অপরাজিত ২০৫ রান। খেলেছে ২৬০ বল। ২২টা চার, ৩টা ছক্কা। ঝড় তুলল তুফান। শিলিগুড়ির তুফান রায়। শিলিগুড়ির এক দরিদ্র রাজবংশী পরিবার থেকে উঠে আসা এই বঙ্গ সন্তানটা আজ ব্যাট হাতে দেখিয়ে দিল প্রতিভা সুযোগ পেলে কথা বলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা উইকেটে দাঁড়িয়ে ধৈর্য, শট সিলেকশন আর ম্যাচ সচেতনতা, সব মিলিয়ে এটা ছিল একেবারে টেস্ট-টেম্পারামেন্টের ইনিংস। অনূর্ধ্ব ১৬ বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে মণিপুরের বিরুদ্ধে রানের পাহাড়ে চড়ে বসে বাংলা। কটকের রাভেনশ ইউনিভার্সিটি গ্রাউন্ড-১-এ মণিপুর টস জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্তে উপণীত হয়। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে বাংলা বড় রানে পৌঁছে যায় ওপেনার তুফান রায় ও তিনে নামা সৌহার্দ্য নিয়োগী দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ৪৪৪ বলে ৩৬২ রানের উপর ভর করে। সৌহার্দ্য ২৪টি চার ও ২টি ছয়ের সাহায্যে ২১৮ বলে ১৮৪ রান করে। ২২টি চার ও তিনটি ছয়ের সাহায্যে ২৬৫ বলে ২০৫ রানে অপরাজিত তুফান রায়। প্রথম দিনের শেষে বাংলার স্কোর ৯০ ওভারে ৬ উইকেটে ৪৫২। অধিনায়ক রাজেশ মণ্ডল ২৭ বলে ৪১, রাম সেন ৭ বলে ১, প্রবীণ ছেত্রী ২ বলে ১, সায়ক জানা ১২ বলে ২, আকাশ যাদব ৪ বলে ৮ রান করে আউট হয়। উইকেটকিপার অতনু নস্কর ৫ বলে ৩ রানে অপরাজিত। বুশ সাগোলসেম, রোজের, স্বাভিমান ও চিংগাম্বা একটি করে উইকেট শিকার করে। ১৮৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা সৌহার্দ্য নিয়োগী ও তুফান রায়ের অপরাজিত ২০৫ রান দলকে পাহাড়সম ৪৪৫ রানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইনিংসটার মেরুদণ্ড ছিল তুফান। এই ইনিংস অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইঙ্গিত বহন করছে যে বাংলার মফস্বল, উত্তরবঙ্গ, প্রান্তিক সমাজেও ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক চোখ, সঠিক মঞ্চ, আর বিশ্বাস। আজ তুফান শুধু রান করেনি। আজ সে অনেক অলীক স্বপ্নকে বিশ্বাস করার সাহস যুগিয়েছে।

বিজয় হাজারেতে বাংলার জয়! মুকেশ-সামি-শাহবাজদের দাপট, ব্যর্থ পন্থ-অভিষেক-বৈভব। বরোদার কাছে হারতে হয়েছিল অভিমন্যু ঈশ্বরনদের। সেই মাঠেই চণ্ডীগড়কে ৬ উইকেটে হারাল তারা। মুকেশ কুমারের ৫ ও মহম্মদ সামির ৩ উইকেটের পাশাপাশি শতরান করলেন অভিষেক পোড়েল। বিজয় হজারের আরও একটি ম্যাচে রান পেলেন না ঋষভ পন্থ ও অভিষেক শর্মা। ঝোড়ো শুরু করেও বড় রান করতে ব্যর্থ ১৪ বছরের বৈভব সূর্যবংশী। রিঙ্কু সিং অর্ধশতরান করেন। চমক দিলেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের অনুকূল রায়। রাজকোটের মাঠে বাংলার বিরুদ্ধে প্রথমে ব্যাট করে ৪৮.২ ওভারে ৩১৯ রান করল চণ্ডীগড়। ১২২ রান করেন অধিনায়ক মনন ভোরা। ৬৭ রান করেন সান্যম সাইনি। বাংলার বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল মুকেশ কুমার। ১০ ওভারে ৫৯ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন। শুরুতে রান দিলেও শেষ দিকে উইকেট নিলেন শামি। ৬৯ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিলেন। চণ্ডীগড়কে অল আউট তিনিই করলেন। ২ উইকেট শাহবাজের দখলে। ভোরার গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিলেন এই বাঁহাতি স্পিনার। ৩২০ রান তাড়া করতে নেমে শুরু থেকে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করে বাংলা। বিশেষ করে ওপেনার অভিষেক। প্রথম উইকেটে ১০ ওভারে অধিনায়ক অভিমন্যুর সঙ্গে ৮৮ রানের জুটি গড়েন। তার মধ্যে ২৫ রান অভিমন্যুর। তিন নম্বরে নামা সুদীপ ঘরামি ১৭ রান করেন। চতুর্থ উইকেটে অভিজ্ঞ অনুষ্টুপ মজুমদারের সঙ্গে ৫৯ রানের জুটি বাঁধেন অভিষেক। ৮৪ বলে ১০৬ রানের ইনিংস খেলেন বাংলার তরুণ ক্রিকেটার। ১২ চার ও দু’টি ছক্কা মারেন। অভিষেক আউট হওয়ার পর বাকি কাজ করলেন অনুষ্টুপ ও শাহবাজ়। অনুষ্টুপ করলেন ৬৩ রান। বল হাতে ২ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাট হাতে অপরাজিত ৭৬ রানের ইনিংস খেলেন শাহবাজ়। সুমন্ত গুপ্তের ২২ সঙ্গে মিলে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। ১৪ বল বাকি থাকতে ৬ উইকেটে জেতে বাংলা।

এদিকে, পাঞ্জাবের হয়ে আরও একটি ম্যাচে বড় রান করতে পারলেন না অভিষেক। ওপেন করতে নেমে ২৬ বলে ৩০ রান করেন তিনি। ভারতের এক দিনের দলে সুযোগ পেতে হলে আরও ধারাবাহিক হতে হবে অভিষেককে। পাঞ্জাবকে ৫ উইকেটে হারিয়েছে উত্তরাখণ্ড। প্রথমে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৬৯ রান করে পঞ্জাব। ১৪ বল বাকি থাকতে রান তাড়া করে নেয় উত্তরাখণ্ড। রান পাননি পন্থও। দিল্লির হয়ে এই ম্যাচে খেলেননি বিরাট কোহলি। ফলে অধিনায়ক পন্থের কাঁধে দায়িত্ব ছিল বেশি। প্রথমে ব্যাট করে ৭ উইকেট হারিয়ে ৩২০ রান করে সৌরাষ্ট্র। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ২৬ বলে ২২ রান করেন পন্থ। যদিও ৩ উইকেটে ম্যাচ জেতে দিল্লি। পন্থের ফর্ম চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। এই ফর্ম থাকলে নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ের দলে তাঁর জায়গা পাওয়া কঠিন। টি২০ বিশ্বকাপের আগে ঝুঁকি অস্ট্রেলিয়ার! ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের দলে জায়গা পেলেও বিহারের হয়ে বিজয় হাজারে খেলতে নেমেছিল বৈভব। কিন্তু এই ম্যাচে রান পায়নি সে। ২১৮ রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভাল হয়েছিল বৈভবের। ৯ বলে ৩১ রান করে সে। কিন্তু সেই ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি বাঁহাতি ওপেনার। ১০ বলে ৩১ রান করে আউট হয় বিহারের ছেলে। ছ’টি চার ও একটি ছক্কা মারে সে।

উত্তরপ্রদেশের হয়ে রান পেয়েছেন ধ্রুব জুরেল ও রিঙ্কু। তিন নম্বরে নেমে ১০১ বলে ১৬০ রানের ইনিংস খেলেন জুরেল। ভারতের নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ের দলে পন্থের পরিবর্তে ঢোকার দাবিদার হয়ে উঠলে তিনি। রিঙ্কুও রান পেয়েছেন। তবে শতরান হাতছাড়া হয়েছে তাঁর। ৬৭ হলে ৬৩ রান করেন উত্তরপ্রদেশের অধিনায়ক। প্রথমে ব্যাট করে ৭ উইকেটে ৩৬৯ রান করে উত্তরপ্রদেশ। ৫৪ রানে বরোদাকে হারিয়েছে তারা। চমক দিয়েছেন অনুকূল। ঝাড়খণ্ডের হয়ে পুদুচেরির বিরুদ্ধে ছ’নম্বরে নেমে ৫৩ বলে ৯৮ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। সাতটি চার ও আটটি ছক্কা মারেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। ৭ উইকেটে ৩৬৮ রান করে ঝাড়খণ্ড। পুদুচেরিকে ১৩৩ রানে হারায় তারা। পরে বল হাতেও ২ উইকেট নেন অনুকূল। আইপিএলে কেকেআর দলে থাকা ক্রিকেটার যে ফর্মে অনুকূল রয়েছেন, তাতে আগামী মরসুমে কলকাতার দলে নিয়মিত খেলতে দেখা যেতে পারে।





