RK NEWZ ভোর তখন সাড়ে ৪টে। দিনের আলো তেমন ফোটেনি। তারাপীঠের হোটেলে একতলার ঘরগুলিতে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন আবাসিকেরা। অধিকাংশই পুণ্যার্থী। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে আলিপুরদুয়ার, শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারের পুজো দিতে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে গিয়েছিলেন। আচমকা বিস্ফোরণ এবং চিৎকারে তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। বীরভূমের অন্যতম পর্যটন ও তীর্থকেন্দ্র তারাপীঠে ভোররাতে বেসরকারি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত সাত জন আবাসিকের। ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের উদ্ধার করে রামপুরহাট গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ তারাপীঠ থানার ঢিল ছোড়া দূরত্বে পুকুরপাড়ে অবস্থিত ‘বিদিশিনি’ নামে একটি বেসরকারি হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে আচমকাই আগুন লাগে। গভীর রাতে অধিকাংশ আবাসিক যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, সেই সময় আগুন লাগায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হোটেলের ভিতর থেকে ধোঁয়া ও আগুন বেরোতে দেখে স্থানীয়রা খবর দেন পুলিশ ও দমকলকে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকল বাহিনী। শুরু হয় আগুন নেভানোর পাশাপাশি হোটেলের ভিতরে আটকে পড়া আবাসিকদের উদ্ধারের কাজ। দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন দমকলকর্মীরা। এরপর হোটেলের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে দগ্ধ অবস্থায় সাত জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃতদেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য রামপুরহাট গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে গুরুতরভাবে দগ্ধ হন আরও বেশ কয়েকজন আবাসিক। তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মৃত ও আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার এবং দিনহাটা এলাকার বাসিন্দা। ফলে খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারের সদস্যরা তারাপীঠ ও রামপুরহাটের উদ্দেশে রওনা দেন। অনেকেই হাসপাতালে এসে স্বজনদের খোঁজ করছেন।

হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল জানিয়েছেন, ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ সেখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহের এনসিবি হঠাৎ ফেটে যায় এবং সেখানে আগুন ধরে যায়। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের এখানে রাতপাহারার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা উঠে সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রগুলি সচল করেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। কিন্তু তত ক্ষণে অন্দরসজ্জার ফাইবারে আগুন ধরে যায়। আগুনটা আরও বেড়ে যায়। দমকলকর্মীরা এসে আগুন নিবিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ধোঁয়া পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।’’ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে তিনি আরও বলেন, ‘‘আতঙ্কে ঘর থেকে আবাসিকেরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা বাইরে আগুনের মধ্যে পড়ে যান। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পিছন দিক দিয়ে বেরোনোর দরজা রয়েছে। কিন্তু সেটা অনেকে খুঁজে পাননি। তাঁরা রিসেপশন দিয়ে বেরোতে শুরু করেন। তখনই অনেকের গায়ে আগুন লেগে যায়।’’ বীরভূমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ শ্রীকান্ত গায়কোয়াড় বলেন, ‘‘যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে, রামপুরহাট হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ১২ থেকে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।’’দমকলের ওসি নীলাদ্রি মজুমদার বলেন, ‘‘দোতলা পর্যন্ত আগুন ছড়িয়েছিল। কিন্তু তিনতলায় কোনও আগুন ছিল না। সেখানে অনেক ধোঁয়া ছিল। হোটেলে সিঁড়ি বা অন্যত্র সমস্ত জানলা বন্ধ ছিল। তাই ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারেনি। হোটেলে দুটো সিঁড়ি রাখতেই হয়। এখানেও সেটা ছিল। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ঠিক ছিল। আমরা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ন’জনকে উদ্ধার করেছি।’’

কোচবিহারের দিনহাটা থেকে তারাপীঠে পুজো দিতে আসা একজন ছিলেন ওই হোটেলের দোতলায়। আগুন দেখে বারান্দা দিয়ে পাইপ পেয়ে কোনও রকমে তাঁরা নীচে নামেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা ঘুমোচ্ছিলাম। বাইরে চিৎকার শুনে দরজা খুলে দেখি প্রচণ্ড আগুন আর ধোঁয়া। বারান্দাটা না থাকলে ভিতরেই দম বন্ধ হয়ে সকলে মরে যেতাম। কী ভাবে যে নামলাম, বলতে পারব না।’’ রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘এখনও কয়েক জন আশঙ্কাজনক। হোটেলে আগুন নেবানোর ব্যবস্থা ঠিকঠাক ছিল কি না, দেখতে হবে। এ ভাবে তো চলতে পারে না। এত মানুষের জীবনের দায় কে নেবে? চারদিকে জতুগৃহ বানিয়ে রেখেছে।’’

অগ্নিকাণ্ডে আহত হোটেল আবাসিক মুনমুন মণ্ডল জানান, তাঁর মা-সহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য ওই হোটেলে ছিলেন। কিন্তু আগুন লাগার পর তাঁদের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তারাপীঠ থানার পুলিশ এবং রামপুরহাট থানার পুলিশ। দমকল বাহিনী ও পুলিশের পক্ষ থেকে যৌথভাবে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। হোটেলের ভিতরে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালানো হয়। দমকলের প্রাথমিক অনুমান, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে ঠিক কী কারণে আগুন লাগল এবং আগুন এত দ্রুত কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনও ত্রুটি ছিল কি না এবং নিরাপত্তাবিধি মানা হয়েছিল কি না—সবকিছুই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। পাশাপাশি হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। ভোরের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে তারাপীঠে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।




