RK NEWZ মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদী। তাঁর হাতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মঙ্গল পাণ্ডে, বড়মার ছবি তুলে দেওয়া হল। মঞ্চে বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘একটাই ফুল, পদ্মফুল।’’ ভারত মাতা কি জয়। ছাব্বিশের বঙ্গভোটে প্রচার প্রায় শেষ। আর এই শেষবেলায় সব রাজনৈতিক দলেরই প্রচারের সুর একেবারে সপ্তমে। সোমবার সকাল সকাল বারাকপুর শিল্পাঞ্চলের সাত বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থীদের হয়ে শেষ জনসভা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সিপাই বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত জায়গায় দাঁড়িয়ে মঙ্গল পাণ্ডে আবেগে শান দিলেন। দ্বিতীয় দফা ভোটে দলীয় কর্মী, সমর্থকদের মনোবল আরও চাঙ্গা করলে মোদি বললেন, ‘‘বাংলার মেজাজ বলছে, এবার পদ্ম ফুটছেই। অঙ্গ, কলিঙ্গের পর এবার বঙ্গে পদ্ম ফোটার পালা। নিশ্চিন্তে থাকুন, ৪ মে-র পর বিজেপি সরকারের শপথে আমি আসবই। কথা দিয়ে গেলাম।”১৮৫৭ সালে এই ব্যারাকপুরে স্বাধীনতার প্রথম লড়াইকে শক্তি জুগিয়েছিল। আজ এই ভূমি বাংলায় পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করছে। একটাই ধ্বনি, পাল্টানো দরকার। সকাল সকাল আমাকে আশীর্বাদ দিতে এসেছেন বহু মানুষ। হেলিপ্য়াড থেকে যখন আসছিলাম, রাস্তার দু’পাশে মানুষের উৎসাহ দেখে আমি অভিভূত। কল্পনা করতে পারিনি। এই ভোটে আমার এটা শেষ সভা। বাংলায় যেখানে যেখানে গিয়েছি, মানুষের যা মেজাজ দেখেছি, এই বিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছি যে, ৪ মের পরে বিজেপির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আসতেই হবে। গত তিন-চার দশক ধরে দেশের কোণায় কোণায় যাচ্ছি। রাজনীতি, বিজেপি-তে আসার পরে, পার্টি যা বলে, তা-ই করি। নির্বাচনের দায়িত্ব সামলানোও তার মধ্যেই পড়ে। দিন-রাত-ঋতু কিছু দেখি না। আপনাদের মাঝে থাকলে শান্তি পাই, সুখ পাই। আপনারাই আমার পরিবার। এই দৌড়োদৌড়িতে একটু ক্লান্তি আসে। ৩০-৪০ বছর আগেও ক্লান্সি আসত। কিন্তু এই ভোটে অন্য অনুভূতি হচ্ছে। এই গরম সত্ত্বেও বাংলার ভোটে এতটুকু ক্লান্তি আসছে না। রোড শো শেষ হওয়ার পরেও মানুষের ভিড়। সেয়ি ভিড়ের মধ্যে হেঁটেছি। হেলিপ্যাডে গিয়েছি। রোড শো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, তীর্থযাত্রা। মা কালীর ভক্তদের মাঝে গিয়েছি। তাঁরা ভালবাসেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অযোধ্যায় রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়,তাক আগে ১১ দিন বিভিন্ন পুজো, আচার করেছি। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে গিয়েছি। এই ভোটেও তা-ই হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে বাংলার জন্য আমার ভালবাসা। আমার আধ্যাত্মিক মননের কেন্দ্র হল বাংলা। ঈশ্বররূপী জনতার প্রেম ছিল। বাংলার রোড শো, সভায় আমাকে আপন করে নেওয়ার বার্তা পেয়েছি। ছবি পেয়েছি। যত রাত হোক, রাতে গিয়ে সেই ছবি দেখি। ছবির পিছনে ছোট শিল্পীদের ভাব বোঝার চেষ্টা করি। চিঠি পড়ি। কোথাও কষ্ট দেখতে পাই, কোথাও আশা। আমি জবাব দিই। বাংলার জনতা জনার্দনের এই অসীম প্রেম আমার সৌভাগ্য। সকলের চোখে স্নেহ দেখি। এটাই আমার জীবনের পুঁজি। ওঁরা আমায় দেখে কেঁদে ফেললে ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। রোড শো, সভা থেকে ফিরে গিয়ে কানে বাজে আপনাদের কথা। র্যালির