Saturday, March 7, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

হাওড়ার ভোট বোমাবাজি, মারামারি, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ!‌ ভোটের বাজারে রক্তস্রোত!‌ শহরতলীর কাছে চিরকালই মুড়িমুড়কির বিষয়!

উত্তর হাওড়ায় গোলাবাড়ি এলাকায় এই সেদিনও খুনের ঘটনা ঘটল। ভোর চারটের সময় স্থানীয় এক প্রোমোটারকে এক দুষ্কৃতী গুলি করে হত্যা করল। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ল। ঘটনাস্থল, চায়ের দোকান। শোনা যাচ্ছে, ছেলেটি চা খেতে এসেছিল। রমজান মাস। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পড়ে। সকালবেলা কিছু-না-কিছু খেয়ে নেয়। তারপর সারাদিন উপবাস করতে হয়। কিন্তু সিসিটিভিতে পুরনো ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় বিধায়ক মোটর সাইকেল করে যাচ্ছে তাঁকে পিছনে বসিয়ে। বিধায়ক বলছেন, ‘‌‘‌তাকে আমি চিনি না।”‌ সেই ছেলেটি এবং তার সঙ্গী পলাতক ছিল। পুলিশ অবশেষে দিল্লি থেকে পাকড়াও করেছে। সিপিএমের সময় যে, লুম্পেন সমাজ নানাভাবে জমি-বাড়ির দালালি করত, সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকত, তারাই আবার শাসকদলে‌ থাকার জন্য অনেকে আবার তৃণমূলে মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। এটি একটা সিস্টেম। এটা কোনও ব্যক্তি বা কারওর পক্ষেই বোধহয় চিরতরে অবসান ঘটানো সম্ভব নয়।‌ ঠিক যেমনটা সিনেমায় দেখা যায়। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি এই সমাজবিরোধী অধ্যুষিত এলাকায় ঢুকে বলছিলেন, “সিপিএম, পুলিশ আর সমাজবিরোধী – এই ত্রয়ীর নেক্সাস আমাকে পরাজিত করার চেষ্টা করছে।”

হাওড়া কলকাতার যমজ শহর।‌ হাওড়ার ভোট বোমাবাজি, মারামারি, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ ছিল ভয়ংকর। হাওড়ার হিংসার ট্র্যাডিশন বহুদিন ধরে, বহু বছর ধরেই। ‘শিবপুর’ বলে একটা সিনেমা হয়েছে। যেখানে এই মারামারি, কাটাকাটি, গোষ্ঠীবাজি এসব দেখানো হয়েছে। কেন হাওড়ায় এটা হয়? একটা সময় এই হাওড়া ছিল ব্রিটিশদের ভাষায় ‘ভারতের শেফিল্ড’। লন্ডনের লোকেরা হাওড়ার জন্য গর্ববোধ করত। ভোট চলছে। ভোট। মানুষ ভোট দিচ্ছে। নানা রকমের বুথ। লোকসভার কংগ্রেস প্রার্থী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। সিপিএম প্রার্থী প্রবীণ নেতা সমর মুখোপাধ্যায়। গোলাবাড়ি থানা মানেই বোমাবাজি। সুলতান সিং তখন হাওড়ার পুলিশ কমিশনার। ভোট চলছে। আর প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে গাড়ি নিয়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন।‌ হাওড়ায় সেবার প্রচণ্ড গোলমাল!‌ সুলতান সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল কংগ্রেস, যে, তিনি রিগিং মাস্টার। বুথ দখলে সিপিএমকে প্রভূতভাবে সাহায্য করেছে নানাভাবে‌। সুলতান সিংয়ের সঙ্গে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির ব্যাপক ঝামেলা। সেই সুলতান সিং পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। মন্ত্রী হন। সাদা অ্যাম্বাসাডর এখন হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে চলেছে। হাওড়া ব্রিজ তৈরি করেছিলেন ব্রিটিশরা। এত বছর পরেও হাওড়া ব্রিজ সচল।‌ দু’দিকে তাকালেই গঙ্গা।‌ গঙ্গার যতই অবক্ষয় হোক না কেন, এখনও বহতা স্রোত। ব্রিজটি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ‌ ঠাকুরও হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিলেন।‌ ভানুসিংহের চিঠিতে লেখা। তখন অবশ্য হাওড়া ব্রিজটা জোড়া লাগানো হত, খোলা হতো। মাঝখান দিয়ে স্টিমার যেত।

