RK NEWZ আড়াই দশক ধরে এ দেশের নবীন প্রজন্মকে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। স্বপ্নের সেই ফেরিওয়ালাকে বর্তমানে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সরকার-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য শাসনব্যবস্থা ও শাসকের বদল ঘটানো হলে কিছুতেই তা ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘বেআইনি’ হতে পারে না। ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘বেআইনি’ তখনই হয় যদি সেই আন্দোলনের চরিত্র সহিংস হয়ে ওঠে। ইদানীং দু’টি ইংরেজি শব্দ ভারতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছে– ‘রেজিম চেঞ্জ’। শব্দ দু’টি দেশের শাসক দল বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তারা মনে করছে, শুধু মনেই করছে না, তারা বিশ্বাসও করছে, নেহা বোরা ও প্রশান্ত ভূষণ তাদের হাতে মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। সেই অস্ত্রের প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা তরুণ প্রজন্ম ও বিরোধীদের নবতম আন্দোলন পর্বের ইতি ঘটাবে। সেই প্রচেষ্টায় কোনও ঘাটতিও তারা রাখছে না। দেশব্যাপী প্রচার শুরু করে দিয়েছে। ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কথা বলেছিলেন প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। নয়াদিল্লির প্রেস ক্লাবে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, এখন নির্বাচন ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনার দাবিতে তাঁরা লড়াই করছেন। কিন্তু আন্দোলন বন্ধ করতে সর্বাত্মক সরকারি বর্বরতা চলতে থাকলে শাসন পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর লড়াই শুরু হবে। বলেছিলেন, আমরা সবাই শাসক ও শাসনের বদল চাই। ‘রেজিম চেঞ্জ’ চাই। এর ঠিক আগের দিন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে এক ভিডিও বার্তায় নেহা বোরা বলেছিলেন, বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সে দেশের ‘সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্টস ফ্রন্ট’-কে শুভেচ্ছা জানিয়ে সেই বার্তায় তিনি বলেছিলেন, আন্দোলনের পথ দেখানোর জন্য বাংলাদেশকে অভিনন্দন।
নেহা বোরার পরিচয় আর নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন ‘আইসা’-র ২৯ বছর বয়সি এই নেত্রী এখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ‘পোস্টার গার্ল’। রাহুল গান্ধী তাঁকে অন্যদের সঙ্গে তাঁর বাসভবনের লনে চায়ের আসরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে সাংবাদিকদের সামনে তাঁকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট অভিযানে নিজের পাশে থাকার জায়গা করে দিয়েছেন। উত্তরাখণ্ডের এই ডাকাবুকো মেয়ে বলেছেন, তাঁর মা-বাবা বিজেপির ঘোর সমর্থক। অথচ তিনি মা-বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করেননি। এই কন্যা, যিনি এ দেশের ‘জেন জি’ তো বটেই, ‘জেন আলফা’-রও রোল মডেল হয়ে উঠেছেন, তাঁকে কীভাবে দমানো যায় সরকার এখনও তা বুঝে উঠতে পারেনি। ‘ককরোচ’ নেতাদের দিয়ে ‘শান্তি বন্ড’-এ সই করাতে পারলেও নেহাকে তারা রাজি করাতে পারেনি। তিনি বেঁকে বসেছেন। বলেছেন, কোনও রকম ‘পিস বন্ড’-এ সই করবেন না। দেখা যাক, জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। বিজেপি ‘রেজিম চেঞ্জ’ শব্দ দু’টি লুফে নিয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনকে তারা যে-ধরনের ‘চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-এর মোড়কে হাজির করাচ্ছে– এই শব্দদ্বয় সেক্ষেত্রে তাদের কাছে পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার শামিল। কেন্দ্র ও রাজ্যস্তরের বড়-মেজ, সেজ-ছোট সব নেতাই এক সুরে এক ঢঙে বলতে শুরু করেছেন, মোদির নেতৃত্বে শক্তিশালী ভারত যারা দেখতে চায় না, তারা চাইছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মতো রাস্তায় নেমে সরকারের বদল ঘটাতে। আরএসএস সংঘচালক মোহন ভাগবত পর্যন্ত ফ্রান্স, আলবেনিয়া, বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই পশ্চিমি-চক্রান্ত ব্যর্থ করা প্রতিটি দেশপ্রেমী ভারতীয়র লক্ষ্য হওয়া উচিত। নেহা বোরা ও প্রশান্ত ভূষণের কথা তুলে ধরে বিজেপি প্রচার শুরু করেছে, সরকার ফেলে দেওয়াই এদের লক্ষ্য। সেজন্য সারা দেশে তারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছে। এটাই তাদের অঘোষিত লক্ষ্য। বিরোধীদের ঝোলা থেকে সেই বিড়ালছানা বেরিয়ে পড়েছে।
বিরোধী-আন্দোলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিজেপি ‘রেজিম চেঞ্জ’ শব্দদ্বয় এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন ওই কথা উচ্চারণ করা ঘোরতর অন্যায়! বিশ্বের যে কোনও গণতান্ত্রিক দেশেই আন্দোলন করা জনগণের মৌলিক অধিকার। যা কিছু অন্যায় বলে মনে হবে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই আন্দোলন। সেই আন্দোলনের প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন রকমের। মহাত্মা গান্ধী আজীবন অহিংস শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলে গিয়েছেন। অসহযোগ আন্দোলনের হদিশ দিয়েছেন। অনশনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন। সেই কারণেই সারা বিশ্বে এখনও তিনি সমাদৃত। পূজিত। বন্দিত। গান্ধীজির যে তিন প্রধান আন্দোলন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল, ভুললে চলবে না, সেগুলির প্রতিটির লক্ষ্য ছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’। ১৯২০ সালে তিনি শুরু করেন অসহযোগ আন্দোলন। প্রেক্ষাপটে একবার চোখ বুলিয়ে নিন। ১৯১৯ সালে পাস হয় রাওলাট আইন, যা যে কোনও ভারতীয়কে বিনা বিচারে ও বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের অধিকার দিয়েছিল। সেই বছরেই ঘটানো হয় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নাইটহুড’ খেতাব ত্যাগ করেন। পরের বছর গান্ধীজি শুরু করেন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন।
‘ককরোচ’ নেতাদের দিয়ে ‘শান্তি বন্ড’-এ সই করাতে পারলেও নেহাকে তারা রাজি করাতে পারেনি। তিনি বেঁকে বসেছেন। বলেছেন, কোনও রকম ‘পিস বন্ড’-এ সই করবেন না। দু’-বছর পর ১৯২২ সালে গোরক্ষপুর সহিংসতায় মর্মাহত গান্ধীজি আচমকা সেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। রেজিম চেঞ্জের লক্ষ্যে গান্ধীজির দ্বিতীয় বড় আন্দোলন ছিল ১৯৩০-’৩৪-এর আইন অমান্য আন্দোলন। পূর্ণ স্বরাজের লক্ষ্যে সেই আন্দোলন তিনি শুরু করেছিলেন ডান্ডি মার্চ দিয়ে। সবরমতি আশ্রম থেকে পদযাত্রা শুরু করে ডান্ডি উপকূলে গিয়ে লবণ আইন অমান্য করেছিলেন। তৃতীয়টি ‘ভারত ছোড়ো আন্দোলন’ বা ‘কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট’। ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট যে আন্দোলনের শুরু, বহু বাধা বহু বিপত্তি বহু প্রাণের বিনিময়ে পাঁচ বছর পর তা স্বাধীনতা এনেছিল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট হয়েছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’। সরকার-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য শাসন ব্যবস্থা ও শাসকের বদল ঘটানো হলে কিছুতেই তা ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘বেআইনি’ হতে পারে না। ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘বেআইনি’ তখনই হয় যদি সেই আন্দোলনের চরিত্র সহিংস হয়ে ওঠে। ককরোচ জনতা পার্টি কিংবা ‘জেন জি’, ‘জেন আলফা’ অথবা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ‘রেজিম চেঞ্জ’ আন্দোলনও তাই যেমন বেআইনি নয়, তেমনই তা মোকাবিলার পূর্ণ অধিকারও সরকারের আছে। বিরোধী ও সরকার, দু’-তরফের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া নাযায়েজ হবে আন্দোলনের চরিত্র সহিংস হয়ে উঠলে। ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কথা বলে প্রশান্ত ভূষণ অন্যায় কিছু করেননি। সরকারও মনে করতেই পারে, এভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্য দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা। সন্দেহ নেই, শাসককে চ্যালেঞ্জ জানানোর চরিত্র ও প্রকৃতি দ্রুত বদলে গিয়েছে। সরকারের প্রতিপক্ষ যারা, চিরায়ত প্রথাগত রাজনীতিতে তারা বিশ্বাসী নয়। রাজনীতির গতানুগতিক ধারাবাহিকতায় গা ভাসাতে তারা রাস্তায় নামেনি। তাই প্রথাগত মোকাবিলা সরকারের পক্ষে হিতে বিপরীত হতে পারে।
আড়াই দশক ধরে এ দেশের নবীন প্রজন্মকে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। স্বপ্নের সেই ফেরিওয়ালাকে এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে আশাভঙ্গের জাঁতাকলে পিষ্ট সেই নবপ্রজন্মই। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি, একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের মধ্য দিয়ে স্বপ্নভঙ্গ, বৈশ্বিক রাজনীতির গেরোয় কর্মসংস্থানের সংকোচন ও আর্থিক প্রবৃদ্ধির নিম্নগামিতা সার্বিক হতাশার যে-জাল বিছিয়ে চলেছে, নির্বাচন কমিশনের খামখেয়ালিপনা ও রাজনীতিকরণ হতাশার সেই ধিকিধিকি আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। যন্তর মন্তরে জমায়েত নিষিদ্ধ করা, ‘পিস বন্ড’-এ সই আদায় এবং পুলিশি দমন-পীড়ন শান্তি স্বস্ত্যয়ন এনে দেবে, এমন মনে করাটা হয়তো অতি সরলীকরণ হবে।
১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট যে আন্দোলনের শুরু, বহু বাধা বহু বিপত্তি বহু প্রাণের বিনিময়ে পাঁচ বছর পর তা স্বাধীনতা এনেছিল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট হয়েছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’। ভৌগোলিক বিশালত্ব, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বিপুল বৈচিত্র উপমহাদেশের অন্য দেশগুলি থেকে ভারতকে পৃথক করে রেখেছে। ভারতের সেনা বাহিনীর ভাবনা-চিন্তা-চরিত্রও উপমহাদেশীয় চরিত্র থেকে আলাদা। নেহা বোরা-রা বাংলাদেশ থেকে প্রাণিত হতে পারেন, কিন্তু ভারতের পক্ষে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপাল হয়ে ওঠা কঠিন। এই সত্য– শাসকের শ্লাঘা কিংবা স্বস্তির কারণ হলেও হতে পারে, তবে তা জনগণের বিশ্বাসের ঘাটতি মেটাতে পারবে কি? জ্ঞানেশ কুমারকে বহাল রেখে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফেরানো অসম্ভব। তাঁকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন। এমন সসেমিরা হাল নরেন্দ্র মোদির আগে হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট কি তাঁর মুশকিল আসান হয়ে উঠবে?





