Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

‘‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’’!‌ ঘোষনা কার?‌ ‘‘ঘটনার পর থেকেই বাড়ি ফেরেনি ‘‘ভাইপো’’

RK NEWZ ‘‘ভাইপো’’র বাড়ি মণ্ডপ থেকে ৫০ মিটারের মধ্যে অমর বসু সরণিতে। প্রথম জনের বাড়িতে গেলে তাঁর পিসি বলেন, ‘‘ঘটনার পর থেকেই বাড়ি ফেরেনি ‘‘ভাইপো’’ । আমরাও যোগাযোগ করতে পারিনি।’’ তাঁর ‘‘ভাইপো’’ পাড়ার পুজোয় থাকেন। তবে ঘটনার সময় তিনি মণ্ডপে ছিলেন কি না তা পিসির জানা নেই। আরও এক জনের বাড়ি প্রথম জনের পাশেই। পেশায় অ্যাপ ক্যাব চালক সেই ব্যক্তি ঘটনার পর থেকে পাড়ায় নেই। তাঁর স্ত্রীর অভিযোগ, আসল দোষীকে আড়াল করে তাঁর স্বামীকে ফাঁসানো হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে খবর, দু’জনেরই মোবাইল বন্ধ। তাঁদের পাকড়াও না-করা পর্যন্ত স্পষ্ট হবে না, কেন ওই সময় ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন তাঁরা? স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁরাই ঘোষণা করেছিলেন, না কি কেউ তাঁদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ঘোষণা করতে— তা-ও স্পষ্ট হবে। ওই দু’জনের পাশাপাশি, স্থানীয়দের একাংশের দাবি, অভিষেক হোড় ওরফে সোনাই নামে ক্লাবের এক সদস্যও ওই সময় পুজোর অফিসঘরে ছিলেন। ঘোষণায় যে গলার আওয়াজ তাঁরা শুনতে পেয়েছেন তার সঙ্গে অভিষেকের গলার মিল রয়েছে বলেও দাবি। অভিষেককে পাড়ায় পাওয়া না-গেলেও ফোনে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিষেকের কথায়, ‘‘আমি দুর্ঘটনার ১০-১৫ মিনিট আগেই পার্বতী ঘোষ লেন ধরে ছেলেকে বিধান সরণিতে নিয়ে যাই। মণ্ডপে উপস্থিত ছিলাম না। ফলে জানি না কে ঘোষণা করেছেন।’’ চোরবাগানের পুজোর ‘ফিল্ড সেক্রেটারি’ অমর পাল। তাঁরও হদিস মেলেনি বাড়িতে। তবে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার সময় আমি মণ্ডপে ছিলাম না। অফিস ঘর খোলাই থাকে। আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় কে ঘোষণা করেছেন।’’ এই ধরনের কিছু ঘোষণা করতে তিনি নির্দেশ দেননি বলেও দাবি করেন অমর।

এখানেই রহস্য তৈরি হয়েছে। মণ্ডপের থিম শিল্পী সুশান্ত পাল জানিয়েছেন, বাইরে যাওয়ার রাস্তার ধারেই অফিসঘর বা ভিআইপি লাউঞ্জ তৈরি করা হয়েছে। তবে দর্শনার্থীদের বেরোনোর পথ থেকে ওখানে ঢোকা সম্ভব নয়। ওখানে যাওয়ার আলাদা একটা পথ তৈরি করা হয়েছিল। ফলে বাইরে থেকে কেউ হঠাৎ ঢুকে ঘোষণা করবেন, সেই সম্ভাবনাও নেই। চোরবাগান বিপর্যয়ের ঘটনায়, ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ ঘোষণা মাইকে বার বার কে বা কারা করেছিলেন? ঘটনার দু’দিন পর মণ্ডপের মধ্যে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এবং ধৃত ক্লাব কর্তাদের জেরা করে দু’জন সন্দেহভাজনের নাম পেয়েছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। অন্য দিকে, চোরবাগান বিপর্যয়ের তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করল কলকাতা পুলিশ। গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের ওই বিশেষ তদন্তকারী দল কাজ করবে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার পাশাপাশি, শনিবার ওই সময়ে মণ্ডপে উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে শুরু করে ক্লাব সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্ঘটনার ঘটনাক্রম পুনর্নির্মাণ করছেন তদন্তকারীরা। এক তদন্তকারী আধিকারিকের কথায়, ‘‘প্রবল বৃষ্টির জন্য বাইরে যাওয়ার গেট আটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেক দর্শনার্থী। অন্য দিকে ‘প্রবেশ পথ’ খোলা থাকায় মণ্ডপের মধ্যে ঢুকে পড়া দর্শনার্থীদের চাপে মাঝে পড়ে যাওয়া অনেকেই অসুস্থবোধ করতে থাকেন।’’ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, গ্রিলে ঘেরা ঘোরানো উড়ালপথের উপরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গিয়েছেন কয়েক জন দর্শনার্থী। অন্য একটি ভিডিয়ো দেখা যাচ্ছে, বাইরে যাওয়ার গেট থেকে মণ্ডপের ৮-১০ মিটার ভিতরে প্রবল ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মাটিতে পড়ে গিয়েছেন কয়েক জন। আতঙ্কে অনেকে চিৎকার করছেন। এক পুলিশকর্মী ক্রমাগত কাউকে ফোন করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন। তাঁকে ধরে এক জন মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছেন। এ রকম একটা আপৎকালীন এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই মণ্ডপ থেকে কেউ মাইকে ঘোষণা করেন, ‘‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে।’’ সেই ঘোষণায় সবাইকে দ্রুত মণ্ডপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়। ওই ঘোষণায় আতঙ্কিত হয়ে আরও বেশি হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। বাজেয়াপ্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজও সেই ঘটনাক্রমকে সমর্থন করছে বলে তদন্তকারীদের ইঙ্গিত। চোরবাগানের মণ্ডপের বাইরে যাওয়ার পথেই ছিল ক্লাব সদস্য এবং বিশেষ অতিথিদের বসার ঘর। সেখান থেকে মাইকে ঘোষণার ব্যবস্থাও ছিল। লালবাজার সূত্রে খবর, ঘোষক হিসেবে দু’জন অভিযুক্তের নাম উঠে এসেছে তদন্তে।

তদন্তকারীদের ইঙ্গিত, তাঁরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছেন। প্রথমে তাঁরা চিহ্নিত করেছেন কে বা কারা ঘোষণা করেছিলেন? দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্লাবের কর্মকর্তাদের কার কী ভূমিকা ছিল? ওই দিন ঘটনার সময় কে কে উপস্থিত ছিলেন? এক তদন্তকারীর কথায়, ‘‘ক্লাবের সদস্য থেকে শুরু করে পুলিশের যে কর্মীরা দুর্ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’’ কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস সরব হয়েছে, জোর করে চোরবাগান পুজো কমিটির দখল নিয়ে। তাঁদের নিশানায় স্থানীয় বিধায়ক বিজয় ওঝা থেকে শুরু করে উত্তর কলকাতার বিজেপি নেতা তমোঘ্ন ঘোষও রয়েছেন। এ ছাড়া পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘‘ভাইপো’’ দেবদীপ অধিকারীর নাম প্রকাশ্যে আসার পর, তিনিও বিরোধীদের নিশানায়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই কমিটি দখলের জন্য প্রসেনজিৎ সাহা ওরফে বুবাই এবং প্রীতম কর্মকার নামে দু’জন ক্লাব কর্তার ভূমিকা নিয়েও বার বার প্রশ্ন তুলেছেন। কলকাতা পুলিশের এক কর্তার কথায়, ‘‘একটা পুজোয় কেউ আলঙ্কারিক কোনও পদে থাকতেই পারেন। কিন্তু পুজোর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সেটাকে হাতেকলমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির ভূমিকা কতটা সেটা দেখতে হবে!’’ যাঁরা প্রথম উদ্ধারকাজে নেমেছিলেন, সেই স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আপৎকালীন বেরোনোর দরজা পুরো খোলা ছিল না। শিল্পী সুশান্তের কথায়, ‘‘পার্কের তিনটি গেটের মধ্যে বড় দু’টিকে প্রবেশ এবং প্রস্থানের দরজা হিসেবে মণ্ডপে ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয় একটি চার ফুটের গেটকে ব্যবহার করা হয়েছে আপৎকালীন দরজা হিসাবে। ক্লাবের কর্তা অমর দাবি করেছেন, ‘‘মণ্ডপের বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি যে ঘরে রাখা ছিল, তার দেখভালের জন্য যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছে ওই আপৎকালীন দরজার চাবি দেওয়া ছিল।’’

পুলিশ এখনও পর্যন্ত তদন্ত করে যা পেয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য সংগ্রহ থেকে স্পষ্ট, কমিটির কর্তাদের কথাতেও অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। পাশাপাশি, দর্শনার্থীরা যখন প্রথম অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন তখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে পুলিশ ও ক্লাবসদস্যেরা ব্যর্থ হয়েছেন। তার জন্য নতুন কমিটির সদস্যদের অনভিজ্ঞতাকেই দুষছেন স্থানীয়েরা। দুর্ঘটনার পর থেকে পুজো কমিটির অধিকাংশ সদস্যই এলাকায় নেই। নিয়ম মেনে প্রতিমার পুজো করছেন পুরোহিত এবং তাঁকে সহায়তা করছেন দু’জন স্থানীয় মহিলা। কিন্তু গোল বেধেছে বিসর্জন নিয়ে। ক্লাবের কর্মকর্তারা উপস্থিত না-থাকলে বিসর্জন কী ভাবে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পুলিশ প্রশাসন কি বিসর্জনের ব্যবস্থা করবে? সংশয়ে ক্লাবের সাধারণ সদস্য থেকে এলাকার মানুষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles