RK NEWZ ১৯৮২ সালে প্রথম এশিয়ান গেমসে মহিলা হকি দল সোনা জিতেছিল। তার পর থেকে সোনা আসেনি। শুক্রবার সেই খরা কাটালেন সালিমা টেটেরা। সোনা জিতল ভারত। এ দিন মোট ছ’টি সোনা জিতেছে দেশ। ইতিহাস গড়ল ভারতের মহিলা হকি দল। এশিয়ান গেমসে ৪৪ বছর পর সোনা জিতল তারা। শুক্রবার ফাইনালে চিনকে ১-০ গোলে হারাল ভারত। একমাত্র গোল লালরেমসিয়ামির। ১৯৮২ সালে প্রথম এশিয়ান গেমসে মহিলা হকিতে সোনা জিতেছিল ভারত। তার পর এ বারই সোনা জিতল তারা। চলতি এশিয়ান গেমসে ১৬টি সোনা হল ভারতের। মহিলা হকিতে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সের টিকিটও নিশ্চিত হয়ে গেল। শুক্রবার ছ’টি সোনা জিতেছে ভারত। বক্সিংয়ে সোনার হ্যাটট্রিক হয়েছে। এ ছাড়াও সোনা এসেছে হকি, কুস্তি এবং তিরন্দাজি থেকে। ফলে পদকতালিকাতেও এক লাফে পাঁচে উঠে এসেছে ভারত। এই মুহূর্তে ভারতের ১৬টি সোনার পাশাপাশি ২৫টি রুপো এবং ৩৫টি ব্রোঞ্জ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৭৬টি পদক।
হকিতে ইতিহাস
এ দিন ভারতীয় সময় দুপুর ৩.৩০টে থেকে খেলা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যামে দুই দলের বাসই আটকে যায়। ফলে বেশ কিছুটা দেরি করে স্টেডিয়ামে পৌঁছয় দুই দল। ম্যাচ শুরু হয় ৪.৩০টে থেকে।
ম্যাচের আগে সম্মান জানানো হয় লালরেমসিয়ামিকে। তিনি ২০০তম ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন। সেই ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখলেন গোল করে। তাঁর একমাত্র গোলেই ভারত এশিয়াডে সোনা জিতল দীর্ঘ দিন পর।
গত অলিম্পিক্সে রুপো পেয়েছিল চিন। মহিলাদের হকিতে তারা যথেষ্ট শক্তিশালী দল। এ দিন শুরু থেকেই আক্রমণ করতে থাকে তারা। বার বার ঢুকে পড়তে থাকে ভারতের ডি বক্সে। তবে খেলার বিপরীতে গিয়ে প্রথম কোয়ার্টারেই এগিয়ে যায় ভারত। চিনের ডি বক্সে বল পেয়েছিল ভারত। বৃত্তের মধ্যে থেকে লালরেমসিয়ামির শট গোলে ঢুকে যায়। তিন মিনিট পর পেনাল্টি কর্নার পেলেও কাজে লাগাতে পারেনি ভারত।
দ্বিতীয় কোয়ার্টার থেকে আক্রমণের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে দেয় চিন। গোল লাইন সেভ করেন নবনীত কৌর। কিছু ক্ষণ পর পেনাল্টি স্ট্রোক পায় চিন। বক্সের মধ্যে ফাউল করা হয়েছিল চিনের এক খেলোয়াড়কে। তবে ভারতের গোলকিপার সবিতা পুনিয়া অসাধারণ দক্ষতায় সেই পেনাল্টি স্ট্রোক বাঁচিয়ে দেন। চিনের ঝাং ইংয়ের শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বাঁচিয়ে দেন সবিতা।
তৃতীয় কোয়ার্টারের শুরুতেই আবার পেনাল্টি স্ট্রোক পেয়েছিল তিন। বল নবনীতের পায়ে লেগেছিল। কিন্তু রেফারালের পর সেই সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। পেনাল্টি কর্নার থেকে চিনের প্রয়াস রুখে দেন সালিমা টেটে।
খেলা যত গড়াতে থাকে, চিনের দাপট তত বাড়তে থাকে। ম্যাচ পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছিল তারা। ভারত আক্রমণে উঠতেই পারছিল না। কোনও মতে রক্ষণ করে কাটিয়ে দিচ্ছিল। বেশি ক্ষণ রক্ষণ করে জেতা যায় না। কিন্তু ভারতের রক্ষণ এতটাই জমাট ছিল যে চিন দাঁত ফোটাতে পারছিল না। শেষের দিকে চিন গোলকিপারকে তুলে নিয়ে ফিল্ড খেলোয়াড় নামিয়ে দেয়। একটানা আক্রমণ করেও লাভ হয়নি।
হুটার বাজতেই আনন্দে ফেটে পড়েন ভারতের খেলোয়াড়েরা। কোচ শোয়ার্ড মারিন সাপোর্ট স্টাফদের জড়িয়ে ধরে লাফাতে থাকেন। এর পর মাঠে গিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠেন।
সকালে জোড়া সোনা
শুক্রবার সকালে মহিলাদের বক্সিংয়ের ৭৫ কেজি বিভাগে সোনা জেতেন লভলিনা বরগোঁহাই। সোনা আসে মেয়েদের রিকার্ভ তিরন্দাজির দলগত ইভেন্টেও। রিকার্ভ তিরন্দাজির মিক্সড দলগত বিভাগে অবশ্য রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় ভারতীয় দলকে।
প্রত্যাশা মতোই নাগোয়া গেমসে সোনা জিতলেন লভলিনা। ফাইনালে চিনের বাও জ়িয়াইকে হারালেন অলিম্পিক্স পদকজয়ী ভারতীয় বক্সার। ফাইনালের প্রথম থেকেই আগ্রাসী মেজাজে ছিলেন লভলিনা। প্রথম রাউন্ডে ৩-২ ব্যবধানে জেতেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে গতি আরও বাড়িয়ে দেন লভলিনা। জ়িয়াইকে প্রায় কোনও সুযোগই দেননি। লভলিনার অনুকূলে ফল দাঁড়ায় ৪-১। তৃতীয় রাউন্ডেও লভলিনার সামনে সুবিধা করতে পারেননি চিনা বক্সার। তৃতীয় রাউন্ডও লভলিনা জেতেন ৪-১ ব্যবধানে। গত বারের এশিয়ান গেমসে রুপো পেয়েছিলেন লভলিনা। এ বার বদলে ফেললেন পদকের রং। প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এশিয়াডের সোনা জিতলেন নিজের জন্মদিনেই। শুক্রবারই ২৯ বছর পূর্ণ করেন লভলিনা।
লভলিনার আগে দেশকে দিনের প্রথম সোনা এনে দেন মহিলা খেলোয়াড়েরা। মেয়েদের রিকার্ভ তিরন্দাজির দলগত ইভেন্টে সোনা জেতে ভারত। অঙ্কিতা ভকত, কীর্তি এবং কুমকুম মোহদ সেমিফাইনালে চিনকে ৫-১ ব্যবধানে হারান। ভারতীয় দল প্রথম সেট জেতে ৫৩-৫১ ব্যবধানে। দ্বিতীয় সেটে ৫৪-৫২ পয়েন্টে জয় পায়। তৃতীয় সেট ৫১-৫১ পয়েন্টে ড্র হওয়ায় চতুর্থ সেট খেলার আর প্রয়োজন হয়নি। ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ফাইনালে ভারত জেতে ৫-৩ পয়েন্টে ব্যবধানে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় দু’দলের মধ্যে। প্রথম সেট ৫৪-৫৪ ব্যবধানে ড্র হয়। দ্বিতীয় সেটেও দু’দলের পয়েন্ট হয় ৫৬। তৃতীয় সেটে এগিয়ে যায় ভারতীয় দল। ৫৫-৫১ ব্যবধানে জিতে সুবিধাজনক জায়গায় চলে যায়। চতুর্থ সেট আবার ৫৪-৫৪ পয়েন্টে ড্র হয়। এই নিয়ে ভারতীয় তিরন্দাজেরা এ বারের গেমস থেকে চারটি সোনা জিতলেন।
মেয়েদের ইভেন্টে সোনা এলেও রিকার্ভ তিরন্দাজির মিক্সড দলগত ইভেন্টে হেরে যায় ভারত। সেমিফাইনালে জাপানকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ভারতীয় দল। কিন্তু ফাইনালে চিনের কাছে ৩-৫ ব্যবধানে হেরে যায়। ফাইনালের শুরুটা ভাল করতে পারেনি কুমকুম-ধীরজ বোম্মাদেভারা জুটি। প্রথম সেট ৩৪-৩৮ এবং দ্বিতীয় সেট ৩৫-৩৭ ব্যবধানে হেরে চাপে পড়ে যায় ভারতীয় জুটি। তৃতীয় সেট ৩৭-৩৬ ব্যবধানে জিতে আশা জিইয়ে রাখলেও লাভ হয়নি। চতুর্থ সেট ৩৭-৩৭ পয়েন্টে ড্র হয়।
বেলার দিকে বক্সিংয়ে আরও দু’টি সোনা জেতে ভারত। মেয়েদের ৬৫ কেজি বিভাগে সোনা জেতেন পারভিন হুডা। ছেলেদের ৮০ কেজি বিভাগে সোনা জেতেন অঙ্কুশ পাঙ্ঘাল। ছেলেদের ফ্রিস্টাইল কুস্তির ৬৫ কেজি বিভাগে সোনা জেতেন সুজিত কলখল।
২৫ মিনিটে তিন সোনা
এশিয়ান গেমসে ২৫ মিনিটের মধ্যে তিনটি সোনা জেতেন ভারতীয় খেলোয়াড়েরা। দু’টি আসে বক্সিংয়ে। একটি আসে কুস্তিতে। মেয়েদের ৬৫ কেজি বিভাগের ফাইনালে হয় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। চাইনিজ তাইপের অলিম্পিক্স পদকজয়ী চেন নিয়েন চিনকে ৩-২ ব্যবধানে হারালেন পারভিন। প্রথম রাউন্ডে জেতেন পারভিন। দ্বিতীয় রাউন্ড ছিনিয়ে নেন চেন। নির্ণায়ক তৃতীয় রাউন্ডে তুমুল লড়াই হল দুই বক্সারের। শেষ পর্যন্ত তিন জন বিচারক রায় দিলেন পারভিনের পক্ষে। অন্য দুই বিচারক জানান তৃতীয় রাউন্ডে জিতেছেন চেন। টেকনিক্যাল সুপিরিয়রে এগিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত সোনা জেতেন পারভিন।
ছেলেদের বক্সিং থেকেও আসে সোনা। ৮০ কেজি বিভাগের ফাইনালে জেতেন অঙ্কুশ। তাঁকে অবশ্য পারভিনের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার কিম মিনসেয়ঙকে ৪-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেন অঙ্কুশ। অতি আগ্রাসী হতে গিয়ে পয়েন্ট খোয়ান কিম। সুযোগ কাজে লাগাতে ভুল করেননি ভারতীয় বক্সার। বক্সারেরা যখন পর পর সোনা জিতছেন, ঠিক সে সময় কুস্তির রিঙে ঝড় তোলেন সুজিত। ছেলেদের ফ্রিস্টাইল কুস্তির ৬৫ কেজি বিভাগ থেকে ভারতকে এনে দেন নাগোয়া গেমসের ১৫তম সোনা। তাজিকিস্তানের কুদিয়েভ আব্দুলমজিদের সঙ্গে সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় সুজিতের। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় কুস্তিগির ১০-৯ ব্যবধানে জয় পেলেন। তা-ও প্রথম রাউন্ডে ২-৯ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পরও সোনা জেতেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে মরিয়া সুজিতকে রুখতে পারেননি কুদিয়েভ। তাজিক কুস্তিগিরকে ৮-০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন সুজিত।
ব্রোঞ্জ এসেছে সেপকটাকরোয়। ছেলেদের কোয়াড্রান্ট ইভেন্টের সেমিফাইনালে জাপানের কাছে ০-২ সেটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছে ভারতীয় দল। ফলে ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ভারতের পক্ষে ম্যাচের ফল ১২-১৫, ১৩-১৫।




