RK NEWZ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশচিক বরাইককে রাজ্যসভার উপনির্বাচনের প্রার্থী করল বিজেপি। বৃহস্পতিবার রাতেই তিন জনের নাম ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপির টিকিটে তাঁরা রাজ্যসভার প্রার্থী হচ্ছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের রাজ্যসভার উপনির্বাচনের জন্য তিন জন প্রার্থীর নাম অনুমোদন করেছে। তাঁরা হলেন সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশচিক বরাইক। বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অরুণ সিংহের স্বাক্ষর রয়েছে এই বিজ্ঞপ্তিতে। উল্লেখ্য, সুস্মিতা, প্রকাশচিক এবং সুখেন্দুশেখরের পদত্যাগের কারণেই রাজ্যসভার তিনটি আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে। তাঁদেরই আবার উপনির্বাচনে প্রার্থী করছে বিজেপি। অর্থাৎ, প্রার্থীরা একই আছেন, কেবল দল বদলে গিয়েছে। বিকেলেই এই তিন জন সল্টলেকে বিজেপির দফতরে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে পদ্মশিবিরে যোগ দিয়েছেন। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হাত থেকে বিজেপির পতাকা নিয়েছেন তাঁরা। তৃণমূলের তিন প্রাক্তন সাংসদের বিজেপিতে যোগ এবং রাতারাতি রাজ্যসভার উপনির্বাচনের টিকিট পেয়ে যাওয়া নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূল নড়বড়ে। বিজেপি সরকার গঠনের পর শমীকই আশ্বাস দিয়েছিলেন, তৃণমূলের জন্য বিজেপির দরজা বন্ধ থাকবে। কোনও নেতাকে দলে নেওয়া হবে না। সুস্মিতাদের দলবদলে শমীক তাই নানাবিধ প্রশ্নে বিদ্ধ হয়েছেন। তবে সল্টলেকের দফতর থেকেই তার জবাবও দিয়েছেন। জানিয়েছেন, এটি ‘ব্যতিক্রমী’ ঘটনা। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের যোগদানের বিষয়ে যে নীতি তাঁদের ছিল, তা থেকে কোনও বিচ্যুতি ঘটেনি। বরং, তৃণমূলে থেকে যাঁরা দুর্নীতি করেননি, তাঁদের পাশে চায় বিজেপি। আগেই সে কথা জানানো হয়েছিল। আগামী ২৪ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার আসনগুলিতে উপনির্বাচন হবে। ভোটগণনাও হয়ে যাবে তার পরপরই। এই উপনির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৪ জুলাই।
বিজেপিতে যোগ দিলেন প্রাক্তন তিন তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশচিক বরাইক। বৃহস্পতিবার সল্টলেকে বিজেপির দফতরে দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে দলীয় পতাকা হাতে তুলে নেন রাজ্যসভার প্রাক্তন তিন সাংসদ। তার পরেই শমীক জানিয়ে দেন, এই যোগদান ‘ব্যতিক্রমী’ ঘটনা। তবে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের যোগদান করানোর বিষয়ে যে নীতি তাঁদের ছিল, তা থেকে কোনও মতেই ‘বিচ্যুতি’ নয়। তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘‘তৃণমূলে থেকে যাঁরা দুর্নীতি করেননি, তাঁদের আগেই পাশে চেয়েছে বিজেপি।’’ রাজ্যসভার তিন আসনে নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারির পরের দিন, বৃহস্পতিবার সুখেন্দুদের এই যোগদানের পরেই জোরালো হচ্ছে জল্পনা, তবে কি এ বার এই তিন জনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় পাঠাবে বিজেপি। শমীক যদিও তা স্পষ্ট করেননি। জল্পনা জিইয়ে রেখে বলেন, ‘‘চর্চা চলুক না।’’ বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে শমীক জানিয়েছিলেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দলে জায়গা দেওয়া হবে না। পরে সেই শমীকই আবার ‘ভাল তৃণমূলের জন্য দরজা খোলা’ বলে মন্তব্য করেছেন দাবি করে শোরগোল হয় রাজনৈতিক পরিসর থেকে সমাজমাধ্যমে। যদিও শমীক নিজে বলেছিলেন, তিনি সে ধরনের তত্ত্ব দেননি। তবে ‘চুরি’ না-করা তৃণমূল নেতাদের বিষয়ে দলের দরজা খোলার কথা চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার সুখেন্দু, সুস্মিতা, প্রকাশ বিজেপি-তে যোগদানের পরেই শমীকের মুখে শোনা গেল সেই পুরনো তত্ত্বই। তিনি বলেন, ‘‘তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের জন্য দরজা বন্ধ, সে কথা আগে বলেছিলাম, এখনও বলছি। আজকের যোগদান ব্যতিক্রমী ঘটনা, কোনও বিচ্যুতি নয়।’’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন ইংরেজি একটি প্রবাদ— ‘এক্সেপশন প্রুভস দ্য ল’। তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘তৃণমূলের যাঁরা দুর্নীতি করেননি, মানুষের উপরে অত্যাচার করেননি, চাকরি বিক্রি করেননি, মানুষের অধিকার কেড়ে নেননি, তাঁদের কাছে আমাদের আহ্বান ছিল, আপনারা এগিয়ে আসুন, তৃণমূলকে সরিয়ে দিন। তাঁরা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।’’ শমীক এখানেই থামেননি। তিনি আরও বলেন, ‘‘সে রকম যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের তো আমরা আগেই পাশে চেয়েছিলাম। সুতরাং তাঁদেরকে দলে স্বাগত জানানোর মধ্যে কোনও সমস্যা নেই।’’ সুস্মিতা জানান, তাঁর বিরুদ্ধে এ কথা কেউ বলতে পারবেন না যে, তিনি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘এই ধরনের অবিশ্বাস্য দুর্নীতি যে হতে পারে, সেটা আমি তৃণমূলে এসে কাছ থেকে দেখেছি। আমার সমালোচকেরা বলতে পারেন যে, আমার অনেক কিছু নেতিবাচক দিক আছে। কিন্তু একটা কথা কেউ আমার সম্পর্কে বলতে পারবেন না যে, আমি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থেকেছি।’’ দুর্নীতি নিয়ে তৃণমূলকে খোঁচা দেন সুখেন্দুও। তার পরেই শমীক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘‘অতীত সকলের থাকে। তিন জনের এখন একমাত্র পরিচয়, তাঁরা বিজেপি কর্মী।’’
ভোটের পরে তৃণমূল থেকে যাতে কেউ রাতারাতি দলে ঢুকতে না-পারে, সেই জন্য তিন সদস্যের কমিটি গড়া হয় বিজেপিতে। কোনও নেতা কাউকে দলে নিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। সেই আবহে শমীকের ‘ভাল তৃণমূল’ মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রকাশ্যেই ওই মন্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তার পরেই শমীক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, “ভাল তৃণমূল বলে কিছু হয় না! কখনও এই কথা বলিনি। ভোটের আগে থেকে বলছি, যাঁরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তৃণমূলকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে অমৃতরস পানের সুযোগ পাননি, চুরি করেননি, তাঁদের জন্য দরজা খোলার কথা ভাবা যেতে পারে। সেটা এখন না, পরে। কখন দরজা খুলতে হবে, তা নিয়ে দলের মধ্যে ভাবনাচিন্তা করা হবে।” বৃহস্পতিবার সুখেন্দুদের যোগদানের পরে শমীকের গলায় সেই সুরই শোনা গেল। তিনি জানান, যাঁরা তৃণমূলে থেকে দুর্নীতি করেননি, তাঁদের আগেই পাশে চাওয়া হয়েছে। সুখেন্দু যদিও রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই পূর্বতন তৃণমূল সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন। ছেড়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ পদ, তৃণমূলের সদস্যপদ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় এসেছিলেন। ওই দিন তাঁর সঙ্গে সুখেন্দুশেখর সাক্ষাৎও করেন। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সুখেন্দুশেখরের প্রয়াত পিতা শিবেন্দুশেখর রায়কে স্মরণ করেছিলেন। তার পরেই জল্পনা তৈরি হয়েছিল। এ বার তিনি যোগ দিলেন বিজেপি-তেই।
তৃণমূলের সাংসদপদ ছাড়ার পর অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সন্তোষমোহন দেবের কন্যা সুস্মিতা। সেই সময় ভাবা হয়েছিল, এ বার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার পদ ছেড়ে আবারও অসমের রাজনীতিতে মনোননিবেশ করবেন তিনি। কিন্তু বৃহস্পতিবার সল্টলেকে বিজেপির দফতরে গিয়ে দলীয় পতাকা হাতে তুলে নিলেন সুস্মিতা। তাঁর কথায়, ‘‘আমি বাড়িতে বসে বিজেপির ডিজিটাল সদস্যপদ নিতে পারতাম। কিন্তু কোথা থেকে যোগদান করব, সেটা তো নেতৃত্ব ঠিক করেন। তাই নেতৃত্ব বলেছেন, শমীকদা ডেকেছেন, এখানে এসে দলে যোগ দিয়েছি।’’ তার পরে তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি অসমে থাকি। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও আমি দেখা করেছি। তিনিও বলেছেন যে, বাংলার মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। কারণ বাংলা আমাকে দু’বার রাজ্যসভায় পাঠিয়েছে।’’ তবে কি এ বার বাংলা থেকেই কাজ করবেন সুস্মিতা? শমীক জানান, সারা ভারতেই বিজেপির হয়ে কাজ করবেন। সুখেন্দুশেখর এবং সুস্মিতার সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন আরও এক তৃণমূল সাংসদ। প্রকাশচিক বরাইক আলিপুরদুয়ারের ভূমিপুত্র। বৃহস্পতিবার তিনিও যোগ দিলেন বিজেপিতে। বিজেপির একটি সূত্র বলছে, সুখেন্দু, সুস্মিতা, প্রকাশ— তিন জনকে রাজ্যসভায় পাঠাতে পারে বিজেপি। যে হেতু এই উপনির্বাচনে এক জন প্রার্থীকে জয়ী হতে গেলে ১৪৭ জন বিধায়কের সমর্থনের প্রয়োজন, তাই এ বারের নির্বাচনে যে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না তা একপ্রকার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এই মুহূর্তে সম্মিলিত বিরোধী জোটের বিধায়ক সংখ্যা একশোর নীচে। তাই বিজেপির ঘোষিত তিন প্রার্থীর জয় এক প্রকার নিশ্চিত।



