গত বার ডাগ আউটে বসে দিল্লি ক্যাপিটালসের হার দেখতে হয়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। গত বার দিল্লির মেন্টর ছিলেন। এ বার তিনি দায়িত্ব নেই। দিল্লি ক্যাপিটালসের ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট ফাইনাল দেখতে পৌঁছে গিয়েছিলেন বডোদরা। প্রথম ইনিংসে দিল্লির ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছিল, এ বার হাসিমুখে ফিরবেন সৌরভ। এ বারেও হল না। টানা চার বার ফাইনাল হারল দিল্লি। গত তিনবছরে তিনটি ট্রফি জিতে সমালোচকদের যোগ্য জবাব দিয়েছে আরসিবি। ২০২৪ এবং ২০২৬ মহিলা প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন স্মৃতি মন্ধানারা। সেই সঙ্গে ২০২৫ আইপিএল ট্রফি গিয়েছে বিরাট কোহলিদের ঝুলিতে। বৃহস্পতিবার স্মৃতিরা চ্যাম্পিয়ন হতেই আবেগঘন বার্তা লিখে ফেলেছেন কিং কোহলি। এই প্রথমবার কোনও ফ্র্যাঞ্চাইজির পুরুষ এবং মহিলা দলের হাতে একইসঙ্গে ভারতসেরার ট্রফি রয়েছে। বৃহস্পতিবার ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইনস্টাগ্রামে বিরাট লেখেন, ‘আবারও চ্যাম্পিয়ন। আরসিবির পতাকা সকলের উপরে উড়ছে। এটা নিয়ে তোমরা সকলেই গর্ব করতে পারো। স্মৃতি, পুরো টিম, সকলকে এই দুরন্ত জয়ের জন্য অনেক অভিনন্দন জানাই। এই জয়টা তোমাদের প্রাপ্য। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটা উপভোগ করো। ভক্তরাও খুবই ভালোবাসেন আমাদের, সেটাও গ্রহণ করো।’ দ্বিতীয়বার ডব্লিউপিএল ট্রফি জিতেও ভক্তদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্মৃতি। তিনি বলেন, “আরসিবি ভক্তরা বিশ্বের সেরা। আমরা যেখানেই খেলি না কেন, প্রচুর সমর্থন পেয়েছি।” আরসিবি অধিনায়ক মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই নিয়ে পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হল আরসিবি। সেটাও অসামান্য অনুভূতি। বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যও অভিনন্দন জানিয়েছেন ডব্লিউপিএলজয়ী আরসিবিকে। নেটিজেনরাও আরসিবির মহিলা ব্রিগেডকে শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিয়েছেন। বেস্ট ফ্রেন্ড জেমাইমা রডরিগেজের নেতৃত্বাধীন দিল্লি ক্যাপিটালসের বিরুদ্ধে ডব্লিউপিএল ফাইনাল খেলতে নেমেছিলেন স্মৃতি। দুই বন্ধুর যুদ্ধে শেষ হাসি হাসেন আরসিবি অধিনায়ক। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় দুই দলের। কিন্তু আবারও দিল্লি হেরে গেল ফাইনালে। ডব্লিউপিএলের ইতিহাসে প্রত্যেকবার ফাইনালে উঠেছে দিল্লি। চারবার ফাইনাল খেলেও ট্রফি জেতা হয়নি তাদের।

দিল্লির বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে ৯৬ রানে আউট হয়েছিলেন। শতরান হাতছাড়া হয়েছিল। ফাইনালেও হল না। ২০৪ রান তাড়া করতে নেমে ৮৭ রানের ইনিংস খেললেন স্মৃতি মন্ধানা। শতরান করতে না পারলেও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে দ্বিতীয় বার চ্যাম্পিয়ন করলেন। আরও এক বার হেরে মাঠ ছাড়তে হল দিল্লি ক্যাপিটালসকে। টান টান ম্যাচে খুব কাছের বন্ধু মন্ধানার কাছে হারলেন জেমাইমা রদ্রিগেজ। প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২০৩ রান করে দিল্লি। মহিলাদের আইপিএলে ফাইনালে এটি কোনও দলের করা সর্বাধিক রান। সেই রান তাড়া করে ৬ উইকেট জিতল বেঙ্গালুরু। কয়েক মাস আগে ভারতের এক দিনের বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা ছিল মন্ধানার। ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে সর্বাধিক রান করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার পরেই তাঁর জীবনে ঘটে বিপর্যয়। প্রেমিক পলাশ মুচ্ছলের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের আগের দিন জানা যায়, আপাতত বিয়ে স্থগিত। কয়েক দিন পরে বিয়ে ভাঙার কথা জানান মন্ধানা। ফিরে যান তাঁর একমাত্র ভালবাসা ক্রিকেটের কাছে। তাঁকে নিয়ে এই কয়েক মাস কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু মন্ধানা নিজের লক্ষ্য থেকে সরেননি। অবশেষে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জবাব দিলেন তিনি। বুঝিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে যতই ঝড় উঠুক, ক্রিকেট দিয়ে সবকিছুর মোকাবিলা তিনি করতে পারেন। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভাল হয়নি দিল্লির। উইকেট না পড়লেও পাওয়ার প্লে-তে দ্রুত রান করতে পারেননি দুই ওপেনার লিজ়েল লি ও শেফালি বর্মা। পাওয়ার প্লে-র পরে হাত খুলতে না খুলতেই ১৩ বলে ২০ রান করে আউট হন শেফালি। লিজ়েল করেন ৩০ বলে ৩৭ রান। দিল্লির ইনিংসে গতি আনেন জেমাইমা ও লরা উলভার্ট। ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে চার মারছিলেন দুই ব্যাটার। লরেন বেল ছাড়া বেঙ্গালুরুর কোনও বোলার তাঁদের সমস্যায় ফেলতে পারেননি। বেল এই ম্যাচেও দেন ১৯ রান। গোটা প্রতিযোগিতায় ১২৮টি ডট বল করেছেন তিনি, যা মহিলাদের আইপিএলে রেকর্ড। জেমাইমা ৩৭ বলে ৫৭ রান করে আউট হন। পাঁচ নম্বরে মারিজান কাপের বদলে শিনেল হেনরিকে নামায় দিল্লি। সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগে। হেনরি হাত খুলে খেলা শুরু করেন। ডেথ ওভার কাজে লাগান তিনি। শ্রেয়াঙ্কা পাটিল ও নাদিন ডি ক্লার্কের ওভারে একের পর এক বড় শট মারেন। তাঁকে সঙ্গ দেন উলভার্ট। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২০৩ রান করে দিল্লি। উলভার্ট ২৫ বলে ৪৪ রান করেন। হেনরি ১৫ বলে ৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন। প্রথম ইনিংসের পর মনে হচ্ছিল, রান তাড়া করতে সমস্যা হবে বেঙ্গালুরুর। কারণ, এ বারের প্রতিযোগিতায় বডোদরায় মাত্র এক বার ১৬০ রানের বেশি তাড়া করে জিতেছে কোনও দল। একে ফাইনাল, তার উপর ২০৪ রানের চাপ কি মন্ধানারা সামলাতে পারবেন, সেই প্রশ্ন উঠছিল। তার মধ্যে দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই ফর্মে থাকা গ্রেস হ্যারিসকে ফেরান হেনরি। চাপে পড়েননি মন্ধানা ও জর্জিয়া ভল। তাঁরা রান তোলার গতি কমতে দেননি। পাওয়ার প্লে কাজে লাগান। শুরুতে ভলের স্ট্রাইক রেট অনেক বেশি ছিল। মন্ধানা একটু ধরে খেলছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনিও হাত খোলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, বেঙ্গালুরুর বদলে দিল্লি চাপ নিয়ে ফেলেছে। ফিল্ডিংয়ে ভুল হল। ক্যাচ পড়ল। শ্রী চরণি, স্নেহ রানার মতো অভিজ্ঞ বোলারেরা ভুল জায়গায় বল ফেললেন। প্রথমে অর্ধশতরান করেন ভল। শুরুর দিকের ম্যাচগুলিতে তিনি খেলার সুযোগ না পেলেও যে দিন থেকে প্রথম একাদশে জায়গা পেয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রতিভা। পিছিয়ে ছিলেন না মন্ধানাও। ২৪ বলে অর্ধশতরান করেন তিনি। ভলের থেকেও কম বল নেন। প্রতি ওভারে ১০ রানের বেশি উঠছিল। জরুরি রানরেট আয়ত্তের মধ্যেই ছিল। এই জুটি ভাঙতে পারছিলেন না দিল্লির বোলারেরা। প্রতি ওভারে বড় শট আসছিল। চাপ বাড়ল দিল্লির উপর। বোলারেরা লাইন, লেংথ সব গুলিয়ে ফেলেছিলেন। মন্ধানা ও ভল একের পর এক বড় শটে দলকে জয়ের পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন। শতরানের জুটি গড়লেন তাঁরা, যা এই আইপিএলে প্রথম। এ বার গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচে দিল্লির বিরুদ্ধে রান তাড়া করতে নেমে ৯৬ রান করেছিলেন মন্ধানা। অর্থাৎ, তিনি যে দিল্লির বিরুদ্ধে রান করতে ভালবাসেন, তার প্রমাণ আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এই ম্যাচে আরও এক বার পাওয়া গেল। চলতি প্রতিযোগিতায় হরমনপ্রীত কৌরকে হারিয়ে কমলা টুপিরও মালিক হলেন মন্ধানা। নিজের শেষ তাস কাপের হাতে বল তুলে দেন জেমাইমা। তিনিও জুটি ভাঙতে পারেননি। শেষ ৩৬ বলে দরকার ছিল ৫৪ রান। হাতে ৯ উইকেট থাকায় বেঙ্গালুরুর জিততে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। সেই সময় বেঙ্গালুরুকে ধাক্কা দেন মিন্নু মণি। ৫৪ বলে ৭৯ রান করে আউট হন ভল। ভাঙে ৯২ বলে ১৬৫ রানের জুটি। দ্রুত খেলা শেষ করার লক্ষ্যে রিচা ঘোষকে নামায় বেঙ্গালুরু। কিন্তু ৬ রান করে ছক্কা মারতে গিয়ে নন্দনী শর্মার বলে আউট হন রিচা। অন্ধকারের মধ্যে জয়ের হালকা আলো দেখতে পায় দিল্লি। শেষ ১২ বলে দরকার ছিল ১৮ রান। সেই ওভারে আউট হন মন্ধানা। ৪১ বলে ৮৭ রান করেন তিনি। পরের বলে রাধা যাদবের সহজ ক্যাচ ছাড়েন মিনু। সেটাই কাল হল। পর পর দু’টি চার মেরে ২ বল বাকি থাকতে বেঙ্গালুরুকে জিতিয়ে দিলেন রাধা। গত বার ডাগ আউটে বসে দিল্লি ক্যাপিটালসের হার দেখতে হয়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। গত বার দিল্লির মেন্টর ছিলেন। এ বার তিনি দায়িত্ব নেই। দিল্লি ক্যাপিটালসের ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট ফাইনাল দেখতে পৌঁছে গিয়েছিলেন বডোদরা। প্রথম ইনিংসে দিল্লির ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছিল, এ বার হাসিমুখে ফিরবেন সৌরভ। এ বারেও হল না। টানা চার বার ফাইনাল হারল দিল্লি।





