ব্রাজিল ১ (ভিনিসিয়াস) কাতার ১ (খুখি)
মরক্কো ১ (সাইবারি) সুইৎজারল্যান্ড ১ (এমবোলো)
RK NEWZ মরক্কোর বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করল ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের গোলে হার এড়ালেও কার্লো অ্যান্সেলোত্তির কৌশল এবং ব্রাজিলের হারিয়ে যাওয়া ফুটবল-পরিচয় নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। ৭০ শতাংশ বল দখল থাকলেও দেখা যায়নি চেনা সেলেসাও জাদু। জার্সির রং হলুদের বদলে যদি নীল হত, তাহলে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এই টিম অতীতের দুর্ধর্ষও নয়, বরং ইদানীং সময়ের দিকভ্রষ্ট ইতালি৷ জার্সি লাল হলে পোল্যান্ড, সাদা হলে গ্রিস ভাবাটাও অমূলক নয়! মরক্কোর বিরুদ্ধে হলুদ জার্সিতে ব্রাজিলই খেলছে, অন্য কেউ নয়, বোঝা গেল প্রথমার্ধের অন্তিম প্রহরে, যখন লেফট উইং থেকে ভেসে আসা ক্রস কার্যত দু’পা শূন্যে তুলে ভলি মারলেন লুকাস পাকেতা! মিস হিট কিক৷ তাতে গোল এল না ঠিকই৷ কিন্তু আমাদের মতো অনেক দর্শকের সম্বিত ফিরল এটা ভেবে, যে আজ ভোরবেলা ব্রাজিলই নেমেছে৷ অন্য কেউ নয়! চেষ্টার ঘাটতি ছিল না৷ উইং বেয়ে আক্রমণ উঠেছে৷ রক্ষণও মোটের উপর জমাট৷ মাঝমাঠ পোক্ত। ভিনিসিয়াস জুনিয়র মরণান্তিক স্টাইলে স্প্রিন্ট করে গেলেন আগাগোড়া নব্বই মিনিট। কিন্তু সেই টাচ, সেই ডামি, সেই থ্রু পাস… নেই। কোত্থাও নেই! পুরোদস্তুর বল নিয়ন্ত্রণভিত্তিক ইউরোপিয়ান মডেল, তারও অক্ষম অনুকরণে, রসাতলে ব্রাজিল৷
স্কোরলাইন ১-১ যথাযথ৷ মরক্কো খেলেছে মরক্কোর মতো৷ কখনও হাই প্রেস, কখনও লো ব্লকে। কখনও লং পাস দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকারকে বাড়িয়ে৷ কখনও ফুল ব্যাক হাকিমিকে অ্যাটাকিং পজিশনে তুলে৷ ট্রেডমার্ক মরক্কো! কিন্তু ব্রাজিল? এককথায় অতীতের ছায়াও নয়… ভূতগ্রস্ত আত্মা! ৭০ শতাংশ বল পজেশন, ভিনির একক দক্ষতার জোরে সবেধন নীলমণি একখানা গোল, এক পয়েন্ট আর একরাশ হতাশা নিয়ে সাজঘরে ফিরবে গোটা টিম। নেইমার থাকলে কি ছবি পালটে যেত? প্রশ্ন তোলার বদলে অ্যান্সেলোত্তিকে উত্তর খুঁজতে হবে: এই বল দখলভিত্তিক ফুটবল কি আদৌ টুর্নামেন্টের বাকি পর্বে কাজে দেবে? ম্যাচে বল পায়ে রেখে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়া, ছন্দ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, পজিশন ধরে খেলা—সব ছিল। যা ছিল না, তা হল ব্রাজিলের চেনা ঝাঁঝ। চেনা গতি। চেনা সৃজনীশক্তি। মরক্কোর বিরুদ্ধে ১-১ ড্রয়ের পরে তাই শুধু একটি পয়েন্ট হারানোর প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন উঠছে দলের ফুটবল-পরিচয় নিয়েও। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে গ্রুপ সি-র ম্যাচে শুরুতেই ধাক্কা খায় কার্লো অ্যান্সেলোত্তির দল। ২১ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে ব্রাহিম দিয়াজের চেরা পাস ধরে এগিয়ে যান ইসমাইল সাইবারি। গ্যাব্রিয়েলকে পিছনে ফেলে আলিসনের মাথার উপর দিয়ে চিপ করে বল জালে জড়ান। মরক্কো এগিয়ে যায় ১-০ ব্যবধানে। গোল খাওয়ার পর কিছুটা সময় ব্রাজিল দিশাহীন। তারপর ধীরে ধীরে প্রত্যাবর্তন। ৩১ মিনিটে সমতা ফেরান ভিনি জুনিয়র। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে উঠে রাফিনিয়ার সঙ্গে ওয়ান-টু। তারপর প্রতিপক্ষ দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁকানো শটে গোল। স্কোরলাইন ১-১ হলেও ব্রাজিলকে তখনও খুব স্বচ্ছন্দ, তেমন আত্মবিশ্বাসী লাগছিল না।

