RK NEWZ মুখ্যমন্ত্রী সাবধান করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদক্ষেপ! গ্রেফতার হলেন হুমায়ুন কবীরের ‘বিতর্কিত’ সভার তিন আয়োজক। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হুমায়ুনের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘যারা ওই সভায় আপনাকে ডেকেছিল, আগে তাদের তুলব।’ নির্দেশ দেওয়ামাত্রই পুলিশের অ্যাকশন! গত সপ্তাহে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের জনসভায় আমজনতা উন্নয়ন পার্টির একমাত্র বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের যে হুমকি ঘিরে তোলপাড় হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি, তাতে দ্রুত পদক্ষেপ করল পুলিশ। সোমবার দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী এনিয়ে বিধানসভায় বিবৃতি দেওয়ার পর রাতেই গ্রেপ্তার করা হল হুমায়ুনের ওই সভার আয়োজকদের। জানা গিয়েছে, রেজিনগর থানা এলাকা থেকে ধৃত দু’জন – আমিনুল শেখ ও গোলাম মোস্তাফা। ধৃতদের মধ্যে গোলাম মোস্তাফাই হুমায়ুনের ওই সভার জন্য রেজিনগর থানা থেকে অনুমতি চেয়েছিলেন। দু’জনকে আজ বহরমপুর জেলা আদালতে পেশ করা হবে। ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার অর্থাৎ ২৬ জুন। ওইদিন রেজিনগরের কাশীপুর এলাকায় আমজনতা উন্নয়ন পার্টি এক জনসভার আয়োজন করেছিল। সেই সভা থেকে প্রকাশ্যে দলের একমাত্র বিধায়ক হুমায়ুন কবীর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘‘বিজেপি জিতেছে, সরকার গড়েছে, ভালো কথা। কিন্তু মুর্শিদাবাদে হেরেও দু, একজন এমন আস্ফালন দেখাচ্ছেন যেন তাঁরাই বিধায়ক। আমি শুভেন্দু অধিকারীকে বলেছি, এই আস্ফালনটা কমান। আমি যখন মুসলমানদের জড়ো করে করে স্যাটাভাঙা মার শুরু করব না, বিজেপির পতাকা বওয়ার লোক থাকবে না। কেস দেবেন? ওরকম কেস আমাদের বিরুদ্ধে ঢের আছে।” হুমায়ুনের এহেন মন্তব্য ঘিরে তুমুল শোরগোলের মাঝেই সোমবার বিধানসভা এনিয়ে রীতিমতো কড়া বিবৃতি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। হুমায়ুনকে শেষ হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি সাফ জানিয়েছিলেন, ‘‘এনাফ ইজ এনাফ। যারা ওই সভায় আপনাকে ডেকেছিল, আগে তাদের তুলব। তারপর আপনার কাছে যাব। আর এটাই আপনার শেষ বক্তব্য। এভাবে আপনাকে বেপরোয়া মন্তব্য আর করতে দেব না, দেব না, দেব না।” তাঁর সেই হুঁশিয়ারির কয়েকঘণ্টা কাটতে না কাটতেই অ্যাকশনে নেমে পুলিশ সভার আয়োজক হিসেবে ২ জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত আমিনুল শেখের বাড়ি রেজিনগরের লোকনাথপুর গ্রাম। আর মূল উদ্যোক্তা গোলাম মোস্তাফা কাশীপুর এলাকা অর্থাৎ যেখানে ওইদিন সভার আয়োজন হয়েছিল, সেখানকারই বাসিন্দা। তিনি মূলত দলীয় সভার আয়োজনের জন্য পুলিশের অনুমতি চেয়েছিলেন। আর সেই সভাতেই দলের একমাত্র বিধায়ক উসকানিমূলক বক্তব্য রাখেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুঁশিয়ারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পদক্ষেপ করল পুলিশ। গ্রেফতার করা হল নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের ‘বিতর্কিত’ সভার তিন আয়োজককে। ধৃতদের নাম গোলাম মোস্তাফা, মোহাম্মদ আমিনুক হক এবং আনিসুর রহমান। সোমবার রাতেই দুই পৃথক অভিযানে তাঁদের পাকড়াও করে পুলিশ। মুর্শিদাবাদের রেজিনগর এবং শক্তিপুরে সভা করেন আমজনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)-র বিধায়ক হুমায়ুন। সেখানে বক্তৃতার সময়ে তাঁর কিছু মন্তব্য উস্কানিমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে। তা নিয়ে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর এবং শক্তিপুর থানার জোড়া এফআইআর-ও রুজু হয়। হুমায়ুনের মন্তব্য বিতর্কের আঁচ পড়ে বিধানসভায় অধিবেশনেও। সোমবার বিধানসভায় বক্তৃতার সময়ে ওই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পুলিশি ‘অ্যাকশনের’ হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। হুমায়ুনকে নিশানা করে তিনি বলেন, “যারা ওঁকে ডেকেছিল, তাদের আগে তুলব, তার পর আপনার কাছে যাব। যা করার করব, আমি আশ্বস্ত করছি। ধরে রাখুন এটা ওঁর শেষ বক্তব্য। এ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।’’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “এনাফ ইজ় এনাফ (যথেষ্ট হয়েছে)। সময় এসেছে এই ধরনের লোককে সবক শেখানোর।’’ হুমায়ুনকে সংযত হওয়ার জন্যও বলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর ওই সতর্কবার্তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এ বার তিন জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। রেজিনগর থানার দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন গোলাম এবং আমিনুল। গোলাম এজেইউপির কাশীপুর ২ অঞ্চলের সভাপতি। আনিসুর ধরা পড়েছেন শক্তিপুর থানার পুলিশের হাতে। তিনি এজেইউপির বেলডাঙা ২ ব্লকের আহ্বায়ক।
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত আমিনুলের বাড়ি রেজিনগরের লোকনাথপুর গ্রামে। অন্য দিকে ‘মূল উদ্যোক্তা’ গোলাম কাশীপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি মূলত দলীয় সভার আয়োজনের জন্য পুলিশের অনুমতি চেয়েছিলেন। আর সেই সভাতেই বিধায়ক উসকানিমূলক মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। রেজিনগরের সভায় হুমায়ুন কী মন্তব্য করেছিলেন, তা সোমবার বিধানসভায় পড়ে শোনান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘মাননীয় হুমায়ুন কবীর যে বক্তৃতা করেছেন, তা পড়ে শোনাচ্ছি। ২৬ জুন বলেছেন। পার্টির মিটিং করেছেন রেজিনগরে। সেখানে তিনি বলছেন, ‘এই যে অনামিকা ঘোষ ভোটে হেরে মনে করছেন আমি এমএলএ। এখানে এখন আস্ফালন করে বেড়াচ্ছেন! তা আমি শুভেন্দুকে বলেছি, আপনি ভোটে জিতেছেন, আপনার দল জিতেছে ভাল কথা! মুর্শিদাবাদে আস্ফালনটা কম করবেন। আমি যে দিন ময়দানে মুসলমানদের নিয়ে নেমে যাব না, এমন স্যাঁটা ভাঙা মার শুরু করব, যে ময়দানে আপনাদের পতাকা বহন করার লোক থাকবে না। বহরমপুরের সেন্ট্রাল জেলের যা আয়তন, তাতে ৪৭০০-৪৮০০ জনের বেশি ধরে না। লাফিয়ে লাফিয়ে লোককে রাস্তায় নিয়ে নামাব, স্যাঁটাভাঙা মারব…।’’ মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হুমায়ুন যে ভাষায় বক্তৃতা করেছেন, তা করার ক্ষমতা তাঁকে কেউ দেয়নি। প্রসঙ্গত, ‘স্যাঁটা’ শব্দটির অর্থ অঞ্চলভেদে পৃথক। ভাষাতত্ত্ববিদ সত্রাজিৎ গোস্বামী বলেছেন, ‘‘পুরুলিয়ায় শব্দটির অর্থ যৌনাঙ্গ। বীরভূম অঞ্চলে এটি শিরদাঁড়া বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আবার বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়া, পাবনার গ্রাম্যভাষায় এটি ধিক্কার বা ঘৃণার্থে ব্যবহৃত হয়।’’ সোমবার মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পরে মুখ খুলেছিলেন হুমায়ুনও। এজেইউপি বিধায়কের দাবি, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। হুমায়ুনের কথায়, “যাঁরা নবাগত বিজেপি, ৪ মে-র পরে যাঁরা বিজেপি হয়েছেন, তাঁরা যে ভাবে এলাকায় অশান্তি অত্যাচার করেছেন, তার বিরুদ্ধে বলেছি। তাতে যদি আমাকে গ্রেফতার করা হয়, হবে। আমি তো এই লোকগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন দল তৈরি করেছি। জিতেছি।’’
