Monday, July 6, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

অভিজিতের রায় খারিজ, হাইকোর্টে স্বস্তি রাজ্যের!‌ প্রাথমিকে ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল রেখেছে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ

প্রাথমিকে ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল রেখেছে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। খারিজ করে দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশ। বুধবার বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, দুর্নীতি হয়েছে। তবে এত শিক্ষকের চাকরি বাতিল করে দেওয়া যাবে না। ৯ বছর ধরে তাঁরা চাকরি করেছেন। চাকরি বাতিল করলে তাঁদের পরিবারের উপরেও প্রভাব পড়বে। মূলত মানবিক কারণেই চাকরি বাতিলের নির্দেশ খারিজ করেছে আদালত। ১৪১ পৃষ্ঠার রায়ে তার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রাথমিক মামলায় স্বস্তি পেল রাজ্য। এতদিন ধরে এবিষয়ে যে বিতর্ক গোটা রাজ্যে চলছিল তার অবসান হল। বুধবার এই মামলার রায় ঘোষণা করে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। সেখানেই প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলির রায় বাতিল করে দেওয়া হয়। রায়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় ৩২ হাজার চাকরিপ্রার্থীর কাজ থাকছে। তাদের চাকরি বাতিল করা হবে না। নিজের পদেই বহাল রইলেন প্রত্যেকে। প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলির সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ খারিজ করে দিল বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ ছিল, “দীর্ঘ ৯ বছর পর চাকরি বাতিল করলে পরিবারগুলির উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে।” আইনজীবী আশিস কুমার চৌধুরী জানান, সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ অনুযায়ী দুর্নীতির জন্য ৩২ হাজার প্রাথমিক চাকরি বাতিল করা হয়। কর্তৃপক্ষের ভুল কিংবা দুর্নীতির জন্য নিরীহ চাকুরিরতদের চাকরি বাতিল হতে পারে না। যাঁরা সফল হননি, তাঁদের জন্য সব কিছু ড্যামেজ হতে পারে না। এতদিন ধরে যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁরা কোনও প্রভাবশালীদের সঙ্গে যুক্ত নন। তাই তাঁদের চাকরি বহাল থাকবে বলেই জানায় ডিভিশন বেঞ্চ। হাই কোর্টের নির্দেশে স্বস্তিতে ২০১৪ সালের টেটের মাধ্যমে নিযুক্ত প্রাথমিক শিক্ষকরা।
২০২৩ সালের মে মাসে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি প্রাথমিকের মোট ৩২ হাজার চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদিও পরে তৎকালীন বিচারপতি সুব্রত তালুকদার ও বিচারপতি সুপ্রতীম ভট্টাচার্যের বেঞ্চ সেই নির্দেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করে। পাশাপাশি সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ মতো নতুন করে ইন্টারভিউ নেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর এই মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। দেশের শীর্ষ আদালত থেকে মামলা ফেরত আসে কলকাতা হাইকোর্টে। সেই মামলারই রায় ঘোষণা হল এদিন।

প্রাথমিকে ৩২ হাজার চাকরি বাতিলের মামলার শুনানিতে অনিয়মের দাবিকে কার্যত নস্যাৎ করেন রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত। ২০১৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়োগের পরীক্ষায় কোনও দুর্নীতি হয়নি বলে আদালতে দাবি করেছেন রাজ্যের এজি কিশোর দত্ত । ২০১৪ সালে শিক্ষক যোগ্যতা পরীক্ষা বা টেট উত্তীর্ণদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৬ সালে প্রাথমিক স্তরে ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি হয়। নিয়োগ দুর্নীতির মামলার রায় দিতে গিয়ে, প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি ২০২৩ সালের ১২ মে প্রাথমিকের ৩২ হাজার চাকরি বাতিল করে দেন। রাজ্য সরকার এই রায়কে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে চ্যালেঞ্জ করে। বিচারপতি সুব্রত তালুকদার ও বিচারপতি সুপ্রতীম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ চাকরি বাতিলের সিদ্ধান্তের উপর স্থগিতাদেশ দেয়। পরে মামলা আসে বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চে। কিন্তু গত ৭ এপ্রিল বিচারপতি সৌমেন সেন ব্যক্তিগত কারণে মামলাটি থেকে সরে দাঁড়ান । এরপর চলতি বছরের ২৮ এপ্রিম থেকে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হয়। ২ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে শুনানির পর এই মামলার রায় দিল ডিভিশন বেঞ্চ।

