RK NEWZ অভিশপ্ত এক ডিসেম্বর। কলকাতা ময়দানের অগনিত মেসিভক্তর চোখে জল। তিল তিন করে জমানো টাকায় মেসিকে দেখার জন্য টিকিট কিনেছিলেন। জনৈক এক মেসিভক্তের কণ্ঠে অভিযোগ শোনা গিয়েছিল, ‘‘সুদীপ্ত সেনের মতোই কাজ করেছেন শতদ্রু। মানুষের টাকা নিয়ে তছরুপ।’’ শতদ্রুকে কয়েক বছর কাছ থেকে দেখা ময়দানের এক ফুটবলকর্তা তথা ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ‘‘ইভেন্ট করে টাকা আয় করার মধ্যে অন্যায়ের কিছু নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও একটা ন্যূনতম সততা লাগে। যাঁদের থেকে টাকা নিচ্ছি তাঁদের প্রতি একটা দায়দায়িত্ব থাকে। এটা ওর নেই। টাকার নেশা আর অতিরিক্ত লোভই ওকে শেষ করে দিল।’’ মেসি কলকাতায় পৌঁছোনোর কয়েক মিনিট আগে তিনি পোস্ট করেছিলেন, ‘‘এটা নামাই, তার পর ‘বদ্দা’কে এনে বিদায় নেব’। ‘বদ্দা’ মানে বাঙালির আর এক প্রিয় তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন, ভারতের চার শহরে লিয়োনেল মেসির সফর শেষ করার পরবর্তী লক্ষ্য হবে রোনাল্ডোকে ভারতে আনা। তবে মেসি কলকাতায় পা রাখার কয়েক ঘণ্টা পরে যা ঘটল, তাতে ‘অকাল অবসরে’ চলে গিয়েছিলেন। তিনি শতদ্রু দত্ত। ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি যাঁর আর একটি পরিচিতি ‘স্পোর্টস প্রোমোটার’ বা ক্রীড়া সংগঠক হিসাবে। শতদ্রু অতীতে কলকাতায় এনেছেন পেলে, দিয়েগো মারাদোনা থেকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কাফু বা আর্জেন্টিনার গত বিশ্বকাপজয়ী দলের গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে সব হিসাব গোলমাল করে ফেললেন। এই ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য যে প্রস্তুতি, অনুমানক্ষমতা, সমন্বয় ও নিখুঁত পরিকল্পনার দরকার হয়, তার আন্দাজ কি ছিল না শতদ্রুর? অনুষ্ঠান গড়ানোর কিছু ক্ষণের মধ্যে শুরু বিশৃঙ্খলা। তার পর দেড় ঘণ্টা ধরে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি দেখা গেল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। পুলিশের সঙ্গে সমর্থকদের মারপিট, চেয়ার ভাঙা, বোতল ছোড়া— বাদ যায়নি কিছুই। প্রাক্তন ফুটবলারদের অধিকাংশই একই মত পোষন করছেন, বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের এনে ‘ব্রোকারি’ ব্যবসায় আদৌ ভারতীয় ফুটবলের লাভ কোথায়? এতে কোনও একজনের ব্যবসা বাড়ে। অনেক কর্পোরেট সংস্থা লগ্নি করে ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের উন্নতি কোথায়। শুধুমাত্র ক্ষুদে ফুটবলারদের ক্যাম্প কিংবা অ্যাকাডেমিগুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষনের উপায় থাকলে আলাদা কথা। তা তো হয় না। শুধু কিছু পয়শাওয়ালা কিছু লোকেদের ছবি ও সেলফি তুলিয়ে মোটা টাকা উপার্জ্জন করিয়ে ভারতীয় ফুটবলের কোনো উন্নতি হয় না বলে মনে করছেন দিকপাল ভারতীয় ফুটবলাররা। ভারতীয় ফুটবলের প্রধানও এই প্রসঙ্গে সর্বতভাবে একমত।

কে এই শতদ্রু দত্ত?
শতদ্রুর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা হুগলির রিষড়ায়। এই রিষড়া থেকেই উঠে এসেছেন ভারতের প্রাক্তন ফুটবলার সুধীর কর্মকার, শিশির ঘোষেরা। তবে ফুটবল নয়, ছোটবেলায় শতদ্রুর পছন্দ ছিল ক্রিকেট। শ্রীরামপুরের হোলি হোম স্কুলে পড়াশোনা। এর পরে অর্থনীতি নিয়ে লেখাপড়া। পেশা হিসাবে বেছে নেন ওয়েল্থ ম্যানেজমেন্ট এবং ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং। কেরিয়ারের শুরুতে চাকরি করেছেন একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে। তবে ২০১১-য় চাকরি ছেড়ে দেন নতুন কিছু শুরু করবেন বলে। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে খেলাধুলো। নিজে খেলোয়াড় হতে পারেননি। তবে ভারতে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের এনে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চান। একমাত্র পুত্রসন্তানের নাম রেখেছেন ‘দিয়েগো’। তাকে ফুটবলার তৈরি করতে চান। বিদেশে পাঠিয়েছেন খেলা শেখাতে। শতদ্রুর প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ব্যবসায় নেমে জামাইবাবুর সঙ্গে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট শুরু করেন। প্রথম প্রথম ছোটখাটো অনুষ্ঠান সামলাতেন। তবে শতদ্রুর উচ্চাশা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা বরাবরই বেশি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে ‘গুরুদেব’ সম্বোধন করে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে সৌরভকে অর্থাৎ ‘গুরুদেবকে’ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া শুরু করেন। অর্থপ্রাপ্তি বাড়তে থাকে। বছর দুয়েক আগে সৌরভের জন্মদিনে ‘লন্ডন আই’-এর সামনে দাঁড়িয়ে নাচগান করতেও দেখা গিয়েছিল শতদ্রুকে। সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে ক্রমশ কলকাতার ক্রীড়ামহলে নিজের একটা জায়গা তৈরি করতে থাকেন শতদ্রু। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘স্পোর্টস প্রোমোটার’ হিসাবে। মিডিয়াকে নিজে মুখে বলতে শোনা যায় ‘স্পোর্টস প্রোমোটার’ অর্থাৎ ‘ক্রীড়া উদ্যোগপতি’ কথাটা ব্যবহার করার। ‘স্পোর্টস প্রোমোটার’ অর্থাৎ ‘ক্রীড়া উদ্যোগপতি’ ব্যবহারে কাজে লাগান সমাজমাধ্যমকেও। সেখানে নিয়মিত ছবি, ভিডিয়ো পোস্ট করতে থাকেন বিখ্যাত খেলোয়াড়দের সঙ্গে। ফলে নানা মহলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন রাজনীতিবিদ থেকে খ্যাতনামী ব্যক্তিত্বরাও গুরুত্ব দিতে শুরু করেন শতদ্রুকে। তবে ঘটনাপ্রবাহ বলছে, যে ক’টি ইভেন্ট শতদ্রু করেছেন, তার প্রায় সবগুলিতেই কমবেশি বিশৃঙ্খলা ঘটেছে। অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি উঠেছে দর্শকদের ঠকানোর অভিযোগও। যার চরম পরিণতি ঘটে গিয়েছিল এক অভিশপ্ত শনিবাসরীয় বারবেলায়, যুবভারতীতে। ২০১৫-য় প্রথম শতদ্রুর ‘সাফল্য’ পেলেকে কলকাতায় আনা। ১৯৭৭-এ ফুটবলার পেলে এসে ইডেন গার্ডেন্সে ফুটবল খেলেছিলেন মোহনবাগানের বিরুদ্ধে। তবে এ শহরের আধুনিক প্রজন্মের কাছে পেলেকে চাক্ষুষ দেখা সে বারই প্রথম। অব্যবস্থা সে বারও ছিল। তবে, তা নিয়ে আলোচনা বিশেষ হয়নি। সমস্যা হয় দু’বছর পর, ২০১৭-য় মারাদোনাকে আনার সময়। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী ভারতে দ্বিতীয় বার আসবেন শুনে তুমুল আগ্রহ তৈরি হয়েছিল গোটা শহরে। অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে লাইন লেগে গিয়েছিল স্পনসর সংস্থাগুলির। সে বারও যুবভারতীতে আসার কথা ছিল মারাদোনার। তিনি এসেছিলেন। এবং মেসির মতো মারাদোনাকে ঘিরেও ছিল প্রচুর লোকের ভিড়। তবে দু’জনের মেজাজ আলাদা। মেসিকে যেখানে শনিবার শান্ত মুখে (বিরক্ত যদি হয়েও থাকেন তা তাঁর শরীরের ভঙ্গিমায় ধরা পড়েনি) সকলের সব আবদার মিটিয়েছেন। মারাদোনা সেখানে স্টেডিয়ামে গাড়ির উপর উঠে পড়েছিলেন। বুকে বার বার হাত দিয়ে জনতার অভিবাদন গ্রহণ করেছিলেন। স্টেডিয়ামের জনতার স্বপ্নপূরণ হয়েছিল। চেতলা অগ্রণী এবং কৈখালিতে এক স্পনসরের অনুষ্ঠানে ভিড় দেখেই তিনি নামতে চাননি। শোনা গিয়েছিল, রাগের চোটে তিনি প্রকাশ্যে নিজের ম্যানেজারকেই সপাটে চড় মেরেছিলেন। এরপর শতদ্রুর উদ্যোগে কলকাতায় এসেছেন কাফু, রোনাল্ডিনহো, বেবেতো, জুনিনহোরা। ধারে-ভারে এঁরা কেউই মেসি বা মারাদোনার মতো নন। ফলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিল কম। বিতর্কও খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি। সমস্যা প্রবল হয় এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে আনার সময়। বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক সাত মাস পরে কলকাতায় পা দিয়েছিলেন ‘দিবু’। প্রথম অনুষ্ঠান ছিল বাইপাসের ধারে বিশ্ববাংলা অডিটোরিয়ামে। অডিটোরিয়ামে ঢোকার আগেই বাইরে পুলিশের সঙ্গে গোলমাল চলছে কিছু সমর্থকের। জানা গিয়েছিল, ওই সমর্থকেরা যে টিকিটগুলি এনেছিলেন সেগুলি জাল। অথচ সমর্থকদের দাবি ছিল, সেগুলি অনলাইনে ওয়েবসাইট থেকে কেনা। ভিতরে ঢুকে দেখা গিয়েছিল, কোনও স্পষ্ট দিক্নির্দেশিকা নেই। কে কোথা দিয়ে ঢুকবেন, কোথা দিয়ে বেরোবেন কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। মার্তিনেসকে দেখার জন্য সাধারণ সমর্থকদের টিকিট কাটতে হয়েছিল। সেটিও ছিল চড়া দামের। পাশাপাশি, বেশি দামের টিকিটে ছিল মার্তিনেসের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের সুযোগও। অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। মার্তিনেস মঞ্চে আসতেই তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। দাম অনুযায়ী সমর্থকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে সব লাটে ওঠে কিছু ক্ষণ পরেই। শুধু তা-ই নয়, মার্তিনেসের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য কলকাতার দুই প্রধানের কর্তা এবং প্রাক্তন ফুটবলারেরা আদেখলাপনা শুরু করেন। মাঝারি মাপের মঞ্চে প্রায় শ’দুয়েক লোক উঠে যান। এক সময় ঢাকা পড়ে যান মার্তিনেসই। মঞ্চ থেকে মাইক হাতে কলকাতার এক প্রধানের কর্তাকে প্রকাশ্যে গালি দিতেও শোনা গিয়েছিল। তিনি এক প্রাক্তন ফুটবলারের উদ্দেশে অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তিনি মঞ্চে উঠছেন না। ভিড়ের চাপে সময়ের আগেই মার্তিনেস বিশ্ববাংলা অডিটোরিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। অনেকেই প্রতিবাদ করেন, টাকা দিয়েও মার্তিনেসের সই করা জার্সি বা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের সুযোগ পাননি। তখনও উঠেছিল শতদ্রুকে গ্রেফতারের দাবি। এর পর মার্তিনেসকে নিয়ে যাওয়া হয় মোহনবাগান মাঠে। সেখানে পুলিশ কাপের ম্যাচ দেখেন। বিশৃঙ্খলা ছিল সেখানেও। পরের দিন রিষড়ায় নিজের বাড়িতে মার্তিনেসকে নিয়ে যান শতদ্রু।

মার্তিনেস বিদায়ের পর থেকেই মেসিকে আনার চেষ্টা শুরু। আর্জেন্টিনার রোসারিয়োয় মেসির বাবা জর্জের সঙ্গে দেখা করে মেসিকে কলকাতায় আনার জন্য তদ্বির করতে থাকেন। প্রথমে এ ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে আগ্রহ দেখাননি মেসি বা তাঁর বাবা কেউই। ধীরে ধীরে বরফ গলে। সূত্রের খবর, শতদ্রু এতটাই আর্থিক লাভের কথা শোনান যে, মেসির দল তা ফেলতে পারেনি। অবশেষে মেসি ভারতে আসতে রাজি হয়ে যান। গত ১১ ডিসেম্বর সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে শতদ্রু লেখেন, “৯৯৭ দিনের লড়াই, ৩১৭টা বিমান আর ৩/৪ ঘণ্টার ঘুম। আর তিন দিনের লড়াই।” বিভিন্ন সূত্র থেকে শতদ্রু সম্পর্কে যা জানা গিয়েছে, তাতে ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সংখ্যাই বেশি। মেসিকে আনতে বেশ কয়েক বার রোসারিয়ো এবং মায়ামিতে যেতে হয়েছে শতদ্রুকে। সেখান থেকে বিভিন্ন সময়েই জার্সি এনেছেন তিনি। কখনও তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে, কখনও মোহনবাগান ক্লাবকে, কখনও শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কাকে। ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, সেগুলি আদৌ মেসির সই করা কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অর্থাৎ সেগুলি জালও হতে পারে বলে কারও কারও সন্দেহ রয়েছে। মেসিকে আনবেন বলে বহু দিন আগে থেকেই রাজনীতিবিদ, স্পনসর থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানুষকে এই উদ্যোগে শামিল করার এবং অর্থ বিনিয়োগ করানোর চেষ্টা করেছিলেন শতদ্রু। শোনা গিয়েছে, বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মেসির সঙ্গে শতদ্রুর সংস্থার ঠিক কী চুক্তি হয়েছে, তা কখনওই প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ফলে অনেক সমর্থকই ভেবেছিলেন, মেসি এসে যুবভারতীতে খেলবেন। নিদেনপক্ষে অন্তত ফুটবলে একটি-দু’টি শট মারবেন। আদপে হয়নি তাঁর কিছুই। যাঁরা প্রচুর অর্থ ঢেলেছিলেন এই অনুষ্ঠানের জন্য, সেই স্পনসরেরাও ঠিক করে জানতেন না যে কী হতে চলেছে। এতটাই অস্পষ্ট ছিল এই সফর। ঘনিষ্ঠজনেরা বলছেন, এটা নতুন কিছু নয়। শতদ্রু বরাবরই এমন কাজ করে থাকেন। বলেন এক, আর করেন আর এক। তাঁর আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা হবে না, এমনটা ভাবাই যায় না। শতদ্রুকে কাছ থেকে চেনেন এমন কিছু সূত্র আক্ষেপ করে বলেছেন, “মার্তিনেস কখনওই মেসির মতো জনপ্রিয় নয়। সেখানে যদি ও রকম বিশৃঙ্খলা হয়ে থাকে, তা হলে মেসির সময় কী হবে তা আগে থেকে বোঝা উচিত ছিল। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল।” ডিসেম্বরের সেই অভিশপ্ত শনিবার যুবভারতীতে যখন ধুন্ধুমার চলছে, তখন আচমকাই প্রেসবক্সে দেখা গেল কিছু পুলিশকে। তাঁরা এসে দ্রুত প্রেসবক্স খালি করার নির্দেশ দিলেন। সঙ্গে দিলেন অমোঘ সাবধানবাণী, “আপনারা দয়া করে গলার অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড খুলে তার পর বেরোবেন। না হলে বিপদ হতে পারে।” কার্ডে শতদ্রুর নাম ছিল যে! মাঠফেরত হতাশ আর ক্রুদ্ধ মেসিভক্তের কণ্ঠে শোনা গেল, ‘‘সুদীপ্ত সেনের মতোই কাজ করেছেন শতদ্রু। মানুষের টাকা নিয়ে তছরুপ।’’ শতদ্রুকে কয়েক বছর কাছ থেকে দেখা ময়দানের এক ফুটবলকর্তা তথা ব্যবসায়ীর কথায়, ‘‘ইভেন্ট করে টাকা আয় করার মধ্যে অন্যায়ের কিছু নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও একটা ন্যূনতম সততা লাগে। যাঁদের থেকে টাকা নিচ্ছি তাঁদের প্রতি একটা দায়দায়িত্ব থাকে। এটা ওর নেই। টাকার নেশা আর অতিরিক্ত লোভই ওকে শেষ করে দিল।’’ ‘স্পোর্টস প্রোমোটার’ শতদ্রুর ‘প্রোমোটিং’-এর ভবিষ্যৎ কী? আদৌ এই ব্যবসায় ভারতীয় ফুটবলের কী লাভ? এই ব্যবসাকে অনেকে ‘দালালি’ বা ব্রোকার এর কাজ বলেন অভিহাত করেন। শতদ্রুকে নিয়ে ইত্যাদি প্রশ্ন ক্রীড়ামহলে।

১২ ডিসেম্বর ২০২৫ শুক্রবার রাত ২ টো বেজে ৩২ মিনিট
কলকাতায় পা রাখলেন লিয়োনেল মেসি! মেসির ভারত সফরের নাম ‘গোট ট্যুর অফ ইন্ডিয়া’। শুক্র রাত আড়াইটে নাগাদ কলকাতায় পা রাখলেন। প্রায় ১৪ বছর পর ভারতে মেসির আগমন। বিমানবন্দর থেকে মেসি বেরোনো মাত্রই সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড়। সমর্থকদের চিৎকার ও জয়ধ্বনিতে গমগম করছিল বিমানবন্দর চত্বর। মেসিকে স্বাগত জানাতে আগে থেকেই বহু সমর্থক বিমানবন্দরের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। ভারত ও আর্জেন্টিনার পতাকা নিয়ে উচ্ছ্বাস। তোলা হচ্ছিল নিজস্বী এবং ভিডিয়োও। মেসি ছাড়াও কলকাতায় ইন্টার মায়ামির সতীর্থ, প্রিয় বন্ধু তথা উরুগুয়ের ফুটবলার লুইস সুয়ারেস ও আর্জেন্টিনার ফুটবলার রদ্রিগো ডি’পল। ছিলেন শাহরুখ খানও। যদিও শাহরুখ ও মেসি আলাদা বিমানে কলকাতায় এসেছিলেন। শাহরুখ তাঁর ব্যক্তিগত জেটে আসেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাঁদের বিমানবন্দর থেকে বের করে আনেন নিরাপত্তাকর্মীরা। জনগণের ঢল দেখার মতো ছিল বিমানবন্দরে। শীতের রাতে বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন ক্ষুদেরাও। গেট নম্বর চারের বাইরে মেসিকে এক ঝলক দেখে উত্তেজিত ছিলেন প্রত্যেকেই। ১৪ বছর পর বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় শহরে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তিনি কার্গো গেট দিয়ে গাড়ি করে হোটেলের উদ্দেশে রওনা। হোটেলে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম। কার্যক্রম সাজানো ছিল ঠিক এইরকম। শনি সকাল ৯.৩০ থেকে ১০.৩০ পর্যন্ত মিট অ্যান্ড গ্রিট পর্ব। সকাল ১০.৩০ থেকে ১১.১৫ ভার্চুয়ালি নিজের মুর্তি উন্মেচনে এলএম টেন। ১১.১৫ মিনিটে হোটেল থেকে যুবভারতীতে। ১১.৩০ মিনিটে মাঠে শাহরুখ। দুপুর ১২টায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। দুপুর ১২ থেকে ১২.৩০ পর্যন্ত সেলিব্রিটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ, সংবর্ধনা এবং সংক্ষিপ্ত আলাপ পর্ব। অনুষ্ঠান শেষে বিমানবন্দরে। দুপুর ২টোয় হায়দরাবাদের উদ্দেশে রওনা। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরে কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে মেসির ভারত সফরের নাম ছিল ‘গোট ট্যুর অফ ইন্ডিয়া’।

নিরাপত্তা অনেকটা, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো
মেসি ছাড়াও যুবভারতীর অনুষ্ঠানে বহু বিশিষ্ট মানুষের ভিড়। শাহরুখদের মূল দায়িত্ব বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের হলেও কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশ সব রকম ভাবে সাহায্যে। বিভিন্ন পুলিশ জেলা কমিশনারেট থেকে ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, কনস্টেবল থেকে র্যাফ। সব মিলিয়ে প্রায় ২০০০ পুলিশকর্মী নিরাপত্তার দায়িত্বে। গাড়ি রাখার ক্ষেত্রেও নির্দেশিকা জারি ছিল বিধাননগর পুলিশের। সল্টলেক স্টেডিয়ামের অদূরে তৈরি ছিল ‘হোলা মেসি ফ্যান জোন’। সল্টলেক স্টেডিয়ামের অদূরে, একটি হাউজ়িং কমপ্লেক্সে তৈরি ছিল হোলা মেসি ফ্যান জোন। মায়ামির বাড়ির আদলে মেসির বাড়ির প্রতিকৃতির বারান্দায় অধিষ্ঠিত মেসি, তাঁর স্ত্রী আন্তোনেয়া রোকুজো এবং তিন ছেলে মাতেয়ো, থিয়াগো এবং সিরো। ২০১১ সালের ২ সেপ্টেম্বর যুবভারতীতে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ফিফা ফ্রেন্ডলি খেলেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ছিলেন মেসিই। তখনই তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতায় খেলে যাওয়া মেসির বিশ্বকাপ ছিল না। দ্বিতীয়বার কলকাতায় আগত মেসি বিশ্বজয়ী অধিনায়ক। ইন্টার মায়ামিকে প্রথম বার এমএলএস কাপ চ্যাম্পিয়নও করেন।

মেসির সফরের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু গ্রেফতার!
লিয়োনেল মেসিকে ঘিরে রইলেন কর্তা-মন্ত্রীরা। মোটা টাকায় টিকিট কেটে গিয়েও প্রিয় তারকাকে দেখতে না-পাওয়া দর্শকদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ল মাঠে। বোতল পড়ল। গ্যালারির চেয়ার ভেঙে ভেঙে মাঠে ফেলা হল। ফেন্সিংয়ের গেট ভেঙে শয়ে শয়ে দর্শক ঢুকে পড়েছিলেন মাঠে। পুলিশ লাঠিচার্জও সফল হয়নি। লন্ডভন্ড যুবভারতী স্টেডিয়াম। শনি সকাল ১১.৩০ মিনিটে যুবভারতীর মাঠে ঢোকে মেসির গাড়ি। সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ় এবং রদ্রিগো ডি’পল। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু মানুষ ঘিরে ধরেন। ফলে গ্যালারি থেকে শুধু মেসিকে নয়, লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি’পলকেও দেখা যায়নি। ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীদের চিৎকার ‘উই ওয়ান্ট মেসি’ স্লোগান দিতে শুরু। মেসি যুবভারতীতে পৌঁছোতেই অন্তত ৭০-৮০ জন মানুষের ভিড় ঘিরে ধরে। মূলত মন্ত্রী, কর্তারাই ঘিরে ধরেন মেসিকে। মেসিকে ভাল করে হাঁটার জায়গাটুকুও দিচ্ছিলেন না কেউ কেউ! ক্যামেরা এবং মোবাইল হাতে ছবি তোলার ব্যস্ততা। মোহনবাগান এবং ডায়মন্ড হারবারের প্রাক্তন ফুটবলারদের সঙ্গে মেসি পরিচিত হওয়ার সময়ও ভিড়। প্রধান আয়োজক শতদ্রু দত্তর মাইক্রোফোনে ঘোষণা। মেসি ১৬-১৭ মিনিট মাঠে ছিলেন। ১১.৫২ মিনিটে মেসিকে বার করে নিয়ে যাওয়া হয়। আর্জেন্টিনার তারকা মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত। মোটা টাকায় টিকিট কিনে মাঠে এসেও মেসিকে দেখতে না পাওয়ায় ফুটবলপ্রেমীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শুরু হয় গ্যালারিতে লাগানো হোর্ডিং ভাঙচুর। পরে গ্যালারির চেয়ার ভেঙে মাঠে ছুড়তে শুরু করেন ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীরা। মাঠে পড়তে শুরু করে বোতল। মাঠের দখল নিয়ে নেয় অন্তত হাজার দুয়েক লোক। মাঠে ঢুকে কেউ ডিগবাজি খেয়েছেন, কেউ নিজস্বী তুলেছেন, কেউ আবার লাফিয়েছেন। এই সময় গ্যালারিতে কোনও পুলিশকর্মীকে দেখা যায়নি। মাঠের ধারে ফেন্সিংয়ের গেট ভেঙে হু-হু করে মাঠে লোক ঢুকতে শুরু করে। প্রথমে পুলিশ ছিল দিশাহারা। কিছুটা পর সম্বিত ফেরে পুলিশকর্মীদের। লাঠি উঁচিয়ে ক্ষুব্ধ জনতাকে তাড়া করে। সব মিলিয়ে যুবভারতী রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। লিয়োনেল মেসিকে কলকাতায় আনার মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন ডিজি রাজীব কুমার। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস। দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন ডিজি। স্টেডিয়ামের বাইরে উত্তেজনা। বাইপাসে উত্তেজনা। লাঠি নিয়ে জনতাকে তাড়া পুলিশের। শতদ্রুকে ‘চোর-চোর’ স্লোগান জনতার। মেসিকে সামনে রেখে দুর্নীতির অভিযোগ জনতার একাংশের। মাঠের ধারে রাখা তাঁবুতে অগ্নিসংযোগ। লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে চরম বিশৃঙ্খলার পর সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার ঘোষনা করেছিলেন, প্রধান উদ্যোক্তাকে আটক করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত খবর, মূল উদ্যোক্তা শতদ্র দত্ত গ্রেপ্তার স্টেডিয়ামের ভিতরে কিছু সেলফিওয়ালা সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিকদের ভিড়ও ছিল।

বিশ্বমঞ্চে কলকাতার মাথা হেঁট!
‘‘মেসিকে তো দেখতে পেলামই না, বদলে কয়েক জন ক্রিমিনালকে দেখতে হল!’’ জনতার বক্তব্য। লিওনেল মেসির সফর বিশ্ব দরবারে মাথা হেঁট করে দিয়েছিলল কলকাতার। লন্ডভন্ড শহরের বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়াম যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। বিধ্বস্ত যুবভারতী থেকে কেউ তুলে নিয়ে গিয়েছেন ফুলের টব। কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছেন মাঠের ঘাস। এমন কলঙ্কিত দিন সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতার ইতিহাসে আসেনি। হাজার হাজার টাকা দিয়ে মেসিকে দেখার জন্য টিকিট কেটেছিলেন দর্শকেরা। কেউ দিয়েছিলেন ১২ হাজার টাকা। কেউ ১৬ হাজার। কিন্তু তাঁরা এক ঝলকেও দেখতে পাননি বিশ্বজয়ী ফুটবলারকে। ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ জনতার কেউ বলেছেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে একটা বড় দুর্নীতি হল। টাকা ফেরত চাই।’’ পরিস্থিতি এমনই অগ্নিগর্ভ ছিল যে, অনেক দর্শক সারদা কেলেঙ্কারির কথা টেনে এনে মেসির সফরের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তের তুলনা করতে শুরু করেন সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে। কেউ বলেন, ‘‘মেসিকে তো দেখতে পেলামই না, বদলে কয়েক জন ক্রিমিনালকে দেখতে হল!’’ দর্শকদের ক্রোধ ‘অনৈতিক’ নয়। যুবভারতীতে মেসির সফর ঘিরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে সবচেয়ে সস্তার টিকিটের দামই ছিল চার হাজার টাকার উপর। বিশ্বজয়ী ফুটবলারকে সামনে থেকে এক বার চোখের দেখা দেখবেন বলে ভক্তেরা কেউ ১০ হাজার, কেউ ১৫ হাজার, কেউ ৩০ হাজার টাকা দিয়েও টিকিট কেটেছেন। ভেঙে ফেলেছেইলেন কয়েক বছরের সঞ্চয়! কিন্তু মেসির এক ঝলকও দেখতে পাওয়া যায় নি গ্যালারি থেকে।

মেসির ‘দখল’এ কে, সুজিত না অরূপ? অতি অর্থলোভে বলির পাঁঠা শতদ্রু?
কলকাতা বিমানবন্দরে পা রাখার পরেই মেসিকে নিজের ‘দখলে’ নিয়ে ফেলেছিলেন সুজিত। হায়াতে পৌঁছোনো থেকে শনিবার সকাল ১১টা ২৫ পর্যন্ত মেসি কার্যত ছিলেন সুজিতের ‘হেফাজতে’। হোটেল তোমার তো মাঠ আমার। হায়াত রিজেন্সি তোমার তো যুবভারতী আমার। দুই মন্ত্রী সুজিত বসু এবং অরূপ বিশ্বাসের ‘মেসি দখলের’ লড়াইয়েই শনিবারের যুবভারতী বিপর্যয়। হোটেল হায়াত রিজেন্সিতে পৌঁছোনো থেকে শনিবার সকাল ১১টা ২৫ পর্যন্ত মেসি ছিলেন সুজিতের ‘হেফাজতে’। যেখানে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি অরূপকে। হায়াতে সুজিত সপরিবারে ছিলেন। ছিলেন তাঁর পছন্দের বাছাই লোকজনও। নিজের ক্লাব শ্রীভূমির সামনে মেসির ৭০ ফুটের মূর্তি উন্মোচন করানো থেকে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্তিনীয় তারকার সঙ্গে আলাপচারিতা— সবেতেই সুজিত সামনে। সক্রিয়। প্রথম ল্যাপে অতএব, দৌড়ে খানিকটা পিছিয়ে ছিলেন অরূপ।
‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ থেকে দু:স্বপ্নের কাণ্ডারি শতদ্রু দত্ত!
মুম্বইয়ে লিওনেল মেসির ভারত সফরের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বসেছিল চাঁদের হাট। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী, মেসি অনুরাগীরা ছাড়াও বলিউড তারকা থেকে জনপ্রিয় খেলোয়াড়-সহ অনেকেই হাজির ছিলেন। কারা কারা এসেছিলেন? মেসির মুম্বই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন করিনা কাপুর খান, অজয় দেবগন, টাইগার শ্রফ, জিম সর্ভ, ইব্রাহিম আলি খান, শচীন তেন্ডুলকর প্রমুখ। টবলের ঈশ্বরের বরপুত্র লিওনেল মেসির সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলেন জিম, ইব্রাহিমরা। এই ম্যাচের পর বলিউড তারকাদের সঙ্গে হাত মেলান মেসি। উপস্থিত ছিলেন অজয় দেবগন এবং তাঁর ছেলে যুগ, আমন দেবগন, টাইগার শ্রফরাও। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনভিশের স্ত্রী অমৃতাকেও তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলতে দেখা যায়। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে এদিন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়। ভারতীয় ফুটবল তারকা সুনীল ছেত্রীকে তাঁর নামাঙ্কিত জার্সি উপহার দেন মেসি। অন্যদিকে সচিন তেন্ডুলকরও এদিন মাঠে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর নাম লেখা জার্সি দেন মেসিকে। তিনি একটি ফুটবল দেন ক্রিকেটারের ঈশ্বরকে। তাঁরা মাঠে একসঙ্গে অনেকটা সময় কাটান। সুনীল ছেত্রীর সঙ্গেও দীর্ঘ সময় কথা বলেন মেসি। চলে ছবি তোলার পর্ব। দুই ছেলে, তৈমুর আলি খান এবং জেহ ওরফে জাহাঙ্গির আলি খানকে নিয়ে লিওনেল মেসির মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন করিনা কাপুর খান। ছবি তোলেন মেসি, লুই সুয়ারেজ, রডরিগো ডি’পলের সঙ্গে। অভিনেত্রীকে ফুটবল তারকার সঙ্গে খোশমেজাজে গল্প করতেও দেখা যায় এদিন। করিনা কাপুর খান নিজেও সমাজমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেছেন ইভেন্টে যাওয়ার। সেখানে দেখা যাচ্ছে দুই ছেলের হাত ধরে তিনি হাঁটছেন তিনজনেই পিছন ফিরে রয়েছেন। তৈমুর পরে রয়েছে মেসির নাম লেখা আর্জেন্টিনার ফুটবল জার্সি। অন্যদিকে জেহর পরনে ১০ লেখা জার্সি। অভিনেত্রীকে এদিন খয়েরি রঙের একটি স্যুট, মিডি স্কার্টে দেখা যায়।
যুবভারতীকাণ্ডে গ্রেফতার
নাগেরবাজার দু’জনকে পাকড়াও করে দক্ষিণ বিধাননগর থানার পুলিশ। ধৃতদের নাম সৌরভ বসু এবং শুভ্রপ্রতিম দে। শতদ্রুর ‘স্যাঙাত’ পুলিশ এবং প্রশাসনের সেতু লাল্টু ছিলেন মেসিকে ঘিরে থাকা জটলায় লোক ঢোকানোর অন্যতম ‘হোতা’ এই দাস ‘পোস্টমাস্টার’ বলে অভিযোগ? শতদ্রুর ‘স্যাঙাত’ লাল্টু। পুলিশ সূত্রের খবর, লাল্টুকেও ডেকে পাঠাতে পারে বিধাননগর কমিশনারেট। প্রাথমিক তদন্ত পুলিশের, মেসিকে ঘিরে থাকা জটলায় লোক ঢোকানোর অন্যতম ‘হোতা’ তিনিই। মেসির সফর নিয়ে বিধাননগর পুলিশের সঙ্গে শতদ্রুর সংস্থার একাধিক বৈঠকে হাজির ছিলেন লাল্টু। বিভিন্ন দফতরে শতদ্রুর ‘পোস্টমাস্টার’ হয়ে পৌঁছে দিতেন চিঠিচাপাটিও। কিন্তু খাতায়কলমে তিনি কোথাও ছিলেন না। অন্য অনেকের মতোই তিনিও শতদ্রুর ‘স্যাঙাত’। যুবভারতীতে লিয়োনেল মেসির সফরের জন্য শতদ্রু দত্তের সংস্থার তরফে ‘লিয়াঁজো অফিসার’ হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল জনৈক লাল্টু দাসকে। পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে তিনিই যোগাযোগ এবং সমন্বয় রক্ষা করেছেন। যদিও তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি শতদ্রুর সংস্থায় চাকরি করেন না। ‘বন্ধু’ হিসাবে নানা কাজকর্ম করে থাকেন। মেসির সফরে যুবভারতীর যাবতীয় নাট-বল্টু এই লাল্টুর হাতেই ছিল। কিন্তু অপেশাদারিত্বের চোটে যে তা এমন ঢিলে হয়ে যাবে, তা কেউই বুঝতে পারেননি। লাল্টুকে কলকাতা ময়দান চেনে। মেসি সফরের সূত্রের তাঁকে চিতেন রাজ্যের তাৎকালীন তৃণমূলী মন্ত্রীরাও। মোহনবাগানের প্রাক্তন ফুটবলার লাল্টু নব্বইয়ের দশকে সবুজ-মেরুন জার্সিতে স্টপারে খেলতেন। এখন ডালহৌসি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ, মাঠে বাড়তি লোক ঢোকার জন্য তিনিই ‘দায়ী’ ছিলেন। ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পরে রঙের ব্যবসাই লাল্টুর পেশা। নেশা শতদ্রুর সঙ্গে জুড়ে থাকা। তবে তিনি খাতায়-কলমে ‘শতদ্রুর লোক’ নন। যদিও তিনিই দত্তের দূত। যদিও সংস্থার নথিপত্রে তাঁর সই ছিল না। কিন্তু প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষার কোনও বৈঠকে তিনিও সই করেছিলেন বলে অভিযোগ।
শতদ্রু দত্তকে যাঁরা কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা জানেন, তিনি আদতে ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। কিন্তু একইসঙ্গে স্যাঙাত-তন্ত্রে বিশ্বাসী। সেই স্যাঙাতেরা তাঁকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ বা অভয় দিয়ে থাকেন। সেই স্যাঙাতের তালিকায় যেমন লাল্টু আছেন, তেমনই আছেন আরও কয়েকজন। কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল সোমনাথ ব্যানার্জ্জী, কৃষ্ণেন্দু নামধারী অনেকেই। মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর অরিন্দম বসুর নামেও অনৈতিকভাবে ইউটিউবারদের মিডিয়া জোন ও মাঠে প্রবেশ করানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। যুবভারতীর কেলেঙ্কারিতেও সেই স্যাঙাতদের ‘ছায়া’ রয়েছে। সূত্রের খবর, যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাথমিক ভাবে মুম্বইয়ের একটি বড় সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছিলেন শতদ্রু। ওই সংস্থার আন্তর্জাতিক ইভেন্ট পরিচালনার দক্ষতা সুবিদিত। ঠিক সেই কারণেই তাদের পারিশ্রমিকও আকাশছোঁয়া। শতদ্রু যখন অর্থের পরিমাণ নিয়ে দোনামনা করছেন, তখন ওই স্যাঙাতদের কয়েকজন তাঁকে পরামর্শ দেন, রাজ্য সরকার তো যা করার করেই দেবে। বাকিটা ‘স্থানীয় প্রতিভা’ দিয়ে সামলে দেওয়া যাবে। তাতে খরচ কম হবে। লভ্যাংশ থাকবে অনেক বেশি। সেই অনুযায়ীই স্থানীয় দু’জন সঞ্চালক ঠিক করা হয় (যাঁরা জনপ্লাবনে শেষমেশ হারিয়েই গিয়েছিলেন)। মাঠের ভিতরে কোনও উঁচু মঞ্চ করা হয়নি। না-ছিল মেসিকে মাঠে ঘোরানোর জন্য কোনও হুডখোলা গাড়ি। ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত এবং অভিজ্ঞদের বক্তব্য, মেসিকে যদি গোটা মাঠে হুডখোলা গাড়িতে ঘোরানো যেত এবং কয়েকটা ফুটবল দিয়ে তাঁকে সেগুলো দূরপাল্লার শটে গ্যালারিতে ফেলতে বলা হত, তাতেই কাজ হয়ে যেত। কিন্তু স্যাঙাত-তন্ত্র ‘কম খরচে বেশি কাজ’ নীতিতে সেই খরচটুকু করতেও শতদ্রুকে নিরুৎসাহ করে। ঘোর বিপদের সময় অবশ্য তাঁরা কেউ আর আশেপাশে ছিলেন না কেউই। বরং শতদ্রুর নাম শুনলে এমন ভাব করছেন যে, তাঁকে কোনও কালে চিনতেনও না। এবং নিজেদের ঘনিষ্ঠমহলে বলছেন, তাঁরা কোনওকিছুর সঙ্গেই জড়িত ছিলেন না। কলকাতা ছাড়া বাকি তিন শহরেই পেশাদার সংস্থার হাতে অনুষ্ঠানের ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন শতদ্রু। কোনও কার্পণ্য করেননি। ফলে সেখানকার অনুষ্ঠান হয়েছে নিখুঁত পেশাদারি ভঙ্গিতে। মুম্বইয়ে মেসির সঙ্গে নিজস্বী তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের স্ত্রী। তাঁর মধ্যে সেই ‘আকুলতা’ ছিল। কিন্তু কলকাতার মতো ‘হ্যাংলামি’ ছিল না। কোনও কোনও মহল থেকে শতদ্রুকে আড়াল করার চেষ্টায় বাকি তিন শহরের উদাহরণ দেওয়া শুরু হয়েছে। যাতে দোষ আয়োজকের বদলে শহরের উপর পড়ে। তবে পাল্টা এই প্রশ্নও উটছে যে, কলকাতার অনুষ্ঠান কেন কোনও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার সংস্থাকে দিয়ে করানো হল না? তেমন সংস্থার অভাব শহরে না থাকলেও?

ইডেনে আয়োজন হয়নি কেন?
মেসির ‘গোট ইন্ডিয়া ট্যুর’ প্রাথমিক ভাবে ইডেন গার্ডেন্সে হওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত তা বদলে যুবভারতীতে হয়। এর পর গত শনিবার অনুষ্ঠানের দিন যুবভারতীর ঘটনা দেখে হাত কামড়াচ্ছেন প্রাক্তন সিএবি সভাপতি স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়। ইডেনে অনুষ্ঠান করতে চেয়ে আয়োজকদের তরফে যখন প্রথম চিঠি দেওয়া হয়, তখন স্নেহাশিসই সিএবি সভাপতি। বর্তমান সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের দাদা স্নেহাশিসের বক্তব্য ছিল, ‘‘যুবভারতীতে গোলমালের শুরু হয়েছিল মাঠে জলের বোতল পড়া থেকে। আমরা জলের বোতল রাখতামই না। বহু বছর ধরে ইডেনে জলের বোতল নিয়ে ঢোকা বা ভিতরে জলের বোতল বিক্রি করা নিষিদ্ধ। আমরা মহিলাদের লিপস্টিক নিয়েও ঢুকতে দিই না।’’ স্নেহাশিসের প্রশ্ন ছিল, ‘‘আমাদের কোনও অনুষ্ঠানেই কাউকে মাঠে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয় না। সিএবি সভাপতি এবং অন্য কর্তাদেরও আলাদা অনুমতি লাগে। এর জন্য সিএবি-র আলাদা কমিটি আছে। তাদের কাছে অ্যাক্রিডিটেশনের জন্য আলাদা তালিকা পাঠাতে হয়। তারা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, কাদের মাঠে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে। সিএবি এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। আর আমাদের মাঠ নিলে আমাদের শর্তই মানতে হবে।’’ ইডেনে মেসির সফর হয়নি আর্থিক কারণে। আয়োজকদের কাছে ‘হোস্টিং ফি’ হিসাবে ২ কোটি টাকা চেয়েছিল সিএবি। পাশাপাশিই ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষ চেয়েছিলেন ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা। কারণ, ইডেন আদতে সেনার সম্পত্তি এবং মেসির সফর একটি ‘বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান’। তাই ফোর্ট উইলিয়ামকে টাকা দিতে হত। কিন্তু ইডেনের জন্য ওই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে রাজি হননি শতদ্রু। বস্তুত, তিনি নাকি ইডেনের জন্য কোনও টাকাই দিতে চাননি! পক্ষান্তরে, আইএসএল অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে যায়। ফলে শতদ্রু সহজেই যুবভারতী পেয়ে যান। এমনটাই অভিযোগ ছিল সেই সময়ে। বর্তমানে এই আলোচনায় ‘শিষ্য’ বনাম ‘গুরুদেব’ দ্বন্দ! শতদ্রু বনাম সৌরভ! দু’রকম মন্তব্যে ঝড়! ইডেনে মেসির অনুষ্ঠান না হওয়া নিয়ে বিতর্ক! সেই অনুষ্ঠানটা যুবভারতীর বদলে ইডেন গার্ডেন্সে হলে এভাবে বিশৃঙ্খলা হত না, এমনটাই জানিয়েছিলেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু মেসির ভারত সফরের উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত জানিয়েছেন, গোটা অনুষ্ঠান তিনি ইডেনেই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিএবির অনুমতি মেলেনি। এহেন মন্তব্য-পালটা মন্তব্যের জেরে ফের বিতর্ক দানা বেঁধেছে মেসি বিশৃঙ্খলা নিয়ে। একটি সাক্ষাৎকারে সৌরভ বলেন, ইডেনে টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনাল, আইপিএল সেমিফাইনাল, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচ হয়েছে। শতদ্রুকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন মেসি ইভেন্ট ইডেনে করার জন্য, এমনটাও দাবি করেন সৌরভ। তিনি আরও বলেন, মেসি আসবে শুনে সিএবি কর্তারা সকলেই উৎফুল্ল ছিলেন। মেসি ইভেন্টের জন্য ইডেন খুলে দিতে সিএবির কোনও আপত্তি ছিল না বলে সাফ জানিয়ে সৌরভ জানান, শেষ পর্যন্ত শতদ্রুর ইচ্ছাতেই মেসি ইভেন্ট
যুবভারতীতে আয়োজিত হয়েছিল। ইডেনে মেসিকে ঘিরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা হত না বলেই নিশ্চিত সৌরভ।
কিন্তু মেসি ইভেন্টের উদ্যোক্তা শতদ্রুর কন্ঠে একদম উলটো সুর। তিনি বলেন, মেসি ইভেন্টের জন্য ইডেনই তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল। কিন্তু ২৫ দিন অপেক্ষা করেও সিএবির তরফ থেকে অনুমতি পাননি। যেহেতু ইভেন্টের ভেন্যু চূড়ান্ত না হলে মেসির ভারত সফরটাই বাতিল হয়ে যেতে পারত, তাই আর বেশিদিন অপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে জানান শতদ্রু। তাঁর কথায়, “দাদা মনে হয় ভুলে গিয়েছেন, কিন্তু আমরা ইডেনেই মেসির ইভেন্ট আয়োজন করতে চেয়েছিলাম। সেই সময় নির্বাচন থাকায় আমাকে অনুমতি দিতে পারেনি সিএবি।” দু’রকম মন্তব্যে প্রশ্ন উঠছে, মেসির ইভেন্ট নিয়ে ঠিক কী হয়েছিল? গত বছর ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে প্রবল বিশৃঙ্খলা হয়। হাজারে হাজারে মানুষ মাঠে ঢুকে পড়েন, রীতিমতো তাণ্ডব চালান স্টেডিয়াম জুড়ে। মেসি, সুয়ারেসদের নিয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত। তিনি পরে জানিয়েছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর অনুষ্ঠান পণ্ড করা হয়েছিল। পুলিশে অভিযোগও দায়ের করেছেন তিনি।
চুক্তি ছিল, মোট ২০০ জনের সঙ্গে ছবি তুলবেন মেসি
মেসির সঙ্গে ছবি তোলার জন্য চড়া মূল্য ধার্য করা হয়েছিল আয়োজকদের তরফে। শনিবার সকালে হায়াত রিজেন্সিতে বসেছিল সেই ছবি তোলার আসর। চুক্তি ছিল, মোট ২০০ জনের সঙ্গে ছবি তুলবেন মেসি। কিন্তু হোটেলে হাজির হয়েছিলেন ২৯৬ জন। যাঁদের অধিকাংশই ছবি তুলতে পারেননি। যদিও মন্ত্রী সুজিত বসুর পরিবার, নাতি-সহ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরা ছবি তুলেছেন। ছবি তুলিয়েছেন টলিউডের নায়ক-নায়িকা, সপরিবার পরিচালক। সংবাদসংস্থা, স্পনসরদের প্রতিনিধিদের জন্যও ছবি তোলার ব্যবস্থা ছিল। ৫০ জন অর্থের বিনিময়ে ছবি তোলার জন্য গিয়েছিলেন। মোবাইল নিয়ে যাওয়া নিষেধ ছিল। ছবি তুলেছেন মেসির টিমের চিত্রগ্রাহক। পাশে দাঁড়িয়ে টিমের সদস্যেরা গুনেছেন ক’জনের ছবি তোলা হল। তাঁরাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কিউআরকোড স্ক্যানের মাধ্যমে সেই ছবি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু যে ৯৬ জন বাদ গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ ছবি তোলার বাবদে টাকা দিয়েছিলেন কিনা, সে হিসাব এখনও চলছে। কলকাতা থেকে হায়দরাবাদগামী মেসির বিমানে শতদ্রুর থাকার কথা ছিল। তাঁর থাকার কথা ছিল পুরো সফরেই। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছোতেই শতদ্রুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ফলে তাঁর পক্ষে আর বাকি সফরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু যেহেতু শতদ্রুই এই সফরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাই তাঁর তরফে দায়িত্বশীল কারও যাওয়াও দরকার ছিল। শেষমেশ শতদ্রুর বদলে মেসির সঙ্গে যান তাঁর জামাইবাবু অশেষ দত্ত। যিনি একদা শতদ্রুকে এই জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। পরে অবশ্য শতদ্রু আপন এলেমে তাঁকে পিছনে ফেলে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছেন। ঘটনাচক্রে, মেসিকে কলকাতা থেকে ‘ফেয়ারওয়েল’ উড়ানে শতদ্রুর পরিবর্তে সঙ্গ দিলেন সেই জামাইবাবু!
কত জনকে টাকা ফেরাতে হতে পারে?
কত জনকে টাকা ফেরাতে হতে পারে, সে হিসাবও রাজ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। শনিবারের অনুষ্ঠানে যুবভারতীর গ্যালারির জন্য ৪৮ হাজারের মতো টিকিট ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে ১৪ হাজার ছিল সৌজন্যমূলক (কমপ্লিমেন্টারি) টিকিট। তার জন্য কোনও পয়সা নেওয়া হয়নি। বাকি ৩৪ হাজার টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল। সেই ৩৪ হাজার দর্শক চাইলে টাকা ফেরত নিতে পারবেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে। তবে যুবভারতীতে মেসি-সফরের টিকিটের টাকা ফেরানোর পদ্ধতি জটিল না হলেও প্রক্রিয়াগত একটি সমস্যা রয়ে গিয়েছে। শতদ্রুর সংস্থায় তিনি নিজেই যে হেতু সর্বেসর্বা, সে হেতু তাঁকে ছাড়া ওই প্রক্রিয়া চালু করা সম্ভব নয়। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তাঁর সংস্থার হয়ে অর্থনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী কি না, কে সই করবেন, কে টাকা ফেরানোর আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেবেন, সে সব বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়। শতদ্রু পুলিশ হেফাজতে থাকায় তাঁকে দিয়ে দ্রুত এই সব কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব কি না, সে ক্ষেত্রে আইনি সংস্থান কেমন রয়েছে, সে সব বিষয় নবান্নের তরফে আপাতত খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি। প্রক্রিয়াগত সেই পারিপার্শ্বিক দিকগুলি স্পষ্ট হলে রাজ্য প্রশাসনের তরফে ‘জ়োম্যাটো’-কে বার্তা দেওয়া হবে বলেই রাজ্যের এক মন্ত্রী জানিয়েছেন।
রিষড়া থেকে রিও নিত্যযাত্রী ‘প্রভাবশালী’ শতদ্রু
রিষড়া থেকে রিও নিত্যযাত্রী ‘প্রভাবশালী’ শতদ্রুর হাতেখড়ি বাম আমলে, ‘ক্রীড়ামন্ত্রী’ মদনকেও ঘোল খাইয়েছিলেন! শতদ্রু হুগলির রিষড়ার ভূমিপুত্র। সেখানকার বাঙ্গুর পার্কের সামনে তাঁর আলিশান বাড়ি। যে বাড়ি মোড়া ১৮টি সিসি ক্যামেরায়। কম বয়সে রিষড়া লেনিন মাঠে নিয়মিত ক্রিকেট খেললেও ছোট থেকেই তিনি ফুটবলপ্রেমী। যুবভারতী কেলেঙ্কারির ঘটনায় জনতার কাঠগড়ায় ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, অরূপের ইস্তফা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশিই তাঁর সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্রের। যাঁর আমলে যুবভারতীতে ফিফার ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ খেলতে এসেছিল লিয়োনেল মেসি-সহ আর্জেন্টিনা। খেলতে এসেছিল ‘ব্রাজিল অলস্টার’। দ্বিতীয় ম্যাচটির সময় যুবভারতী কেলেঙ্কারিতে ধৃত শতদ্রু দত্ত ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিলেন মদনকে! পরিস্থিতি এমনই পর্যায়ে গিয়েছিল যে, চুক্তিভঙ্গের দায়ে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী গ্রেফতারও হয়ে যেতে পারতেন। ব্যক্তিগত চেষ্টাচরিত্র করে সে যাত্রায় মান বেঁচেছিল মদনের। সে ঘটনা প্রশাসন এবং রাজনীতির অন্দরমহলে অনেকেরই জানা। যুবভারতীর কেলেঙ্কারির পরে সে ইতিহাস ঘুরে আসছে ওয়াকিবহাল মহলে।
মদন অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে দু’তিন লাইনের মন্তব্য করেছিলেন শুধু। তার মধ্যে ‘বিস্ফোরক’ কিছু নেই। ১৩ বছর আগের ঘটনা এখন লোকমুখে আবার ঘুরতে শুরু করেছে। ঘুরছে তখন যাঁরা ক্রীড়া দফতরে কাজ করতেন, তাঁদেরও ঘনিষ্ঠমহলে। সেই ঘটনা বলছে, ১৩ বছর আগে ২০১২ সালে শতদ্রুর উদ্যোগেই কলকাতায় এসেছিল ‘ব্রাজিল অলস্টার’। সেই দলে ছিলেন ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সাত খেলোয়াড়। ছিলেন অধিনায়ক দুঙ্গা, বেবেতো, মাউরো সিলভা, ব্র্যাঙ্কোর মতো ফুটবলারেরা। ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলেরও জনা তিনেক সদস্য ছিলেন সেই দলে। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলারদের প্রদর্শনী ম্যাচ ছিল যুবভারতীতে। সেই ম্যাচেও প্রায় ৫০ হাজার লোক হয়েছিল। অধিকাংশ দর্শকই টিকিট কেটে খেলা দেখতে এসেছিলেন। ম্যাচ ছিল এমনই ডিসেম্বর মাসের ৮ তারিখে। যুবভারতীর গ্যালারি প্রায় ভরে গিয়েছিল। কিন্তু দেখা যায়, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ব্রাজিলের টিম মাঠে নামছে না। পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোরালো হচ্ছিল। মদন তখন যুবভারতীতে ক্রীড়ামন্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট ঘরে বসে। তিনিও লক্ষ করেন, টিম নামছে না। সেই সময়েই তাঁর কাছে প্রশাসনের উপরমহল থেকে ফোন আসে। বলা হয়, টিম হায়াত রিজেন্সি হোটেল ছেড়ে মাঠে আসেনি। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। টিম না নামলে রাজ্য সরকারকে বেকায়দায় পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, তৃণমূল সরকার তখন মাত্রই দেড় বছর হল রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। এমন একটা সময়ে সরকারের ‘বদনাম’ হওয়া খুব ভাল ঘটনা হত না। তার আগে ২০১১ সালের ২ সেপ্টেম্বর আর্জেন্তিনা-ভেনেজ়ুয়েলা ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ ভাল ভাবে উতরে গিয়েছিল। ফলে কলকাতা যে আন্তর্জাতিক মানের খ্যাতনামীদের সামলাতে পারে, সেই ধরনাও তৈরি হয়েছিল। ব্রাজ়িল অলস্টার মাঠে না নামলে তাতেও চুনকালি পড়ত। মদনের এক ঘনিষ্ঠের কথায়, ‘‘শতদ্রু দত্তকে ডেকে দাদা জানতে চান, কী হয়েছে। শতদ্রু দাদাকে বলে, চুক্তি অনুযায়ী ব্রাজ়িল দলের ভারতীয় মুদ্রায় দু’কোটি টাকা বকেয়া আছে। সেই টাকা না-পেলে টিম হোটেল থেকে মাঠেই আসবে না। মাঠে নামার তো প্রশ্নই নেই।’’ মদন আরও জানতে পারেন, শতদ্রু ব্রাজ়িল অলস্টার দলের ম্যানেজারকে বলেছেন, মদন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী। টাকাপয়সার ব্যাপারে তিনিই যা করণীয় করবেন। তাঁর উপরেই বিষয়টা নির্ভর করছে। মদনের ওই ঘনিষ্ঠের দাবি, ‘‘দাদা তখনও পর্যন্ত টাকাপয়সা বা চুক্তির কথা কিছুই জানতেন না।’’ অথৈ জলে পড়েন ক্রীড়ামন্ত্রী। এক দিকে রাজ্যের সম্মান। অন্য দিকে চুক্তিভঙ্গের বিপদ। তার উপর যুবভারতীর ক্ষোভ। অনন্যোপায় হয়ে মদন ব্রাজ়িল টিমের ম্যানেজারকে জানান, টিম মাঠে এসে খেলতে নামুক। তিনি ভারতীয় মুদ্রায় ওই টাকা যোগাড় করে দেবেন। কিন্তু তাতে ব্রাজ়িলের ম্যানেজার রাজি হননি। তিনি বলেন, পুরো বকেয়া অর্থ মেটাতে হবে মার্কিন ডলারে! ঘটনাচক্রে, ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর ছিল রবিবার। ফলে ভারতীয় মুদ্রাকে বিদেশি মুদ্রায় পরিবর্তন করার উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত মদনের মৌখিক প্রতিশ্রুতিতেই ব্রাজিল অলস্টার মাঠে নামতে রাজি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রীকে জানানো হয়, বকেয়া টাকা না-পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা ভারতেই তাঁবু খাটিয়ে বসে থাকবেন এবং ক্রীড়ামন্ত্রীর বিরুদ্ধে পুলিশে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ করবেন। মদন-ঘনিষ্ঠের কথায়, ‘‘ওরা বলেছিল, উই উইল ক্যাম্প ইন ইন্ডিয়া!’’ তাঁর বক্তব্য, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে মদন সেই টাকা জোগাড় করেছিলেন এবং চুক্তিভঙ্গের দায় থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। যদিও রাজ্য সরকার বা রাজ্যের ক্রীড়া দফতরের উদ্যোগে সেই দলকে কলকাতায় আনা হয়নি। তারপর থেকে মদন আর শতদ্রুর সঙ্গে কোনও সংশ্রব রাখেননি। তবে বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ ওই ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন।
শতদ্রুর ‘ইভেন্ট’ জগতে হাতেখড়ি বাম আমলে হলেও ‘প্রভাবশালী’ হন তৃণমূলের জমানাতেই। তবে তিনি ‘কাজ’ করেন শুধু বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের নিয়েই। এই ধরনের যে কোনও ব্যবসায়ীই সমাজের বিভিন্ন স্তরের কেষ্টুবিষ্টুকে ‘নৈবেদ্য’ দিয়ে বশ করে রাখেন। শতদ্রুর ক্ষেত্রে তা ছিল এই ধরনের ম্যাচ বা ইভেন্টের গোছা গোছা ভিআইপি পাস এবং খ্যাতনামীর আশেপাশে ঘুরঘুর করার আমন্ত্রণ, ছবি তোলার সুযোগ। নামী মুখ, পরিচিত ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলগুলির নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে যেত টিকিটের গোছা। তবে এখন টিকিট নিতে তাঁর কাছে যেতে হয়। যে কারণে শুক্রবার রাত পর্যন্তও এই শ্রেণির অনেকে হায়াত রিজেন্সিতে তাঁর কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছেন। বস্তুত, এঁদের অনেকে মেসির সফর চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই শতদ্রুর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অতিঘনিষ্ঠ মদ্যপায়ী কিছু তথাকথিত সাংবাদিকও। গত দু’মাস তাঁরা প্রায় ব্যাকপ্যাকের মতো শতদ্রুর ঘাড়ে পড়ে থেকেছেন। এ অবশ্য প্রত্যাশিতই যে, শতদ্রু গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁরা শতদ্রুকে দ্রুত হাত থেকে ফেলে দিয়েছেন। এতটাই যে, বিপন্ন শতদ্রুর ঘনিষ্ঠ লোকজন ফোন করলে সেই ফোনও ধরছেন না! শতদ্রুকে অনেকেই বলে থাকেন ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। সেই একক সেনার ‘প্রভাব’ এবং ‘ক্ষমতা’ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মেসির সফরের ২৪ ঘন্টা আগে তিনি দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত চার ঘণ্টা ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপকে যুবভারতীতে বসিয়ে রেখেছিলেন! বারবার ফোন করলেও ধরেননি বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবারেই বিরক্ত অরূপ শতদ্রুকে বলেছিলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠান এই শেষ বার। আর করতে দেওয়া হবে না! ঘটনাপ্রবাহও সেই দিকেই গেল। যদিও একেবারে অন্য কারণে।
এমনিতে শতদ্রু হুগলির রিষড়ার ভূমিপুত্র। সেখানকার বাঙ্গুর পার্কের সামনে তাঁর আলিশান বাড়ি। যে বাড়ি মোড়া ১৮টি সিসি ক্যামেরায়। কম বয়সে রিষড়া লেনিন মাঠে নিয়মিত ক্রিকেট খেললেও ছোট থেকেই শতদ্রু ফুটবলপ্রেমী। দিয়েগো মারাদোনার এমনই ভক্ত যে, পুত্রের নাম রেখেছেন ‘দিয়েগো’। রিষড়ার মানুষ শতদ্রুকে ‘রনি’ নামেই চেনেন। এই রনির ইভেন্টের জগতে হাতেখড়ি তাঁর জামাইবাবু অশেষ দত্তের সূত্রে। কিন্তু ক্রমে অশেষকে টপকে শ্যালক হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। মূলত খেলার ইভেন্টেই তাঁর ঝোঁক বাড়তে থাকে। সমান্তরাল ভাবে বাড়তে থাকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। যে ঘনিষ্ঠতা তাঁকে এগোতে সাহায্যই করেছে বলে ময়দান এবং রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য। প্রসঙ্গত, শনিবার যুবভারতীতে মেসি-সফরে সৌরভও আমন্ত্রিত ছিলেন। তাঁকে মেসির কাছাকাছি দেখাও যাচ্ছে বিভিন্ন ভিডিয়োতে। অনেকে বলছেন, তিনি নাকি মেসিকে আরও কিছুক্ষণ থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। যদিও সৌরভের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের দাবি, তার কোনও অবকাশ ছিল না। রিষড়ায় শতদ্রুর কৈশোরের যে বন্ধুমহল, সেখানে তিনি প্রায়শই শ্লাঘা নিয়ে বলতেন, ‘‘আমি রিষড়া থেকে রিও (ব্রাজিলের প্রাক্তন রাজধানী শহর) ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতে পারি!’’ আপাতত তিনি বিধাননগর পুলিশের হেফাজতে। সেখানেই আরও ১২টি দিন কাটাতে হবে তাঁকে। একাকী সৈন্যের বাহিনী আপাতত ব্যারাকে!
শতদ্রুর টাকার লেনদেন ঘিরে সন্দেহ! রিষড়া বাঙুর পার্কে ‘চারু সুধা’ বাড়িতে হানা সিটের
সন্দেহ করা হয়েছিল, মেসির এই সফরে কালো টাকা ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। সেদিকটা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সল্টলেকের যুবভারতী স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার মামলায় তদন্তের গতি বাড়াল পুলিশ। শুক্রবার ভোররাতে ওই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তের হুগলির রিষড়া পার্ক এলাকার বাড়িতে তল্লাশিতে যায় বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের আধিকারিকরা। সকাল ছ’টা নাগাদ ‘চারু সুধা’ নামে পরিচিত ওই বাড়িতে পৌঁছন তাঁরা। সূত্রের খবর, রিষড়া থানার পুলিশও অভিযানে সামিল ছিল। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, যুবভারতীতে হওয়া বিশৃঙ্খলার ঘটনার তদন্তের স্বার্থেই প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে শতদ্রুর বাড়িতে ছিলেন আধিকারিকরা। তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের পর বিধাননগর পুলিশের একটি দল রিষড়া থানায় যায়। সেখান থেকে কিছুক্ষণ পরে তাঁরা ফের বিধাননগরের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে আপাতত নারাজ পুলিশ। একই ভাবে সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনও মন্তব্য করতে চাননি শতদ্রুর পরিবারের সদস্যরাও। রিষড়া থানার পুলিশের সহায়তায় মহিলা পুলিশকর্মী-সহ 5 জন আধিকারিক শতদ্রুর বাড়ির ঢোকেন। পরিচারিকাকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি, বিলাসবহুল ওই তিনতলা বাড়ির বিভিন্ন অংশে তল্লাশিও চালানো হয়েছে। শতদ্রুর ঝাঁ-চকচকে তিনতলা বাড়িতে পৌঁছে সুইমিং পুল, ফুটবল মাঠ-সহ পুরো বাড়ি তল্লাশি করে পুলিশ। পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ বাড়িতে ছিলেন না এদিন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি, বিলাসবহুল বাড়ির প্রতিটি ঘরে তল্লাশি অভিযান চালান তদন্তকারীরা। তবে কোনও কিছু সিজ করা হয়নি বলে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, মেসির এই সফরে কালো টাকা ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। সেদিকটা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। মেসির কলকাতা সফরের সময় যুবভারতী মাঠ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ব্যাপক পরিস্থিতিতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে বিধাননগর কমিশনারেট দ্রুত কড়া পদক্ষেপ নেয়। একাধিক ধারায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। রবিবার শতদ্রু দত্তকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে তোলা হবে বলে জানা গেছে। পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিধাননগর উত্তর থানায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে কমিশনারেট পুলিশ। অশান্তি সৃষ্টি, ভাঙচুর, হিংসা ছড়ানো, নাশকতামূলক কার্যকলাপ চালানো এবং জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ধৃতের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৯২, ৩২৪ (৪)(৫), ৩২৬ (৫), ১৩২, ১২১ (২), ৪৫ ও ৪৬ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ধৃতের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করে পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত চালাচ্ছে। লিওনেল মেসি অবশেষে শহরে পা রেখেছিলেন। যুবভারতীতে শুধু কলকাতার নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শকরা মেসি দর্শনে জমায়েত হয়েছিলেন। দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও মেসি প্রেমীরা নেতাজি ইন্ডোরে উপস্থিত হয়েছিলেন। যুবভারতীতে মেসি প্রবেশের কিছুক্ষণ পরেই পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। দর্শকদের অভিযোগ, মেসিকে ঘিরে থাকছিলেন ভিআইপিরা, যাদের সংখ্যা কমিয়ে ১০০ করা হয়। এর ফলে গ্যালারি থেকে ২০ মিনিটের জন্য মেসিকে দেখা যায়নি, যা দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর বোতল ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মেসি এবং অন্যান্যরা দ্রুত মাঠ ছাড়েন। এরপর যুবভারতী মাঠ জুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরেই কলকাতা বিমানবন্দর থেকে শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
কলকাতা হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্টে শতদ্রু
মেসিকাণ্ডে এবার অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের পথে শতদ্রু দত্ত। রক্ষাকবচ চেয়ে একদিকে যখন কোর্টে গিয়েছেন অরূপ বিশ্বাস। তখন সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছেন শতদ্রু দত্ত। নিজের সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে মেসিকে কলকাতায় আনার উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। যুবভারতীতে লিওনেল মেসি আসার দিন যে অব্যবস্থা ও বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার জন্য প্রচুর দর্শক আকাশছোঁয়া দামের টিকিট কেটে এসেও মেসিকে দেখতে পারেননি। পুরো সময়টাই মেসির সঙ্গে একেবারে প্রায় লেপ্টে ছিলেন অরূপ বিশ্বাস। এরপরই প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন শতদ্রু দত্ত। এরপর হাইকোর্টে রক্ষাকবচ চেয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস। শতদ্রু দত্তের কথায়, হাইকোর্টে অরূপ বিশ্বাসকে রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে। ওঁনাকে গ্রেফতার করা যাবে না। আমি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই ডিভিশন বেঞ্চে অ্যাপিল করব। যদি সেখান থেকে কোনও সদুত্তর না পাই, তাহলে আমি সুপ্রিম কোর্টে যাব। আমাকে যখন গ্রেফতার করা হয়েছিল, তখন এমনই বলা হয়েছিল যে আমি না কি প্রভাবশালী লোক। কিন্তু অরূপ বিশ্বাস তো আমার থেকেও প্রভাবশালী লোক। উনিও তো প্রমাণ লোপাট করতে পারেন, প্রভাব খাটাতে পারেন। আমি তাই সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা ভেবেছি। বারবার শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাজিরা এড়িয়ে যাচ্ছেন অরূপ বিশ্বাস। আদালতে এদিন অরূপ বিশ্বাসের প্রতি বিস্ফোরক মনোভাব দেখা যায় বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের। বৃহস্পতিবার বিচারপতি বলেন, ‘মেসিকাণ্ডে আমরা অত্যন্ত লজ্জিত। এই ঘটনায় রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। মেসিকে জড়িয়ে ধরে অরূপ বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছেন! মেসি কি অরূপ বিশ্বাসের বাল্যবন্ধু? অরূপ বিশ্বাস এসব কীভাবে করতে পারলেন? মেসির অত কাছাকাছি অরূপ বিশ্বাস গেলেন কেন? এতে মেসির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি?’ হাইকোর্টের বিচারপতি মন্তব্য করেন, গোটা দেশের আরও অনেক জায়গায় মেসি গেছেন, কোথাও তো এসব হয়নি। পুলিশ দেখা করতে বলছে, যাচ্ছেন না কেন? কবে যাবেন?” উত্তরে অরূপ বিশ্বাসের আইনজীবী বলেন, ‘আপনি রক্ষাকবচ দিলে কালকেই যাব। এরপর আদালত নির্দেশ দেয়, ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিয়ে অরূপ বিশ্বাসকে তলব করতে হবে। একইসঙ্গে হাইকোর্ট জানিয়ে দেয়, তদন্ত চলবে তদন্তের মতোই। তবে পুলিশ গ্রেফতারের মতো কড়া পদক্ষেপ করতে পারবে না। আদালতের অনুমতি ছাড়া রাজ্য ছাড়তে পারবেন না অরূপ বিশ্বাস। শতদ্রুর কথায়, আমরা রায়টা পর্যালোচনা করছি। আদালত ভর্ৎসনাই করেছে। তবে, যে রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাব। আমাকে সেদিন এক ঘণ্টার মধ্যে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল, উনি তো আইনের উর্ধ্বে নন। এবার নতুন সরকারকে সামনে রেখে নতুন লক্ষ্যে স্পোর্টস বিজনেস ‘প্রোমেটার’ শতদ্রু দত্ত?





