RK NEWZ ফেসবুক লাইভে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “দরিদ্র মানুষকে ঘৃণা করা কোনও জনপ্রতিনিধির শোভা পায় না। যিনি বাচ্চার জন্য দুধ ফোটাচ্ছিলেন, তিনি অত্যন্ত অসহায়। মনে রাখা উচিত, মায়ের অভিশাপ সবচেয়ে বড় অভিশাপ।” পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে এক মহিলা শিশুর জন্য উনুন জ্বালিয়ে দুধ গরম করছিলেন। সেই সময় এলাকা পরিদর্শনে আসা নগরোন্নয়ন ও পুরবিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ওই বৃদ্ধাকে রীতিমতো ধমক দিয়ে উনুন বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ফুটপাত খালি করতে বলেন। এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই একজন মন্ত্রী কীভাবে দুধের শিশুর মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে পারেন, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে কড়া প্রতিক্রিয়া ও নানাবিধ প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিতর্ক বাড়তেই অবশ্য সোমবার এক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তবে এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে এবার সরাসরি ময়দানে নেমেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুস্থ ও গৃহহীন ওই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, ফুটপাতবাসী ওই পরিবারটি সম্মত থাকলে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁদের জন্য সুরাহার ব্যবস্থা করবেন। দলের কোনও সমর্থক বা কর্মীর বাড়িতে আপাতত তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি শিশুটির ভবিষ্যৎ পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। পার্ক স্ট্রিটের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবিকতা বনাম ফুটপাথ সুরক্ষার ইস্যুতে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে বাগযুদ্ধের পারদ আরও একধাপ চড়ে গেল। ওই ঘটনায় বিতর্ক বাড়তেই সোমবার এক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি দাবি করেন, ব্যস্ত ও সংকীর্ণ ফুটপাতে উন্মুক্ত অবস্থায় আগুন জ্বালিয়ে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় যে কোনও মুহূর্তে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। সেই সুরক্ষার খাতিরেই তিনি খাবার তৈরি বন্ধ করতে বলেছিলেন, কোনও শিশুর মুখের দুধ কেড়ে নেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তবে কথা বলার সময় তাঁর ভাষা বা আচরণ আরও কিছুটা কোমল ও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত ছিল বলে স্বীকার করে নিয়েছেন মন্ত্রী।
পার্কস্ট্রিট চত্বরে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গিয়ে স্টোভে বাচ্চার দুধ গরম করা নিয়ে এক প্রৌঢ়ার সঙ্গে অগ্নিমিত্রা পালের মেজাজ হারানোর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। সেই ভিডিও নিয়ে দিনকে দিন সমালোচনা বাড়ছে বই কমছে না। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের তোলা ‘অমানবিকতার’ অভিযোগকে নস্যাৎ করে পাল্টা জবাব দিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী। বিরোধীদের এই সমবেদনাকে ‘রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি’ বলে তাঁর প্রশ্ন— ব্যস্ত ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে দুপুর দুটোয় অনবরত গাড়ির চলাচলের মাঝে মাত্র ১০ ইঞ্চি উঁচু ফুটপাতে ছ’মাসের শিশুকে একলা ছেড়ে স্টোভ জ্বালানো কি নিরাপদ? কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তখন কি বিরোধীরা তার দায় নিত? ‘বাটি ভর্তি দুধ কেউ দেয়নি, শুধুই রাজনীতির রুটি সেকা’। ঘটনা নিয়ে বিরোধীদের ‘কলকচালি’ নিয়ে কটাক্ষ করে অগ্নিমিত্রা বলেন, “গতকাল সারাদিন বিরোধী দলের অনেক কান্নাকাটি শুনলাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফুটপাতে দুধ গরম করা নিয়ে। কিন্তু বাস্তবটা হল, ওই পরিবারের কাছে এক বাটি দুধ নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি! সবাই রাজনীতির আগুনে নিজেদের রুটি সেঁকেছে।” অতীতে কংগ্রেসের ২৮ বছর, বামফ্রন্টের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “যাঁরা ‘অপারেশন সানশাইন’ করেছেন, আর ১৫ বছর ধরে তোলা আদায় করে ফুটপাতে হকার বসিয়ে সারা বাংলাকে শেষ করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে অন্তত আমাদের মানবিকতার পাঠ নিতে হবে না।” ‘অ্যাক্সিডেন্ট হলে দায় নিত কে?’ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের সেই মুহূর্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে পুরমন্ত্রী জানান, রাস্তা আর ফুটপাতের উচ্চতার তফাত ছিল মাত্র ইঞ্চি দশেকের। সেখানে দুপুর দুটোয় অনবরত গাড়ি চলছে। তার মাঝে এক ছ’মাসের বাচ্চা একা হামাগুড়ি দিচ্ছে, যার মা বা ঠাকুমা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যদিকে, অনবরত লোকজন ও স্কুলপড়ুয়াদের যাতায়াতের রাস্তার ওপর কেরোসিনের স্টোভে এক গামলা দুধ ফোটানো হচ্ছিল। অগ্নিমিত্রার প্রশ্ন, “যদি বাচ্চাটা রাস্তায় নেমে আসত বা স্টোভ উল্টে কোনো বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটত, তবে তার দায় কে নিত? পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর? পুলিশ? সরকার নাকি সোচ্চার হওয়া এই বিরোধীরা?”
ফুটপাতবাসী পরিবারটির পূর্ব ইতিহাস তুলে ধরে মন্ত্রী দাবি করেন, “ওই মহিলা ক্যামেরার সামনে নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ধাপায় থাকেন। যদি নিজের বাড়ি ধাপাতে থাকে, তবে বারবার বারণ করা সত্ত্বেও কেন পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে এসে স্টোভ জ্বালাবেন? ওই মহিলার ছেলে পাশের কারনানি ম্যানশনে কাজ করত, কিন্তু চুরি করার দায়ে তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়।” পরিবারটিকে আগেও হোমে বা নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। বস্তি পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী জানান, এই ঘটনার মাত্র পাঁচ দিন আগেই বণিকসভাগুলির সঙ্গে সরকারের একটি বৈঠক হয়েছে। যেখানে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের জন্য রাজ্য সরকারের জমিতে পাঁচটি বিনামূল্যে আবাসন টাওয়ার তৈরির বিনিময়ে ডেভেলপারদের বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ সরকার বস্তিবাসীদের সঠিক পুনর্বাসন দিতে চায়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, হকার নীতি ও বিনিয়োগের পরিবেশ। ফুটপাতের অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অগ্নিমিত্রা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ফুটপাত বড়লোক বা গরিব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তা সাধারণ পথচারীদের জন্য। হকার নীতির রূপরেখা স্পষ্ট করে তিনি জানান, ফুটপাতের তিন ভাগের এক ভাগ জায়গা হকাররা ব্যবহার করতে পারবেন, আর বাকি দুই ভাগ ফাঁকা রাখতে হবে পথচারীদের জন্য। রাজ্যে বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে শহরের শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুত্ব বুঝিয়ে প্রবাদের সুরে মন্ত্রী বলেন, “কথাতেই আছে— ‘প্রথম দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’। আমাদের শহর, রাস্তা ও ফ্লাইওভারের এই বিশৃঙ্খল দশা দেখলে কোনও দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী আসবে? ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ বা শিল্প আনতে গেলে শহরকে আগে সাজাতে হবে। কলকাতা তো পশ্চিমবঙ্গের মুখ ও জানলা।” নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে শহরের সব রাস্তা মেরামতে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি। মানুষের বিপুল জনমত নিয়ে আসা বিজেপি সরকার শহরের বেআইনি পার্কিং, যানজট ও ফুটপাত জবরদখলমুক্ত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান পুরমন্ত্রী। বিরোধীদের অনাবশ্যক বা ধ্বংসাত্মক রাজনীতি ছেড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানান তিনি। বক্তব্যের একেবারে শেষান্তে নিজের কড়া মনোভাবের বিষয়ে নজিরবিহীন আত্মপর্যালোচনাও করতে দেখা যায় মন্ত্রীকে। কিছুটা পরিশীলিত সুরে অগ্নিমিত্রা স্বীকার করে নেন, “হ্যাঁ, আমি হয়তো চিৎকার করে বলেছিলাম। সেটা হয়তো আমার আরেকটু নরম সুর বা বুঝিয়ে বলা দরকার ছিল।” তবে শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার যে কোনও আপস করবে না, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
‘অধিকাংশের ভাতা বন্ধ, বিজেপি ঠিক করবে যোগ্য-অযোগ্য?’ অন্নপূর্ণা যোজনা প্রসঙ্গে প্রশ্ন মমতার, প্রশাসন ও বিজেপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে খোঁচা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শাসকদল এখন কেবল বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতেই ব্যস্ত। এখনও পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে নানা কেস দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিভিন্ন জেলায় পথ ও রেল অবরোধ এবং স্থানীয় বিজেপি নেতা ও মন্ত্রীদের ঘিরে ক্ষোভপ্রদর্শনের ঘটনার উল্লেখ করে সরাসরি নতুন বিজেপি সরকারকে তোপ দাগলেন তিনি। অন্নপূর্ণা যোজনার যোগ্য-অযোগ্যের বিচার এবং ভাতার টাকা না মেলা নিয়ে রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন কালীঘাট তৃণমূল প্রধান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত রাজ্যের যেসব মহিলারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পেতেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশের ভাতাই বর্তমানে বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা আটকে রাখা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও বেশিরভাগ মহলাই যে এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর্থিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই বলে জানান তিনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপি যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, কাজের বেলায় তার ঠিক উল্টো পথ হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসন ও বিজেপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে খোঁচা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শাসকদল এখন কেবল বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতেই ব্যস্ত। এখনও পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে নানা কেস দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে গিয়ে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা সাধারণ মহিলারা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে নজর দেওয়ার বিন্দুমাত্র সময় নেই সরকারের। ভোটের প্রচারের সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মমতা বলেন, নির্বাচনের আগে যখন এই প্রকল্প নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তখন কোনও কঠিন শর্তের কথা বলা হয়নি। কিন্তু এখন সুবিধা দেওয়ার নামে জটিল ফর্ম ফিলাপ ও নানা নিয়মকানুন চাপানো হচ্ছে। কে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়ার যোগ্য আর কে যোগ্য নন – তা স্থির করার অধিকার বিজেপির নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভের ঘটনায় ইতিমধ্যেই পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল দাবি করেছেন, তৃণমূলের লোকেরাই এর ভিতরে রয়েছে এবং উস্কানি দিয়ে গন্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করছে। তবে পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ যে মন্তব্য করেছেন তাতে ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়তে পারে। তাঁর কথায়, মহিলাদের ঢালাও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিয়েই তৃণমূল অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছে!




