আজ বিশ্ব ক্রিকেট দেখছে ভারতের দাপট। মাঠে আর মাঠের বাইরে। ভারত আজ পরপর দুবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়েছে। আমরা যখন ক্রিকেটারদের জয়োল্লাসে মত্ত, তখন আমাদের সেই মানুষটিকেও স্মরণ করা উচিত, যিনি এই সাফল্যের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নাম এন.কে.পি. সালভে। ঘটনাটি ১৯৮৩ সালের জুন মাসের। লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ভারত তখন বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেছে। ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিসিসিআই সভাপতি সালভে সাহেব একটি খুব সাধারণ অনুরোধ করেছিলেন, ভারতীয় হাই কমিশনার এবং তাঁর স্ত্রীর জন্য বক্স সিটের মাত্র দুটি টিকিট। লর্ডসের কর্মকর্তারা সরাসরি ‘না’ বলে দিলেন। সেদিন বক্সের অর্ধেক আসন খালি ছিল, এমনকি স্বাগতিক ইংল্যান্ড ফাইনালেও ওঠেনি। তবুও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড সভাপতিকে দুটি টিকিট দেওয়ার সৌজন্যটুকু তারা দেখায়নি। সালভে এই অপমান ভোলেননি। তাঁর ভাষায়।”আমার নিজের দেশ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছে, অথচ অর্ধেক খালি বক্সে তারা আমাকে দুটো টিকিট দিতে অস্বীকার করল। সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম ভারত ক্রিকেটে শীর্ষে পৌঁছালেও, খেলার রাজনীতিতে আমাদের মর্যাদা দ্বিতীয় সারির। এটা বদলাতেই হবে।” সেদিন বিকেলে ভারত বিশ্বকাপ জিতল। গোটা ভারত যখন উৎসবে ভাসছে, সালভে তখন মনে মনে ছক কষছেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে এই অপমানের কথা জানালেন এবং তাঁর পূর্ণ সমর্থন পেলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই, বিশ্বকাপকে ইংল্যান্ডের মাটি থেকে বের করে আনা। সবাই বলেছিল এটা অসম্ভব। কারণ তখন ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার হাতে ছিল ‘ভেটো’ ক্ষমতা। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই তারা এককভাবে এটি আয়োজন করে আসছিল। সালভে দুর্গের দেওয়ালে ধাক্কা না দিয়ে তার ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে বসলেন। তিনি যা করলেন তা ক্রিকেটের ইতিহাস বদলে দিল। তিনি ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে একটি এশীয় ব্লক তৈরি করলেন। ইংল্যান্ড যে ২১টি সহযোগী দেশগুলোকে অবজ্ঞা করত, সালভে তাদের পাঁচ গুণ বেশি অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের পাশে টানলেন। পরবর্তী আয়োজনের টোপ দিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে ইংল্যান্ডের পাশ থেকে সরিয়ে নিলেন। ইংল্যান্ড যুক্তি দিয়েছিল যে এশিয়ায় দিনের আলো কম হওয়ায় ৬০ ওভারের ম্যাচ সম্ভব নয়। সালভে পাল্টা চালে ক্রিকেটের ফরম্যাটটাই বদলে ৫০ ওভারের করে দিলেন, যা আজ আধুনিক ওডিআই স্ট্যান্ডার্ড। আইসিসি-র ভোটে ১৬-১২ ব্যবধানে ভারত জয়ী হলো। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের বাইরে বের হয়ে এলো।
এরপরের ইতিহাস সবার জানা। এক দশকের মধ্যে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া তাদের ভেটো ক্ষমতা হারায়। ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কেন্দ্র লর্ডস থেকে সরে এসে মুম্বাইয়ে থিতু হয়। বিসিসিআই আজ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বোর্ড। আইপিএল-এর জন্ম, কোটি কোটি ডলারের টিভি স্বত্ব। এই সবকিছুর শুরু হয়েছিল লর্ডসের সেই অর্ধেক খালি বক্সে দুটি টিকিট না পাওয়ার জেদ থেকে। লর্ডসের কর্মকর্তারা সেই টিকিট দুটি দিতে অস্বীকার করতে মাত্র এক মিনিট সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু সালভে সেই অপমানের জবাব দিতে চার বছর সময় ব্যয় করেছিলেন। সম্মান বিনামূল্যে পাওয়া যায়, কিন্তু অসম্মানের মূল্য অনেক সময় একটি আস্ত খেলার মালিকানা দিয়ে মেটাতে হয়। এন.কে.পি. সালভের এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে তিনি একা ছিলেন না। এটি ছিল একটি যৌথ প্রচেষ্টা, যেখানে ভারত এবং পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড প্রথমবারের মতো একজোট হয়ে কাজ করেছিল। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপকে যা রিলায়েন্স নামে পরিচিত ছিল। ইংল্যান্ডের বাইরে আনার জন্য যারা প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁরা হলেন —
১. আই.এস. বিন্দ্রা : সালভে সাহেবের ডান হাত হিসেবে কাজ করেছিলেন আই.এস. বিন্দ্রা। তিনি তখন বিসিসিআই-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। বিন্দ্রা ছিলেন অত্যন্ত কৌশলী এবং কূটনীতিতে দক্ষ। ইংল্যান্ডের ভিটো পাওয়ারকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এবং আইসিসি-র ভোটিং প্রক্রিয়ায় ছোট দেশগুলোকে একজোট করার পেছনে তাঁর মস্ত বড় ভূমিকা ছিল।
২. জগমোহন ডালমিয়া : কলকাতার সন্তান এবং বিসিসিআই-এর অন্যতম দিকপাল জগমোহন ডালমিয়া এই মিশনের ‘আর্থিক মস্তিষ্ক’ ছিলেন। ইংল্যান্ডের যুক্তি ছিল যে এশিয়ায় বিশ্বকাপ আয়োজন করলে স্পনসর বা টাকা পাওয়া যাবে না। ডালমিয়া প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে ভারত এবং এশিয়ায় ক্রিকেটের বাজার ইংল্যান্ডের চেয়েও বড়। তিনি ‘রিলায়েন্স’-কে টাইটেল স্পনসর হিসেবে যুক্ত করেছিলেন, যা সেই সময়ের জন্য ছিল এক বিশাল বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
৩. নুর খান : পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের তৎকালীন প্রধান এয়ার মার্শাল নুর খান ছিলেন সালভের প্রধান সহযোগী। সালভে এবং নুর খান একজোট হয়ে Indo-Pak Joint Management Committee অর্থাৎ IPJMC গঠন করেছিলেন। ভারত ও পাকিস্তান এক হওয়ায় আইসিসি-র পক্ষে এই জোটকে অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
৪. গামিনী দিসানায়েক : শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের এই প্রভাবশালী নেতাও সালভের এশীয় ব্লককে সমর্থন করেছিলেন। শ্রীলঙ্কার সমর্থন এশীয় শক্তিকে আরও মজবুত করেছিল।
৫. ইন্দিরা গান্ধী : সরাসরি ক্রিকেটের মাঠে না থাকলেও, পর্দার আড়াল থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থন ছিল সালভের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি সরকারিভাবে গ্যারান্টি দিয়েছিলেন যে বিশ্বকাপের জন্য প্রয়োজনীয় ফরেন এক্সচেঞ্জ এবং নিরাপত্তার সব দায়িত্ব ভারত সরকার নেবে।

১৯৮৭ বিশ্বকাপ মিশনের চার সারথী ছেলেন এন.কে.পি. সালভে, সভাপতি, বিসিসিআই এই আন্দোলনের প্রধান নেতা ও মুখ। ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থন আদায় এবং আইসিসি-র ভোটিংয়ে নেতৃত্ব দেন। জগমোহন ডালমিয়া কোষাধ্যক্ষ, বিসিসিআই। মিশনের আর্থিক কারিগর। রিলায়েন্স-কে স্পনসর হিসেবে আনা এবং টুর্নামেন্টকে লাভজনক করার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন। আই.এস. বিন্দ্রা, যুগ্ম সম্পাদক, বিসিসিআই, দক্ষ কূটনীতিক। ছোট দেশগুলোকে একজোট করা এবং আইসিসি-র নিয়মের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করায় ওস্তাদ ছিলেন। এয়ার মার্শাল নুর খান, সভাপতি, পিসিবি, যৌথ শক্তির প্রতীক। ভারতের সাথে পাকিস্তানের বৈরিতা ভুলে এক টেবিলে আসা নিশ্চিত করেন, যা আইসিসি-কে পিছু হটতে বাধ্য করে। সালভে সাহেব ছিলেন এই আন্দোলনের মুখ, বিন্দ্রা ছিলেন কূটনীতিবিদ, আর ডালমিয়া ছিলেন অর্থনৈতিক কারিগর। এই ত্রয়ী মিলে লর্ডসের সেই শতাব্দী প্রাচীন আধিপত্য চুরমার করে দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছরের মধ্যেই আবার ব্রিটিশদের হার ভারতীয় তিন মূর্তির কাছে।





