ইডেন টেস্ট শুরু হওয়ার আগে থেকেই পিচ নিয়ে প্রচুর জল্পনা হয়েছে। পিচ প্রস্তুতকারক সুজন মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি এমন উইকেট তৈরি করেছেন, যেখানে খেলা পাঁচ দিনই গড়াবে। কিন্তু ম্যাচের যা পরিস্থিতি, তাতে রবিবার তৃতীয় দিনেই শেষ হয়ে যেতে পারে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম টেস্ট। ইডেন গার্ডেন্সের ২২ গজে ব্যাটারদের ‘অসহায়তা’ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে পিচের মান নিয়ে। অনিল কুম্বলে, চেতেশ্বর পুজারাদের মতো বিশেষজ্ঞেরা বিরক্ত। ম্যাচের প্রথম দিনের খেলার পরই পিচের সমালোচনা করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং কোচ। সুজন দাবি করেছিলেন, স্পোর্টিং উইকেট তৈরি করেছেন। ব্যাটার-বোলার সকলেই কিছু না কিছু সাহায্য পাবেন। দর্শকেরা উপভোগ্য টেস্ট ক্রিকেট দেখতে পাবেন চার-পাঁচ দিন ধরে। তাঁর এই দাবি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে ২২ গজের চরিত্র। অসমান বাউন্স থাকা পিচকে বিপজ্জনক বললেন পুজারা। শনিবার চা বিরতির সময় পিচ নিয়ে আলোচনার সময় কিছুটা বিরক্ত মনে হল ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটারকে। তিনি বলেছেন, ‘‘এই পিচ ব্যাটারদের সাহায্য করছে না। আউটগুলো দেখলেই ব্যাটারদের অসহায়তা বোঝা যাবে। তাদের বিশেষ কিছু করার থাকছে না। বল কোন উচ্চতায় আসবে বোঝা যাচ্ছে না। কোনও বল লাফিয়ে উঠছে। আবার কোনওটা নেমে যাচ্ছে। পিচে বেশ কিছু ছোট ফাটল তৈরি হয়েছে। বল পড়ে প্রত্যাশার থেকে বেশি ঘুরছে।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘সবচেয়ে গুরুতর হল গুড লেংথ স্পটেও দু’রকম বাউন্স রয়েছে। ফলে বোলারদের বিশেষ কিছু চেষ্টা করতে হচ্ছে না। ব্যাট করার জন্য এই পিচকে খানিকটা বিপজ্জনকই বলব।’’ টেস্টের দ্বিতীয় দিনের চা বিরতির আগেই ২০ উইকেট পড়ে গিয়েছে। পিচ নিয়ে বিরক্তি রয়েছে দু’শিবিরেই। প্রথম দিন চা বিরতির পর থেকেই ধুলো উড়তে শুরু করেছিল ইডেনের পিচে। দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই ফাটল দেখা গিয়েছে। অসমান বাউন্সের সমস্যা তো রয়েছেই। পিচ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই। শুক্রবার সকালে জসপ্রীত বুমরাহের করা ১৪০ কিলোমিটার গতির বল ঋষভ পন্থের হাতে পৌঁছোয় তিন বার মাটি ছোঁয়ার পর! ঘরের মাঠে ভারতীয় দল কোনও সুবিধা পাচ্ছে না। স্বাভাবিক ভাবেই পিচের মান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে সিএবিকে। নিশ্চিত ভাবে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা (আইসিসি)। সিএবি-র সভাপতি হিসাবে দায় এড়াতে পারবেন না সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। ইডেন গার্ডেন্সের সম্মান বাঁচাতে পারবেন সৌরভেরা?

খুশি নন কুম্বলেও। শনিবার বুমরাহের হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা একটা বলে জোর বেঁচে যান দক্ষিণ আফ্রিকার ওপেনার রায়ান রিকেলটন। বড় আঘাত পেতে পারতেন তিনি। তা দেখে কুম্বলে বলেন, ‘‘পিচ কেমন আচরণ করবে বোঝাই যাচ্ছে না। এমন পিচ প্রত্যাশিত নয়। ভারতকে এখানে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে হবে। আমার তো মনে হচ্ছে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করাই কঠিন হবে বেশ। জয়ের লক্ষ্য ১৪০-১৫০ রানের বেশি হলে ভারতীয় দলকেও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।’’ ইডেনের পিচ নিয়ে প্রথম দিনই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্স। তিনি বলেছিলেন, “প্রথম ওভারে চার-পাঁচটা বলের বল দেখলাম একটা বল গড়িয়ে গিয়েছে। একটা বল থেকে চারটে বাই রান হয়েছে। দু’-তিনটে বল আচমকা লাফিয়ে উঠেছে। বোঝাই গিয়েছে পিচের বাউন্স সমান নয়। ২০, ৩০ রান করার পর ব্যাটারেরা আত্মবিশ্বাস পেয়ে যায়। তার পর এই রকম বাউন্স এলে সমস্যায় পড়বেই। এক ঘণ্টা কাটিয়ে ফেলার পরেও ব্যাটার পিচ বুঝতে পারছে না। এটা কোনও ভাবেই কাম্য নয়।” খেলেছেন মাত্র ২৪ বল, রান ২৭, তাতেই নজির পন্থের! ইডেনে ভেঙে দিলেন সহবাগের ভারতীয় রেকর্ড।

টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ইডেনে কি হারের গন্ধ পাচ্ছেন? পাঁচ দিনের পরিবর্তে কলকাতা টেস্ট হয়তো তিন দিনেই শেষ হতে চলেছে। ইডেন টেস্ট যে ভারত জিততে চলেছে, সেই গন্ধ ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়েছে ভারতের সাজঘরে। তৃতীয় দিনেই হয়তো প্রোটিয়া-নিকেশ শেষ হয়ে যাবে ভারতের। ভারতে এসে চিরকালই দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যর্থ হয়েছে। এবারও যে সেটাই হতে চলেছে তা পরিষ্কার। যতই প্রোটিয়া ব্রিগেড টেস্ট ফরম্যাটে বিশ্বশাসন করুক, যতই তারা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ী হোক, ভারত ভূমিতে কিছু করা খুবই কঠিন তাদের পক্ষে। ইডেনে সেটাই দেখা গেল। প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা করে ১৫৯ রান। ভারতের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ১৮৯ রানে। ভারত তিরিশ রানে এগিয়ে থাকে প্রথম ইনিংসে। প্রোটিয়াদের দ্বিতীয় ইনিংসে ভাঙন ধরান রবীন্দ্র জাদেজা। তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটারদের সামনে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে হাজির হন। প্রোটিয়াদের ইয়ানসেনের পেস ও হারমারের স্পিনে ভারত কুপোকাৎ হয়। ভারতীয় ইনিংসে লোকেশ রাহুল (৩৯) সর্বোচ্চ রান করেন। পেস ও স্পিনের সঙ্গে সন্ধি করতে না পেরে ভারতের প্রথম ইনিংস দ্রুত শেষ হয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংসের গোড়া থেকেই উইকেট পড়তে থাকে। দ্বিতীয় দিনের শেষে প্রোটিয়াদের রান ৭ উইকেটে ৯৩। দক্ষিণ আফ্রিকা ৬৩ রানে এগিয়ে। অক্ষর প্যাটেল বলে গেলেন, এই উইকেটে রক্ষণাত্মক নীতি চলবে না। মানসিক দিক থেকে আক্রমণাত্মক হতে হবে। আক্রমণই সেরা নীতি হওয়া উচিত। প্রোটিয়াদের ১২৫ রানের মধ্যে থামিয়ে ভারত প্রথম টেস্ট জিতে নিতে চাইবে। রবীন্দ্র জাদেজা দ্বিতীয় ইনিংসে দারুণ সফল। প্রোটিয়াদের ইনিংসে দস নামানোর তিনিই নায়ক। কুলদীপ যাদবও তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করেন। পাঁচ ওভার হাত ঘুরিয়ে কুলদীপ নেন ২টি উইকেট। অক্ষর প্যাটেল নেন একটি উইকেট। অধিনায়ক বাভুমা (২৯) এখনও ক্রিজে দাঁত কামড়ে পড়ে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন করবিন বশ। তৃতীয় দিনের সকালে প্রোটিয়া ব্যাটাররা কতক্ষণ ভারতীয় বোলারদের গোলাগুলি সামলাতে পারেন সেটাই দেখার।

ঘাড় এবং মেরুদণ্ডের সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি করানো হল ভারতের অধিনায়ক শুভমন গিলকে। শনিবার দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে অ্যাম্বুল্যান্সে করে মাঠ থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার উডল্যান্ডস হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। অবস্থা যা তাতে প্রথম টেস্টে শুভমনের আর খেলার সম্ভাবনা কার্যত নেই। বোর্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার ঘুম থেকে ওঠার পরেই শুভমন ঘাড়ে ব্যথা অনুভব করেন। তার জন্য তিনি ব্যথা কমানোর ওষুধ খান। তাতেও লাভ হয়নি। ব্যাট করতে নামার আগেও তিনি ব্যথা কমানোর ওষুধ খেয়েছিলেন। নিজের তৃতীয় বলে সাইমন হারমারকে স্লগ সুইপ মারতে গিয়ে ঘাড়ে আবার ব্যথা শুরু হয় শুভমনের। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে চলে আসেন ফিজিয়ো। পরীক্ষা করার পর শুভমনকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। মাত্র তিন বল ক্রিজ়ে ছিলেন শুভমন। সমস্যা এতটাই যে ঘাড় ঘোরাতেই পারছেন না শুভমন। মেরুদণ্ডেও সমস্যা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর এমআরআই হয় শুভমনের। সেখানেও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এক বছর আগে এমনই একটি চোট পেয়েছিলেন শুভমন। তখনও এমআরআই করানো হয়েছিল। তখনকার এবং এখনকার এমআরআই-এর ফলাফলের মধ্যে মিল রয়েছে। চিকিৎসকদের দাবি, শুভমনের বয়স যেহেতু ২৬ বছর, তাই সহ্যশক্তি বেশি। চিকিৎসার পরিভাষায় একে ‘পেন থ্রেসহোল্ড’ বলে। কিন্তু এ বারের ব্যথা এতটাই যে শুভমন তা সহ্য করতে পারছেন না। ফলে চিকিৎসকেরা তাঁকে হোটেলে দলের সঙ্গে রাখতে চাননি। শনিবার রাতটা হাসপাতালেই থাকতে হবে শুভমনকে। ভারতীয় দল পরিচালন সমিতি তা মেনে নিয়েছে। এর পর তাঁর কী চিকিৎসা হবে সেটা পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ রকম গুজব রটেছে যে, সিএবি-তে শুরুতে চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। এমনকি বোর্ডের চিকিৎসক চার্লস মিনজ় বিষয়টি হালকা ভাবে নিয়েছিলেন। পরে দেখা যায় বিষয়টি গুরুতর। যা অবস্থা, তাতে ইডেন টেস্টে শুভমনের খেলার সম্ভাবনা কার্যত নেই। বোর্ড সূত্রে খবর, তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হলে গুয়াহাটি টেস্টেও হয়তো খেলতে পারবেন না। শুভমন মাঠ ছাড়ার পর দুপুর ১২.৪১ মিনিটে বিসিসিআই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, ‘‘শুভমন গিলের ঘাড় শক্ত হয়ে গিয়েছে। দলের মেডিক্যাল টিম ওর পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। আবার মাঠে নামতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে ওর পরিস্থিতির উন্নতির উপর।’’ ভারতের ইনিংসের ৩৫তম ওভারে ওয়াশিংটন সুন্দর আউট হওয়ার পর চার নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন শুভমন। সেই ওভারেই ঘাড়ে টান লাগায় মাঠ ছাড়েন তিনি। দলের সব উইকেট পড়ার পরও ব্যাট করতে নামতে পারেননি। সাজঘরে ফেরার পর ‘নেক কলার’ পরানো হয়েছিল শুভমনকে। ‘আইস প্যাক’ও দেওয়া হচ্ছিল। ম্যাচের পর বোলিং কোচ মর্নি মর্কেল জানিয়েছিলেন, শোয়ার দোষের কারণে ঘাড় শক্ত হয়ে গিয়ে থাকতে পারে শুভমনের। মর্কেলের কথায়, “কী করে ওর ঘাড় শক্ত হয়ে গেল সেটা আগে আমাদের বুঝতে হবে। হয়তো শোয়ার দোষে হয়েছে। শারীরিক ধকলের মতো ব্যাপার নেই। শুভমন ফিট। নিজের খেয়াল ভালই রাখে। আজ সকালে দুর্ভাগ্যবশত ঘাড় শক্ত অবস্থাতেই ঘুম থেকে উঠেছে। সারা দিন ধরেই সেটা ছিল।”



