RK NEWZ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর। ঠিক দেড় দশকের ব্যবধান। এই ব্যবধানেই মিলে গেলেন দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। অধুনাপ্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং সদ্য প্রাক্তন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই প্রাক্তনকে মিলিয়ে দিল একটি সুপ্রাচীন জনপদ, হুগলির শ্রীরামপুর। ১৫ বছর আগে ২০১১ সালের মে মাসে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন বুদ্ধদেব। তার চার মাস পর সে বছর সেপ্টেম্বরে কলকাতার বাইরে প্রথম কোনও রাজনৈতিক প্রকাশ্য কর্মসূচি করেছিলেন সিপিএমের তৎকালীন ‘কর্নেল’। সেটি ছিল শ্রীরামপুরে। দলের শ্রমিক সংগঠন সিটুর জেলা সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৬ এর ৪ মে ক্ষমতা থেকে সরতে হয়েছে মমতাকে। তারপর সেই শ্রীরামপুরেই কলকাতার বাইরে প্রথম কোনও প্রকাশ্য কর্মসূচি করেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী। বুদ্ধদেবের সভা হয়েছিল শ্রীরামপুর স্টেশন লাগোয়া আরএমএস ময়দানে। কয়েকশো মিটার দূরে শনিবার মমতা সভা করলেন শ্রীরামপুর কোর্টের মাঠে। ঘটনাচক্রে, বুদ্ধদেবকে সরিয়েই দেড় দশক আগে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা। ক্ষমতা হারানোর পর সেই মমতা শ্রীরামপুরের সভা থেকে স্পষ্ট করে দেন, বিজেপি বিরোধী আন্দোলনে তিনি সবার সঙ্গে চলতে চান। নামোচ্চারণ না-করে এ-ও স্পষ্ট করলেন, সিপিএম নিয়েও তাঁর ছুতমার্গ নেই। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে যখন সর্বভারতীয় রাজনীতি উত্তাল, তখন বিজেপি বিরোধী পরিসরে নানাবিধ সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক মারিয়ম আলেকজান্ডার বেবি দেশের প্রায় প্রতিটি বিজেপি বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আবেদন জানিয়ে পত্র পাঠাচ্ছেন। দিল্লির একে গোপালন ভবন থেকে কালীঘাটে শুধু চিঠিই আসেনি, মমতার সঙ্গে ফোনে কথাও বলেছেন বেবি। ঠিক তার পরেই শনিবারের সভা থেকে মমতা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বার্তা দিলেন, তিনি ‘লাল-নীল-হলুদ’ দেখবেন না। মমতা বলেন, “ইতিমধ্যেই আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদবের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আমি ইস্যুকে সমর্থন করি। কোন পার্টি, কী কালার, দেখার দরকার নেই। কে লাল, কে নীল, কে হলুদ তাও দেখার দরকার নেই। বেবির ফোন এবং মমতার এহেন বার্তার পরে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে কি তাহলে ক্রমশ কালীঘাট এবং আলিমুদ্দিন স্ট্রিট কাছাকাছি আসছে? সেই জল্পনায় অবশ্য জল ঢেলে দিয়েছেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর কথায়, “এটা দেশের ব্যাপার, রাজ্যের নয়। অহেতুক জল্পনা তৈরি করেও কোনও লাভ নেই।”
জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করেন, একই ভাবে নিশানা করেন কমিশনের আর এক পদস্থ আধিকারিক সীমা খান্নাকেও। প্রসঙ্গত, এসআইআর পর্বেই তৃণমূল অভিযোগ করেছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সীমার নেতৃত্বে ভোটার লিস্টের নিধন যজ্ঞ চলছে। গত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের সেই কথা টেনে মমতা বলেন, “আমরা উকুন বাছার মতো করে এসআইআর করেছিলাম। তাই চুরিটা ধরতে পেরেছি। আমরাই প্রথম নাম দিয়েছিলাম ভ্যানিশ কুমার।” হাইকোর্টের শর্তসাপেক্ষ অনুমতিতে সভা করতে হয়েছে মমতাকে। যে অনুমতি পাওয়ার জন্য মমতা তারিফ করেছেন শ্রীরামপুরের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। হাইকোর্ট বিকেল ৪টে থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত সভার সময় বেঁধে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে বলে দিয়েছিল, এক হাজারের বেশি লোক জমায়েত করা যাবে না। সময়ের মধ্যেই সভা শেষ হল বটে। তবে, ভিড় কিন্তু মন্দ হয়নি। গোটা কর্মসূচির ভিডিওগ্রাফি করেছে পুলিশ। প্রশাসনের তরফে ড্রোন উড়িয়েও ছবি তোলা হয়েছে। যা দেখে বক্তৃতার মাঝে মমতা বলেন, “ওই দেখুন আকাশে ড্রোনের নেত্য হচ্ছে।” ইঙ্গিতপূর্ণভাবে মমতা এদিন বলেছেন, বাংলায় পুজো পার্বণ মিটে গেলেই তিনি আরও একটা দশমী করবেন। দেড় দশক আগে গদি হারানোর পর শ্রীরামপুরে যখন প্রথম সভা করেছিলেন বুদ্ধদেব, তখন তাঁর দলের মধ্যে কোনও খণ্ড তৈরি হয়নি। ক্ষমতা থেকে যাওয়ার চার মাসের মধ্যে কলকাতার বাইরে মমতা পা রাখলেন বটে, কিন্তু তাঁর দলের নাম এবং প্রতীক আপাতত সেই জ্ঞানেশ কুমারেরই নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের রেফ্রিজারেটরে।
‘‘ওই দেখো, ড্রোন ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে… কে কে আছে মঞ্চে, দেখছে।’’ ড্রোনগুলো সরে যেতে দেখে তিনি বলতে থাকেন, ‘‘পালাচ্ছে, চোরের মতো পালাচ্ছে।’’ সভার মাঝে মমতা বলেন। হুগলির শ্রীরামপুর কোর্ট মাঠ থেকে বিজেপিকে তোপ দাগলেন তিনি। অভিযোগ, জনসভায় তাঁর সঙ্গে কে কে রয়েছেন, আকাশপথে তার নজরদারি করছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এমনকি, মমতার এ-ও অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে বাড়িতে দেখা করতে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির উপর নজরদারি করছে সরকার। সভার শুরুতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছবিতে মাল্যদান করেন মমতা। তার পর এক পঙ্ক্তিতে ফেলে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে তোপ দেগেছেন। এসআইআর নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করার সময় হঠাৎ মমতা তাকান মাথার উপরের দিকে। উপস্থিত সকলে তাঁকে অনুসরণ করেন উপরে তাকান। দেখা যায়, একাধিক ড্রোন। তাই দেখে মমতা বলতে থাকেন, ‘‘ওই দেখো, ড্রোন ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে… কে কে আছে মঞ্চে, দেখছে।’’ ড্রোনগুলো সরে যেতে দেখে তিনি বলতে থাকেন, ‘‘পালাচ্ছে, চোরের মতো পালাচ্ছে। কে কে বসে আছে, রাত্রে তাকে অ্যারেস্ট করবে। হাতের সামনে প্রমাণ করে দিলাম।’’ তার পর প্রশাসনকে তোপ দাগেন তৃণমূলনেত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘ড্রোনের নৃত্য হচ্ছে! মাঠে জল সাফ করার লোক নেই। আরে কার চোখকে ফাঁকি দিবি রে! আমি তো চালিয়েছি, পনেরো বছর। আমি তো জানি, কোথা থেকে কী হয়। একটা মিটিংয়ের ড্রোন ঘুরিয়ে দেখছে কে কে এসেছে।’’ নাম না করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সঙ্গে থাকা বিধায়কদের সমালোচনা করেছেন মমতা। বলেন, ‘‘ওদের বিজেপির কাছে খেয়ে পরে থাকতে দিন। ওরা বিরোধী দল নয়। ওরাও এক দিন যাবে। ভাবছে এই ভাবে চলবে? পুলিশ নিয়ে চলছে, টাকা নিয়ে দুলছে। আর বলছে, ‘আমার পরিবারকে বাঁচাব’! মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল।’’ মমতার এই সভা করা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। পুলিশ-প্রশাসনের অনুমতি না-পেয়ে আদালতে গিয়েছেন মমতার দলের নেতারা। তার মধ্যে গত কয়েক দিনে হুগলি জেলার বেশ কয়েক জন মমতাপন্থী তৃণমূল নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। তৃণমূলনেত্রীর অভিযোগ, ‘‘এখন ভয় ইন। ভরসা আউট। তবে বিপদঘণ্টা বেজে গিয়েছে। আর বেশি দিন নেই।’’
হুগলির শ্রীরামপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় যোগ দিতে যাচ্ছিলেন বিধায়ক। অভিযোগ, পথে উত্তরপাড়ায় তাঁর গাড়ি আটকে ভাঙচুর করা হয়েছে। পাথর, রড দিয়ে হামলার পাশাপাশি, ডিমও ছোড়া হয়েছে। কুণাল জানান, মমতার সভায় যাতে তিনি যেতে না পারেন, তাই এ সব করা হয়েছে। বিধায়কের হুঁশিয়ারি, এ সব করে তাঁকে থামানো যাবে না। তার পরেই গাড়ি ঘুরিয়ে সটান ভবানী ভবনে চলে যান বিধায়ক। তাঁকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। বিধায়ক ভবানী ভবনের ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে জানান, তিনি অভিযোগ করতে যাননি। হামলা সংক্রান্ত ঘটনায় অভিযোগ তিনি উত্তরপাড়া থানায় মেল করে জানিয়েছেন। রাজ্য পুলিশের সদর দফতর ভবানী ভবনে কেবল নিজের গাড়ির অবস্থা দেখাতে গিয়েছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। সভার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ঘটনার নিন্দা করেছেন মমতা। তিনি দাবি করেছেন, ‘বিজেপির গুন্ডারা’ এ সব করেছে। এটা ‘গণতন্ত্রে অশনিসঙ্কেত’। বিজেপি সাংসদ রাহুল সিংহ জানিয়েছেন, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণেই এ সব ঘটেছে। এর সঙ্গে বিজেপির যোগ নেই।
শ্রীরামপুরে শনিবার বিকেলে জনসভা করবেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। সেখানেই যোগ দিতে যাচ্ছিলেন বিধায়ক। অভিযোগ, উত্তরপাড়া সখের বাজারে কুণালের গাড়ি আটকে দাঁড়িয়ে পড়েন কয়েক জন। তার পরে লাগাতার পাথর, ডিম ছুড়তে থাকেন। লোহার রড দিয়ে আঘাত করতে থাকেন গাড়ির কাচে। বিধায়ক জানান, তাঁর গাড়ির পিছনের কাচ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘চালকের পাশে বসি আমি। আমাকে নিশানা করে পাথর ছোড়া হয়। আমার শরীর কাচে ভর্তি।’’ গাড়ির কাচ ভাঙছিল না দেখে বড় বড় পাথর এনে ছোড়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বিধায়ক। কেন এ রকম করা হল? বিধায়কের কথায়, ‘‘ওদের মুখে ছিল একটাই কথা, গো ব্যাক। মমতার সভায় যাওয়া যাবে না।’’ তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘সাধারণ নাগরিকের মতো একজন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। সেই গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর, ডিম ছোড়া হল।’’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা চলে যাবেন ভবানী ভবনে। তাঁর কথায়, ‘‘চেষ্টা করছি ভবানী ভবনে ঢুকব সটান। দেখুক (পুলিশ) গুন্ডারাজ কেমন চলছে। পুলিশ গুন্ডাদের না সরালে যাওয়া সম্ভব নয়।’’ তবে তিনি এ-ও জানিয়েছেন, এ সব করে মমতাপন্থীদের থামানো যাবে না। ঘটনার নিন্দা করেছেন মমতা। জানিয়েছেন, তৃণমূলকর্মীদের আটকাতেই এ সব করা হচ্ছে। বিধায়কের উপরে হামলা করা হয়েছে। তিনি আহত হয়েছেন।




