প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে। অথচ খাতায়কলমে ঋতু বসন্ত। আবহাওয়াবিদদের মতে, গত বছরের মতো এ বারও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হঠাৎ শীত বিদায় নিয়ে এসে গিয়েছে গ্রীষ্ম। দেশের অধিকাংশ স্থানেই। নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগছে। ফুটছে শিমুল, পলাশ। যে ফাগুন হাওয়ার প্রেমে বসন্তকে নিয়ে প্রায় শ’খানেক গান লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই মধুর বসন্ত আর নেই। এই ঋতু উবে যাচ্ছে প্রায় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকেই। আবহাওয়াবিদদের মতে, গত বছরের মতো এ বারও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হঠাৎ শীত বিদায় নিয়ে এসে গিয়েছে গ্রীষ্ম। দেশের অধিকাংশ স্থানেই। তবে বিশেষত পশ্চিম ও উত্তর ভারতে। কোথাও কোথাও প্রায় কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই হানা দিয়েছে তাপপ্রবাহ। মার্চের ১০ তারিখ মুম্বইয়ে তাপমাত্রা উঠে গিয়েছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭.৬ ডিগ্রি বেশি। বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’। মার্চের প্রথম দু’সপ্তাহে হিমাচল প্রদেশেরও কিছু এলাকায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি। দিল্লিও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে। স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি বেশি। এমনকি, রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি থাকছে। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভও পড়েছে তাপপ্রবাহের কবলে। শীত মিটতে না মিটতেই তাপপ্রবাহের এই ঘটনা আগামী কয়েক মাসের জন্য তো বটেই, আসলে দীর্ঘমেয়াদী অশনি সঙ্কেতও দিচ্ছে, বলছেন আবহাওয়াবিদেরা। একে তো শীত ছোট হচ্ছে। উপরন্তু বসন্ত উবে যাওয়ার অর্থ সুদীর্ঘ, তীব্র দাবদাহের কাল। জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জলসম্পদ এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা সব কিছুর ওপরই বিরূপ প্রভাব ফেলবে এই পরিস্থিতি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দিন তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি থাকবে। এই প্রবণতা অবশ্য সর্বত্র সমান নয়। দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে বসন্ত একেবারে উধাও হয়ে গেলেও পুর্বাঞ্চলে এ বছর বসন্তের হালকা প্রভাব ছিল। আবহাওয়া দফতরের প্রধানের কথায়, “গত বছর পশ্চিমবাংলায় বসন্ত আসেনি। শীত থেকে সরাসরি গ্রীষ্ম। এ বার বসন্তের খানিকটা প্রভাব ছিল। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা ও চরম ভাব, দুই’ই যে ভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী বছরেও বসন্ত বাতাসের ছোঁয়া পাওয়া যাবে, এমনটা নিশ্চিত বলা যায় না।
বসন্ত একেবারেই ছোট হয়ে যাওয়ায় সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মার্চ-এপ্রিল মাসেই তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। এ বছর যে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহেও রাজ্যে অধিকাংশ এলাকায় আবহাওয়া খানিকটা মনোরম, তার মূল কারণ বঙ্গোপসাগরের ওপর একটি নিম্নচাপ বলয়ের উপস্থিতি। জলবায়ুর উষ্ণায়ন ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি। একদিকে শহরাঞ্চলে তাপজনিত মানসিক ও শারীরিক চাপ ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষত কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে। এর সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা মিলে তাপজনিত অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। এ ছাড়া, রাতের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দিনের বেলার তীব্র তাপ থেকে স্বস্তি বা শক্তি পুনরুদ্ধারের যে সুযোগ শরীর পেত, সেই সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হচ্ছে কৃষি ও বাস্তুতন্ত্র। বসন্ত তো দেশ জুড়ে উৎসবের মাস। অনেক উৎসবই ফসল তোলার সঙ্গে যুক্ত। তা ছাড়া, রঙে রঙে ভরে ওঠে অরণ্য। ডালে ডালে নতুন পাতা, তাতে কত বাহারি রং। ফসল উৎপাদন বা ফুলের প্রস্ফূটন, সব চক্রই ব্যাহত হবে ফাল্গুনের দাবদাহে।





