RK NEWZ রুদ্রনীল ঘোষ। শিক্ষক এবং শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঘোষের পুত্র রুদ্রনীল ঘোষের বয়স এখন ৫৩ বছর। প্রাথমিক শিক্ষা হাওড়ার সাঁতরাগাছি কেদারনাথ ইনস্টিটিউশনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বোর্ডের অধীনে সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।‘বাম’ থেকে ‘রাম’ হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তিনি। তবে সরাসরি নয়। ভায়া তৃণমূল। ছাত্রজীবনে ছিলেন সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর নেতা। কর্মক্ষেত্র ছিল হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজ। ছাত্রফ্রন্ট থেকে সিপিএমের পার্টি সদস্যপদও পেয়েছিলেন। তা নিয়ে তাঁর শ্লাঘাবোধও রয়েছে। কিন্তু তৃণমূল সরকারে আসার পরে লাল থেকে ক্রমে সবুজঘেঁষা হয়ে ওঠেন। জুটে গিয়েছিল সরকারি পদও। সে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে তিনি কমলা শিবিরে চলে যান। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি-র হয়ে প্রথম লড়েছিলেন ভবানীপুরে। কিন্তু এ বার তাঁর ‘পুর’ বদলেছে। তিনি লড়ছেন হাওড়ার শিবপুর থেকে। যা তাঁর ‘ঘরের মাঠ’। সেখানে তৃণমূলের প্রার্থী রানা চট্টোপাধ্যায়। যিনি গত বার জিতেছিলেন বালি কেন্দ্রে। এই সুযোগে রুদ্রবাহিনী চোরাগোপ্তা প্রচার করছে, ‘শিবপুর নিজের ছেলেকেই চায়!’ গত বিধানসভা ভোটে পদ্মের প্রতীকে রুদ্রের সঙ্গে লড়েছিলেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা তনুশ্রী চক্রবর্তীও। ভোটের পরে তনুশ্রী রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলেও রুদ্র মাটি কামড়ে ছিলেন। তনুশ্রী বিবাহ করে ভিন্দেশে সংসারধর্ম করছেন। কিন্তু ‘বিজেপি-র রাহুল গান্ধী’ রুদ্র এখনও অকৃতদার। গত নভেম্বরে তনুশ্রীর বিয়ের পরে রুদ্রকে নিয়ে কৌতূহল বেড়েছিল। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিয়ে করবেন। তবে কি ভোট মিটলেই সানাই বাজবে? অজানা কথা। বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন স্কুলশিক্ষক। বাবা ছিলেন আঁকিয়ে। সরকারি আর্ট কলেজের ডিগ্রিধারী। সেই সূত্রেই আঁকা রুদ্রের রক্তে। তিনি এখনও আঁকেন। তবে ক্যানভাসে আঁকার সুযোগ খুব একটা পান না। বদলে এমন একটি মোবাইল সেট ব্যবহার করেন, যাতে ডিজিটাল পেন্টিংয়ের বন্দোবস্ত রয়েছে। তাতেই ছবি আঁকেন অভিনেতা-নেতা।

এ বার কলকাতার কোনও কেন্দ্র নয়, পিতৃভূমিতে ভোটে লড়ছেন রুদ্রনীল ঘোষ। জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী অভিনেতা-রাজনীতিকের কথায়, ‘‘শিবপুরের ছেলে শিবপুরে এলাম।’’ ২০২১ সালে ভবানীপুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী ছিলেন রুদ্রনীল। তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পরাজিত হন। এ বার রুদ্রনীলের প্রতিদ্বন্দ্বী রানা চট্টোপাধ্যায়। পেশায় চিকিৎসক রানা বর্তমানে বালি পুরসভার চেয়ারম্যান এবং ওই কেন্দ্রের বিধায়ক। ইতিমধ্যে মনোনয়ন দাখিল করেছেন দু’জনেই। রুদ্র জানালেন তাঁর বিষয়-আশয়। গত বিধানসভা ভোটের সময় হলফনামায় জানিয়েছিলেন তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬৯ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা। ঋণ ৫৯ লক্ষ টাকার বেশি। হলফনামায় শিবপুরের বিজেপি প্রার্থী জানিয়েছেন, তাঁর হাতে রয়েছে নগদ ১০ হাজার টাকা। চারটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে অভিনেতা-রাজনীতিকের। সব মিলিয়ে ব্যাঙ্কে জমা ৮২ হাজার টাকা। পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে আছে মাত্র ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কে জমা ৮০৭ টাকা। মিউচুয়াল ফান্ড বা শেয়ার বাজারে কোনও বিনিয়োগ নেই অভিনেতার। একটি ফরচুনার লেজেন্ডার গাড়ির মালিক রুদ্রনীল। গাড়িটি কিনেছিলেন ২০২১ সালে। মূল্য ৩৮ লক্ষ ৫২ হাজার টাকা। শিবপুরের বিজেপি প্রার্থীর গয়নাগাটি, অলঙ্কার নেই। কমিশনকে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে রুদ্রনীলের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৩৯ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫৭৯ টাকা। কৃষি বা অকৃষিজমি নেই রুদ্রনীলের নামে। উত্তরাধিকার সূত্রেও জমিজমা পাননি। মোট তিনটি বাড়ি রয়েছে অভিনেতার। নাকতলা এলাকায় ১৮৭৯ বর্গফুটের একটি বাড়ি রয়েছে তাঁর। বাকি দু’টি বাড়ি হাওড়ায় জগাছায়। ৩৬০ বর্গফুটের বাড়িটি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। দ্বিতীয়টি নিজের কেনা ১৫০০ বর্গফুটের। এখন নাকতলার বাড়িটির বাজারমূল্য আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। জগাছার পৈতৃক বাড়িটির দাম প্রায় ১০ লক্ষ টাকা এবং জগাছায় কেনা বাড়িটির আনুমানিক মূল্য ৩০ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে রুদ্রের স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ১ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে রুদ্রনীলের রোজগার ছিল ২৫ লক্ষ টাকা। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার মালিক রুদ্রনীল। আর ঋণ নেই তাঁর। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করেছেন রুদ্রনীল। তখন এসএফআই করতেন। অভিনয়জীবনে অনেকটা সময় তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজ্য বৃত্তিশিক্ষা পর্ষদের সভাপতিও ছিলেন রুদ্র। এখন রাজ্য বিজেপির অন্যতম মুখ তিনি।
হাওড়ার শহরের বহু জায়গায় জল জমা। সেই জমা জলে দাঁড়িয়ে মানুষের দুর্ভোগের কথা জনসমক্ষে তুলে ধরছেন শিবপুরের বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ। তার জন্য জমা জলে নেমে প্রচার। কখনও হাঁটুর উপর প্যান্ট গুটিয়ে, কখনও পায়ে চপ্পল পরে জলমগ্ন রাস্তায় হেঁটে বেড়িয়েছেন। তারই ফাঁকে ভোটের প্রচার। এ ভাবেই সুকৌশলে হাওড়া শহরে জল জমা রুখতে প্রশাসনিক ব্যর্থতা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করছেন রুদ্রনীল, যা আসলে তাঁর ভোট প্রচারেরই অঙ্গ। তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে হাওড়ায় অন্যতম প্রধান ইস্যু বেহাল নাগরিক পরিষেবা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন হাওড়ায় নির্বাচিত পুরবোর্ড না থাকার কারণে পুর পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। তার জেরে মানুষ নাগরিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তা নিয়ে মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভকে নতুন করে উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিরোধীরা। রুদ্রনীলও একই কৌশল অবলম্বন করেছেন। শিবপুরের বেলগাছিয়া-সহ বেশ কিছু এলাকায় রাস্তায় জল জমে যায়। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন রুদ্রনীল। জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে হেঁটে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। সম্প্রতি হাওড়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডেও বৃষ্টির মধ্যেই জমা জলে নেমে প্রচার করতে দেখা গিয়েছিল রুদ্রনীলকে। একই ভাবে হাওড়া পুরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডে জাতীয় সেবা দলের কাছে রাস্তায় জমে থাকা নোংরা জলে নেমে প্রচার চালিয়েছেন তিনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি পথচারীদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন। মাইক হাতে নিয়ে এলাকাবাসীর উদ্দেশে তাঁকে বলতে শোনা যায় ‘রাস্তার উপরে কীভাবে নোংরা জল জমে রয়েছে, তা আপনারা নিজেরাই দেখুন। এটাই তৃণমূল কংগ্রেসের উন্নয়নের চিত্র।’ তিনি অভিযোগ করেন, ড্রেনের নোংরা জলের মধ্যে দিয়ে মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলাররা। তাঁর কথায়, ‘যাঁরা বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকল, তাঁদের তো মানুষের জন্য কাজ করার কথা। কিন্তু তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতেই ব্যস্ত থেকেছেন। ফলে আজ গোটা শিবপুর কেন্দ্রেই একই চিত্র। জল জমে থাকা রাস্তা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দুর্ভোগে জর্জরিত সাধারণ মানুষ।’ শিবপুরবাসীর উদ্দেশে তাঁর আহ্বান, ‘আপনারা নিজেরাই রাস্তায় নেমে পরিস্থিতি বিচার করুন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।’