হাওড়া স্টেশনের গা দিয়ে এসেই গোলাবাড়ি থানা। শেরশাহের তৈরি জি টি রোড গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। গোটা দেশে এত সংকীর্ণতম জি টি রোড বোধহয় হাওড়াতেই। কলকাতার ইতিহাস যদি ৩০০‌ বছরের হয়, তো হাওড়ার ইতিহাস ৫০০ বছরের।‌ ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসের কনকনে শীতে লোকসভার নির্বাচন। সিপিএম নেতা লগনদেও সিংয়ের পরনে সাদা সাফারি, সাদা প্যান্ট আর তার সঙ্গে সাদা চটি।‌ সিপিএমের ‘বাহুবলী’ নেতা হিসেবে পরিচিত। হাওড়া পুরসভার মেয়র আলোকদূত দাস। লগনদেও সিংয়ের প্রচুর চেলাচামুন্ডা হিন্দিভাষী, উর্দুভাষী মুসলমান। বাঙালি লুম্পেন কমরেড নিয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন উত্তর হাওড়া। পরবর্তীকালে ‘হাওড়া ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’-এর চেয়ারম্যান পর্যন্ত হন। সুলতান সিং খুব রঙিন চরিত্র। সুলতানের চরিত্রে অনেক রকমের শেড ছিল। সমাজবিরোধীদের দমন করার ব্যাপারে সাংঘাতিক ভূমিকা নিয়েছিলেন। তখন রীতিমতো এনকাউন্টার হত। সমাজবিরোধীদের দমন করতেন। রসিকতা করে সুলতান সিং সম্পর্কে বলা হত, ‘বাচ্চে শো যাও, নেহি তো সুলতান সিং আ জায়েঙ্গে।’ সুলতান সিং রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে যে ছেলেমেয়েরা ভালো পোশাক পরে নেই, তাদের কাছে গিয়ে বলতেন, ‘‘তুমি কেন ভালো ড্রেস পরোনি?’’ নৈতিক অভিভাবক হিসেবে যেন অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির কাছে ফোন আসছে, বোটানিক্যাল গার্ডেনের কাছে হাঙ্গামা। ৮৪ সালের ভোট। এমনকী, ভোটগণনার দিন শিবপুর বি ই কলেজের ভোট গণনাকেন্দ্রে ব্যাপক হাঙ্গামা চলছে কংগ্রেস এবং সিপিএমের মধ্যে। সমর মুখোপাধ্যায় যে পরাস্ত হতে পারেন, সেটা সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতারাও ভাবতে পারেননি। জ্যোতি বসু নিজে সমরবাবুর জন্য প্রচারে এসে জনসভায় বলেছিলেন যে, প্রিয়বাবু মিথ্যাবাদী। আমি যদি কোনও দিন কংগ্রেসে যোগ দিই তাহলে আমার নামে কুকুর পুষবেন।‌ আমি কিন্তু ওঁকে খারাপ নামে ডাকব না। কারণ কুকুরকে আমরা খুব ভালোবাসি। একথা জ্যোতিবাবু বলেছিলেন। ৮৪ সালে প্রিয়বাবু জিতলেন। রাজীব গান্ধীর আস্থাভাজন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, প্রথমে সংসদ সদস্য হলেন।‌ তারপর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি থেকে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী। একসঙ্গে তিন তিনটে পদ! বর্ষীয়ান কম্যুনিস্ট নেতা সমর মুখোপাধ্যায় পরাস্ত প্রিয়বাবুর কাছে। এত অভিযোগ, এত রিগিং, এত গোলমাল! হাওড়া পুরসভার মেয়র অলোকদূত দাস তিনি কংগ্রেসি কাউন্সিলারদের সামলাতে পারতেন না। জলের সংকট হলে কাউন্সিলররা এক বালতি করে জল‌ নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করে কর্পোরেশনে ঢুকতেন। তারপর সেই বালতির জল নিজেদের মাথায় ঢালতেন। মাথায় জল ঢেলে মেয়রের ঘরের সামনে বিক্ষোভ দেখাতেন।‌ বিরোধী রাজনীতির এক অদ্ভুত চেহারা। তখন কংগ্রেস বিরোধী দল। আর সিপিএম শাসকদল।‌ তখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজনীতির সেন্টার স্টেজে অবতীর্ণ হননি।‌

হাওড়ার ভোট বোমাবাজি, মারামারি, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ ছিল ভয়ংকর। সিপিএমের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কম ছিল? হাওড়ায় পতিতপাবন পাঠক ছিলেন হাওড়ার বালির বিধায়ক এবং পরিষদীয় দলমন্ত্রী। পতিতপাবন পাঠকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠত যে, বেলুড়ের স্ক্রাপইয়ার্ড-দুর্নীতি, বালিতে ইটের ব্যবসা, নানা রকমের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে হত। লগনদেও সিংর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠত, বেআইনি প্রোমোটিং, অবৈধ নির্মাণ এসবের মদতদাতা। যখন লঞ্চ সার্ভিস চালু হল, হাওড়া স্টেশন থেকে বাবুঘাট, রামকৃষ্ণপুর থেকে বাবুঘাট। সেই লঞ্চ সার্ভিসের সমবায়ও নিয়ন্ত্রণ করতেন লগনদেও সিং। প্রলয় তালুকদার মধ্য হাওড়ার মন্ত্রী, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। লঞ্চ সার্ভিসের একজন অন্যতম কর্মকর্তাও ছিলেন। প্রলয় তালুকদার আর লগনদেও সিংয়ের মধ্যে বিপুল ঝগড়া লেগেছিল এই লঞ্চ সার্ভিস নিয়ে।‌ ভোটের সময় নির্বাচনী প্রচারে পর্যন্ত এই প্রলয় তালুকদার বনাম লগনদেও সিংয়ের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব একটা বড় প্রচারের হাতিয়ার হয়েছিল।‌ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি সিপিএমের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে কম প্রচার করেননি। কংগ্রেসের দুই নেতা, উত্তর হাওড়ার অশোক ঘোষ মধ্য হাওড়ার অম্বিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁদের নিয়ে রাজনীতি করতেন। সোমেন মিত্রের অনুগামী ছিলেন উৎপল ভৌমিক প্রিয় বিরোধী নেতা। সোমেন মিত্রের অনুগামী। পরবর্তীতে উৎপল ভৌমিককে সমাজবিরোধীদের সাহায্যে সন্ধেবেলায় হত্যা করা হয়। হাওড়ার হিংসার কার্যকলাপের যে ট্রাডিশন সে কিন্তু আজ থেকে নয়, সেই বহুদিন ধরে, বহু বছর ধরে হয়ে চলেছে। অথচ হাওড়া ছিল ব্রিটিশদের ভাষায় ‘ভারতের শেফিল্ড’। লন্ডনের লোকেরা হাওড়ার জন্য গর্ববোধ করত। হাওড়ায় কত পাটকল ছিল। একদিকে যেমন কুলি টাউন ছিল। সেরকম হাওড়ায় ছিল সাংস্কৃতিক জগৎ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কতদিন থেকেছেন এই হাওড়ায়। এই হাওড়া জেলা ক্ষুদ্র জেলা ছিল। আর আয়তনে ছোট হলে কী হবে, জনবসতির ঘনত্ব খুব বেশি। এখনও কিন্তু হাওড়ায় জনবসতি পাঁচমেশালি।‌ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান।‌ হিন্দিভাষী, বাঙালি, উর্দু মুসলমান, বাঙালি মুসলমান। নানা বস্তি। পিলখানা বস্তি থেকে শুরু করে শালিমার বস্তি। এতরকমের জনবসতি, সেখানে একটা টানাপোড়েন রাজনীতিতে এখনও থেকে গিয়েছে। হাওড়ার বেদনা নির্বাচনের সময় নতুন নতুন রূপে প্রকাশিত হয়েই চলেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles