RK NEWZ একা মেসি এসেছিলেন যখন, খানিক মাঠে চক্কর কাটতে, এই কলকাতা শহর উন্মাদনায় গমগম করছিল। আর এবার আসছে ব্রাজিল। আস্ত টিম। পূর্ণশক্তির দল নিয়ে। একজন ভিনিসিয়াস কিংবা এনড্রিক নন… আগামিকাল পা রাখবে গোটা দল। প্রথম সারির একাধিক তারকা সমেত। হেডস্যারও এলেবেলে কেউ নন। খোদ কার্লো অ্যান্সেলোত্তি। অথচ আদতে শহরের তামাম ব্রাজিল অনুরাগীর যে ফুটবল-জ্বরে কাঁপার কথা ছিল, তার মৃদুতম কম্পনও টের পাওয়া যাচ্ছে না! মনেই হচ্ছে না সামনের শনিবার খাস যুবভারতীতে ব্রাজিলের মুখোমুখি ভারত! সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) টিকিট বিক্রি নিয়ে ফাটকা ফ্লপ করে যাওয়াই কি এর প্রধান কারণ? উঠছে প্রশ্ন। সংশয় জমছে কর্তাদের সদিচ্ছা ও উদ্যোগ নিয়েও। আর এতকিছুর তালেগোলে হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের আগে জোড়া ধাক্কা। চোটের কারণে ময়দানে দেখা যাবে না বার্সেলোনার তারকা ফরোয়ার্ড রাফিনিহাকে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্রিসবেনে ৪-২ গোলে জিতেছিল কার্লো অ্যান্সেলোত্তির দল। ওই ম্যাচে ভ্যান্ডারসন ব্রাজিলকে এগিয়ে দেওয়ার পর সমতা ফেরায় সকারুজরা। প্রথমার্ধের ঠিক আগে পেনাল্টি থেকে গোল করেন রাফিনিহা। এরপরই ডান উরুর পেশিতে টান। বিরতিতেই মাঠ ছাড়েন। স্ক্যান রিপোর্টে চোট খুব গুরুতর না হলেও ঝুঁকি নিতে নারাজ ব্রাজিল। চিকিৎসার জন্য সোজা বার্সেলোনায় উড়ে যাচ্ছেন তারকা উইঙ্গার। আর তাঁর পরিবর্ত হিসেবে কেউ আসছেনও না। ১ অক্টোবর, কলকাতায় পা রাখছে সেলেসাওরা। রাফিনিহা না থাকলেও ভিনিসিয়াস জুনিয়র, এনড্রিকদের নিয়ে তারকখচিত দলই নামবে যুবভারতীর সবুজ গালিচায়। জৌলুস কমছে। আর এরই মধ্যে গ্যালারি ভরানো নিয়ে ঘোর চিন্তায় এআইএফএফ। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সভাপতি কল্যাণ চৌবে ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতার তিন প্রধান এবং আইএফএ-র মাধ্যমে ছাড় দিয়ে টিকিট বিক্রি হবে। কিন্তু সেই কৌশল সুপার ফ্লপ। পরিসংখ্যান বলছে, আইএফএ-কে ২ হাজার টিকিট দেওয়া হলেও তাদের ৩১৫টি অনুমোদিত সংস্থার থেকে মাত্র ২৪টি টিকিটের দাবি এসেছে। মোহনবাগান ৬ হাজার টিকিট পেয়ে বিক্রি করতে পেরেছে সাকুল্যে ৯০টি! ইস্টবেঙ্গল তাদের বরাদ্দ ৪ হাজার টিকিটের মধ্যে মাত্র ৪০০টি চেয়েছে। মহমেডানের অবস্থাও তথৈবচ। মুখ বাঁচাতে এক শীর্ষকর্তা নিজেই ১২টি টিকিট কিনেছেন! এআইএফএফ-এর এই পরিকল্পনা মাঠে মারা যাওয়ার মূল কারণ টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম। ক্লাব ও আইএফএ-কে দেওয়া টিকিটের দাম ছিল ৬ হাজার টাকা। ১০ শতাংশ ছাড়ের পর অঙ্কটা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪০০ টাকা। এক ক্লাব কর্তার স্পষ্ট যুক্তি, ‘অনলাইনে অ্যাপে যেখানে ৩৫০০ টাকায় টিকিট মিলছে, সেখানে কেউ ৫৪০০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটবে কেন?’ স্পনসর সংস্থা স্টাইল বাজার নিজেদের ইনস্টাগ্রাম পেজে গ্রাহকদের জন্য প্রোমো কোড দিয়ে ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফার দিচ্ছে। যা দেখে আরও এক কর্তার শ্লেষ, ‘টিকিট বিক্রি যে তলানিতে, এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।’ খালিদ জামিলের কোচিংয়ে ভারত সদ্য বেঙ্গালুরুতে পানামাকে ১-১ গোলে রুখে দিয়েছে। রায়ান উইলিয়ামস টিমকে এগিয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফেরান ওমর ভ্যালেন্সিয়া। দলের দুরন্ত পারফরম্যান্স। অথচ শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে দর্শক ছিলেন মাত্র ৯০৩৯ জন। পুজো কড়া নাড়ছে দুয়ারে। ৩ তারিখ ব্রাজিলের পর ৬ তারিখ উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ। জোড়া আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলির জন্য দর্শকরা এই উৎসবের মরশুমে গাঁটের কড়ি কতটা খরচ করবেন, তা নিয়ে ঘোর সংশয় ফুটবল মহলে।
৩ অক্টোবর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মুখোমুখি ভারত ও ব্রাজিল। ছ’দিন পর, ৬ অক্টোবর ভারতের সামনে আরও এক কঠিন প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে। কিন্তু এমন ফুটবল মহাযজ্ঞের জন্য কি শুরু থেকে প্রস্তুত ছিল সল্টলেক স্টেডিয়াম? উত্তর, একদমই নয়। ম্যাচ ঘোষণার পর ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের প্রতিনিধিরা কলকাতায় আসেন। মাঠের বেহাল দশা দেখে চূড়ান্ত অসন্তোষ প্রকাশ করেন তাঁরা। এরপরই সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের অনুরোধে আসরে নামেন ব্রাজিলীয় টার্ফ বিশেষজ্ঞ ইভান নাসিমেন্তো। দীর্ঘ এক মাস কলকাতায় পড়ে থেকে যুবভারতীর মাঠকে আন্তর্জাতিক মানের করে তুলেছেন তিনি। ২০১৭ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আগে শেষবার এই মাঠের খোলনলচে বদলানো হয়েছিল। কৃত্রিম টার্ফ সরিয়ে বসানো হয় প্রাকৃতিক রিভেরা বারমুডা ঘাস। কিন্তু তারপর লাগাতার আইএসএল ও অন্যান্য টুর্নামেন্ট চলায় পিচের বড়সড় ক্ষতি এড়ানো যায়নি। নাসিমেন্তো এসে দেখেন, মাঠের জমি রীতিমতো এবড়োখেবড়ো। ঘাসও বেশ বড়। মেরামতির প্রথমেই মাটির স্তর সমান করার কাজে হাত দেন তিনি। নাসিমেন্তোর কথায়, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য দাঁড়ায় মাটি এবং পুরো প্রক্রিয়ার মানোন্নয়ন করা। মাটিতে ঢেউ খেলানো একটা অমসৃণ ভাব ছিল।’ রুক্ষতা কাটাতে ও হাওয়া চলাচলের জন্য ডিলিং বা অ্যারেশন প্রক্রিয়ার সাহায্য নেওয়া হয়। এরপর ভারী রোলার চালিয়ে অমসৃণ মাঠকে পুরোপুরি সমতল করে বিশেষজ্ঞ দল। মাঠের যে অংশগুলোয় সাদা দাগ টানা হয়, সেখানে বছরের পর বছর রঙের মোটা প্রলেপ জমে মাটি পাথর হয়ে গিয়েছিল। সেই সমস্ত জায়গা আগে নরম করা হয়। এরপর চলে ঘাস ছাঁটাইয়ের কাজ। আগে যেদিকটা কাটা হয়, এবার ঠিক তার উল্টোদিকে কোপ পড়ে। পাশাপাশি, ছত্রাক ও পোকা দমনে নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। এরপর পিচে হালকা ও গাঢ় সবুজ রঙের স্ট্রাইপ বা নকশা ফুটিয়ে তোলার পালা। নাসিমেন্তোর দাবি, ‘সঠিক সার প্রয়োগ এবং মাটির চরিত্র বুঝতে প্রতিদিন মাঠের প্রতিক্রিয়া নজর রাখা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, খেলোয়াড়রা যেন চোট না পান এবং টেলিভিশনেও খেলা দেখতে দারুণ লাগে।’ ব্রাসিলিয়ার মানে গারিঞ্চা স্টেডিয়ামে নাসিমেন্তোর সংস্থা ‘অ্যারিনাস’ দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত। সেখানে বছরে মাত্র কুড়িটা ফুটবল ম্যাচ হলেও প্রচুর কনসার্ট চলে। তাই বারবার ঘাস বদলানোর অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। কলকাতায় এই কঠিন কাজে তিনি পাশে পেয়েছেন স্টেডিয়ামের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় কর্মীদের। নাসিমেন্তোর মূল্যায়ন, ‘ব্রাজিল থেকে আমাদের দুটি দল এসেছিল। কিন্তু মাঠের দেখভালের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় দলটির সাহায্য ছাড়া এই কাজ অসম্ভব। ওরা দারুণ কাজ করেছে।’ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে আলাদা অনুশীলন-মাঠের ব্যবস্থাই দস্তুর। তবে এবার তা থাকছে না। খেলার আগের দিন মূল পিচেই অনুশীলন করবে দুই দল। নাসিমেন্তোর বক্তব্য, ‘প্রোটোকল অনুযায়ী আলাদা ময়দান থাকছে না। মাঠেই বিকেল ৪টে থেকে ৫টা পর্যন্ত অনুশীলন করবে ব্রাজিল। আর ভারত নামবে সন্ধে ৬টায়, অনুশীলন চলবে ৭টা পর্যন্ত।’ ব্রাজিলীয় বিশেষজ্ঞের স্পষ্ট জবাব, ‘সময় ছিল খুব কম। ১০০ শতাংশ হয়তো নয়, তবে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। মাঠের রং, সমতল ভাব এবং ঘাসের ঘনত্ব এখন যথেষ্ট ভাল। আশা করছি, দর্শকরা দারুণ একটা ম্যাচ উপভোগ করবেন!’




