কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযথা আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। তাঁরা দেশের ক্ষতি করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে কালোবাজারিদেরও পৃথক বার্তা দিয়েছেন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সঙ্কটের মোকাবিলা করার কথা বলেছেন মোদী। কালোবাজারি রুখতে রাজ্য সরকারগুলিকে সক্রিয় হতে বলেছেন তিনি। রাতে তিনি পশ্চিম এশিয়ার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথাও বলেন। রান্নার গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে দেশব্যাপী উদ্বেগের মাঝে এ বার মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দিল্লির একটি সম্মেলন থেকে প্রধানমন্ত্রী এলপিজি উদ্বেগের প্রসঙ্গ তোলেন। জানান, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব সমস্ত দেশের উপরেই পড়েছে। তার মোকাবিলায় সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে। দিল্লিতে একটি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই এলপিজি উদ্বেগের প্রসঙ্গ তোলেন। জানান, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে সমস্ত দেশের উপরেই। তার মোকাবিলা করতে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে। মোদী বলেন, ‘‘কিছু মানুষ এলপিজি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। আমি কোনও রাজনৈতিক মন্তব্য করতে চাই না। শুধু বলব, তাঁরা জনগণের সামনে নিজেদের রূপ প্রকাশ করে ফেলছেন এবং সার্বিক ভাবে দেশের ক্ষতি করছেন।’’ এর পরেই কালোবাজারিদের এক হাত নেন প্রধানমন্ত্রী। জানান, কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কালোবাজারে বিক্রি করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। কেউ রেহাই পাবেন না। এর পরেই তিনি বলেন, ‘‘কালোবাজারি এবং মজুতদারদের নিয়ন্ত্রণ করতে রাজ্যগুলিকে পদক্ষেপ করতে হবে। আমি অনুরোধ করছি, আপনারা নজরদারি বৃদ্ধি করুন।’’ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে এক কঠিন সঙ্কটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মিলেমিশে তার মোকাবিলা করতে হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, দেশের যুবসমাজ, শহর ও গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ— এ ক্ষেত্রে সকলের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, ‘‘বিশ্ব এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। তবে ভারত তার নিজের ছন্দ ধরে রেখেছে। গোটা বিশ্ব জানে, আগামীর দিকে তাকাতে হলে ভারতের দিকে তাকাতে হবে। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। আমাদের একটাই লক্ষ্য, একটাই উদ্দেশ্য— উন্নত ভারতবর্ষ। দেশ শুধু এগোচ্ছে না, দেশ পরবর্তী ধাপে পা রাখতে চলেছে। অনেক রাষ্ট্রনেতাই ভারতের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, বিশ্বের অন্য প্রান্তে যুদ্ধের কারণে দেশের মানুষ যেন সমস্যায় না পড়েন। ১৪০ কোটি ভারতবাসীর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। কোভিডকালের মতো এই সঙ্কটও আমরা সফল ভাবে অতিক্রম করে যাব।’’ আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত হানতে পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। কিছু কিছু জাহাজে ছাড় দিলেও অধিকাংশ পণ্যবাহী জাহাজ ওই এলাকায় আটকে রয়েছে। ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে জ্বালানির জোগান থমকে গিয়েছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, দেশে খনিজ তেলের কোনও সঙ্কট নেই। এলপিজি-র জোগান যতটা বাইরে থেকে আমদানি করা হয়, তা ব্যাহত হয়েছে হরমুজ়ে সমস্যার কারণে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে জোর দিয়েছে কেন্দ্র। গত কয়েক দিনে দেশে এলপিজি উৎপান ২৮ শতাংশ বৃদ্ধিও পেয়েছে। তবে অনেক জায়গাতেই গ্যাস মিলছে না। অভিযোগ, কোথাও কোথাও বুক করার পরেও গ্যাস আসছে না। কোথাও আবার বুকিং করাই যাচ্ছে না। অনেক হোটেল, রেস্তরাঁ বন্ধের পথে। এ নিয়ে অযথা আতঙ্ক ছড়াতে নিষেধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী সংসদে জানিয়েছেন, শহরাঞ্চলে দু’টি গ্যাস বুকিংয়ের মধ্যে ব্যবধান ২৫ দিন এবং গ্রামাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় ওই ব্যবধান বাড়িয়ে ৪৫ দিন করা হয়েছে। এতে চিন্তায় সাধারণ মানুষ। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর সে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এটাই মোদীর প্রথম ফোনালাপ। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং অসামরিক পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে সে দেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি পণ্য ও জ্বালানি পরিবহণের পথ নিরবচ্ছিন্ন রাখাকেই নয়াদিল্লি বর্তমানে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারত ফের স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। এই সঙ্কট কাটাতে যুদ্ধ নয়, আলাপ-আলোচনা এবং কূটনীতির পথেই সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন মোদী।
প্রথমে বলা হয়েছিল, একটি সিলিন্ডার বুক করার ২১ দিন পর দ্বিতীয় সিলিন্ডার বুক করা যাবে। তার কিছু দিনের মধ্যেই ব্যবধান বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়। তবে তা কেবল শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে দেশের গ্রামাঞ্চল এবং দুর্গম এলাকায় দু’টি এলপিজি সিলিন্ডার বুকিংয়ের ব্যবধান বাড়িয়ে ৪৫ দিন করা হয়েছে। সংসদে এমনটাই জানালেন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী। শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে অবশ্য এই ব্যবধান এখনও ২৫ দিন। রান্নার গ্যাসের কালোবাজারি রুখতেই বুকিংয়ে রাশ টেনেছে কেন্দ্র। প্রথমে বলা হয়েছিল, একটি সিলিন্ডার বুক করার ২১ দিন পর দ্বিতীয় সিলিন্ডার বুক করা যাবে। তার কিছু দিনের মধ্যেই ব্যবধান বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়। বৃহস্পতিবার সংসদে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী এই সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, ২৫ দিনের ব্যবধান কেবল শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। গ্রামে একটি গ্যাস সিলিন্ডার বুক করার অন্তত ৪৫ দিন পর দ্বিতীয় সিলিন্ডারটি বুক করা যাবে। লোকসভায় মন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে পেট্রল, ডিজ়েল, কেরোসিনের অভাব নেই। পর্যাপ্ত গ্যাসও মজুত রয়েছে। জ্বালানি নিয়ে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। ভারত মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে। তার অধিকাংশই আসে ইরান সংলগ্ন হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। ওই রুটে পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় এলপিজি-র জোগান কমেছে। তবে তাতে চিন্তার কোনও কারণ নেই বলে দাবি করেছেন পুরী। তিনি জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে এলপিজি উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছে। গত ৮ মার্চ কেন্দ্রের নির্দেশিকার পর ২৮ শতাংশ উৎপাদনও বেড়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম চলতি মাস থেকেই বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কলকাতায় ৬০ টাকা বেড়ে এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে ৯৩৯ টাকায়। দেশের নানা প্রান্তেই এলপিজি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, সিলিন্ডার বুক করাই যাচ্ছে না। অনেকে আবার বুক করতে পারলেও সিলিন্ডার হাতে পাননি। দিকে দিকে গ্যাসের অভাবে হোটেল, রেস্তরাঁর ভাঁড়ারে টান পড়েছে। তবে কেন্দ্রের দাবি, গ্যাস বুক করার আড়াই দিনের মাথায় সিলিন্ডার মিলছে। সেই সময়ে কোনও পরিবর্তন হয়নি। সংসদে বৃহস্পতিবারও মন্ত্রী সে কথা জানিয়েছেন। তবে কালোবাজারি রুখতে বাণিজ্যিক গ্যাসের জোগানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে বলে দাবি করেন। পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সংঘাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পুরী জানিয়েছেন, বিশ্ব এমন জ্বালানি সঙ্কটের মুখে আগে কখনও পড়েনি। তবে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হওয়ায় ভারতে তাঁর আঁচ বিশেষ একটা পড়েনি বলে দাবি করেছেন তিনি। হরমুজ় ছাড়াও অন্য পথে জ্বালানি আনা হচ্ছে। ৪০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনেছে ভারত। পুরীর কথায়, ‘‘সিএনজি ১০০ শতাংশ সরবরাহ হচ্ছে। এলএনজি-রও কোনও ঘাটতি নেই।’’ তিনি জানান, প্রতি দিন বিভিন্ন বিকল্প রাস্তা হয়ে এলএনজির কার্গো ঢুকছে দেশে।





