Thursday, March 19, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

রাজনীতিতেও ‘‌বোল্ড’‌ মনোজ তিওয়ারী!‌ তৃণমূলের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে মন্ত্রী আউট

দেশের হয়ে শতরান করেও কেন মনোজ তিওয়ারীকে আর সুযোগ দেওয়া হয়নি?‌ এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। তবে, কিছুটা আভাস বা সদুত্তর মিলেছে রাজনীতিতে আসার পর। প্রবাদ আছে অতি দর্পে হত লঙ্কা। রাজনীতির বিদগ্ধজনেদের ভাষায় এমনটাই আঙুল উঠেছে ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হওয়া মনোজের দিকে। বড় ব্যবধানে বিজয়ী বিধায়ক হওয়ার সত্ত্বেও বিদায় ছিল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। অনেকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অপমানের দহন জ্বালায় দগ্ধ। শিবপুরের বিধায়ক মনোজ তিওয়ারিও টিকিট পেলেন না। অবসৃত ব্যাটার?‌ না!‌ চোট আঘাতের সমস্যা?‌ না!‌ তাহলে কেন?‌ পরিবর্তে প্রার্থী ডাক্তারবাবু রানা চট্টোপাধ্যায়। চমক ছিল শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারির মতো মন্ত্রী নেতাকে সরিয়ে টিকিট রানা চট্টোপাধ্যায়কে। রাজনৈতিক মহলে বেশ চর্চার বিষয়। শিবপুরে রানার প্রতিপক্ষ বিজেপির তারকা প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ। মন্ত্রীকে শিবপুর এলাকার বাসিন্দারা অনেকেই কখনও ‘‌দাম্ভিক’ আবার কখনও বা ‌‘‌হামবড়া’ বলে অভিহিত করে থাকতেন। প্রত্যাশিতভাবেই একাধিক অভিযোগের তীরে বিদ্ধ মনোজ তিওয়ারীকে ছেঁটে ফেলল তৃণমূল! ঘাসফুলের প্রাক্তন হলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার। হাওড়ার শিবপুরের মনোজ তিওয়ারীকে নিয়ে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি থেকে বিভিন্ন তোলাবাজির অভিযোগও রয়েছে মনোজের বিরুদ্ধে। গত নির্বাচনে বিজেপির রথীন চক্রবর্তীকে হারালেও প্রশ্ন উঠছে, রুদ্রনীলকে ‘সেফ জোনে’ খেলতে নামিয়ে গেরুয়া শিবিরের মুখে হাসি ফোটাতে সচেষ্ট? এবার ‘ঘোষবাবু’র প্রতিপক্ষ আপাতত ‘‌ডাক্তাববাবু’‌।

কেন বাদ?‌ বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে বিধায়কদের একাংশ দলীয় ‘হুইপ’ অমান্য করায় কড়া পদক্ষেপ করে তৃণমূল পরিষদীয় দল। হুইপ অমান্যকারী বিধায়কদের তালিকা তৈরি করতে গিয়ে রাজ্যের এই মন্ত্রীর অনুপস্থিতির বহর দেখে কার্যত স্তম্ভিত তৃণমূল পরিষদীয় দল। সদ্যসমাপ্ত বাজেট অধিবেশনের জোড়া পর্ব তো বটেই, শীতকালীন অধিবেশনেও যোগ দেননি শিবপুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। বস্তুত, শেষ কবে এই প্রাক্তন ক্রিকেটারকে বিধানসভায় দেখা গিয়েছিল, তা মনেও করতে পারছেন না সতীর্থ বিধায়কেরা। মনোজের এ-হেন আচরণে ‘ক্ষুব্ধ’ ছিলেন তৃণমূল পরিষদীয় দলের একাংশ। সাধারণত শাসক বা বিরোধীদলের কোনও বিধায়ক বিধানসভার অধিবেশন বা কোনও কমিটির বৈঠকে হাজির হতে না-পারলে স্পিকারকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেন। কিন্তু বিধানসভার সচিবালয় সূত্রে খবর, মনোজের তরফে তেমন কিছু করা হয়নি!‌ প্রশ্ন উঠেছিল, মনোজ কি আর মন্ত্রী থাকতে চান না? অনেকে এমন প্রশ্নও তুলছেন যে, মনোজ কি আদৌ রাজনীতিতে থাকতে চান? মন্ত্রিত্ব, রাজনীতি। মাসের পর মাস বিধানসভার অধিবেশনে অনুপস্থিত। সরকারের কাছে ‘বার্তা’ পাঠাতে চাইছেন? অনুপস্থিতির কারণ জানতে মনোজকে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর-সহ ফেসটাইম এবং হোয়াট্‌সঅ্যাপে একাধিক বার ফোন করা হলেও জবাব মেলেনি। মোবাইলে পাঠানো হোয়াট্‌সঅ্যাপ এবং টেক্সট মেসেজেরও।

হাওড়ার রাজনীতিতে মনোজ কয়েক বার বিতর্কে জড়ান। বিবাদ বেধেছিল হাওড়া পুরসভার প্রশাসক ডাক্তাববাবু সুজয় চক্রবর্তী এবং বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা তথা মন্ত্রী অরূপ রায়ের। শিবপুরে একটি মেলায় পার্কিং নিয়ে মনোজ-সুজয়ের মধ‍্যে গোলমাল হয়েছিল। দু’পক্ষ ধস্তাধস্তিতেও জড়িয়ে পড়েছিল। বিবাদ মেটাতে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে যেতে হয়েছিল শিবপুরে। ঘটনার উৎস মনোজ-অরূপ রায়ের দীর্ঘ দিনের ‘দ্বন্দ্ব’ বলেই মনে করেন তৃণমূলের অনেকে। শিবপুর বিধানসভা এলাকায় অরূপ-মনোজ বিবাদ সর্বজনবিদিত। ২০২১ সালে মনোজ বিধায়ক হওয়ার পর থেকে বিবাদের সূত্রপাত। হাওড়া জেলার রাজনীতিতে তৃণমূলের ‘প্রবীণ মুখ’ অরূপ। তাঁর হাত ধরেই তৃণমূলের হাওড়ায় প্রবেশ। তাই অরূপের বিচরণ হাওড়া সদর জেলার সর্বত্র। মনোজ আবার নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে কারও ‘হস্তক্ষেপ’ বরদাস্ত করেন না। রাজনৈতিক এলাকা ‘দখল’ নিয়েই অরূপ-মনোজ বিবাদ শুরু হয়েছিল। যদিও প্রকাশ্যে দু’পক্ষের কেউই অপর পক্ষকে নিয়ে কটু মন্তব্য করতেন না। পরবর্তীতে হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও একই আচরণ ছিল মনোজের।

মনোজের সঙ্গে গোলমাল হয়েছে হাওড়া পুরসভার প্রশাসক সুজয়েরও। শিবপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সংস্কার শুরুর পর এলাকার বিধায়ক মনোজের অনুগামীরা একটি ফ্লেক্স লাগিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, মনোজের উদ্যোগে এবং হাওড়া পুরসভার সহযোগিতায় রাস্তাটি নির্মিত হচ্ছে। কাজ শেষের পর আবার সুজয়ের পক্ষ থেকে আর একটি ফ্লেক্সে উল্লেখ করা হয়, মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় এবং সুজয়ের আন্তরিক উদ্যোগে রাস্তা নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ওই ফ্লেক্স লাগানো নিয়ে দু’জনের বিরোধ আরও বাড়ে। ২০২৪ সালের জুন মাসে মনোজ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, তাঁর বিধানসভা এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের গতি ‘ধীর’। সুজয় তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেন না। সুজয় সেই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, শিবপুরে যথেষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। বিধানসভায় এই ‘অনুপস্থিতি’ এবং দফতরে ‘অনিয়মিত উপস্থিতি’ নিয়ে অবশ্য অন্য কেউ কোনও ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। কারণ, মনোজ মন্ত্রী। তাই তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। ফলে তৃণমূল পরিষদীয় দল বা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির পক্ষে কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব ছিল না। ১৯-২০ মার্চ দলের দেওয়া হুইপ অমান্য করে কেন মনোজ অধিবেশনে গরহাজির কারণ জানতে চাওয়া হয় বলে জানিয়েছিলেন, তৃণমূল পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ। পরিষদীয় দলের একটি সূত্র জানাচ্ছে, যোগাযোগের জন্য মুখ্য সচেতকের দফতরে মনোজের একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকলেও সেই নম্বরটি ক্রমাগত বেজে যায়। সেটি কেউ ধরেন না।

রাজনীতিতে মনোজের আগমন খুব বেশি দিন আগে নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বর্ষীয়ান বিধায়ক জটু লাহিড়ীকে সরিয়ে ক্রিকেটার মনোজকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। টিকিট না পেয়ে বিজেপিতে চলে যান জটু। তাতে মনোজের জয় আটকায়নি। বিজেপির প্রার্থী রথীন চক্রবর্তীকে ৩২,৬০৩ ভোটে হারিয়ে জিতেছিলেন মনোজ। তিনি প্রথম বার জেতার পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোজকে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। এর আগে ২০১৬ সালে উত্তর হাওড়া কেন্দ্র থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লা তৃণমূলের টিকিটে জেতার পরে তাঁকেও ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন মমতা। কিন্তু ২০২১ সালে লক্ষ্মীরতন ভোটে দাঁড়াতে চাননি। তাই ভোটের পরে মমতা সেই দফতরের দায়িত্ব দেন মনোজকেই। নব মহাকরণে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল একটি ঝাঁ-চকচকে দফতরও। সেখানেও মনোজ অনিয়মিত বলেই শোনা যায়। প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মী মন্ত্রী এবং বিধায়ক হিসাবে তুলনায় ‘সপ্রতিভ’ ছিলেন বলেই মনে করে তৃণমূল পরিষদীয় দল। পরিষদীয় দলের নির্দেশ মতো বিধানসভার অধিবেশনে নিয়মিত যোগদান করতেন লক্ষ্মীরতন। দলের শীর্ষনেতাদের পরামর্শও নিয়মিত নিতেন।

তৃণমূলের সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ভোটের আগে মনোজের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভোটে লড়ার জন্য রাজি করিয়েছিল প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আইপ্যাক। তখন মনোজ বাংলার হয়ে ক্রিকেট খেলছেন। রাজনীতিতে যোগদানের শর্ত ছিল, ভোটে জিতলেও তাঁকে যেন ক্রিকেট খেলতে দেওয়া হয়। সেই শর্তেই শিবপুরে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। ২০২৩ সালের আগস্টে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর। যদিও ক্রিকেট মাঠে সক্রিয় থাকার সময়েও মনোজ বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অবসর নেওয়ার পরে অধিবেশনে অংশগ্রহণ প্রায় বন্ধই করে দেন। ঘটনাচক্রে, মনোজের মতোই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন বাংলা দলে তাঁর সতীর্থ অশোক দিন্দা। বিজেপির হয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতেছিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক। বিধানসভার অধিবেশনে ‘বন্ধু’ মনোজের চেয়ে প্রাক্তন মিডিয়াম পেসার দিন্দার উপস্থিতি কিন্তু চোখে পড়ার মতো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles