গত ফেব্রুয়ারিতে, রাজ্যসভা নির্বাচনে দলের তরফে প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করেছিল তৃণমূল। সেখানেই ছিল অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের নাম। রাজ্যে পালাবদলের পরে তৃণমূলে লাগাতার ধস অব্যাহত। অভিনেত্রীও কি সেই পথেরই পথিক? রাজনীতিতে যেতে ইচ্ছুক, এমনটা আগে বিশেষ শোনা যায়নি। ফলে গত এপ্রিল মাসে কোয়েল তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় যেতে রাজি হয়েছেন শুনে বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠেরা। কেউ কেউ এমনও বলেছিলেন যে, তাঁর হয়ে অন্য কেউই এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। কোয়েলের রাজ্যসভার পদ ছাড়ার প্রসঙ্গ উঠতেই সে সব কথা ফিরে আসছে নানা মহলে। রাজ্যসভা নির্বাচনে প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করে তৃণমূল। সেই তালিকায়, রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী ছাড়াও অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের নাম ছিল। তার কয়েক দিন আগে তদানীন্তন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের খতিয়ান নিয়ে মল্লিকবাড়িতে গিয়েছিলেন তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পরে এপ্রিল মাসে দিল্লিতে রাজ্যসভার সাংসদ পদে শপথ নিতে যান কোয়েল। সঙ্গে ছিল তাঁর গোটা পরিবার। শপথের পরে অভিনেত্রী বলেছিলেন, “অনেক ভেবে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তা নয়। এটা তো একটা মহৎ দায়িত্ব, দেশের সেবা, মানুষের সেবা— এর থেকে তো বড় মহৎ কাজ হতে পারে না। সেই জায়গা থেকে আমি নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবতী মনে করি যে, আমার নাম মনোনীত হয়েছে এবং আমি এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায় আসতে পেরেছি।” কোয়েলের যেহেতু পঞ্জাবি পরিবারে বিয়ে, তাই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে নাকি ভবানীপুরের পঞ্জাবি ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ভোটের ফলে এই অঙ্ক ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। ভবানীপুরে পঞ্জাবিদের ভোট এমন কিছু বেশি নয়। ফলে, কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানোটা ‘তেলা মাথায় অতিরিক্ত তেল’ দেওয়ার মতো ঘটনা বলে অনেকে মনে করেন। দলের অন্দরে কান পাতলে আর একটা কথাও শোনা যায়। কোয়েলের স্বামী বর্তমানে প্রযোজনা ছাড়াও কিছু রিয়্যাল এস্টেটের কাজের সঙ্গে যুক্ত। রিয়্যাল এস্টেট ব্যবসার স্বার্থেই নাকি তিনি কোয়েলকে মমতার অনুরোধ ফেলতে বারণ করেন। কোয়েল-ঘনিষ্ঠ এক অভিনেতা অবশ্য এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন। অভিনেত্রীর বন্ধুস্থানীয়েরা মনে করেন, কোয়েল কখনও অনৈতিক কাজ করেননি। রাজ্যসভার একটি সামান্য পদের জন্য তো কখনওই করবেন না। এমনকি, তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় যাওয়ার পরেও কোয়েলের অভিনেতা পিতা রঞ্জিত মল্লিক বলেছিলেন, “কোয়েল বড় হয়েছে। বুঝদার মেয়ে। ওকে আলাদা করে বলার কিছু নেই। খুবই বুদ্ধি নিয়ে কাজ করে। এ ক্ষেত্রেও তেমনই করবে। বাবা হিসাবে যা যা বলার সেটুকু বলেছি। সৎ পথে থেকে ভাল কাজ করুক, এটাই চাওয়া।” এখন পালাবদলের সময়। যাদের হয়ে রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন কোয়েল, সেই তৃণমূলে ভাঙন ধরেছে। কিন্তু তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সদস্যদের দলে কোয়েল যোগদান করবেন না। সম্মান রেখে রাজনীতি থেকে দূরেই থাকবেন। অভিনেত্রীকে যাঁরা কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা অন্তত এমনই মনে করছেন। প্রসঙ্গত, সোমবার সকাল থেকে কোয়েলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তিনি নিশ্চুপ।
লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। কাকলির দাবি, তাঁকে নিয়ে প্রায় ২০ জন সাংসদ এনডিএ-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিধানসভার পর এ বার লোকসভার সংসদীয় দলও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। সিংহভাগ সাংসদ হারিয়ে লোকসভায় এখন মমতার ‘হাতে রইল পেন্সিল’। রইলেন মাত্র গুটিকয়েক সাংসদ। দলে সাংসদ-বিদ্রোহের পর লোকসভায় মমতার ‘অনুগত’ রইলেন সংসদীয় দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ মাত্র আট জন। বাকি সকলেই এখন বিদ্রোহী শিবিরে। নির্বাচনে ভরাডুবির পরে লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে যে ভাঙন ধরতে চলেছে, সেই আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল গত কয়েক দিন ধরেই। রবিবার রাতে দিল্লির কোনও এক গোপন ঠিকানায় বৈঠকে বসেছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। সোমবার দুপুরে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে আরও একপ্রস্ত বৈঠক হয় বিদ্রোহী সাংসদদের। দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গিয়েছিলেন ভূপেন্দ্রর বাড়িতে। এর পরেই খবর ছড়ায় বিদ্রোহীরা চিঠি জমা দিয়েছেন স্পিকার ওম বিড়লার কাছে। তাঁদের দাবি, বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ-র সঙ্গে যুক্ত হতে চান। লোকসভায় তৃণমূল সাংসদদের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। উল্লেখ্য, লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। কাকলির দাবি, তাঁকে নিয়ে প্রায় ২০ জন সাংসদ এনডিএ-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্য দিকে, এই বিদ্রোহে শামিল হননি বাকি আট জন। ১৭ জন ‘বিদ্রোহী’র নাম প্রকাশ্যে এসেছে। তালিকায় কাকলি, শতাব্দীর পাশাপাশি রয়েছেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, খলিলুর রহমান, অসিত মাল, অরূপ চক্রবর্তী, শর্মিলা সরকার, জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া, আবু তাহের, কালীপদ সোরেন, জুন মালিয়া, সাজদা আহমেদ, ইউসুফ পাঠান, দেব, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাপি হালদার এবং পার্থ ভৌমিক। শত্রুঘ্ন সিংহ, প্রতিমা মণ্ডল এবং মিতালি বাগ বিদ্রোহী শিবিরের দিকে ঝুঁকে আছেন বলে শোনা যাচ্ছে। যাঁরা মমতার ‘অনুগত’ হয়ে রয়ে গিয়েছেন, এমন ছ’জনের নামও ভেসে আসছে। প্রত্যাশিত ভাবে সেই তালিকায় একজন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, সায়নী ঘোষ, মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজ়াদের নামও রয়েছে নেত্রীর ‘অনুগত’ তালিকায়। বিভিন্ন সূত্রে যা খবর মিলছে, তাতে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মালা রায় ঝুঁকে রয়েছেন দলনেত্রীর দিকেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়িতে বৈঠকের পরে সন্ধ্যায় দিল্লিতে শতাব্দীর বাসভবনে ফের বৈঠকে বসেছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও গিয়েছেন শতাব্দীর বাড়িতে। লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙনের পরে বিদ্রোহীদের তোপ দেগেছেন ‘মমতা-অনুগত শিবিরের’ সাংসদ মহুয়া মৈত্র। কৃষ্ণনগরের সাংসদের দাবি, বিদ্রোহীরা চাইলে বিজেপিতে যেতেই পারেন। কিন্তু তার আগে তাঁদের সাংসদ পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনি লেখেন, “২০২৪ সালে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন সাংসদেরা। সেই জনাদেশ এনডিএ-র পক্ষে ছিল না।” বিদ্রোহী সাংসদদের ‘লোভী, স্বার্থান্বেষী এবং বিশ্বাসঘাতক’ বলে বিঁধেছেন তিনি। দলনেত্রীর ‘অনুগত’ কীর্তি আজাদও গোটা ঘটনাকে বিজেপির ‘নোংরা চাল’ বলে নিশানা করেছেন। তাঁর দাবি, ২০ সাংসদের যে কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সাজানো। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্রের বাড়িতে যে বৈঠক হয়েছে, তাতে লোকসভার ১২ জন এবং রাজ্যসভার এক জন সাংসদ ছিলেন বলে দাবি কীর্তির। এর বাইরে আর কেউ কোনও কিছুতে স্বাক্ষর করেননি বলে দাবি মমতার অনুগত ওই সাংসদের।