অভিজিতের রায়ের মূল কথাগুলি বুধবারের রায়ের কপিতে উল্লেখ করেছে ডিভিশন বেঞ্চ—

কোনও অ্যাপটিটিউড টেস্ট (দক্ষতা পরীক্ষা) নেওয়া হয়নি। ইন্টারভিউ যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের কোনও আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। কী ভাবে অ্যাপটিটিউড টেস্টে নম্বর দিতে হবে, তার কোনও নির্দেশিকাও ছিল না। অ্যাপটিটিউড টেস্টে দেওয়া নম্বর সম্পূর্ণ বেআইনি। আদালত-সহ সকলকে ধোঁকা দেওয়ার মিথ্যা প্রক্রিয়া। ইন্টারভিউয়ের মূল্যায়ন ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং অযৌক্তিক। এর নেপথ্যে বহিরাগত কারণ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সিবিআই ও ইডির তদন্তে। সংরক্ষিত শ্রেণির এমন অনেক প্রার্থী ছিলেন, যাঁরা সাধারণ শ্রেণির প্রার্থীদের তুলনায় বেশি নম্বর পেয়েছিলেন। কিন্তু তার পরেও তাঁদের সাধারণ তালিকায় জায়গা দেওয়া হয়নি। নিয়োগের জন্য বোর্ড কোনও সিলেকশন কমিটি গঠনই করেনি। বরং একটি বাইরের সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এবং তার সভাপতি-সহ আধিকারিকেরা একটি ক্লাব চালানোর মতো করে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা করেছিলেন। যাঁদের টাকা ছিল, তাঁদের কাছে শিক্ষকের চাকরি বিক্রি করা হয়েছে। রায়ের প্রতিলিপিতে আদালত জানিয়েছে, ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বাতিল এই মামলায় জড়িত, যাঁরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রাথমিক স্কুলে এত বছর ধরে পরিষেবা দিয়ে আসছেন। কোনও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ভাবে অপরাধ বা অন্যায়ের অভিযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগ, বোর্ড দুর্নীতি করেছে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের নিয়ম মেনে নিয়োগ করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে জ়িরো টলারেন্স নীতির অনুসরণ প্রয়োজন কি না, এই ধরনের নিয়োগে হস্তক্ষেপ করা অন্যায় কি না, তা আমাদের বিশেষ ভাবে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করেছে।

ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য আদালত সবসময় চায় সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা বজায় থাকুক। যদি কোনও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এমন ধরনের ব্যাপক অনিয়ম প্রমাণিত হয়, যাতে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আদালত পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারে। ব্যাপক অনিয়ম বলতে বোঝায়, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম বা জালিয়াতি হয়েছে। এমন অনিয়ম যেখানে অনেক প্রার্থী সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু আদালতের উপর এই দায়িত্ব আরোপ করা যায় না যে, তারা অতিরিক্ত অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিটি সম্ভাবনা, প্রতিটি বিকল্প ব্যাখ্যা, প্রত্যেক কল্পিত পরিস্থিতি এক এক করে খুঁজে বার করে সব ব্যাখ্যা বাতিল করবে। ২০১৪ সালের টেট উত্তীর্ণ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনও ইন্টারভিউ এবং অ্যাপটিটিউড টেস্ট নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এর আইনগত এবং তথ্যগত ব্যাখ্যা মামলাকারীরা স্পষ্ট করতে পারেননি। ন্যায়বিচারের সময় আদালতকে একটি সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। আদালত নিজের পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী, নতুন নতুন নীতি তৈরি করে নিয়োগপ্রক্রিয়া বদল করতে পারে না। সব নিয়োগ বাতিল করার জন্য আদালতের সামনে প্রমাণ-সহ একটি সুস্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। যেখানে বলা সম্ভব পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাপক, সর্বজনীন অনিয়ম হয়েছে। এই মামলার তথ্য থেকে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলা যাচ্ছে না।

কয়েক জন ব্যর্থ চাকরিপ্রার্থী নিজেদের অসন্তোষের কারণে এ ভাবে ৩২ হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার সুযোগ পেতে পারেন না। এই ভাবে চাকরি বাতিল করলে অনেক নির্দোষ, সৎ শিক্ষককে অকারণে অপমান, লজ্জা ও কলঙ্ক সহ্য করতে হবে। তা ছাড়া, তদন্ত এখনও চলছে। চাকরি বাতিল না-করার সেটাও অন্যতম কারণ। তদন্তে কোথাও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে, যাঁরা চাকরি পেয়েছেন তাঁরা ব্যক্তিগত ভাবে দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে, মোট ২৬৪ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। তাঁদের অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে উত্তীর্ণ করা হয়েছিল। তদন্তে এই ২৬৪ জনকে চিহ্নিতও করা হয়েছে। আরও ৯৬ জন প্রার্থী ন্যূনতম যোগ্যতার নম্বর পাননি, তবুও তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই কিছু প্রার্থীর সমস্যা রয়েছে বলেই, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘ভুয়ো’ বলা যায় না। ৩২ হাজার শিক্ষকের নিয়োগকে একযোগে বাতিল করার কোনও আইনি ভিত্তি নেই। নতুন পরীক্ষার নির্দেশ দিলে তার প্রভাব সব শিক্ষকের উপর সমান ভাবে পড়বে না। প্রায় ৯ বছর পরে পুনরায় পরীক্ষার নির্দেশ দিলে প্রকৃতপক্ষে অন্যায় ও অযৌক্তিক পরিস্থিতি তৈরি হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছিলেন ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা। ইতিমধ্যে তাঁরা ৯ বছর চাকরি করেছেন। নিয়োগের সময় যাঁর ১৮ বছর বয়স ছিল, এখন তিনি ২৭। যাঁর সে সময় ৪০ বছর বয়স ছিল, এখন তিনি ৪৯। হঠাৎ চাকরি কেড়ে নেওয়া হলে শিক্ষককে এবং তাঁর পরিবারকে ভোগান্তির শিকার হতে হবে। এ ভাবে চাকরি হারালে ওই শিক্ষকদের অস্তিত্বসঙ্কট দেখা দেবে। তাই চাকরি বাতিলের সিদ্ধান্তকে আমরা সমর্থন করছি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles