RK NEWZ ২০২১ সালের তুলনায় এ বার ৫১ লক্ষ ভোটার কম ছিল। তবে ভোট পড়েছে ৩০ লক্ষেরও বেশি। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটের প্রথম দফার ভোটের ধারা বজায় থাকল দ্বিতীয় দফাতেও। রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা আগের চেয়ে কমলেও অনেকটা বেড়ে গেল ভোটদাতার সংখ্যা। দুই দফাতেই প্রচুর মানুষ বুথে গিয়ে ভোট দিলেন। এমনকি, যাঁরা সাধারণত বুথমুখী হন না, তাঁদেরও এ বার ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে দেখা গেল। রাজ্যে ভোটের হার ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে ইতিমধ্যেই। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সারা দেশে সমস্ত বিধানসভা নির্বাচনে এ যাবৎ ভোটদানের হারে এটাই সর্বোচ্চ। সর্বভারতীয় রেকর্ড।হার এখনও পাওয়া যায়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত ভোটের হার ৯২.৬৩ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এ বার ৫১ লক্ষ ভোটার কম ছিল। তবে ভোট পড়েছে আগের বারের তুলনায় ৩০ লক্ষেরও বেশি। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটের হার এখনও পাওয়া যায়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত কমিশন ৯২.৬৩ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানিয়েছে। দুই দফা মিলিয়ে ভোটের হার ৯২.৯৩ শতাংশ। মোট ভোটার কমে গেলে এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ ভোট দিলে সাধারণ হিসাবেই ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোট সেখানেই থামল না। ভোটের হার এই রাজ্যে নজির গড়ে ফেলল। এসআইআর-এর পর আরও রাজ্যে ভোট হয়েছে। ভোটারের সংখ্যা সেখানেও কমেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মতো ঘটনা অন্য কোথাও ঘটেনি।পরিসংখ্যান থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট— নানা কারণে যাঁরা ভোট দিতেন না বা নানা কারণে যাঁরা ভোট দিতে পারতেন না, তাঁরা অনেকেই এ বার ভোট দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভোটের ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গের এই হিসাব বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। এত দিন ধরে ভোট দেননি যাঁরা, তাঁদের ভোট এ বার সব হিসাব উল্টে দিতে পারে। এই বাড়তি ভোটই হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণকারী! গত বারের তুলনায় যে ৩০ লক্ষাধিক মানুষ এ বার বেশি ভোট দিলেন, তার মধ্যে ২১ লক্ষই রয়েছেন প্রথম দফায়। দুই দফার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত বারের তুলনায় এ বছর প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে প্রায় ১০ হাজার জন করে বেশি ভোট দিয়েছেন। তবে বিধানসভা ভিত্তিক হিসাবে ফারাক রয়েছে। প্রথম দফার আসনগুলিতে গড়ে ভোটদাতার সংখ্যা বেড়েছে ১৪,২৩৭ জন করে। দ্বিতীয় দফায় বিধানসভা ভিত্তিক সেই বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ৬,৬১৫। একাধিক বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ্যে চলে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখা হয়েছে বিজেপি-কে। কোথাও কোথাও দাবি, তৃণমূলই ক্ষমতা ধরে রাখছে পশ্চিমবাংলায়। তবে প্রায় সর্বত্র হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত বুথফেরত সমীক্ষায় স্পষ্ট। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস অনুযায়ী, এই ধরনের সমীক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। তবে মিলে যাওয়ার কিছু নিদর্শনও রয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও রয়েছে। তৃণমূলের অনেকে এই প্রসঙ্গে গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের দৃষ্টান্ত টানছেন। পশ্চিমবঙ্গে সে বারও অনেক ভোট পড়েছিল এবং ভোটের ফল রাজ্যে শাসকের পক্ষে গিয়েছিল। পাশাপাশিই প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের দৃষ্টান্ত দিয়ে তাঁরা দাবি করছেন, এসআইআর-এর পর ভোটের হার বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে বিহারেও ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন সরকারের ‘প্রত্যাবর্তন’ হয়েছে। বিরোধীদের তরফে অবশ্য ২০১১ সালের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এত দিন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোটদানের নজির ছিল ওই বছরেই। ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ এবং সেই ভোটে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান হয়েছিল। পরিবর্তনের হাওয়ায় রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। এ বারের পশ্চিমবঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক বাড়তি ভোট কোন পক্ষে যায়, সেটাই দেখার।
প্রথমবার হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তার পরে আবার এই ২০২৬ সালে। এমন ‘অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গ সাধারণত দেখেনি। ব্যতিক্রম এক বার— ২০১১ সাল। ৫৭ বছর আগের এক বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ‘রিগিং’ শব্দটি আলোচিত হয়েছিল। সেই থেকে এ বার পর্যন্ত মোট ১৪টি বিধানসভা নির্বাচনের সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। ২০১১ সাল ধরলে ১৪টি নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তৃতীয় বার যথার্থই ‘অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ’ ভোট দেখল এই রাজ্য। এমন ভোট করানোর মূল কৃতিত্ব অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের। ‘ভয়ভীতিহীন’ ভোট করাতে বদ্ধপরিকর কমিশনের ভরসায় দুই দফাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু দু’টি দফাতেই একটিও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষের পরে কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি বিধানসভা নির্বাচন দেখল, যে বার ভোটের দিন তো নয়ই, প্রচারপর্বেও কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অথচ পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ২৪ জনের প্রাণ গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। তার পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালে সাত জন নির্বাচনী হিংসার বলি হয়েছিলেন। এ বার সে সংখ্যা শূন্য। ভোটের দিন কোথাও কোনও বোমাবাজির ঘটনাও ঘটেনি। অথচ মাত্র পাঁচ বছর আগের ভোটে ৬০টিরও বেশি বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছিল। প্রায় রক্তপাতহীন নির্বাচন করানোর কৃতিত্ব কমিশনকেই দিচ্ছেন অধিকাংশ। তাঁদের মতে, যে ভাবে কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় থেকে ধাপে ধাপে রাজ্যের প্রশাসনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বাড়ানো শুরু করেছিল, ভোট ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ-প্রশাসনে বেনজির রদবদল ঘটিয়ে গোটা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিয়েছিল, তারই সুফল এই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এজন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে কমিশনের তিন কর্তা সিইও (মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক) মনোজ অগ্রবাল এবং সুব্রত গুপ্ত ও এনকে মিশ্রকে। মনোজ ১৯৯০ ব্যাচের আইএএস অফিসার। রাজ্যের দেওয়া তিনটি প্যানেল বাতিল করে মনোজকে সিইও হিসাবে বেছে নিয়েছিল নয়াদিল্লির নির্বাচন সদন। তাঁর ঠান্ডা মাথা, ক্ষুরধার বুদ্ধি, সোজাসাপ্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা বিশেষ আলোচিত। ফলে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পছন্দের অফিসার। কমিশন সূত্রে খবর, ভোটের কাজে প্রতিটি ধাপেই মনোজের প্রায় সব সুপারিশ জ্ঞানেশ মেনে নিয়েছিলেন। সুব্রতও ১৯৯০ ব্যাচেরই আইএএস। কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম.টেক। প্রযুক্তি ভাল বোঝেন। তাঁকে এসআইআর পর্বে ‘বিশেষ রোল পর্যবেক্ষক’ হিসাবে নিয়োগ করেছিল নির্বাচন কমিশন। ওই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের তথ্য এবং নথি যাচাইয়ে তাঁর বুদ্ধি কাজে লেগেছিল। সুব্রতর কাজে ‘খুশি’ হয়ে কমিশন তাঁকে বিধানসভা ভোটেও কাজে লাগায়। বিধানসভা ভোটে ‘বিশেষ পর্যবেক্ষক’ হিসাবে দায়িত্ব নেন তিনি। পুলিশ এবং পর্যবেক্ষকদের কাজে নজরদারি করেন সুব্রত। অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস মিশ্রকে কমিশন নিয়োগ করেছিল ‘বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক’ হিসাবে। ১৯৮৮ সালের সিকিম ব্যাচের আধিকারিক মিশ্র কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দা দফতরে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সেই সূত্রেই কলকাতায় আসা। অবসরের পরে দিল্লিবাসী হলেও এ রাজ্যে তিনি প্রায় সাত-আট বছর ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন।
কমিশনের একাধিক সূত্রের দাবি, শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য এই তিন আধিকারিকের ভূমিকা ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ ছিল। অশান্তি এড়াতে নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিলেন এঁরাই। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়, বরং পুলিশ-প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনার নীতিতে আস্থা রেখেই তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ছবি বদলে দিয়েছেন। বামেরা দাবি করেন, ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নির্বাচন, যখন রাজ্যবাসী রিগিং-সন্ত্রাস দেখলেন। কংগ্রেস বা তৃণমূল নেতারা সে তত্ত্ব নস্যাৎ করেন। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ের কথায়, ‘‘১৯৬৯ সাল থেকেই রিগিং শুরু এবং তা শুরু হয়েছিল সিপিএমের হাত ধরে।’’ পরে ১৯৭১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে বৃহত্তম দল হয়। সে বারের নির্বাচন (অন্তত ভোটগ্রহণ) মোটের উপরে অবাধ ছিল বলেই প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকের দাবি। তবে সৌগত সে কথা মানছেন না। তিনি বলছেন, ‘‘১৯৬৯ সালের মতো ১৯৭১ সালেও অনেক আসনেই সিপিএম চোরাগোপ্তা রিগিং চালিয়েছিলে। সে সব করেই বেশি আসন পেয়েছিল।’’ রক্তপাত বা প্রাণহানির ঘটনা যদি মাপকাঠি হয়, তা হলে ১৯৭১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এ বারের নির্বাচনের চেয়ে পিছিয়েই থাকবে। তৎকালীন রাজনীতিকদের মধ্যে যাঁরা এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়, তাঁরা বলছেন, নকশাল জমানার শেষ দিকে হওয়া সে নির্বাচনে বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোটে অংশ নিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, সে বারের নির্বাচনে চার জন প্রার্থী খুন হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে কংগ্রেস বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু সে নির্বাচনকে রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘কালো’ নির্বাচন হিসাবে বামেরা দাগিয়ে দিয়েছিল। ‘প্রবল রিগিং’-এর কারণেই বরানগরের মতো তদানীন্তন বামদুর্গে জ্যোতি বসুর মতো প্রার্থী পরাস্ত হয়েছিলেন বলে সিপিএম এখনও দাবি করে। তার জেরেই ১৯৭৭ সালের ভোটে কংগ্রেস শোচনীয় প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছিল বলে বামেদের ব্যাখ্যা। পুরনো কংগ্রেসিরা সে তত্ত্ব পুরোপুরি মানতে চান না।