সময় কাল দেখি, এক ছোট বোন রেলিং ভেঙে সামনে আসার চেষ্টা করেন। রক্ষীদের সঙ্গে বচসা হয়। তিনি না খেয়ে সকালে চলে আসেন সভাস্থলে। বাচ্চাদের বলেছিলেন, আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। আমি ক্ষমাপ্রার্থী, ওই বোনের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। তাঁর বিশ্বাসকে সম্মান জানাই। কখনও না কখনও দেখা হবে। তাঁর আশীর্বাদ, আপনাদের আশীর্বাদ আমার উপর বর্ষিত হবে সব সময়। বাংলার সেবা করা, সুরক্ষিত করা, বড় চ্যালেঞ্জ থেকে তাকে রক্ষা করা আমার ভাগ্যে লেখা রয়েছে। আমার দায়িত্বও। এই দায়িত্ব থেকে পিছু হঠব না। বাংলার এই ভোট, গোটা পূর্ব ভারতের ভাগ্য বদলানোর ভোট। যখন ভারত সমৃদ্ধ ছিল অতীতে, তখন তিনটি মজবুত স্তম্ভ ছিল— অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ অর্থাৎ বিহার, বাংলা, ওড়িশা। এই তিন স্তম্ভ দুর্বল যখন হয়, গোটা ভারতে ঝটকা লেগেছে। আজ বিকশিত ভারতে এই তিন স্তম্ভ জরুরি। ভারতের ভাগ্যোদয় পূর্বোদয় ছাড়া সম্ভব নয়। ভারতের ভাগ্যোদয় এবং পূর্বোদয় পরস্পরের পরিপূরক। ২০১৩ সাল থেকে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকে বলছি, পূর্ব ভারত যখন এগোবে, তখন দেশ এগোবে। অঙ্গ, কলিঙ্গে কমল ফুটেছে। এখন বাংলার পালা। এ বার যা দেখলাম, পূর্বোদয় হবেই। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গের নারীশক্তি ভরসা করে বিজেপি-তে। বাংলা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সাংসদ করেছিল। তার প্রেরণা বিজেপির সঙ্কল্প হয়। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা রদ করে তাঁর একটি সঙ্কল্প পূরণ করেছি। আরও একটি সঙ্কল্প রয়েছে শ্যামাপ্রসাদের— বাংলার সমৃদ্ধি এবং শরণার্থীদের সমস্যার সমাধান। বাংলায় যে বিজেপি সরকার আসছে, তারা শ্যামাপ্রসাদের সঙ্কল্প পূরণ করবে। ভআরতের প্রগতি, সংস্কৃতি, স্বাধীনতায় বাংলার সন্তানদের ভূমিকা ছিল বড়। কিছু দূরে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। বন্দে মাতরমের দেড়শো বছর পূর্তিতে বাংলাও ঐতিহাসিক পরিবর্তন করতে চলেছে। বন্দে মাতরম দাসত্ব থেকে মুক্তির মন্ত্র ছিল। এ বার বাংলার নব নির্মাণের মন্ত্র তৈরি করতে হবে। সুজলং, সুফলংকে নীতি করব, শস্য শ্যামলং -কে রোজগারের পথ করব। মলয়জ শীতলং-কে সুখ সমৃদ্ধির পথ করব। দুর্গার শক্তিকে সুরক্ষার গ্যারান্টি করব।প্রচারের সময় বাংলার বিকাশ নিয়ে বিজেপির পরিকল্পনা তুলে ধরেছি। তৃণমূলের নেতারা একবারও মা-মাটি-মানুষের নাম নেয়নি এই ভোটে। যে মন্ত্র নিয়ে তারা বাংলায় সরকার গড়েছিল, তা ওরা ভুলে গিয়েছে। ১৫ বছর ওদের সুযোগ দিয়েছেন, মায়ের জন্য, নারী সুরক্ষার জন্য কিছু করেনি। মাটি, কৃষক, যুবক, মানুষের জন্য কিছু করেনি। কিছু বলার নেই বলে একটাই ফর্মুলা নিয়েছে, গালি দাও, হুমকি দাও, মিথ্যা বলো। মোদীকে, সেনাকে গালি দিয়েছে। বাংলার লোকজনকে হুমকি দিয়েছে। তৃণমূলের এক জন নেতাও রিপোর্ট কার্ড দেয়নি। যারা নিজের কাজের রিপোর্ট দিতে পারে না, তাঁদের কি সুযোগ দেওয়া উচিত? কিছু করেন, বরবাদীর জন্য সুযোগ দেবেন? বাংলার মানুষের ভবিষ্যতের জন্য তৃণমূলের কাছে কোনও রূপরেখা নেই। কী করা হবে, কোথায় নিয়ে যাবে, তা-ও বলে না তৃণমূল। কারণ ওদের কোনও ইচ্ছা নেই, দূরদর্শিতা নেই। পরিবর্তন কেন জরুরি, তা ব্যারাকপুরের থেকে বেশি কেউ জানে না। যে ব্যারাকপুরে আগে বাইরে থেকে লোক আসতেন, কাজের জন্য, আজ সেখান থেকে লোক পালিয়ে যাচ্ছেন। বাধ্য