Monday, April 27, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

সরকারি পুরস্কারও ‘শিল্পী’ রঘু রাইকে কিনতে পারেনি‘! ‘কথা বলা ছবি’র কারিগর!আমার একটাই ধর্ম,সত্যকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা!’

RK NEWZ হাতে কয়েকশো মেগা পিক্সেলের মোবাইল ক্যামেরা, অটো ফোকাস আর সাবজেক্ট। আজকাল ছবি মানেই তাই। যাদের ক্যামেরা আছে, তাদের সকলেই যে বিরাট ভেবেচিন্তে সৃজনশীল ছবি তোলেন তা নয়। যত দিন যাচ্ছে সৃষ্টিশীলতার সংজ্ঞা কোথাও গিয়ে যেন বদলে যাচ্ছে। মত অনেকের। কিন্তু এমনটা ছিল না কয়েকবছর আগেও। যখন রঘু রাইয়ের মতো শিল্পীরা চুটিয়ে কাজ করতেন, তখন সবকিছুই খানিকটা অন্যরকম মনে হত। একেকটা ছবি কত অব্যক্ত কাহিনি বলত! ছবির অর্থ খুঁজে বের করার পর ‘বাঃ, কেয়াবাত!’ ছাড়া কিছুই বেরত না। নেপথ্যে কত গভীর ভাবনা।২০১৫-২০১৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ছবিটা বদলাতে শুরু করে, কোভিডের পর সবটাই কেমন পাল্টে যায়। পুরনো দিনের চরিত্রেরা হারিয়ে যেতে থাকে, ঠুনকো জিনিসপত্রে ভরে যায় চারিদিক। এমনই দ্রুত পালাবদলের জমানায় এক দুপুরে হঠাৎই আর্কাইভ থেকে রঘু রাই সত্যজিৎ রায়ের কিছু ছবি পান। কলকাতায় দু’দিনের ঝটিকা সফরে অসাধারণ সেসব ছবি তুলেছিলেন তিনি। যা দেখলে আজও সত্যজিৎকে জীবন্ত মনে হবে। ছবি পেলেন। কিন্তু এমন অমূল্য জিনিস দিয়ে কী করবেন! মাথায় হাত পড়ার আগে উপায় বাতলে দিলেন তাঁর বন্ধু শিল্প সংগ্রাহক ইনা পুরী। সত্যজিৎ রায় বলে কথা! হেলায় হারানো যাবে না তাই বই করার প্রস্তাব পাড়লেন। এক কথায় রাজি শিল্পী। সেই সব ছবি দিয়ে তৈরি হয় ‘সত্যজিৎ রায়’ নামে একটি বই। এই প্রত্যেকটি ছবির পিছনে কত যে গল্প আছে, তা ওই দুপুরে বসে তিনি মেলে ধরেছিলেন বন্ধুর কাছে। কলকাতার আনাচে-কানাচে খুব একটা ঘুরে বেড়ানোর সময় হয়নি। কিন্তু বিখ্যাত গঙ্গার ঘাট ও রায় বাটিতে অবশ্যই গিয়েছেন। বিভিন্ন মুডে সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলেছেন। কখনও আলোর প্রতিফলন, কখনও দুর্গা পুজোর সময় না হওয়ার সত্ত্বেও গঙ্গার ঘাটে দুর্গা প্রতিমার আগমন!

এত কিছু শোনার পর কৌতুহলের খাতিরেই সত্যজিতের সঙ্গে আলাপের অভিজ্ঞতা জানতে চান এক সঞ্চালক। রঘু রাই জানিয়েছিলেন, দিল্লিতে কাজের সূত্রে দু’বার দেখা। তখনই কলকাতায় শুট করার পরিকল্পনা করে ফেলেন। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সত্যজিতের সঙ্গে কথোপকথনের একটা ছোট্ট অংশ শেয়ার করেন। জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে সত্যজিৎ সেবার প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন। পোডিয়াম থেকে নামার সময় একা সবগুলো বইতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। রঘু সাহায্যের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সেই অফার গ্রহণ করেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘ওয়েল, নট দিস টাইম…’। এমনই ছিলেন সত্যজিৎ। তার প্রমাণ কলকাতায় এসেও তিনি পান।ছবির শুটিং চলাকালীন রঘু রাই সত্যজিতের ছবি তোলেন। ফলে আলাদা করে কিছুই করা সম্ভব হয়নি। জানান, একদিন সাধারণ পোশাকে গঙ্গার ঘাটে এসে দাঁড়ান তিনি, হঠাৎ একটা দুর্গা প্রতিমা পিছনে দেখতে পান রঘু। ছবি তোলেন। এগুলো সবই তাঁর কাছে ‘ভগবানের দান’। মনে করতেন, কিছু একটা ম্যাজিক করে দেওয়ার প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই তিনি সেদিন করেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেন্সে চোখ রাখার পর হিসেবনিকেশ না কষে মন আর ব্রহ্মাণ্ডের হাতে পুরোটা ছেড়ে দিতেন। যা হত, তাতেই।

যিনি দলাই লামা, মাদার টেরেসা বা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দিগ্গজ লোকেদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তিনি সত্যজিতের সঙ্গী হওয়ার আগে কি কোনও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন? কোনও ক্ষেত্রেই কি প্রস্তুতি আদৌ নিতেন তিনি? প্রশ্নের উত্তরে এক সংবাদ সংস্থাকে শিল্পী জানিয়েছিলেন, এমন মানুষজন নিজেরা আদতে বিস্ময়, অনন্য। ছবি তুলতে তাঁর কখনও তাই বাড়তি কিছুই লাগেনি। এঁদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা অদ্ভুত দ্যুতি রয়েছে, ভগবান প্রদত্ত পুরোটাই। ছবিতেও সে সবই ফুটে উঠেছে অবিরল। শুধু মন যা চেয়েছেন তাই করেছেন। রঘুর কথায়, ‘আমার কাছে কোনও কিছুর উপলব্ধি হওয়া, তা গ্রহণ করা এবং সঠিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এটাই আসলে ভাব প্রকাশের ভাষা। অনেকে আমার কিছু ছবি দেখে বার বার প্রশ্ন করেন, ওটা তোলার সময় ঠিক কী ভেবেছিলাম। আমি সকলকে একটাই উত্তর দিই, “কিছুই ভাবিনি!” আমি অনুভব করেছি আর সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া কাজ করেছে। এটুকুই! ভাবনাচিন্তা করা তো রাজনীতিকদের কাজ, একজন শিল্পী একটা কিছু মাথায় নিয়ে কাজ শুরু করেন, তারপর বাকিটা হয়ে যায় নিজের মতো করে। এটাই সৃজনশীলতার পরিচয়। তোমাকে শুধু অপেক্ষা করতে হবে ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই এনার্জি এসে ধরা দিচ্ছে।’

ছবির ভাব, ধরন, মনের কথা প্রকাশের ক্ষমতা প্রসঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল ডিজিটাল টেকনোলজির কথাও। প্রথমেই প্রযুক্তি শুনে প্রশংসা শুরু করেন। এই সত্যজিৎ রায়ের ছবির উদাহরণ টেনেই জানান, কত ছবি এমনি পড়ে ছিল, সংরক্ষণই হয়নি সেভাবে। কিন্তু প্রযুক্তির দয়ায় তা ফিরে পাওয়া যায়। তবে, এর খারাপ দিক তো রয়েছেই। স্বীকার করে নেন অকপট, একবাক্যে। আজকাল যে কেউ আলোকচিত্রী। বর্ষীয়ান শিল্পী খানিকটা ক্ষোভের সুরেই একদা বলেছিলেন, ‘প্রযুক্তির ভয়াবহ দিক এটা। একটা হাতে মোবাইল বা ক্যামেরা আছে, ছবি তুলে নিলাম। এই সব মোটেও ভাল ছবি নয়। ছবিতে প্রাণ কই?’

যুদ্ধ থেকে সাম্প্রতিককালের সিএএ প্রটেস্ট, দেশের বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উদযাপন, ফ্রেমবন্দি করেছিলেন রঘু রাই। অনেকে বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যেমন, ইন্দিরা গান্ধী হেরে যাওয়ার সময় তাঁর ছবি তোলেন। তা নিয়ে সমালোচনা হয়। কিন্তু সেই তাঁর সরকারই রঘু রাইকে পদ্ম পুরস্কার দেয়।

বদলে শিল্পী কী দিয়েছিলেন? ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ঠিক যা হয়েছিল সারা দেশে, তা তুলে ধরেছিলেন সকলের সামনে। মানুষের জীবনকে সূক্ষ্ম সুতোয় বেঁধেছিলেন। অমলিনভাবে। সেই কাজের জন্যই পদ্মপ্রাপ্তি। রঘু মনে করতেন, এটাই তাঁর অবদান, দেশের প্রতি। আলাদা করে আর কাউকে কী দেবেন! বলেছিলেন, ‘আমার একটাই ধর্ম, সত্যকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা!’

২০২২ সালের পর বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে একটি বই লেখেন। একাধিক প্রদর্শনী তো ছিলই। সঙ্গে দেশের যেকোনও বড় দুর্যোগে এই বয়সেও ছুটে যেতেন। মানুষের কষ্ট তুলে ধরতেন। যাতে তা সকলের কাছে পৌঁছয়। এই নিয়ে দশটিরও বেশি বই রয়েছে তাঁর।

এতকিছুর মধ্যে যদিও সবেচেয়ে পছন্দ সেই সত্যজিতের বইটিই। ইনা পুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সত্যজিৎ রায়ের মতো মানুষের ছবি তোলা আর তার অভিজ্ঞতা রঘু রাইয়ের মতো মানুষের মুখ থেকে শোনা অবশ্যই চিরস্মরণীয়। বইতেও তা প্রকাশ পায়!’

দাদার হাত ধরে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ক্যামেরার সঙ্গে রঘু রাইয়ের পথ চলা শুরু হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, অতীতকে ক্যামেরাবন্দি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উপহার হিসেবে রেখে যাওয়াই একজন আলোকচিত্রীর প্রধান কাজ। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ইন্দিরা গান্ধী, সত্যজিৎ রায়, মাদার টেরেসা এবং দলাই লামার মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বদের এমন সব মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করেছেন, যা আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর সন্তানদের নিয়ে তোলা তাঁর একটি পারিবারিক ছবি এবং ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস বিপর্যয়ের হাড়হিম করা আলোকচিত্রগুলো ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। রঘু রাই শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তাজমহলের ওপর তাঁর তোলা কাজের জন্যও আন্তর্জাতিক স্তরে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। নিজের তোলা অসাধারণ সব ছবি নিয়ে তিনি একাধিক বইও প্রকাশ করেছেন। চিত্রসাংবাদিকতায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’-তে ভূষিত করে। সমালোচকদের মতে, রঘু রাইয়ের ছবিগুলো নিজেই কথা বলত, তাই তাঁর সৃষ্টির গভীরতা বোঝাতে কোনও বাড়তি ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ত না।

দুজনেই শিল্পী। একজন আলোছায়ার জাদুকর, অন্যজন ক্যামেরার চিত্রী। সত্যজিৎ রায় ও রঘু রাই —শিল্পমাধ্যমের দু’জন মহীরুহের সম্পর্ক ও সখ্য গড়ে উঠেছিল প্রায় আকস্মিকভাবে। অদ্ভুত নিবিড় সেই যোগাযোগ। যা কয়েক দশক পেরিয়ে শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্রে আটকে নেই—হয়ে উঠেছে দুই সৃষ্টিশীল মনের পারস্পরিক সম্মান ও ভালবাসার দলিল।

আজ প্রয়াত হলেন রঘু রাই। তাঁর চিরপ্রস্থান, অনেকের চোখেই, যেন সেই দলিলের একমাত্র জীবন্ত সাক্ষীর চিরতরে মুছে যাওয়া!

প্রথম দেখা, প্রথম মুগ্ধতা

১৯৬৫-৬৬ সালের কথা। রঘু রাইয়ের দাদা বাড়িতে কিনে আনেন এডওয়ার্ড স্টাইকেনের বিখ্যাত বই ‘দ্য ফ্যামিলি অফ ম্যান’। দুনিয়ার তাবড় আলোকচিত্রীদের সংকলন। যেখানে একমাত্র ভারতীয় মুখ সত্যজিৎ রায়—পথের পাঁচালীর একটি অসাধারণ ছবি নিয়ে। যা দেখামাত্র রঘু রাই বুঝেছিলেন, এই শিল্পী শুধু চলচ্চিত্রকার নন… হতে পারেন না। তিনি আসলে দৃশ্যের আড়ালে কথা বলেন। একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চান।

প্রথম পরিচয়ে একরাশ মুগ্ধতা। যা জন্ম নিল তীব্র আসক্তিতে। পাগলের সত্যজিতের ছবি দেখা শুরু করেলন রঘু রাই। যা নিয়ে পরে লিখেছিলেন, ‘প্রতিটি চলচ্চিত্র শেষ হওয়ামাত্র মনে হত আগেরটা এর চেয়ে ভাল ছিল না। পরেরটাই সেরা!’ এই মুগ্ধতা অন্ধ ভক্তি নয়… এক শিল্পীর আরেক শিল্পীকে দেখার প্রগাঢ় বিস্ময়।

প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ পরে, ১৯৭৪ সালে, দিল্লিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের অনুষ্ঠানে। মঞ্চ থেকে নামছিলেন রায়। হাতে তিন-তিনটি পুরস্কার। তরুণ রঘু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, ‘মিস্টার রায়, এত ভার বহন করা কঠিন নিশ্চয়ই!’ সত্যজিতের রায়ের উত্তর ছিল মনে রাখার মতো—‘এই ভার বইতেও যে আনন্দ!’

দুই শিল্পীর মতবিনিময়

প্রথম মোলাকাত স্মরণীয়। কিন্তু সত্যিকারের সখ্য গড়ে উঠেছিল আরও পরে, যখন দুজন একটি বিচারকমণ্ডলীর হয়ে একসঙ্গে কাজ করছিলেন। সদস্য হিসেবে রামকিঙ্কর বেইজও ছিলেন সেখানে। রঘু রাইয়ের তোলা একজন মহিলা ঠেলাগাড়ি চালাচ্ছেন—ছবিটির ভরপুর প্রশংসা করেন সত্যজিৎ। এই স্বীকৃতিতে আপ্লুত রঘু বুঝেছিলেন, শুধু বিনয়ভাষণ নয়। রায় সত্যিই ছবিটি ‘দেখেছিলেন’। আর দেখেছিলেন বলেই নিজের মুগ্ধতা মেলে ধরেন অকপটে।

কেমন ছিলেন মানুষ সত্যজিৎ? রঘু রাই একবার একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। একজন সাংবাদিক সত্যজিৎকে শ্যাম বেনেগাল ও মৃণাল সেনের কাজ সম্পর্কে মতামত জানতে চান। সত্যজিতের অতিসংক্ষিপ্ত জবাব, ‘হ্যাঁ, তাঁরা ভাল পরিচালক!’ ব্যাস, এটুকুই। অতিতিক্ত কিছু নয়। রাই পরে বলেছিলেন, ‘মানিকদা, আপনি বিশ্লেষণী মন্তব্য না করলে আর কে মতামত দেবে?’ হাল্কা হেসে সত্যজিতের প্রত্যুত্তর, ‘কারও সমালোচনা করলে আমার মনে হয় অহংকার প্রকাশ পাচ্ছে!’ এই প্রত্যাখ্যান এড়িয়ে যাওয়া নয়—রঘুর চোখে, এক গভীর প্রজ্ঞা ও মানবিক বোধের প্রকাশ।

‘ঘরে বাইরে’র সেটে দুই ক্যামেরা

১৯৮০ সালে ‘ঘরে বাইরে’র শুটিং চলাকালীন রঘু রাই দিন দুই কাটিয়েছিলেন সত্যজিতের সঙ্গে। শর্ত একটাই—‘অ্যাকশন’ বলার পর আর ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করা যাবে না!

এই একটিমাত্র মন্তব্যেই কি সত্যজিৎ রায়ের পুরো শিল্পদর্শন ধরা নেই?

সেটে তুলেছিলেন অগুনতি ছবি। অধিকাংশ আলোকচিত্রই আলোর অভাবে কম এক্সপোজড হয়ে পড়ায় রঘু প্রচণ্ড মর্মাহত হন। কিন্তু কয়েক দশক পর ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সেই নেগেটিভ স্ক্যান করে বুঝতে পারেন—আঁধারের জাল ফুঁড়ে উঠে এসেছে অসাধারণ কিছু মুহূর্ত! কখনও গঙ্গার ধারে, কখনও প্রতিমা বিসর্জনের সামনে, কখনও শিশুদের সঙ্গে হাসিখেলায় মেতে ওঠা সত্যজিৎ—প্রতিটি ফ্রেম অজানা-অচেনা ‘মানিকদা’কে জীবন্ত করে তুলেছে।

সৃষ্টির সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য

সত্যজিৎ তাঁকে ‘সমান শিল্পী’ হিসেবে সম্মান করতেন—এই নিয়ে রঘুর বিস্তর শ্লাখাবোধ ছিল। একদিন ফোন করে আচমকা আবদার, ‘মানিকদা, আপনার সঙ্গে শুধু থাকতে চাই!’ জবাবে সত্যজিতের সাগ্রহ সম্মতি, ‘বেশ তো, চলে এসো!’ ছোট্ট সংলাপ। যার মধ্যেই ধরা পড়ে দুজনের সম্পর্কের গভীরতা ।

স্মৃতিকথার ধাঁচে মৈত্রী ও সখ্যের বিবরণ দিয়েছেন রঘু। লিখেছেন ‘বিয়িং উইথ দাদু: সত্যজিৎ রায়’। শুধুমাত্র ফটোগ্রাফি বই নয়—এই গ্রন্থ সময়ের প্রাণময় দলিল। এক অনুপম সাংস্কৃতিক বিনিময়। যার প্রতিটি ছত্রে ধরা পড়েছে এক ফেলে আসা মুহূর্ত, যেখানে দুই শিল্পী একে অপরের আয়নায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

আজ সশরীরে নেই রঘু রাই। কিন্তু তাঁর তোলা সেই আলো-আঁধারি ছবিগুলো রয়ে যাবে। শুটিংয়ের সেটে দু’হাতের বিশেষ মুদ্রায় নিমগ্ন সত্যজিৎ, লেন্স পেতে চাতকপিয়াসী রঘু রাই… সততই অবিনশ্বর।

‘না, মানিকদা। এখনও হয়নি। যা চাইছি, তা পাচ্ছি না’। কথাগুলি লেখা রয়েছে দেশের ফটোগ্রাফির জনক রঘু রাইয়ের একটি বইতে। তখন ‘ঘরে-বাইরে’ ছবির শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত প্রবাদপ্রতিম পরিচালক সত্যজিৎ রায়। পরিচালক মানিকদার নিজস্ব ছবি তুলতে সেখানে হাজির, আরেক কিংবদন্তি। রঘু রাই লিখেছেন, রায়ের ছবি তোলার অনেকদিনের আগ্রহ ছিল। বইতে থাকা ছবি তোলার ঘটনা প্রসঙ্গে লিখেছেন সত্যজিৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি আমার কাছে কী চাও? আমাকে কী করতে হবে?

রাই লিখেছেন, আমার মুখে কথা ফুটল না। ভাবতে পারছিলাম না, কী বলব! ভয়ে ভয়ে এবং একটা অস্বস্তিকর পরিবেশে বেশ কয়েকটা ছবি নিলাম। কিন্তু, কিছুতেই আমার শান্তি আসছিল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই উনি বললেন, কী এবার হয়েছে তো? জবাবে আমি বললাম, না, মানিকদা, এখনও হয়নি!

আমার প্রতিবাদ শুনে উনি একটু মুচকি হাসলেন। আমি আরও কয়েকটা ছবি তুললাম। কিছুক্ষণ পরেই দৃশ্যগ্রহণের সাময়িক বিরতি ঘটল। উনি শ্যুটিংয়ের খাটেই আধশোয়া হলেন। হাতে ছিল সেই চিরাচরিত পাইপ। সেই সময় তাঁর ছবির নায়িকাও বিছানায় বসেছিলেন। আমি কয়েকটা ছবি নিলেও আমি বিছানার অন্যদিকে চলে গেলাম। যেখান থেকে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, সত্যজিৎ রায়ের পিছনের দেওয়ালটাই কেবল দেখা যাচ্ছে। দেখলাম জানালা দিয়ে আসা আলোটাও বেশ ফিনফিনে হয়ে ঘরে ঢুকছে। আপনারা দেখতে পাবেন লাগোয়া ঘরটির দরজা এবং খাটের একটা সুন্দর ছায়া দেওয়ালের উপর এসে পড়েছে। আমার মুখ দিয়ে আপনিই বেরিয়ে এল, মানিকদা এদিকে তাকান। আমার চিৎকারে উনি মুখ ফেরালেন। অবাক বিস্ময়ে! এটাই সেই মুখের ভাবের সহজাত অভিব্যক্তি। লিখেছেন রঘু রাই।

ছবিকে ভালবেসে তিনি হাজির হয়েছিলেন গঙ্গা নদীর কোলে বাঙালির বসতবাটি কলকাতা শহরেও। ভালবেসে ফেলেছিলেন কল্লোলিনীর জীবন-তরঙ্গকে। তার অনেক আগে থেকেই কলকাতা রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়ে রয়েছে। রঘু রাই ছবি তুলেছেন মাদার টেরিজার, কালীর। রঘু রাই বুঝেছিলেন এই শহরের একটি নিজস্ব আত্মা রয়েছে। যমুনার কোলের ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে ইন্দিরার পাশ ঘেঁষে হাজির হয়েছিলেন গঙ্গামাতৃক কালীর শহরে।

সত্যজিৎ রায়ের নাম জানতেন, তাঁর ছবিও দেখেছিলেন রঘু রাই। তিনি তখন নয়াদিল্লির স্টেটসম্যান অফিসে চাকরি করেন। সত্যজিৎ তখন দিল্লিতে ২২ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মঞ্চ থেকে তিনটি জাতীয় পুরস্কার নিয়ে নেমে আসছেন। রঘু রাই তাঁকে বলেন, মিস্টার রে, আপনার হাতে খুব ভারী জিনিস হয়ে গেছে। আপনার একটু সাহায্য পেলে বোধহয় ভাল হয়। সত্যজিৎ বলেন, এবারে বোধহয় নয়, আমি খুশি আপনার ব্যবহারে।

কয়েক বছর পরেই রাই ও রে-র আবার সাক্ষাৎ হয় এক বিচারকমণ্ডলির সারিতে। সেখানে ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, ভাস্কর রামকিঙ্কর বেজও। সেই থেকে সত্যজিৎকে এতটাই ভালবেসে ফেলেন রঘু রাই যে, তাঁকে দাদু বলে ডাকতেন। রঘু রাইকে ভারতীয় আলোকচিত্রের জনক বলা হয়। লোকে বলে ছবি কথা বলে। কিন্তু, রঘু রাই সেই হাতে গোনা ফটোগ্রাফারের একজন, যাঁর ছবি মানুষকে দিয়ে কথা বলিয়ে নেয়। প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি করে। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিনোদনের ভাষাকে বিপ্লব ও সমাজ বদলের ভাষায় পরিণত করেছিলেন। বাংলাদেশ যুদ্ধ, শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের দুর্দশা, মন্বন্তর, ৭১-এর যুদ্ধে খাদ্য সঙ্কট থেকে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার মর্মন্তুদ অশ্রু তাঁর সাদা-কালো ফ্রেমে গোটা দেশের চোখে জল এনে দিয়েছিল। মাদার টেরিজা, বিসমিল্লা খান, দলাই লামা, রবিশঙ্কর, জাকির হোসেন, পণ্ডিত ভীমসেন জোশি থেকে শর্মিলা ঠাকুর-পতৌদি, অপর্ণা সেন- কার মুখ নেই লেন্সের দৃষ্টিতে।

অথচ, ছোট থেকে তাঁর চোখে ফটোগ্রাফার হওয়ার কোনও স্বপ্ন ছিলই না। তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হবে। আর নিজে চেয়েছিলেন গানবাজনায় নামডাক হবে। সেই মানুষটাই বাবার ইচ্ছেয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও ২৩ বছর বয়সে তুলে নেন সমাজ-জব্দ করার অস্ত্র ক্যামেরা। রঘু রাইয়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতের (বর্তমানে পাকিস্তান) পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং গ্রামে ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৭২ সালে পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী সম্মান। চারজনের মধ্যে সকলের ছোট ছেলে ছিলেন। রঘুর দাদা ছিলেন স্টেটসম্যানের ফটোগ্রাফার। একদিন দাদার ক্যামেরা খেলার ছলে নিয়ে রঘু একটি গাধার ছবি তোলেন। ডেভেলপ করার পর সেই দাদাই ছবিটি লন্ডনের দ্য টাইমসে পাঠিয়ে দেন। সেই ছবি ছাপা হওয়ার পরেই রঘু রাইয়ের জীবন বদলে দেয় সেই গাধা।

তাঁর কথায়, আমি যখন একটা ক্যামেরা হাতে তুলে নিই। তখন আমার সম্পূর্ণ জীবনীশক্তি ওই অতটুকু ভিউফাউন্ডারে ঢুকে পড়ে। আমি ভাবি কী দেখছি আমি। আমার কাছে ক্যামেরা হল খুব কাছ থেকে জীবনকে দেখার একটি মাধ্যম। স্টেটসম্যানে চাকরি পাওয়ার পর ১৯৬৬ সালে তিনি সেখানকার চিফ ফটোগ্রাফার হন। তারপর কাজ করেন সানডে ও ইন্ডিয়া টুডেতে। ১৯৭৭ সালে তিনি ম্যাগনাম ফটো এজেন্সিতে নির্বাচিত হন। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চিত্র সাংবাদিকতার জনক হেনরি কার্টিয়ের-ব্রেসন।

রঘু রাই একবার বলেছিলেন, দক্ষতা কখনও শেখানোর বস্তু নয়। সেটা নিজেকে অর্জন করতে হয়। আমি তোমাদের একটা ক্যামেরা দিতে পারি, কিন্তু তোমার মধ্যে ‘দর্শন’ দিতে পারি না। সাদা-কালো ছবি নিয়ে বলেছিলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি খুব ভাল। এবং এতে করে তুমি ক্যামেরাকে অটো ফোকাস, অটো এক্সপোজারে নিয়ে যেতে পার। যাতে সুন্দর ছবি আসবে। কিন্তু আমি আমার ছবিকে সাদা-কালোয় দেখতে চাই।

রঘু রাই তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়টাই অ্যানালগ ক্যামেরায় ছবি তুলেছেন। এরপর এসেছে ডিজিটাল এবং আইফোন ফটোগ্রাফির যুগ। রাই তার সবকটাকেই স্বাগত জানিয়েছেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে ক্যামেরার সঙ্গে যুগলবন্দি বেঁধে বহু ইতিহাসকে ফ্রেম করে রেখেছেন রাই। তিনি বলেছেন, যদি কোনও সঙ্কটময় পরিস্থিতি আসে, একটি ফটোই পারে সেই অভিব্যক্তিকে ধরে রাখতে। যেমন তোমার সামনে একটি আয়না ধরলে হবে, ক্যামেরা সেই কাজটাই করে দেখায়।

তিনি নব্য ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, একটি ছবি অতিরিক্ত এডিটিং ও টেকনিক্যালিটিজ দিয়ে ভারী করা উচিত নয়। এসব করলে ছবির মূল গন্ধটাই হারিয়ে যায়। তাঁর কথায়, জো দিল সে নেহি বোলেঙ্গে উও আওয়াজ কা ফ্যায়দা নেহি। আজকালকার বাচ্চারা এত এডিট করে, এত টেকলিক্যালিটি দিয়ে ছবিকে ভারী করে তোলে সেটা উচিত নয়। একটি ছবি যতক্ষণ না হৃদয় দিয়ে তোলা হবে, সেখানে এসবের কোনও অর্থ নেই। ছবি ক্যামেরা তোলে না, তোমাদের হৃদয়ে ক্লিক করবে, তবেই সেটা ছবি হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles