Thursday, April 23, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

পয়লা বৈশাখের উপহার কালচার? স্মৃতির রোম্যান্টিক আবিলতায় থমকে সভ্যতা

RK NEWZ কটা সময় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল দিনের শুরুতে নতুন জামা পরে পরিবারের বড়দের প্রণাম করা, দুপুরে বাড়িতে ঘরোয়া ভাবেই খাওয়াদাওয়ার বিশেষ আয়োজন আর সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনের জমায়েত। আর তারই মাঝে পাড়ার দোকানগুলিতে হালখাতা সেরে নেওয়া। তবে এখন বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ মানে সারাদিনের কাজকর্ম সেরে কোনও এক বাঙালি রেস্তরাঁয় খেতে যাওয়া। বড়দের প্রণাম করাটাও এখন ফোনে ফোনেই সেরে ফেলা হয়। অনেকের তো সেইটুকুও সময় হয় না! আর উপহারের? সারা বছরই দেওয়া হচ্ছে, পয়লা বৈশাখে আলাদা করে কিছু কেনা না হলেও ক্ষতি কী? তবে মজার বিষয় হল মাদার’স ডে, ফাদার’স ডে, ভ্যালেনটাইন্স ডে-তে উপহার দেওয়ার চল কিন্তু আগের তুলনায় বেড়েছে। পয়লা বৈশাখের থেকে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্‌যাপনের একটা বিপুল পটবদল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেটাই তো স্বাভাবিক। অনেকেই বলবেন, ওই সব স্মৃতির রোম্যান্টিক আবিলতায় থমকে থাকলে সভ্যতা এগোবেই বা কী করে? সেই নিয়ম মেনেই কি পয়লা বৈশাখের উপহার দেওয়ার বিষয়টা থেকে অনেক বাঙালিই ‘মুভ অন’ করে গিয়েছেন? ইংরেজি সালটা ১৯৮৬। এ তো গেল পিসিদিদুনের পয়লা বৈশাখের উপহারের কথা। তবে পয়লা বৈশাখের আগে মায়ের সঙ্গে হাতিবাগানে কেনাকাটা করতে যাওয়াটা একটি অলিখিত নিয়মের মধ্যে পড়ত রুমকির কাছে। তবে ওই সময়টায় কোনও বড় দোকানে নয়, ফুটপাত থেকে হাঁস-মুরগি আঁকা টেপফ্রক আর বাটিকের জামাই কিনে দিতেন মা। আর একটু বায়না করলে রঙিন চুড়ি আর মাথায় লাগানোর রংবেরঙের ক্লিপ! ব্যাস ওইটুকু কেনাকাটিতেই ছিল অফুরান আনন্দ! আর মা-বাবার দেওয়া সামান্য উপহারের জন্যই সারা বছর ধরে চলত অপেক্ষা।

একটা সময় ছিল যখন মাসি-পিসি-কাকিমাদের থেকে পয়লা বৈশাখে একটা কিছু পাওয়ার চল ছিল শিশুদের কাছে। কেউ নামমাত্র টাকা পেত, কেউ আবার সুতির ফুলছাপ ফ্রক। উপহারটি খুব মূল্যবান না হলেও সেই উপহার দেওয়ার মধ্যে ছিল অনেকখানি ভালবাসা আর আদরের ছোঁয়া। এখন কি সেই ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে খুদেরা? অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা অনুরাধা সরকার বললেন, ‘‘আমার জামাই আমেরিকায় কর্মরত। সেই সূত্রে মেয়ে আর নাতিও ওখানেই থাকে। ওরা যখন দেশে ফেরে, তখন ওদের জন্য জামাকাপড় আর রকমারি উপহার কিনে রাখি। তবে পয়লা বৈশাখে সাধ হলেও উপায় নেই।’’ পয়লা বৈশাখের ঐতিহ্য এখন বাঙালির মন থেকে পুরোপুরি মুছে গিয়েছে, এ কথা মানতে নারাজ অভিনেত্রী কণীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনেত্রী বলেন, ‘‘পয়লা বৈশাখ মানেই সুতির জামা উপহার পাওয়ার একটা চল ছিল। এর পাশাপাশি গল্পের বইও পেতাম। মনে আছে, গড়িয়াহাট বাজার, কালীঘাটের বাজার এবং যদুবাবুর বাজারে ঘুরে ঘুরে ৫০ টাকা, ৩০ টাকা দিয়ে সুতির জামা কিনতাম। বোন আর আমার জন্য একই ধরনের জামা খুঁজে খুঁজে বার করতে বেশ মজা লাগত। চৈত্র সেলে কেনাকাটার বিষয়টি এখন স্মৃতির খাতায় জুড়েছে। তবে মেয়েকে আমি এখনও পয়লা বৈশাখে নতুন জামা উপহার দিই। আমাদের সময় পয়লা বৈশাখের উদ্‌যাপন ছিল এক রকম। আর এখনকার দিনে উদ্‌যাপনের ধাঁচটা বদলে গিয়েছে শুধু। মেয়েকে নিয়ে আমি পয়লা বৈশাখের দিন বিকেলবেলা ক্লাবে যাব। ওখানে বাংলা গান হবে, কবিতার আসর বসবে। বাংলা ভাষার চর্চা হবে। অনেক বাড়িতে এখন নতুন করে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে জমায়েত হচ্ছে। সেখানে ঘরোয়া আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, সবই হচ্ছে। উপহারের থেকেও উদ্‌যাপনেই তো বেশি আনন্দ।’’ পয়লা বৈশাখের উপহারের বিষয়টি অনেকের কাছেই নস্ট্যালজিয়া। বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত দ্বৈপায়ন সাহা। বয়স ৩৫। দ্বৈপায়নের মতে, ‘‘ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখে মা জামা কিনে দিতেন। শুধু আমার জন্যই নয়, বাবার জন্য ফতুয়া, ঠাকুরমার জন্য শাড়িও কিনতেন। আর নিজের জন্য কিনতেন একটা নাইটি। বিয়ের পরে উপহার দেওয়ার তালিকায় জুড়েছিল বৌয়ের নামও। বৌকেও দেখেছি মায়ের জন্য শাড়ি কিনে আনতে। তবে দু’বছর হল আলাদা ফ্ল্যাটে থাকছি। এখন সারাবছর উপহার দেওয়ার চল থাকলেও আলাদা করে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে কোনও কেনাকাটাই করা হয় না।’’ পয়লা বৈশাখের সময় আর এক রকম উপহারের প্রসঙ্গ না টানলেই নয়। দোকানে দোকানে হালখাতা করতে গিয়ে রকমারি উপহার প্রাপ্তি। নরম পানীয় আর মিষ্টির বাক্সের সঙ্গে একটা উপহার নিশ্চিত। নতুন বছর নিয়ে সেই রকম স্মৃতিই ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী অঙ্গনা রায়। অভিনেত্রী বললেন, ‘‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির পয়লা বৈশাখের উদ্‌যাপন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। অনেক সময়েই মনে হয়, পুরনো দিনগুলিই তো ভাল ছিল। ছোটবেলায় দেখতাম, মা-বাবা পরিবারের কাছের লোকজনকে পয়লা বৈশাখে নতুন জামা উপহার দিতেন। যখন আসানসোলে দাদু-দিদার কাছে ছিলাম, তখন দাদু পয়লা বৈশাখের দিন সন্ধ্যাবেলা বিভিন্ন দোকানে হালখাতা করতে যেতেন। ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন ক্যালেন্ডার, পেন, মিষ্টির বাক্স। সেই উপহার পাওয়ার আনন্দটাই ছিল আলাদা। বড় হওয়ার পর এখন আমার উপহার দেওয়ার পালা। আমি চেষ্টা করি ওই দিন বাবা-মা আর দাদুকে একটা নতুন পোশাক উপহার দিতে। তবে উপহারের থেকেও বাড়ির লোকজনকে সময় দিলে তাঁরা বেশি খুশি হন। তাই ওই দিনে শুটিং না থাকলে বাড়িতেই তাঁদের সঙ্গে দিনটা কাটানোর চেষ্টা করি।’

হাতিবাগান হোক বা গড়িয়াহাট, গড়িয়া বাজার হোক কিংবা বাগুইহাটির মার্কেট, পয়লা বৈশাখের আগে বাজারে থিক থিক করত লোকজন। আর সেই ভিড় ঠেলে কেনাকাটা করা ছিল একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। এখন অবশ্য সেই ভিড় চোখে পড়বে না। হাতিবাগানের খুচরো ব্যাবসায়ী রাধারমণ শিকদার। সন্ধ্যাবেলা দোকানের মধ্যে মোবাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। এ বার বাজার কেমন জানতে চাওয়ামাত্রই একরাশ হতাশা দেখা দিল তাঁর চোখমুখে। জবাব দিলেন, ‘‘খুব অল্পই মাল তুলেছি। বাজার আর আগের মতো নেই। বেশি মাল তুলতেও ভয় লাগে। এখন তো লোকে মলে গিয়ে বেশি টাকা দিয়ে জামা কিনছেন। আর আমাদের কাছে এসে সেলের পোশাকের জন্যও দরদাম করছেন। এই তো অবস্থা খরিদ্দারের!’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles