আরজি করের চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় রাজ্য যে ধরনের ধারাবাহিক নাগরিক আন্দোলন দেখেছিল, তা শেষ কবে পশ্চিমবাংলা দেখেছে, তা অনেক প্রবীণও মনে করে বলতে পারেন না। সেই আন্দোলন দলহীন, পতাকাহীন হলেও তাতে সরকার-বিরোধিতার স্বর ছিল তীব্র। এসআইআর নিয়ে হয়রানির অভিযোগ এবং আন্দোলনের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিল টানা ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ। তার আগেই শিকেয় উঠে গিয়েছিল আরজি কর আন্দোলনও। শুক্রবার আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা আবার স্বাস্থ্য প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। বিধানসভা ভোটের আগে যা শাসক শিবিরের কাছে ‘অস্বস্তিকর’। শাসক শিবির অবশ্য পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আগেভাগে ময়দানে নেমে পড়়েছিল। এলাকার তৃণমূল বিধায়ক তথা হাসপাতালের রোগীকল্যাণ সমিতির সদস্য অতীন ঘোষ হাসপাতালে গিয়ে ‘গাফিলতি’র বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতালে নজরদারির অভাব ছিল। দেড় দশকের স্থিতাবস্থা-বিরোধিতা কাঁধে নিয়ে বিধানসভা ভোটের ময়দানে নেমেছে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বের কালে ২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার প্রতিবাদে নজিরবিহীন নাগরিক আন্দোলন দেখেছিল পশ্চিমবাংলা। সময়ের নিয়মে সেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। ভোটের আগে রাজ্য রাজনীতিতে মূল আলোচ্য হয়ে উঠেছিল এসআইআর প্রক্রিয়া। পোড়খাওয়া রাজনীতিক মমতা এসআইআর জনিত হয়রানিকে সামনে রেখে গণ আন্দোলনও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভোটপক্ষ শুরু হতেই এসআইআর নামক কার্পেটটি সরিয়ে নতুন করে উঁকি দিল সেই আরজি কর। ঘটনা অন্য। নতুন কাণ্ডের প্রেক্ষিতে ‘স্থানমাহাত্ম্যে’ পুরনো ঘটনা ফিরে ফিরে আসছে আলোচনায়। প্রশ্ন উঠছে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন নিয়ে। যে প্রশ্ন উঠেছিল বছর দেড়েক আগের ঘটনাতেও। চার বছরের সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন দমদমের নাগেরবাজারের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। লিফ্টে পাঁচতলা থেকে নীচে নামার সময়েই দুর্ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, প্রবল ঝাঁকুনির পর লিফ্টটি নীচে গর্তে পড়ে যায়। দীর্ঘ ক্ষণ দরজা খোলা যায়নি। অরীপ কোনওক্রমে শিশুসন্তান এবং স্ত্রীকে লিফ্ট থেকে বার করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু নিজে বের হতে পারেননি। পরিবারের লোকজনের আকুতিতেও কেউ কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ। দেড় থেকে দু’ঘণ্টা আটকে থাকার পর বছর ৪০-এর অরূপের মৃত্যু হয়। বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁর পরিজনেরা। হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ দেখান অন্যান্য রোগীর আত্মীয়েরাও। সূত্রের খবর, মৃতের স্ত্রী এবং সন্তান আরজি করেই চিকিৎসাধীন। ঘটনার খবর পেয়েই হাসপাতালে পৌঁছে যান কলকাতার ডেপুটি মেয়র তথা কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক অতীন। যিনি এ বারেও পুরনো কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী। আরজি কর হাসপাতাল তাঁর বিধানসভা এলাকাতেই। গাফিলতির কথা মেনে নিয়েই অতীন জানিয়েছেন, তিনি আগামী সোমবার জরুরি ভিত্তিতে রোগীকল্যাণ সমিতির বৈঠক ডাকতে বলেছেন। সেই বৈঠকেই এই ঘটনায় কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার রিপোর্ট পেশ করতে হবে। বৈঠকে ডাকতে হবে হাসপাতাল প্রশাসন-সহ পূর্ত দফতরের আধিকারিকদেরও। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি অবশ্য আরজি করের ঘটনার ‘ফায়দা’ তুলতে সে ভাবে মাঠে নামেনি। শুধুমাত্র হাসপাতালে গিয়ে মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিজেপি প্রার্থী রীতেশ তিওয়ারি এবং সিপিএম প্রার্থী রাজেন্দ্র গুপ্ত। তবে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি বিবৃতি দিয়েছেন। প্রত্যাশিত ভাবেই যাতে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে মমতার প্রশাসনকে। শুভেন্দুর বিবৃতির শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘অভিশপ্ত আরজি কর’। লেখা হয়েছে, ‘রাজ্য প্রশাসনের পচে যাওয়া, জং ধরা কঙ্কালসার চেহারাটা আজ (শুক্রবার) আর আড়ালে নেই, সম্পূর্ণ উন্মোচিত। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের আজকের মর্মান্তিক ঘটনা সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।’ দমদমের অরূপের মৃত্যুর ঘটনাকে ‘অপরিকল্পিত খুন’ বলেও তোপ দেগেছেন বিরোধী দলনেতা। তিনি এ-ও লিখেছেন, ‘আর কত নিরীহ মানুষের প্রাণ গেলে এই নির্বিকার, অযোগ্য প্রশাসনের চেতনা হবে? এই জরাজীর্ণ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ প্রশাসনকে সরিয়ে নতুন, দায়িত্বশীল সরকারের প্রতিষ্ঠা করা আজ সময়ের দাবি।’ আরজি কর হাসপাতালের লিফ্টে আটকে এক নাগরিকের অপমৃত্যুর পরে নির্বাচনের আবহে নতুন করে আলোচ্য হয়ে উঠেছে আরজি কর।
আরজি করের চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় রাজ্য যে ধরনের ধারাবাহিক নাগরিক আন্দোলন দেখেছিল, তা শেষ কবে পশ্চিমবাংলা দেখেছে, তা অনেক প্রবীণও মনে করতে পারেন না। সেই আন্দোলন দলহীন, পতাকাহীন হলেও তাতে সরকার-বিরোধিতার স্বর ছিল তীব্র। ২০২৪ সালের ১৪ অগস্ট ‘মেয়েদের রাত দখল’ এবং তার পর টানা প্রায় তিন মাসের লাগাতার আন্দোলনে রাজপথে যে ভাবে মহিলারা নেমে পড়েছিলেন, তা-ও সাম্প্রতিক অতীতে হয়নি। শুক্রবারের আরজি করের ঘটনা নিয়ে তেমন কোনও আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার সামান্যতম ইঙ্গিতও দেখা যায়নি। অনেকের মতে, এর কারণ দু’টি। প্রথমত, মৃত অরূপ দক্ষিণ দমদম এলাকার সক্রিয় তৃণমূল কর্মী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, ওই ঘটনার ২৪ ঘন্টা আগেই আরজি করের নির্যাতিতার মা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি বিজেপির হয়ে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়তে আগ্রহী। যা দু’বছর আগের নাগরিক আন্দোলনে যোগদানকারীদের একটি বড় অংশকে ‘নিরুৎসাহিত’ করেছে। ফলে যে আরজি করের আবার অপমৃত্যু হওয়ায় শাসকদলের বড়সড় বিপাকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেই আরজি কর বলেই এই ঘটনায় আন্দোলন দানা বাঁধার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।