হচ্ছেন। এখানে কারখানার শব্দ আসত এক সময়, আজ গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। অকল্যান্ড পাটকলে কী হল, সবাই দেখেছেন। আজ ব্যারাকপুরের দুর্ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাট, কাপড়কল বন্ধ হয়েছে একটার পর একটা। ব্যারাকপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে গত কয়েক মাসে এক ডজন পাটকল বন্ধ হয়েছে। আপনাদের রোজগার বন্ধ হচ্ছে। গুন্ডাদের রোজগারের জায়গা, বোমার কারখানা ফুলেফেপে উঠছে। তৃণমূলের সিন্ডিকেটের দোকান বাড়ছে। এটাই ওদের জঙ্গলরাজ। নিজের বাড়ি, দোকান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে ওদের সিন্ডিকেটকে জিজ্ঞেস করতে হয়। তৃণমূলের সিন্ডিকেটকে ভাগাতে হবে, ওদের হারাতে হবে।’’
২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। দ্বিতীয় দফায় মোট ২৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করছে নির্বাচন কমিশন। মোট রাজ্য পুলিশ ব্যবহার করা হবে ৩৮ হাজার ২৯৭। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণে অসংখ্য অলি-গলি রয়েছে। বুথের বাইরে সংকীর্ণ গলিগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার ক্ষেত্রে ৪৫৮টি গলি চিহ্নিত করে সেখানে নতুন করে সিসিটিভি বসানো হবে। উত্তর কলকাতার ক্ষেত্রে ২৭০টি গলি চিহ্নিত করে নতুন করে সিসিটিভি বসানো হবে। এছাড়াও বেশ কিছু সরু গলি রয়েছে, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে টানা টহলদারি চালানো হবে পুলিশের তরফে। কলকাতায় যে বহুতলগুলিতে বুথ তৈরি করা হচ্ছে এবার, সেখানে ফ্ল্যাটগুলির বাসিন্দাদের আগে থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ভোটের দিন বা ভোটের আগের দিন যে পরিচারিকা কাজে আসবেন, তাঁদের পরিচয় জানিয়ে রাখতে হবে। তালিকা তৈরি করে দিতে হবে। কমিশন জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাই মূল লক্ষ্য। প্রথম দফায় যে ধরনের ত্রুটি দেখা গিয়েছে, সেগুলি সংশোধন করে দ্বিতীয় দফায় আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ এবং কলকাতা উত্তরের ডিইও স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, ভয়মুক্ত এবং অবাধ নির্বাচন করা মূল লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের। কমিশনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিগত নির্বাচনগুলির পরে যেসব এলাকায় হিংসা হয়েছে, সেখানে বাড়তি বাহিনী রাখা হবে। কলকাতার ক্ষেত্রে বস্তিগুলিতে সব থেকে বেশি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভোট দিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী উপদ্রুত অঞ্চলগুলিতে বারবার টহল দেবে। সিসিটিভির মাধ্যমে গোটা এলাকায় নজর রাখবে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন। কলকাতাতে ভোট ঘিরে অশান্তি এড়াতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এবার একগুচ্ছ নির্দেশিকা দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রথম দফার তুলনায় আরও বেশি করে সক্রিয় হতে বলা হয়েছে। যে বুথগুলি স্পর্শকাতর, সেই জায়গাগুলির উপর বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুথের বাইরে সংকীর্ণ গলি চিহ্নিত করা হয়েছে উত্তর এবং দক্ষিণ কলকাতায়। সেই সব গলিতে যাতে কোনও হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটে, তার জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে কমিশন।





