুকনো মহাপ্রসাদের তালিকায় রয়েছে শুকনো মিষ্টি, যেমন খাজা, গজা, লাড্ডু, মিষ্টি চাকুলি, পুলি, নাড়ু, মনোহরা, ঝিল্লি, বল্লভা, মালপোয়া ইত্যাদি। রথযাত্রায় যখন দেবতারা রথে থাকেন তখন শুধুমাত্র নিসঙ্খুড়ি ভোগ প্রভুদের দেওয়া হয় এবং কোনও ভাত বা শঙ্খুড়ি মহাপ্রসাদ দেওয়া হয় না। শঙ্খুড়ি ও নিশাঙ্খুড়ি মহাপ্রসাদ ছাড়াও, এক বিশেষ ধরণের শুষ্ক মহাপ্রসাদ রয়েছে, যা ‘নির্মাল্য’ নামে পরিচিত। আধ্যাত্মিক গুরুত্বের বিচারে নির্মাল্য মহাপ্রসাদের মতোই সমান তাৎপর্যপূর্ণ।

সাধারণত নির্মাল্য বলতে শুকনো ভাত বা অন্নকেই বোঝায়। বিশেষ নির্ধারিত স্থানে কড়া রোদে শুকিয়ে নেওয়া রান্না করা চাল বা ভাত। এর পর এটি ছোট কাপড়ের থলিতে ভরে রাখা হয়। শাঙ্খুড়ি বা সুখিলা মহাপ্রসাদ হাতের কাছে না থাকলে নির্মাল্যকেই সমমর্যাদা দেওয়া হয়। পুরীর জগন্নাথের মন্দিরে কোনও প্রকারের ধাতব বাসনপত্র ব্যবহৃত হয় না। পুরো ভোগটাই বানানো হয় মাটির পাত্রে। এই হেঁশেলে কোনও পুরনো পাত্রে রান্না করা হয় না, প্রতি দিন নতুন নতুন পাত্রেই রান্না হয়। মন্দিরের রান্নাঘরে খাবার রান্নার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মহাপ্রসাদ বিক্রি ও বিতরণের জন্য বিভিন্ন ধরন ও আকারের মাটির পাত্র ব্যবহার করা হয়। পুরীর মন্দিরে সেবকদের যে ৩৬টি শ্রেণি রয়েছে, তাদের মধ্যে ‘কুম্ভকার’ বা মৃৎশিল্পীদের একটি গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মূল কাজই হল বিভিন্ন মাপের মৃৎপাত্ তৈরি করা। এই কাজের জন্য তাঁদের নামে ১৪৩ একর জমিও বরাদ্দ রয়েছে। পাত্র তৈরির বিনিময়ে তাঁরা ‘খেয়ি’ বা একবেলার আহার পেয়ে থাকেন। কুমোররা মাটির পাত্রগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করেন। যে পাত্রগুলিতে বেশি সময় ধরে রান্না করা হবে, সেগুলিকে কালো রং করা হয়। আর অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে যে সব পাত্রে রান্না করা হয়, সেগুলিকে লাল রং করা হয়। এই সব পাত্রে ভোগ তৈরি হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। উনুনের মুখে সবচেয়ে বড় মাটির পাত্রে অন্ন বসানো হয়। তার উপরে সাত থেকে ন’টা পর্যন্ত ক্রমশ ছোট হতে থাকা পাত্রে খিচুড়ি, পায়েস রান্না হয়। একেবারে নীচের পাত্র থেকে ওঠা বাষ্পের ভাপে রান্না হয় উপরের পাত্রগুলিতে থাকা খিচুড়ি, পোলাও। রান্নার এক বার উনুনে বসানো হলে আর নাড়াচাড়া করা হয় না। বিস্ময়কর ভাবে, সবার আগে সবচেয়ে উপরে থাকা পাত্রটির রান্না শেষ হয়। তার পরে রান্না শেষ হয় তার ঠিক নীচে থাকা পাত্রটির। এ ভাবে সব শেষে সুসিদ্ধ হয় উনুনের উপরে রাখা শেষ হাঁড়ির ভোগ। মন্দিরের হেঁশেলে তিন ধরনের উনুন বা চুল্লি রয়েছে। ভাত বা অন্ন চুল্লি, পিঠা চুল্লি এবং অহিআ চুল্লি। মোট ৭৫২টি উনুন আছে। ভাত বা অন্ন চুল্লিটি দেখতে অনেকটা প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের মতো, আকারে বেশ বড়। এই উনুনের উপরেই একের পর এক হাঁড়ি বসিয়ে অন্ন প্রসাদ তৈরি করা হয়। পিঠা চুল্লিটি দেখতে অনেকটা উল্টোনো পদ্মফুলের মতো। এই উনুনে মূলত মিষ্টির পদগুলি তৈরি করা হয়। এবং অহিআ চুল্লিতে ডাল, তরকারি এবং অন্যান্য ব্যঞ্জন তৈরি করা হয়। রন্ধনশালার চত্বরে দু’টি কুয়ো আছে, যাদের নাম গঙ্গা ও যমুনা। কুয়োগুলির ব্যাস ১০ ফুট, গভীরতা প্রায় ১০০ ফুট। এই কুয়ো দু’টির জল ব্যবহার করেই ভোগ রান্নার কাজ করা হয়। জগন্নাথদেবের রান্নাঘরে আলু, টম্যাটো, সজনে ডাঁটা, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচালঙ্কা, শুকনো লঙ্কা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, করলা এবং ক্যাপসিকাম ব্যবহার কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে আনন্দবাজার। জগন্নাথদেবের রান্নাঘরে রান্না হওয়া প্রসাদ ভোগ মণ্ডপ থেকে চলে আসে আনন্দবাজারে। দিনে লক্ষ লক্ষ টাকার প্রসাদ বিক্রি হয় সেখান থেকে। পাল্টে যান জগন্নাথদেবের মন্দিরের রাঁধুনিরা। পাল্টায় না শুধু জগন্নাথ মন্দিরের রন্ধনশালায় তৈরি হওয়া ভোগের স্বর্গীয় স্বাদ। কী ভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রসাদের স্স্বাদ এক থাকে, তা অবাক করে ভক্তদের।