প্রথমার্ধের শেষদিকে কিছুটা গতি ফেরে। লুকাস পাকেতা প্রায় গোল পেয়ে গিয়েছিলেন। বাঁদিক থেকে আসা ক্রসে শূন্যে উঠে শট নেন। কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ে সেভ করেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু। গোটা ফার্স্ট হাফ জুড়ে হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ, সাইবারিদের পাল্টা আক্রমণও বারবার ব্রাজিলের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে৷ সেকেন্ড হাফে ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রণ বেশি। ম্যাচ শেষে ৭০ শতাংশ পজেশনের হিসেব। কিন্তু সংখ্যাটা বিভ্রান্তিকর। কারণ পায়ে বল থাকলেও সুযোগ তৈরি হল কই? অ্যান্সেলোত্তি ৬১ মিনিটে ইগর থিয়াগো ও পাকেতাকে তুলে মাতেউস কুনহা ও লুইস হেনরিকে নামান। পরে ফাবিনিয়ো, দানিলোও ময়দানে। কিন্তু তাতেও আক্রমণের গতি বাড়েনি। ৭৮ মিনিটে ভিনির পাস থেকে রাফিনিয়ার শট বুনু সহজে বাঁচিয়ে দেন। শেষদিকে কর্নার ও ক্রস থেকে চাপ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু মরক্কোর রক্ষণ ভাঙার মতো তীক্ষ্মতা ও তীব্রতা দেখা যায়নি। উল্টে অতিরিক্ত সময়ে এল আইনাউইয়ে দূরপাল্লার শটে আলিসনের পরীক্ষা নেন। ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার জায়গা: ব্রাজিল কি নিজেদের স্বাভাবিক ঘরানা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? অ্যান্সেলোত্তি আসার পর দলকে আরও কাঠামোবদ্ধ, আরও ইউরোপীয় ধাঁচে খেলানোর চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু সেই গড়নের মধ্যে ভিনি, রাফিনিয়া কিংবা ব্রুনো গিমারাইসদের স্বতঃস্ফূর্ততা উধাও! উল্টোদিকে মরক্কো নিজেদের পরিচয়ে অটল। দ্রুত ট্রানজিশন, সংগঠিত রক্ষণ, সুযোগ পেলেই সরাসরি আক্রমণ। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে সেটাই কার্যকর হয়েছে। সমস্যাটা কি অ্যান্সেলোত্তির কৌশলে? ইতালীয় কোচ কি ব্রাজিলের লাতিন আমেরিকান স্বভাবকে ইউরোপীয় ছাঁচে ফেলতে গিয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ভার চাপিয়ে দিচ্ছেন? নাকি খেলোয়াড়রাই নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ? ব্রুনো, ফাবিনিয়োরা ইউরোপীয় ক্লাবে খেলেন বলে এই দুর্দশা—এটা অক্ষম যুক্তি৷ মানা কঠিন৷ অতীতেও রোনাল্ডো, কাকা, কাফুরা কেউ মিলান কেউ মাদ্রিদে খেলেছেন৷ কিন্তু হলুদ জার্সি গায়ে চাপালেই স্কোলারির অনুশাসনে সব নদীর জল এক ঘাটে এসে মিশত। লাতিন আমেরিকার সৌন্দর্য ও নৈপুণ্যে ধুয়েমুছে সাফ ইউরোপীয় পেশিশক্তি-নির্ভর ফুটবল! অ্যান্সেলোত্তির পক্ষে দ্রুত বিকল্প পথ খুঁজে বের করাটা অসম্ভব। খানিক অযৌক্তিকও বটে। টার্গেট এখন একটাই৷ নিজস্ব মডেলকে খাপ খাওয়ানোর উপায় বের করা। নয়তো দেশ ছাড়ার আগে ‘দাদু’ সম্বোধনে যে বাচ্চা ছেলেটা হাপুস নয়নে কেঁদে কাপ ফেরত আনার আবদা। গত বারের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল মরক্কো। আফ্রিকার শক্তিধর দেশ হিসাবে উঠে এসেছিল তারা। চার বছর পরের এই মরক্কো দল আগের চেয়েও ভাল। অনেকেরই গত বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে নতুন যাঁরা এসেছেন তাঁরাও মানিয়ে নিয়েছেন। কয়েক মাস আগে আফ্রিকার কাপ অফ নেশন্স জয় নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। তবে মরক্কো বুঝিয়েছে, এ বারও তারাই আফ্রিকার সেরা দল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজ়িলের ঠিক নীচেই রয়েছে তারা। আশরফ হাকিমি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। সাইবারি, ব্রাহিম, আয়নাউই, বোউদ্দাদিরাও কারও থেকে কম যান না। ব্রাজ়িলকে এ দিন অনেকটা সময় তটস্থ করে রেখেছিল।

শেষ মুহূর্তের গোলে সুইৎজারল্যান্ডকে আটকে দিল কাতার। দাপটে খেলেও প্রচুর সুযোগ নষ্টের খেসারত দিল সুইসরা। কাতার বনাম সুইৎজারল্যান্ড ম্যাচে ৯০ মিনিট জুড়ে এই দৃশ্যই দেখা গেল। বল নিয়ন্ত্রণ থেকে শট, সবেতেই এগিয়ে থাকল সুইৎজ়ারল্যান্ড। কিন্তু গোল করল মাত্র একটি। শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে নিশ্চিত এক পয়েন্টও হাতছাড়া করল তারা। ১-১ ড্র হল কাতার-সুইৎজ়ারল্যান্ড ম্যাচ। প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন ব্রিল এমবোলো। তবে যে হারে সুযোগ নষ্ট করেছে তারা তা চিন্তায় ফেলে দিল দলের কোচ মুরাত ইয়াকিনকে। প্রশংসা করতে হবে কাতারের গোলকিপার মাহমুদ আবুনাদার। তিনি প্রচুর শট বাঁচিয়েছেন। না হলে লজ্জাজনক ভাবে এই ম্যাচ হারতে হত কাতারকে। শেষ মুহূর্তে নাটকীয় ভাবে যে তারা গোল শোধ করে দেবে কেউই ভাবতে পারেননি। গোল করেন বৌয়ালেম খুখি। প্রতিপক্ষকে হালকা ভাবে নেওয়ার খেসারত দিতে হল সুইৎজারল্যান্ডকে। ইউরো কাপ বা বিশ্বকাপ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলার ব্যাপারে সুনাম রয়েছে সুইৎজারল্যান্ডের। এ দিন তারা খেলেছেও তেমনই। র্যাঙ্কিংয়ে অনেকটা নীচে থাকা কাতারকে তারা গোল করার সুযোগ সে ভাবে দেয়নি। কিন্তু নিজেরাও গোল করতে পারেনি একটির বেশি। প্রচুর সুযোগ নষ্ট করেছে। ম্যাচের শুরু থেকেই সুইৎজ়ারল্যান্ডের আগ্রাসন ছিল। তার মাঝেই দুর্দান্ত একটি সুযোগ নষ্ট করেন এডমিলসন। ওই মিসের পর কার্যত হারিয়েই যায় কাতার। এক একসময় সে দলের ১০ জন মিলে রক্ষণ করছিলেন। সুইৎজারল্যান্ডের মুহুর্মুহু আক্রমণ কোনও মতে রুখে দিচ্ছিল কাতার। ১৭ মিনিটে গোল করে সুইৎজারল্যান্ড। রেমো ফ্রিউলারের ভাসানো বল পেয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন ব্রিল এমবোলো। তাঁকে অবৈধ ভাবে বাধা দেন কাতারের গোলকিপার আবুনাদা। এর পরেই আঘাত পেয়ে তিনি পড়ে যান। পেনাল্টির সিদ্ধান্ত অবশ্য খারিজ হয়নি। এমবোলোই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। গোল হজম করে আরও রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে কাতার। অন্য দিকে, সুইৎজ়ারল্যান্ড একের পর এক আক্রমণ করতে থাকেন। গোলমুখ খুলতে পারছিল না। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে বেশ কিছুটা সময় সুইৎজ়ারল্যান্ডের খেলায় কোনও ঝাঁজ ছিল না। ম্যাচটি দেখে মনেই হচ্ছিল বিশ্বকাপের কোনও খেলা হচ্ছে। কাতার বা সুইৎজ়ারল্যান্ড, কারওরই যেন গোল করার ইচ্ছা ছিল না। তবে শেষের দিকে দু’দলের আক্রমণ ম্যাচ কিছুটা উত্তেজক হয়ে ওঠে। আচমকাই গোল করে দেয় কাতার। সংযুক্তি সময়ের পঞ্চম মিনিটে বাঁ দিক থেকে সতীর্থের ভাসানো বলে জোরালো হেডে বল জালে জড়িয়ে দলের এক পয়েন্ট নিশ্চিত করেন খুখি।