সোমবারই বিধানসভায় ‘গুন্ডা দমন বিল’ সংক্রান্ত আলোচনায় নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই এবার পুলিশের নজরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান। মঙ্গলবারই বিতর্কিত এই বিধায়কের বাড়িতে সমন নিয়ে হাজির হল রেজিনগর ও শক্তিপুর থানার পুলিশ। আগামী ৩ ও ৪ জুলাই তাঁকে থানায় হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যে সভার থেকে ঘটনার সূচনা সেই সভার আয়োজক তিন এজেইউপি নেতাকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শক্তিপুর থানার এফআইআর অনুযায়ী, ২৭ জুন সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ একটি ফেসবুক ভিডিও পুলিশের হাতে আসে। অভিযোগ, সেই ভিডিওতে হুমায়ুন কবির পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘অপমানজনক, মানহানিকর, উস্কানিমূলক এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননাকর’ মন্তব্য করেছেন। পরে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ৮ মে শক্তিপুর থানার গড়দুয়ারা ঘাট সংলগ্ন বিজয় সমাবেশে তিনি ওই বক্তব্য রেখেছিলেন। পুলিশের দাবি, ওই বক্তব্য জনশৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতেও প্রভাব ফেলতে সক্ষম। রেজিনগর থানার এফআইআরে অভিযোগের ভাষা আরও কড়া। সেখানে বলা হয়েছে, ২৬ জুন কাশীপুর হাটতলায় আয়োজিত এক জনসভায় হুমায়ুন কবির এমন বক্তব্য দেন, যা একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
নওদা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক হলেন হুমায়ুন। গত ২৬ জুন রেজিনগরের এক সভায় হুমায়ুন মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছিলেন, “মুর্শিদাবাদে আস্ফালনটা একটু কম করবেন। আমি যেদিন ময়দানে মুসলমানদের নিয়ে নেমে যাব না, সেদিন এমন স্যাঁটা ভাঙা মার শুরু করবে যে আপনাদের পতাকা ধরার লোক থাকবে না।” পরে আবার ২৭ জুনের এক সভা থেকে পুলিশের উদ্দেশে চরম গালমন্দ করেন হুমায়ুন। সেই ঘটনায় রেজিনগর ও শক্তিপুর থানায় জোড়া এফআইআর দায়ের হয়েছিল। সোমবার বিধানসভার অধিবেশনে সেই প্রসঙ্গ টেনেই নওদার বিধায়ককে চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আইনের শাসন কাকে বলে তা এবার টের পাবেন বিতর্কিত এই বিধায়ক।” ফলতার জাহাঙ্গির খানের উদাহরণ টেনে শুভেন্দুর হুঙ্কার ছিল, “পুষ্পা বলেছিল, ‘ঝুঁকেগা নেহি’। ভাষা সংযত না করলে ওই নওদার এমএলএটারও একই পরিণতি হবে।” মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বলেন, “ও মমতা ব্যানার্জীকে ডিল করেছে, আমাকে ডিল করেনি। আমাকে ডিল করতে হবে ওকে। এমন রূঢ় অ্যাকশন নেব, বুঝতে পারবে আইনের শাসন কাকে বলে।” একই সঙ্গে হুমায়ুনের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী ফাঁস করেন, “ওনার এজেন্ডা ছিল ১৩৫ জন এমএলএ জেতাবেন। মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূলের হবে, আর উনি উপ-মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এই অ্যাজেন্ডা কোথাও খায়নি।” মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া বার্তার পর আর সময় নষ্ট করেনি প্রশাসন। মঙ্গলবারই রেজিনগর ও শক্তিপুর থানার পুলিশ আধিকারিকরা হুমায়ুনের বাড়িতে গিয়ে সমন ধরিয়ে আসেন। শুধু সমন পাঠানোই নয়, ওই বিতর্কিত সভার আয়োজকদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতিধ্যেই পুলিশ গ্রেফতার করেছে রেজিনগরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির অঞ্চল সভাপতি গোলাম মোস্তফা এবং কাশীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য আনিসুর রহমানকে।বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর ২৪ ঘণ্টাও কাটল না, তার আগেই হুমায়ুনের বাড়ির দরজায় পুলিশের কড়া নাড়া এবং দলের দুই নেতার গ্রেফতারি— সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে যে চরম চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার, আগামী ৩ ও ৪ জুলাই থানায় হাজিরা দেন কিনা বিতর্কিত এই বিধায়ক।




