RK NEWZ লালবাজারের তরফে জানানো হয়েছে, ধর্মতলার মতো ব্যস্ত জায়গায় কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হবে না। ২১ জুলাই ধর্মতলায় ‘শহিদ দিবসের’ কর্মসূচি করতে চেয়ে পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়েছিল তৃণমূলের দুই শিবিরই। ২১ জুলাই ধর্মতলায় সভা করা যাবে না। কালীঘাট এবং ঋতব্রত— দুই তৃণমূলকেই জানিয়ে দিল কলকাতা পুলিশ। লালবাজারের তরফে জানানো হয়েছে, ধর্মতলার মতো ব্যস্ত জায়গায় রাস্তা আটকে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি করা যাবে না। প্রসঙ্গত, ২১ জুলাই ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ‘শহিদ দিবসের’ কর্মসূচি পালন করতে চেয়ে পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়েছিল তৃণমূলের দুই শিবিরই। পুলিশ অনুমতি দেওয়ার আগেই রবিবার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ফিতে নিয়ে মাপজোক করতে দেখা গিয়েছিল কালীঘাট তৃণমূলের কুণাল ঘোষ, দোলা সেনদের। বিষয়টি নিয়ে সোমবার বিধানসভায় ক্ষোভপ্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কুণালদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘ফিতে নিয়ে মাপতে চলে গিয়েছেন! কোথায় (সভা) করবেন বলে দেব।’’ একই সঙ্গে তাঁর খোঁচা, ‘‘আপনাদের সভায় অনেক লোক হবে। লক্ষ লক্ষ। ব্রিগেডে চলে যান! গিয়েছিলেন তো এক বার!’’ মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্যের পরেই রাস্তায় যানচলাচলে বাধা দিয়ে মাপজোক করার অভিযোগে দোলা, কুণালদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। তার পরের দিনই ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের সভা করা যাবে না বলে জানিয়ে দিল লালবাজার।
এই প্রসঙ্গে কালীঘাট তৃণমূলের তরফে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী বলেন, “এখনও পুলিশের তরফে কোনও চিঠি আমরা পাইনি। তাই এখনই এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করব না।” ঋতব্রত শিবিরের তরফে পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক তথা মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, “আমরা আমাদের শহিদ দিবস পালন করবই। তা কখনও মানুষের কোনও অসুবিধা করে হবে না। আমরা সবাই মিলে বসে এই কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।” দল যখন ভেঙে টুকরো টুকরো, সেই অবস্থায় এই বছর আদৌ ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস পালন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল তৃণমূলের অন্দরে। তবে বৃহস্পতিবার সেই সংশয় দূর করে ধর্মতলায় অন্যান্য বছরের জায়গায় জমায়েত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বিরোধী দল থাকার সময় থেকেই ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে শহিদ দিবস পালন করা তৃণমূলের রেওয়াজ। গত বৃহস্পতিবার কুণাল ঘোষের উদ্যোগে উত্তর কলকাতা তৃণমূল রামমোহন হলে এক কর্মসূচির আয়োজন করে। সেই সভায় কুণালের ফোন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য লাউড স্পিকারে শোনানো হয়। সেখানেই মমতা বলেন, ‘‘২১ জুলাই আশা করি অনুমতি পাব। আমরা একটা দিনই মিটিং করি। সে দিন বিস্তারিত বলব। পাঁচ জন কর্মী থাকলেও সেই মিটিংয়ে থাকব। আপনারা ওই দিন সমবেত হোন।’’ তার দু’দিন পরেই কলকাতা পুলিশের কাছে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা করার অনুমতি চায় কালীঘাটপন্থী তৃণমূল। নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করে ওই জায়গায় সভা করার অনুমতি চায় ঋতব্রত তৃণমূলও। কয়েক বছর বাদ দিলে গত ৩৩ বছর ধরে ধর্মতলাতেই ২১ জুলাইয়ের সভা করে এসেছেন মমতা। ২০১১ সালে ব্রিগেড ময়দানে ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি হয়েছিল। ২০১৩ সালে এবং কোভিডের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালেও ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের সভা করেনি তৃণমূল।
১৯৯৩ সালে যুব কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন মমতা। তার বছর দুয়েক আগে বিপুল সমর্থন নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরে তৎকালীন বাম সরকার। রাজ্যে তখন বিরোধী দলের ভূমিকায় কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ ছিল, কারচুপি করে ভোটে জিতেছে সিপিএম। তাই সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানের ডাক দেন তৎকালীন যুব কংগ্রেসের সভাপতি মমতা। ওই দিন সকাল ১০টা থেকে মহাকরণ অভিমুখী জমায়েত শুরু হয়। মহাকরণ ঘিরে পাঁচটি এলাকা দিয়ে এগোতে থাকেন যুব কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকরা। তাঁদের সঙ্গে রাস্তায় নামেন মমতা নিজেও। বিভিন্ন মিছিলে ছিলেন সৌগত রায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, মদন মিত্র, অধুনাপ্রয়াত পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়েরা। কিন্তু মহাকরণে পৌঁছনোর আগে পাঁচ দিক থেকে ব্যারিকেড করে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। তাতেই ধুন্ধুমার শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে যায় যুব কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের। পুলিশকে লক্ষ্য করে শুরু হয় ইট-পাথরবৃষ্টি। বিক্ষোভকারীদের হটাতে পাল্টা কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ।
সব মিলিয়ে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ব্রেবোর্ন রোডে ধাক্কাধাক্কি এবং কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন মমতা। তাঁর নিরাপত্তারক্ষী সার্ভিস রিভলভার উঁচিয়ে পুলিশের মোকাবিলায় এগিয়ে যান। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয় মেয়ো রোড-রেড রোডের মোড়ে। বোমাও পড়ে। সেই উত্তেজনার আঁচ ছড়িয়ে পড়ে গোটা মধ্য কলকাতায়। রেড রোডে পুলিশের ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একটি লরিকে ঢাল করে এগোতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। বিক্ষোভকারীদের তাড়া খেয়ে পুলিশের পদস্থ অফিসারেরা পালাতে থাকেন। সেই অবস্থায় বিক্ষোভকারীদের দেখে মারমুখী হয়ে ওঠে পুলিশবাহিনী। গুলি চালাতে শুরু করে তারা। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৩ জন মারা গিয়েছেন। জখম বহু। তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘‘ওরা মহাকরণ দখল করতে আসছিল। পুলিশ গুলি চালিয়েছে।’’




