RK NEWZ আপাতত সিএবিতে সৌরভ রাজত্ব। দুর্নীতি, তোলাবাজি ও সিএবির ক্ষমতার অপব্যবহার। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বঙ্গ ক্রিকেটে দুর্নীতির অভিযোগ বারবার স্পষ্ট। একের পর এক ক্রিকেটারকে খেলার সুযোগ করে দিয়েছে সিএবি! অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে দলের জায়গা ‘বিক্রি’ হচ্ছিল। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। এই পন্থাতেই একের পর এক ক্রিকেটারকে খেলার সুযোগ করে দিয়েছে সিএবি! গত কয়েকদিন ধরেই কানাঘুষো চলছিল এই বিস্ফোরক অভিযোগ নিয়ে। টাকা নিয়ে ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। জড়িত খোদ সিএবি-র সদস্য! যিনি বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার কমিটি মেম্বারও। এ নিয়ে যাবতীয় নথি জমা করে সিএবি-তে অভিযোগ জানালেও লাভ হচ্ছে না। বরং তা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। তদন্তের গতিপ্রকৃতি, আদৌ কোনও অনুসন্ধানমূলক পদক্ষেপ করা হচ্ছে কি না, কিছুই জানাচ্ছে না সিএবি। এরকমই একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে এবার সরাসরি ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁকে চিঠি পাঠালেন আইনজীবী সায়ন্তন সিনহা। যা নিয়ে ফের তোলপাড় সিএবি। এবার সিএবির কমিটি মেম্বারের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর প্রমাণ-সহ অভিযোগ জমা পড়ল ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ’র কাছে। অভিযোগ, বিপুল অর্থের বিনিময়ে ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, সিএবির নাম না করে এই একই অভিযোগ তুলেছিলেন সিএবির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অভিষেক ডালমিয়াও। ক্রীড়ামন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন সায়ন্তন সিনহা নামে কলকাতা হাই কোর্টের এক আইনজীবী। জানিয়েছেন, গতবছর ১৪ আগস্ট এই একই মর্মে তিনি চিঠি দিয়েছিলেন সিএবি প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি-সহ একাধিক ব্যক্তিকে। সায়ন্তন অভিযোগ এনেছেন সিএবি সদস্য ‘মহারাজ ঘনিষ্ঠ’ অম্বরীশ মিত্রর বিরুদ্ধে। সংস্থার ক্রিকেটীয় কার্যকলাপের সঙ্গে অম্বরীশ যুক্ত। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে একের পর এক উঠতি ক্রিকেটারের থেকে টাকা আদায় করেছেন, এমনটাই অভিযোগ। টাকা আদায়ের প্রমাণ হিসাবে একাধিক স্ক্রিনশটও তুলে ধরেছেন সায়ন্তন। সেখানে অম্বরীশের সঙ্গে চ্যাটের স্ক্রিনশট রয়েছে। সেখানে সিএবি সদস্য সরাসরি আশ্বাস দিচ্ছেন, টাকা মিটিয়ে দিলেই ক্রিকেটারদের দল পাওয়া নিশ্চিত। মূলত জুনিয়র পর্যায়ের টুর্নামেন্টগুলিতে ক্রিকেটারদের সুযোগ করে দেওয়া হত অর্থের বিনিময়ে। কয়েক দফায় অনলাইনে এই টাকা পাঠানো হয়েছে অম্বরীশের অ্যাকাউন্টে, সেই প্রমাণও মিলেছে ওই স্ক্রিনশটগুলিতে। অন্তত কয়েক লক্ষ টাকার লেনদেনের প্রমাণ স্রেফ স্ক্রিনশটগুলিতেই রয়েছে। অভিযোগ দুর্নীতিবাজ অম্বরীশ বহাল তবিয়তে সিএবির যাবতীয় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যাবতীয় প্রমাণ তুলে ধরে সায়ন্তনের অভিযোগ, এমন বিস্ফোরক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অম্বরীশ বহাল তবিয়তে সিএবির যাবতীয় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বঙ্গ ক্রিকেট সংস্থায় চিঠি দিয়েও লাভ হয়নি। বাংলার ক্রীড়াক্ষেত্র থেকে দুর্নীতি মুছে ফেলার ডাক দিয়েছেন ক্রীড়ামন্ত্রী, সেই বিষয়টি উল্লেখ করেই চিঠি দিয়েছেন সায়ন্তন। তাঁর কথায়, অর্থের বিনিময়ে দলের জায়গা ‘বিক্রি’ হচ্ছিল। তার ফলে প্রকৃত সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। বাংলার ক্রিকেটে এই দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার আশায় চিঠি দিয়েছেন ওই আইনজীবী।

২৮ জুন, রবিবার দুপুরে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁকে লম্বা ই-মেল পাঠিয়েছেন আইনজীবী সায়ন্তন সিনহা। সায়ন্তন লিখেছেন, দুর্নীতি, তোলাবাজি ও সিএবির ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে। সায়ন্তন সিনহা লিখেছেন, ‘২০২৫ সালের ১৪ অগাস্ট আমি এ নিয়ে বিস্তারিত অভিযোগ সিএবি প্রেসিডেন্ট, সচিব, ওম্বাডসম্যান, এথিক্স অফিসার ও অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্যদের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অভিযোগের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন ভিজিল্যান্স কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদেরও প্রতিলিপি পাঠিয়েছিলাম।’ সায়ন্তন সিনহা লিখেছেন, ‘আমি অভিযোগ করেছিলাম সিএবি-র কমিটি সদস্য ও বিভিন্ন ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অম্বরীশ মিত্রর বিরুদ্ধে। তার কারণ, প্রকাশ্য মঞ্চে, বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে টাকা লেনদেনের নথি ও তথ্য ঘোরাফেরা করছিল। যা দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছিল সুযোগ করে দেওয়া, ক্লাব পাইয়ে দেওয়া, ম্যাচ খেলানো এবং নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে উঠতি ক্রিকেটার ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়েছে। আমি নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছিলাম এবং সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে সবরকম ক্রিকেটীয় কার্যকলাপ থেকে নির্বাসিত রাখার দাবি তুলেছিলাম।’ এরপরই সরাসরি সিএবি-কে কাঠগড়ায় তুলে ক্রীড়ামন্ত্রীকে আইনজীবী সায়ন্তন লিখেছেন, ‘কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০২৫ সালের ১৪ অগাস্টে সেই অভিযোগ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনও স্বাধীন তদন্ত, শৃঙ্খলাভঙ্গের পদক্ষেপ করার কথা কাউকে জানানো হয়নি। অম্বরীশ মিত্রও ক্রিকেটীয় কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্তই রয়েছেন। পুরস্কার বিতরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দলের ম্যানেজার হিসাবে এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে হেল্পলাইন খোলার একটি প্রস্তাব আপনাকে দেওয়া হয়েছে। সেটাকে স্বাগত জানাই।’ ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে সায়ন্তন আবেদন করেছেন, যেন তাঁর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিএবি কী পদক্ষেপ করেছিল, তা জানতে চাওয়া হয় ক্রীড়ামন্ত্রকের তরফে। সেই সঙ্গে যেন এটাও নিশ্চিত করা হয় যে, অভিযোগের প্রকৃত তদন্ত হয়েছে বা হচ্ছে। সায়ন্তনের পত্রবোমায় ময়দানে ফের শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ঘটনা হচ্ছে, গত বছর প্রথমে আইনজীবী সুমন কীর্তনিয়া অম্বরীশ মিত্রর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগপত্রের সঙ্গে বিভিন্ন অনলাইন ট্রানজাকশনের স্ক্রিনশট ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের প্রতিলিপি জমা দেওয়া হয়েছিল সিএবি-র ওম্বাডসম্যানের কাছে। যা নিয়ে সিএবি-র ওম্বাডসম্যান, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য শুনানিও করেন। পরে যদিও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন সুমন কীর্তনিয়া। অন্যদিকে, সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মহম্মদ আজহারউদ্দিন নামে জনৈক এক ব্যক্তি সিএবি-তে পাল্টা একটি চিঠি জমা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, অম্বরীশের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের যে স্ক্রিনশট জমা দেওয়া হয়েছে, সেটি তাঁর সঙ্গেই কথোপকথনের। সেই সঙ্গে আজহারউদ্দিন দাবি করেছিলেন, তিনি ও অম্বরীশ মিলে হাইকোর্ট ক্লাবের দলগঠন, ক্রিকেটারদের জার্সি সহ অন্যান্য ক্রিকেটীয় সরঞ্জাম কিনে দেওয়া ও খাবারের খরচ বাবদ বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুদান নিয়েছিলেন। অনৈতিক কিছু তাঁরা করেননি এবং সিএবি নির্বাচনের আবহে এটি নিয়ে জলঘোলা হচ্ছে। তবে ময়দানের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিল, হাইকোর্ট ক্লাবের দলগঠনের জন্য অনুদান নেওয়া হলে সেখানে অর্থের বিনিময়ে বাংলার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে কেন? ওম্বাডসম্যান যদিও কোনও পদক্ষেপ করেননি বলে অভিযোগ ওঠে। সুমন কীর্তনিয়া অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরই ফের একই অভিযোগ করেছিলেন সায়ন্তন। যা নিয়ে সিএবি কোনও পদক্ষেপই করেনি বলে বোমা ফাটান তিনি। সেই সময় সিএবি-র অ্যাপেক্স কমিটির সদস্য ছিলেন মহাদেব চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘গত বছর অ্যাপেক্স কমিটির বৈঠকে এই অভিযোগটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে তৎকালীন সিএবি সচিব নরেশ ওঝা বৈঠকে বলেছিলেন, রেলের কর্মী অম্বরীশের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করা হলে অভিযুক্তের চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে। যে কারণে আর এগনো হয়নি। আমাকেও পরে অ্যাপেক্স কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত বছর অম্বরীশের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ নিয়ে এটুকুই জানি।’ সিএবি-র কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাসের সাফাই, ‘এ ব্যাপারে এখনও কিছু জানি না। এটা তো ওম্বাডসম্যানের এক্তিয়ার। ক্রীড়ামন্ত্রী বা তাঁর দফতর থেকে কোনও চিঠি পাঠানো হলে তার জবাব নিশ্চয়ই দেবেন সিএবির ওম্বাডসম্যান।’ যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই ‘সৌরভের ছায়াসঙ্গী’ অম্বরীশ রেলের ক্লাব নেতাজি সুভাষ ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি হিসাবে সিএবিতে এসে সাফাই গাইতে শুরু করেন, ‘আমি সামান্য একজন সদস্য। প্রত্যেকবার সিএবি নির্বাচনের আবহে এরকম অভিযোগ উঠছে। গতবারও আমার বিরুদ্ধে ঠিক এজিএমের আগেই অভিযোগ করা হয়েছিল। এবারও সামনে যুগ্মসচিব নির্বাচন। তার আগে এরকম অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ক্রীড়ামন্ত্রীকে কী চিঠি দেওয়া হয়েছে আমি জানি না। তবে গতবার অভিযোগ ওঠার পর রেলের ভিজিল্যান্স থেকেও আমাকে ডেকে কথা বলা হয়েছিল। আমি সব তথ্য নথি দেখিয়েছিলাম। তারা ছাড়পত্র দেওয়ার জন্যই ফের সিএবি-তে প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছে। ফের ডাকা হলে যাব।’ ক্রীড়ামন্ত্রী এ নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করেন কি না, দেখার অপেক্ষায় ময়দান।




